রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য রয়েছে ফুট ওভারব্রিজ। কিন্তু এসবের কোনওটিতে দোকানপাট বসিয়ে চলাচল কঠিন করে তোলা হয়েছে, কোনওটিতে ভাসমান মানুষ ও মাদকাসক্তদের আস্তানা। কোথাও আবার দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের জন্য বন্ধ। ফলে পথচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। ব্যস্ত কিছু এলাকায় আবার এসব ওভারব্রিজের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব স্থাপনা কতটা পথচারীবান্ধব ও কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কয়েকটি ফুট ওভারব্রিজ সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কোথাও ব্যস্ত, কোথাও ফাঁকা
মিরপুর ১ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১০ নম্বর গোলচত্বরের পথে রয়েছে চারটি ওভারব্রিজ। এর মধ্যে মিরপুর ১ নম্বর ও ১০ নম্বরের ব্রিজে পথচারীদের চলাচল বেশি। তবে ১০ নম্বরের ব্রিজটি সংস্কারকাজের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ।
অপরদিকে মিরপুর ২ নম্বরের সনি হলের পাশে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের সামনে থাকা ওভারব্রিজে সারাদিনে হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ পারাপার হন। শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশের ব্রিজেও পথচারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। এর মধ্যে দুটি ব্রিজেই অবস্থান নিয়েছেন ভাসমান মানুষ।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সেহরান সোবহান আদিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ওভারব্রিজগুলো এখনো ব্যাকডেটেড। অনেক কনজাস্টেড। জনসংখ্যার তুলনায় এগুলো আরও প্রশস্ত করা উচিত। আবার বিভিন্ন ব্যানারে প্রায় ঢেকে থাকে ব্রিজের চারপাশ। এতে দেখতে খারাপ লাগার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়ও থাকে।’
মিরপুর ১ নম্বরের ওভারব্রিজে চার বছর ধরে মোবাইল সিম বিক্রি করেন মো. মিজান। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকজন মাঝেমধ্যে তুলে দেয়, আবার বসি। তাদের কাজই তো তুলে দেওয়া। আমরা আবার বসি।’
ওই ব্রিজ দিয়ে চলাচলকারী শিক্ষার্থী রামিম রহমান জুনায়েদ বলেন, ‘আমি সাধারণত ওভারব্রিজ দিয়েই রাস্তা পার হই। তবে বেশিরভাগ ওভারব্রিজের অবস্থা ভালো না। নেশাখোরদের আড্ডা থাকে কিংবা দোকানপাটে ভরা থাকে। এতে চলাচলে সমস্যা হয়, আনসেফ ফিল করি।’
হৃদি রহমান বৃষ্টির ভাষ্য, দিনের বেলা কষ্ট হলেও ওভারব্রিজ দিয়ে চলাচল করা যায়। তবে সন্ধ্যার পর আলো ঠিক না থাকায় এবং ‘আজেবাজে লোকজন’ থাকায় ভয় লাগে।
মিরপুর ২ নম্বরের একটি ওভারব্রিজের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর হুসাইন বলেন, ‘এখানে আসলে ওভারব্রিজের কোনও প্রয়োজন নেই। এখান দিয়ে কাউকে পার হতেও দেখি না। উল্টো রাতে আড্ডা হয়। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে টাকা খরচ করা উচিত।’
মিরপুর ১০-এ তিন মাস ধরে বন্ধ
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি। চার রাস্তার মোড় হওয়ায় এখানকার ওভারব্রিজ দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ পারাপার হন।
জুলাই আন্দোলনের সময় ব্রিজের নিচে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হলে ওভারব্রিজটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মেরামতের কাজ শুরু করেছে। তবে প্রায় তিন মাস ধরে কাজ চলায় ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারীরা।
ওভারব্রিজের নিচে জুতা সেলাই করা প্রকাশ দাস বলেন, ‘পূর্ব পাশে ওঠা বন্ধ করে মেরামতের কাজ চলছে তিন মাসের বেশি হয়েছে। এখন পশ্চিম পাশও বন্ধ করেছে আড়াই মাসের বেশি। সাইনবোর্ড লাগিয়ে রেখেছে যে কাজ চলছে। কিন্তু কাজ শেষ হয় না।’
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সিরাজ সরদার বলেন, ‘এতদিন ধরে বন্ধ করে রেখে মানুষকে বিপদে ফেলেছে। সবাই এখন নিচ দিয়ে রাস্তা পার হয়। কাজও নিয়মিত হয় না।’
পথচারী আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া ভালো কাজ। তবে দ্রুত শেষ করা উচিত। এর সঙ্গে মানুষের জনজীবন সম্পৃক্ত।’
আরেক পথচারী মহসিন রেজা বলেন, ‘রাস্তাটা সবসময় ব্যস্ত থাকে। এই ওভারব্রিজ দিয়ে প্রচুর মানুষ পারাপার হয়। এখন পারতে না পারায় যেকোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
তবে দায়িত্বে থাকা এক ট্রাফিক পুলিশ বলেন, মানুষ অনেক সময় ওভারব্রিজ থাকলেও নিচ দিয়ে রাস্তা পার হতে চান। তার ভাষ্য, পুলিশ ওভারব্রিজ ব্যবহারের জন্য পথচারীদের বললেও অনেকে তা মানেন না।
ওভারব্রিজ যেন মিনি শপিংমল
ফার্মগেট মোড়ের ওভারব্রিজে উঠলে মনে হয় ছোটখাটো একটি বাজার। নারী, পুরুষ ও শিশুদের পোশাক, গয়না, বেল্ট, মোজা, ব্যাগ, সানগ্লাস, খেলনা, সুগন্ধি, চুলের ব্যান্ড-ক্লিপ, হেডফোন-চার্জারসহ নানা পণ্য বিক্রি হচ্ছে। রয়েছে বাদাম, আমড়া, ছোলা, ঝালমুড়ি, সিম বিক্রি ও ওজন মাপার ব্যবস্থা। এমনকি বসানো হয়েছে পাঞ্চিং বক্সও।
ঢাকা মহানগর পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬-এর ৬৯ ধারায় রাস্তা বা জনসাধারণের স্থানে বিধিবহির্ভূতভাবে পণ্য প্রদর্শন বা বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখার শাস্তির বিধান রয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ফার্মগেটের ব্রিজের দুটি এস্কেলেটরের একটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সেটি বাঁশ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।
তিন বছর ধরে সেখানে ব্যবসা করা এক বিক্রেতা বলেন, ‘কখনও কেউ উঠিয়ে দেয়নি।’
আরেক বিক্রেতা মো. রিয়াজ বলেন, ‘যারা এখানে পার্মানেন্ট ব্যবসা করে, তাদের উঠায় না। ভ্রাম্যমাণদের উঠিয়ে দেয়। তবে ভিআইপি মুভমেন্ট থাকলে পুলিশ আমাদের সরিয়ে দেয়।’
পথচারী কাওসার হোসেন বলেন, ‘এটা তো একটা মার্কেট। ব্রিজে এমনিতেই মানুষ বেশি, তার ওপর দোকানপাটে ভর্তি। হাঁটব কোথা দিয়ে? মাঝে মাঝে জ্যামও লাগে।’
সামসুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রিজটা আগের চেয়ে চওড়া করে বানানো হলো। অথচ দোকানে ভরে গেল। দুটি এস্কেলেটরের একটি ছয় মাসের বেশি সময় ধরে নষ্ট।’
হাসপাতালের সামনের ব্রিজেও ভোগান্তি
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনের ওভারব্রিজেও একই চিত্র। হাসপাতালের গেটের পাশের এস্কেলেটরটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। বাঁশ ও গাছের ডাল দিয়ে সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। হেঁটে ওঠার সিঁড়ির সামনেও ময়লা জমে আছে। অন্য পাশের এস্কেলেটরটি কখনও চলে, কখনও বন্ধ থাকে। ব্রিজের ওপর অবস্থান নিয়েছেন ভাসমান মানুষ।
অসুস্থ রোগী ও স্বজনদেরও এই ব্রিজ ব্যবহার করতে হয়। ফলে অচল এস্কেলেটর, ময়লা ও ভাসমান মানুষের অবস্থান তাদের ভোগান্তি আরও বাড়াচ্ছে।
সংস্কারের পরও ব্যবহার কম
শুধু অচল বা দখল নয়, সংস্কারের পরও কিছু ওভারব্রিজের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরীবাগের ওভারব্রিজটি দীর্ঘদিন চলাচলের অযোগ্য থাকার পর সম্প্রতি সংস্কার করে চালু করা হয়েছে। তবে সেখানে পথচারীর চলাচল কম। বর্তমানে ব্রিজটিতে অবস্থান করছেন ভাসমান মানুষ।
‘নিয়মিত নজরদারি করা হয়’
ফার্মগেট ও আসাদগেটসহ এসব এলাকার ওভারব্রিজে পথচারীদের নিরাপত্তা ও অবৈধ দোকানপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ওভারব্রিজগুলোকে টার্গেট করে এসি পেট্রোল পিআইয়ের মাধ্যমে কাজ করি, যাতে সেখানে স্থায়ীভাবে দোকানপাট বসতে না পারে। এ বিষয়গুলো নিয়মিত নজরদারি ও মনিটরিং করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওভারব্রিজ ও এর আশপাশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটর করতে টহল টিমগুলোকে বলা হয়। তারা সেখানে ওঠানামাকারীদের ওপরও নজর রাখে।’
ফার্মগেট ও আসাদগেট ওভারব্রিজের চিত্র জানালে ডিসি মিজান বলেন, ‘ফার্মগেট ওভারব্রিজের বিষয়ে আমি এখনই আমাদের টিম পাঠাচ্ছি। আশপাশে আমাদের টিম আছে। আর আজ সন্ধ্যায় আসাদগেটে টিম পাঠাবো এবং অভিযান হবে।’
Reporter Name 

























