ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলনবিল পাখির কলকাকলীতে মুখরিত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:২৭:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৮৮ বার

বিভিন্ন জাতের পাখির আগমনে চলনবিল এলাকা এখন মুখরিত হয়ে উঠেছে। ভোরের আলো ফুটতেই ডানা মেলে উড়তে শুরু করে শামুকখোলের দল। কেউ খাবারের খোঁজে যায়, কেউ ফিরে আসে বাসায়। দীঘিপাড়ের গাছের ডালে ডালে তাদের আনাগোনা। ছানাদের কিচিরমিচির আর পাখির ডানার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামের এমন দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি এখন ‘পাখির গ্রাম’ নামে পরিচিত। তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে চলনবিলের পূর্বপাশে উলিপুর গ্রামের অবস্থান।

এলাকাবাসীরা জানান, প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি দীঘিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রামটি। গত কয়েক বছর ধরেই দীঘিপাড়ের বটগাছসহ বিভিন্ন গাছে বাসা বেঁধেছে শত শত শামুকখোল পাখি। জায়গাটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান।

শামুকখোলের পাশাপাশি গ্রামটিতে দেখা মেলে ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির, কোড়া, লালশির, বড় সরালি ও ছোট সরালিসহ নানা প্রজাতির পাখির। গ্রামের মাঠজুড়েও চোখে পড়ে ডাহুক, গাঙচিল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, চখাচখি, কাদাখোঁচা, মাছরাঙা ও সারস। এ ছাড়া রয়েছে আরও অনেক নাম না জানা পাখি।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীঘিপাড়ের গাছগুলোতে বসতি গড়েছে শত শত শামুকখোল। কোনোটি গাছের কচি পাতায় ঠোকর দিচ্ছে, কোনোটি ডালে বসে ছানাদের আগলে রাখছে, খাওয়াচ্ছে খাবার। আবার কোনোটি উড়ে যাচ্ছে এক ডাল থেকে অন্য ডালে। গাছের নিচে দাঁড়ালে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় একের পর এক পাখি।
এই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, তিন-চার বছর আগে অল্প কিছু শামুকখোল এখানে এসে বসবাস ও বাসা বাঁধতে শুরু করে। প্রতি বছর ডিম ফুটে বাচ্চা জন্ম নেওয়ায় পাখির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। এখন পাখি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন।

এলাকাবাসীরা জানান, গ্রামের কেউ পাখিদের ওপর অত্যাচার করেন না, শিকারও করেন না। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে।
একই গ্রামের সজীব সরকার বলেন, প্রতিটি বাড়ির আশপাশের গাছগুলোতে পাখিরা বাস করে। দিন-রাত তাদের বিচরণ দেখতে ভালো লাগে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পাখি দেখতে আসেন। ছবি তোলেন, ভিডিও করেন। পাখিদের নিরাপত্তায় সরকার আরও ব্যবস্থা নিলে ভালো হবে। পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন জীবনের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক নাসিম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

পাখি সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন ‘দ্য বার্ড সেফটি হাউস’-এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, উলিপুরের পাখিগুলো এশীয় শামুকখোল। প্রজাতিটি সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকাভুক্ত। পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ থাকায় পাখিগুলো এখানে বসবাসের পাশাপাশি বংশবিস্তারও করছে। উঁচু গাছগুলো তাদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করছে। তাই পাখিদের আবাসস্থল রক্ষায় গাছগুলো কাটা থেকে বিরত থাকা উচিত।

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী শামুকখোলের প্রধান খাবার। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পাখি দেখা যায়। উপযুক্ত আবহাওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ থাকায় শামুকখোল পাখিগুলো এখানে বসবাস করছে।

এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান ইনকিলাবকে জানান, উলিপুরে পাখির উপস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জায়গাটিকে কীভাবে পাখির অভয়ারণ্য করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ যেন পাখি নিধন বা শিকার করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

