চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিরা নামেই এমপি পদে বহাল রয়েছেন। অনেকাংশে ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ অবস্থা। চট্টগ্রামের তিন নারী এমপি হলেন, মাহজাবীন মোর্শেদ, সাবিহা মুসা ও ওয়াসিকা আয়েশা খান।
নারী এমপিদের অভিযোগ, স্বল্প অনুদানে চট্টগ্রামের নারী এমপিদের এলাকার উন্নয়নে নেই কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ। গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়নে থোক বরাদ্দও রয়েছে নামমাত্র। অধিকাংশ এলাকায় নির্বাচিত এমপির সঙ্গে সংরক্ষিত নারী-এমপির দ্বন্দ্ব তাই চরমে।
তবে রাজনীতি বিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অনেকেই বলেছেন, সংসদে বর্তমানে সংরক্ষিত আসনে ৭২ জন এমপি রয়েছেন। আমাদের সংরক্ষিত পদ্ধতিই ত্রুটিপূর্ণ বলে জানান তারা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, এ ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা না গেলে সংরক্ষিত আসনের নারী-এমপিরা কোনো সুফল পাবেন না। আমরা চাই নারীর ক্ষমতায়ন। নারীকে অবহেলা নয়। কিন্তু সংরক্ষিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। নারীকে ক্ষমতায়ন করতে হবে। জনগণের কাছে জবাবদিহিও করতে হবে সংরক্ষিত নারী-এমপিদের।
জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী এমপিদের প্রাপ্ত সুবিধার মধ্যে রয়েছে, শুল্কমুক্ত একটি গাড়ি, নির্বাচিত এমপিদের এক-তৃতীয়াংশ পরিমান টিআর-কাবিখা, সব মিলিয়ে এক লাখ টাকা বেতন-ভাতা, তিনমাস পর পর ঐচ্ছিক অনুদান তিন লাখ টাকা ও ন্যাম ভবনে থাকার সুযোগ-সুবিধা।
কিন্তু নারী এমপিরা মনে করছেন, একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাদের ক্ষমতা ও কাজের বিস্তর ফারাক রয়েছে। সংসদে তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হলেও সম্পূর্ণ সংসদ সদস্যের ক্ষমতা উপভোগ করতে পারেন না তারা। জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও বরাদ্দ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা, এলাকার প্রভাব সবদিক দিয়ে নির্বাচিতদের চেয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিরা।
নারী এমপিদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চট্টগ্রাম যেহেতু একটা রক্ষণশীল এলাকা সেহেতু এখানে নারীদের অগ্রাধিকারকে পুরুষরা এখনো ভালোভাবে দেখেন না। অনুষ্ঠানে কথার ছলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এমপিদের অনেকেরই মানসিকতা এখনো পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার মধ্যে ডুবে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, নামেই এমপি তারা। তাদের অবস্থা অনেকটা দুয়ো রানীর মতো। সংসদে তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। সংসদের বিভিন্ন অধিবেশনে নারী এমপিরা ফ্লোর পান কম। দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংরক্ষিত আসনের এমপিদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এলাকায় ঘেঁষতে দেন না, উল্টো টিজ করেন, কীভাবে তাদের অসহযোগিতা করা যায় সে চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন।
এমনও দেখা গেছে, সংরক্ষিত আসনের একজন এমপিকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অনেকে আবার নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পেলেও স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করে টিকে থাকতে হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মাহজাবীন মোর্শেদ জানান, আমার সাথে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনের নির্বাচিত এমপিদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কখনো হয়নি। সেটা হয়তোবা আমার ব্যক্তিগত গুণাবলীর জন্যই হয়েছে যে, আমি সহনশীল। চাইলে তারা আমাকে হেয়-তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য দেখাতে পারে না। তবে আমরা নির্বাচিত এমপিদের চেয়ে সুযোগ-সুবিধায় অনেক পিছিয়ে।
মাহজাবীন মোর্শেদ আরো বলেন, অনুদানের যে টাকা আমরা পাই তা খুবই সামান্য। এ টাকায় এলাকার সিকিভাগ উন্নয়ন করাও সম্ভব হয়না। আর টিআর, কাবিখার বরাদ্দ আসে থোক থোক করে। আর চাহিদার তুলনায় এ বরাদ্দ অনেক কম। ক্ষুদ্র বরাদ্দ নিয়ে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা পুরণ করতে পারিনা বলে নিজের কাছে খুব ছোট লাগে। তখন ব্যক্তিগতভাবেই এলাকাবাসীকে সাহায্য করার চেষ্টা করি।
তবে মাহজাবীন মোর্শেদ আরো বলেন, সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের এমন সুযোগ দেওয়া উচিত তারা যেন এলাকার নির্বাচিত এমপির সাথে সংযুক্ত হতে পারে। কারণ যত চিনি, তত মধু। তাই সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের জন্য অনুদান বাড়ানোর উপরই জোর দেন তিনি।
চট্টগ্রামের আরেক সংরক্ষিত আসনের নারী এমপি সাবিহা মুসা। তাকে এলাকার উন্নয়নে তেমন সক্রিয় হতে দেখেননি এলাকাবাসী। তবে তাকে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে দেখা যায়। এমপি হবার পর প্রথম দিকে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির ডাক পড়লেও এখন আর তেমন ডাক পড়ে না বলে জানিয়েছেন তার কাছের মানুষদের অনেকেই। কারণ বক্তৃতা দিয়ে দর্শক মনোযোগ করার আকর্ষণ কম বলে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির তালিকায় কদর কমেছে বলে জানা গেছে অনুষ্ঠান আয়োজকদের কাছ থেকে।
তবে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বর্ষপূর্তি পালনের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সমাবেশে নগর কমিটির কয়েকজন সহ-সভাপতি ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং নির্বাহী কমিটির বেশ কিছু সদস্য সমাবেশে অনুপস্থিত থাকলেও উপস্থিত ছিলেন এমপি সাবিহা মুসা। নগর আওয়ামীলীগের খোরশেদ আলম সুজন তার বক্তৃতায় সাবিহা মুসাকে এজন্য ধন্যবাদও দেন।
এদিকে সাবিহা মুসা এমপি হবার আগের প্রত্যয় ও পরের প্রত্যাশার ফারাক জানাতে গিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সংরক্ষিত আসনের এমপি বানিয়েছিলেন, এটি আমার সৌভাগ্য। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর দেখলাম আমার পদটাই পরে আছে। লজিস্টিক সাপোর্ট একেবারই নেই। এতো কম অনুদানে এলাকায় উন্নয়ন করা তো দূরে থাক, মুখ দেখানোই অনেকটা দায় হয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, যোগ্য নারীদের কেউ বাধা দিয়ে আটকে রাখতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী আমাদের এমপি বানিয়েছেন। তার নির্দেশ মেনেই আমরা এলাকায় যতটুকু পারছি কাজ করছি।
অবশ্য নিজেদের কাজের ব্যাপারে নিজের মনোবলটাই বড় বলে জানিয়েছেন ওয়াশিকা আয়েশা খান। তিনি বলেন, একজন পুরুষ এমপির চেয়ে নারী এমপি অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে মিশতে সক্ষম।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমাদের দেশে অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নারী। নারীরা একজন নারী জনপ্রতিনিধির কাছে যেভাবে মন খুলে কথা বলতে পারেন, দাবি করতে পারেন সেটা পুরুষদের সঙ্গে পারেন না। তবে বাজেট এবং টিআর, কাবিখার মতো প্রকল্পের বরাদ্দের ক্ষেত্রে নির্বাচিত এমপিদের তিন ভাগের এক ভাগ পেয়ে থাকেন সংরক্ষিত এমপিরা। অথচ একজন সংরক্ষিত আসনের এমপির দায়িত্ব থাকে ছয়টা বা সাতটা উপজেলায়। বিপরীতে অধিকাংশ নির্বাচিত এমপির নির্বাচনী আসনের এলাকা থাকে দুই থেকে তিনটি উপজেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাজেট বরাদ্দ বেশি হলে নারী এমপিরা আরও বেশি জনগণের উপকার করতে পারবে বলে মনে করেন ওয়াশিকা আয়েশা খান।
Reporter Name 
























