ঢাকা ০৯:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে ব্রিকসের সম্পর্ক, বিভাজন প্রকাশ্যে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৭:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৭ বার

ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের মধ্যে নিজেদের সম্পর্ক ও কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করছে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলো। ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে চীন, রাশিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ জোটের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতারা একত্র হলেও নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ব্রিকসের দেশগুলোকে ক্রমেই ‘নিয়ম মেনে চলা দেশ’ থেকে ‘নিয়ম নির্ধারণকারী দেশে’ পরিণত হতে হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং ইউএইর আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ নেতারা এতে অংশ নেন।

তবে ব্রিকসের সদস্যদের সবাইকে স্বাভাবিক মিত্র বলা কঠিন। ২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল। আবার মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরান ও ইউএই ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ফলে সম্মেলনটি যেমন কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও সামনে এনেছে।

চীন, রাশিয়া ও ইরানের কাছে ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা প্রভাব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হলেও ভারত জোটটিকে পশ্চিমবিরোধী হিসেবে দেখতে চায় না। নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে বলেন, ব্রিকস ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াতের মতে, কিছু দেশ ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত করতে চাইলেও ভারত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

মতপার্থক্যের মধ্যেও সম্মেলনে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানানো এবং বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানানো হলেও কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই। বাণিজ্য ইস্যুতেও বাড়তে থাকা শুল্ক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি বলা হয়নি।

সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদের বৈঠক। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের মুখোমুখি বৈঠক বলে মনে করা হচ্ছে। ইরান এ বৈঠকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও নিজেকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয়—এমন বার্তা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

অন্যদিকে, সাত বছর পর দিল্লিতে যান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ভারত-চীন সম্পর্কের পুরোনো অবিশ্বাস কিছুটা কমলেও বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা। দুই নেতা ব্যবসা, যোগাযোগব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক বাধা কমানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে সম্মেলনটি দেখিয়েছে, পশ্চিমা-প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠছে। তবে ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে জোটটি শেষ পর্যন্ত কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: বিবিসি

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে ব্রিকসের সম্পর্ক, বিভাজন প্রকাশ্যে

আপডেট টাইম : ১০:৪৭:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের মধ্যে নিজেদের সম্পর্ক ও কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করছে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলো। ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে চীন, রাশিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ জোটের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতারা একত্র হলেও নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ব্রিকসের দেশগুলোকে ক্রমেই ‘নিয়ম মেনে চলা দেশ’ থেকে ‘নিয়ম নির্ধারণকারী দেশে’ পরিণত হতে হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং ইউএইর আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ নেতারা এতে অংশ নেন।

তবে ব্রিকসের সদস্যদের সবাইকে স্বাভাবিক মিত্র বলা কঠিন। ২০২০ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল। আবার মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরান ও ইউএই ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ফলে সম্মেলনটি যেমন কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও সামনে এনেছে।

চীন, রাশিয়া ও ইরানের কাছে ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা প্রভাব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হলেও ভারত জোটটিকে পশ্চিমবিরোধী হিসেবে দেখতে চায় না। নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে বলেন, ব্রিকস ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়াতের মতে, কিছু দেশ ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত করতে চাইলেও ভারত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

মতপার্থক্যের মধ্যেও সম্মেলনে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানানো এবং বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানানো হলেও কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই। বাণিজ্য ইস্যুতেও বাড়তে থাকা শুল্ক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি বলা হয়নি।

সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদের বৈঠক। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের মুখোমুখি বৈঠক বলে মনে করা হচ্ছে। ইরান এ বৈঠকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও নিজেকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয়—এমন বার্তা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

অন্যদিকে, সাত বছর পর দিল্লিতে যান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ভারত-চীন সম্পর্কের পুরোনো অবিশ্বাস কিছুটা কমলেও বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা। দুই নেতা ব্যবসা, যোগাযোগব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক বাধা কমানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে সম্মেলনটি দেখিয়েছে, পশ্চিমা-প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠছে। তবে ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে জোটটি শেষ পর্যন্ত কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: বিবিসি