চলনবিল পাখির কলকাকলীতে মুখরিত

আপডেট টাইম : ০৩:২৭:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

বিভিন্ন জাতের পাখির আগমনে চলনবিল এলাকা এখন মুখরিত হয়ে উঠেছে। ভোরের আলো ফুটতেই ডানা মেলে উড়তে শুরু করে শামুকখোলের দল। কেউ খাবারের খোঁজে যায়, কেউ ফিরে আসে বাসায়। দীঘিপাড়ের গাছের ডালে ডালে তাদের আনাগোনা। ছানাদের কিচিরমিচির আর পাখির ডানার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামের এমন দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। স্থানীয়দের কাছে গ্রামটি এখন ‘পাখির গ্রাম’ নামে পরিচিত। তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে চলনবিলের পূর্বপাশে উলিপুর গ্রামের অবস্থান।

এলাকাবাসীরা জানান, প্রায় ১০০ বিঘা আয়তনের একটি দীঘিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গ্রামটি। গত কয়েক বছর ধরেই দীঘিপাড়ের বটগাছসহ বিভিন্ন গাছে বাসা বেঁধেছে শত শত শামুকখোল পাখি। জায়গাটিকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান।

শামুকখোলের পাশাপাশি গ্রামটিতে দেখা মেলে ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির, কোড়া, লালশির, বড় সরালি ও ছোট সরালিসহ নানা প্রজাতির পাখির। গ্রামের মাঠজুড়েও চোখে পড়ে ডাহুক, গাঙচিল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, চখাচখি, কাদাখোঁচা, মাছরাঙা ও সারস। এ ছাড়া রয়েছে আরও অনেক নাম না জানা পাখি।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীঘিপাড়ের গাছগুলোতে বসতি গড়েছে শত শত শামুকখোল। কোনোটি গাছের কচি পাতায় ঠোকর দিচ্ছে, কোনোটি ডালে বসে ছানাদের আগলে রাখছে, খাওয়াচ্ছে খাবার। আবার কোনোটি উড়ে যাচ্ছে এক ডাল থেকে অন্য ডালে। গাছের নিচে দাঁড়ালে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় একের পর এক পাখি।
এই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, তিন-চার বছর আগে অল্প কিছু শামুকখোল এখানে এসে বসবাস ও বাসা বাঁধতে শুরু করে। প্রতি বছর ডিম ফুটে বাচ্চা জন্ম নেওয়ায় পাখির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। এখন পাখি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসেন।

এলাকাবাসীরা জানান, গ্রামের কেউ পাখিদের ওপর অত্যাচার করেন না, শিকারও করেন না। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে।
একই গ্রামের সজীব সরকার বলেন, প্রতিটি বাড়ির আশপাশের গাছগুলোতে পাখিরা বাস করে। দিন-রাত তাদের বিচরণ দেখতে ভালো লাগে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পাখি দেখতে আসেন। ছবি তোলেন, ভিডিও করেন। পাখিদের নিরাপত্তায় সরকার আরও ব্যবস্থা নিলে ভালো হবে। পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন জীবনের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক নাসিম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

পাখি সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন ‘দ্য বার্ড সেফটি হাউস’-এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, উলিপুরের পাখিগুলো এশীয় শামুকখোল। প্রজাতিটি সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকাভুক্ত। পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ থাকায় পাখিগুলো এখানে বসবাসের পাশাপাশি বংশবিস্তারও করছে। উঁচু গাছগুলো তাদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করছে। তাই পাখিদের আবাসস্থল রক্ষায় গাছগুলো কাটা থেকে বিরত থাকা উচিত।

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী শামুকখোলের প্রধান খাবার। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পাখি দেখা যায়। উপযুক্ত আবহাওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ থাকায় শামুকখোল পাখিগুলো এখানে বসবাস করছে।

এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান ইনকিলাবকে জানান, উলিপুরে পাখির উপস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জায়গাটিকে কীভাবে পাখির অভয়ারণ্য করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ যেন পাখি নিধন বা শিকার করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে।