ঢাকা ০৬:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

নতুন কমিশনে ফিরছে বিপর্যস্ত পুঁজিবাজার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:১৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • ৭ বার

দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ইতিবাচক ধারায় ফিরছে। অথচ সদ্য বিদায়ী রাশেদ মাকসুদ কমিশনের খামখেয়ালিপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্ধান্ত, নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ ও মার্জিন রুলের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আইপিও খরা, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অবমূল্যায়ন এবং একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল দ্বারা প্রভাবিত হওয়াসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার ধবংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল।
রাশেদ মাকসুদ কমিশনের বিদায়ের পর মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, সুশাসন, নানা কালো আইন বাতিলের মাধ্যমে পুঁজি বাজারের স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশাবাদি ছিলেন বিনিয়োগকারীসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। তবে বাধা হিসেবে ছিলেন রাশেদ মাকসুদ ও তার কমিশন। তার বিদায়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাও ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই বছরের মধ্যে সূচক ও দৈনিক লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই বাজার উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের ধারণা, বিদ্যমান ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরও নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান গতিতে বাজার এগোতে থাকলে ডিএসই’র প্রধান মূল্যসূচক খুব শিগগিরই ৬ হাজার পয়েন্টের মাইলফলক অতিক্রম করবে। একই সঙ্গে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণও ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে বিনিয়োগকারী ও বিএসইসি সংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠন রাশেদ মাকসুদ ও তার কমিশনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে।
গতকাল বাজার সংশোধন হয়। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৮১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ৩০টি ভালো শেয়ারের সমন্বয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট ২ হাজার ১৮২ ৮৪ পয়েন্টে নেমেছে। তবে ডিএসইর শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস প্রায় ২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৮৫ পয়েন্টে উঠেছে।

ডিএসইতে এদিন মোট ১ হাজার ৩৮৮ কোটি ৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৪১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। সে হিসেবে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) লেনদেনে আজ ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট অংশ নেয়। এর মধ্যে ১২৩টির দাম বেড়েছে এবং কমেছে ১০৩টির দাম। আর ২৪টির দাম দিনশেষে অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল লেনদেন শেষে এক্সচেঞ্জটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ২১৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এই বাজারে মোট ৩০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এখনো অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দামে লেনদেন হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ভালো মুনাফার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো শেয়ার কেনার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসার অবস্থা, পরিচালন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ভালোভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং কৃত্রিমভাবে দরপতন ঘটানোর নানা অপচেষ্টা থাকলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই সূচকের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতকাল মঙ্গলবার বাজার সংশোধন হলেও বর্তমান সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন পর নিয়মিতভাবে সূচক বৃদ্ধি, বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকা এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী চক্র নানা গুজব, কৃত্রিম বিক্রির চাপ এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। এর ফলে অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন এবং বাজারের ওপর আস্থা হারান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় একই চক্র আবার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আচরণ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। গুজব বা সাময়িক চাপে আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে বাজারকে কৃত্রিমভাবে নিচে নামানোর প্রচেষ্টা আগের মতো সহজ হচ্ছে না। তারা মনে করছেন, এই পরিবর্তন বাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
তারা আরো বলেন, পুঁজিবাজারে টেকসই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরো জোরদার করতে হবে। অস্বাভাবিক লেনদেন, কৃত্রিম দর নিয়ন্ত্রণ, গুজব ছড়ানো এবং সঙ্ঘবদ্ধভাবে বাজারে প্রভাব বিস্তারের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সাথে বিনিয়োগকারীদেরও যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমলেও এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে নেয়ার পরিবর্তে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার ধরে রাখেন। ফলে লেনদেন কমলেও সূচক বাড়তে পারে। বর্তমান বাজারেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বৃদ্ধি, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করতে হবে।
তাদের মতে, পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা গুজব ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা জরুরি। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরো নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরতে পারেন। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও বাড়তে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক লেনদেন দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। বিভিন্ন অপচেষ্টা সত্ত্বেও সূচকের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করছে যে বাজার ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ও ইতিবাচক ধারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রাশেদ মাকসুদ কমিশন নানা কালো আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের পুঁজি বাজারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। একই সঙ্গে এই কমিশনের ভুল-নীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিএসইসি এবং বিনিয়োগকারীরা বিপর্যস্ত। তাই অবিলম্বে মাকসুদ কমিশনের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন তিনি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

নতুন কমিশনে ফিরছে বিপর্যস্ত পুঁজিবাজার

আপডেট টাইম : ০১:১৮:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে ইতিবাচক ধারায় ফিরছে। অথচ সদ্য বিদায়ী রাশেদ মাকসুদ কমিশনের খামখেয়ালিপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্ধান্ত, নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ ও মার্জিন রুলের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আইপিও খরা, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অবমূল্যায়ন এবং একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল দ্বারা প্রভাবিত হওয়াসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার ধবংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল।
রাশেদ মাকসুদ কমিশনের বিদায়ের পর মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, সুশাসন, নানা কালো আইন বাতিলের মাধ্যমে পুঁজি বাজারের স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশাবাদি ছিলেন বিনিয়োগকারীসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। তবে বাধা হিসেবে ছিলেন রাশেদ মাকসুদ ও তার কমিশন। তার বিদায়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাও ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই বছরের মধ্যে সূচক ও দৈনিক লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই বাজার উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের ধারণা, বিদ্যমান ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরও নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান গতিতে বাজার এগোতে থাকলে ডিএসই’র প্রধান মূল্যসূচক খুব শিগগিরই ৬ হাজার পয়েন্টের মাইলফলক অতিক্রম করবে। একই সঙ্গে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণও ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে বিনিয়োগকারী ও বিএসইসি সংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠন রাশেদ মাকসুদ ও তার কমিশনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে।
গতকাল বাজার সংশোধন হয়। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৮১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ৩০টি ভালো শেয়ারের সমন্বয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট ২ হাজার ১৮২ ৮৪ পয়েন্টে নেমেছে। তবে ডিএসইর শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস প্রায় ২ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৮৫ পয়েন্টে উঠেছে।

ডিএসইতে এদিন মোট ১ হাজার ৩৮৮ কোটি ৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৪১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। সে হিসেবে এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) লেনদেনে আজ ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট অংশ নেয়। এর মধ্যে ১২৩টির দাম বেড়েছে এবং কমেছে ১০৩টির দাম। আর ২৪টির দাম দিনশেষে অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল লেনদেন শেষে এক্সচেঞ্জটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২৪ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ২১৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এই বাজারে মোট ৩০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এখনো অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দামে লেনদেন হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ভালো মুনাফার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তারা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো শেয়ার কেনার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসার অবস্থা, পরিচালন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ভালোভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং কৃত্রিমভাবে দরপতন ঘটানোর নানা অপচেষ্টা থাকলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধির কারণে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয় বাজারেই সূচকের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতকাল মঙ্গলবার বাজার সংশোধন হলেও বর্তমান সময়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন পর নিয়মিতভাবে সূচক বৃদ্ধি, বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকা এবং বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী চক্র নানা গুজব, কৃত্রিম বিক্রির চাপ এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। এর ফলে অসংখ্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন এবং বাজারের ওপর আস্থা হারান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় একই চক্র আবার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আচরণ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। গুজব বা সাময়িক চাপে আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে বাজারকে কৃত্রিমভাবে নিচে নামানোর প্রচেষ্টা আগের মতো সহজ হচ্ছে না। তারা মনে করছেন, এই পরিবর্তন বাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
তারা আরো বলেন, পুঁজিবাজারে টেকসই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরো জোরদার করতে হবে। অস্বাভাবিক লেনদেন, কৃত্রিম দর নিয়ন্ত্রণ, গুজব ছড়ানো এবং সঙ্ঘবদ্ধভাবে বাজারে প্রভাব বিস্তারের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সাথে বিনিয়োগকারীদেরও যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমলেও এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে নেয়ার পরিবর্তে ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার ধরে রাখেন। ফলে লেনদেন কমলেও সূচক বাড়তে পারে। বর্তমান বাজারেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বৃদ্ধি, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করতে হবে।
তাদের মতে, পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা সৃষ্টি কিংবা গুজব ছড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা জরুরি। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে আরো নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে ফিরতে পারেন। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও বাড়তে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক লেনদেন দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। বিভিন্ন অপচেষ্টা সত্ত্বেও সূচকের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করছে যে বাজার ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ও ইতিবাচক ধারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রাশেদ মাকসুদ কমিশন নানা কালো আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের পুঁজি বাজারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। একই সঙ্গে এই কমিশনের ভুল-নীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিএসইসি এবং বিনিয়োগকারীরা বিপর্যস্ত। তাই অবিলম্বে মাকসুদ কমিশনের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন তিনি।