ঢাকা ১১:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ঢাকার যানজট নিরসনে ৭ নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ডের আশ্বাস দিয়ে ৬০ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ জ্বালানি সংকট ১৭ বছরের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া: তিতুমীর মন্ত্রিসভায় সোমবার ফাইল উঠলে বৃহস্পতিবারই গেজেট ছয় মাসে দেশে কোনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাসনাত আব্দুল্লাহর দুঃখ প্রকাশের পর কওমি ছাত্রদের কর্মসূচি প্রত্যাহার বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে গুম সবচেয়ে ভয়ংকর: প্রধানমন্ত্রী জনগণকে নিয়ে অপরাধ দমনের জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশ আইজিপির জলের বুকে লাল শাপলার নকশিকাঁথা শাড়িকাণ্ডের আরেক মামলায় তিশার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ, নারাজি দেবেন বাদী

জলের বুকে লাল শাপলার নকশিকাঁথা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৫১:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩ বার
সকালের নরম রোদে টলটল পানি। তাতে ফুটে রয়েছে শাপলা। যেন বিছিয়ে রাখা হয়েছে লাল-সবুজ নকশিকাঁথা। ভোরের আলোয় সেই নকশিকাঁথার বুক চিরে এগিয়ে চলে ছোট ছোট নৌকা। বাতাসে দুলতে থাকা অগণিত শাপলা, মৃদু ঢেউ আর চারপাশে পাখির ডাক–সব মিলিয়ে বরিশালের উজিরপুরের সাতলা বিল হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক মায়াময় চিত্রকর্ম। মায়াবী এ রূপের টানেই প্রতিবছর দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো মানুষ।
তবে সাতলার এই সৌন্দর্য শুধু চোখ জুড়ানোর নয়, স্থানীয় মানুষের আয়েরও উৎস হয়ে উঠেছে। শাপলা দেখতে আসা পর্যটকদের নিয়ে অর্ধশতাধিক নৌকা চলে বিলে; শাপলা বিক্রি করেও আয় করেন স্থানীয়রা।
নতুন সাজে সাতলার শাপলা বিল
প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে নতুন সাজ। সাতলার শাপলার বিলকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে প্রবেশদ্বারে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন গেট ও ভিউ পয়েন্ট। পাশাপাশি পর্যটকদের নৌভ্রমণ ও চলাচলের সুবিধায় ঘাটলাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। ফলে লাল শাপলার নকশিকাঁথার ওপর এখন আঁকা হচ্ছে সম্ভাবনাময় স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ছবি।
গত বছর ১৫ লাখ ও চলতি বছর ৫ লাখ টাকার কাজ হচ্ছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়ি দুটি ভিউ পয়েন্ট। বর্তমানে মুড়িবাড়ি ভিউ পয়েন্টে তোরণ নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। শুধু টাইলসের কাজ রয়েছে; যা চলতি সপ্তাহে শেষ হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থাও করা হবে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুরের পর্যটন সম্ভাবনাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে সাতলা বিলে দশ হাজার একরজুড়ে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলের সৌন্দর্য নিয়ে স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র তৈরি এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের আশা, পরিকল্পিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাতলার শাপলার বিল আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই সাতলার বিল পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র হলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় নানা ভোগান্তিতে পড়তে হতো দর্শনার্থীদের। নতুন গেট, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মিত হলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় নৌকার মাঝি চয়ন (৩৫) বলেন, ‘শাপলা ফোটার সময় প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। পর্যটক বাড়লে নৌকা চালানো, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রি– সবকিছুর ব্যবসা বাড়বে। অনেক পরিবার এ থেকে আয় করতে পারবে।’
বিল ঘিরে আয়ের উৎস
সাতলার লাল শাপলার বিল এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের নকশিকাঁথা নয়, স্থানীয় মানুষের আয়েরও একটি মৌসুমি ক্ষেত্র। শাপলা ফোটার মৌসুমে বিলে পর্যটকদের ঘোরাতে চারটি স্পটে অর্ধশতাধিক নৌকা চলাচল করে। দিনে তাদের সম্মিলিত দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস নৌকা চলাচল ধরে হিসাব করলে মৌসুমে মোট আয় হয় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।
নৌকার মাঝি ইদ্রিস আলী ব্যাপারী, নাসির উদ্দিন, সবুজ ঘরামী, লিয়াকত আলীসহ কয়েকজন জানান, প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার পর্যটক আসেন। শুক্র ও শনিবার এ সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
শুধু নৌকা ভাড়াই নয়, বিলের লাল শাপলাও এখন স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। শাপলা তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন স্থানীয় শতাধিক পরিবার, যার একটি বড় অংশই নারী। দিনভর বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে তারা গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। সংগ্রাহকদের কাছ থেকে পাইকাররা এসব শাপলা কিনে নিয়ে উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, কোটালীপাড়া, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ, বরিশাল শহরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতিমুঠো ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন।
এমনকি রাজধানীর বাজারেও পৌঁছে যায় সাতলার এই শাপলা। শাপলা তুলে দৈনিক মোট ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, যা পুরো চার মাসের মৌসুমে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া পর্যটকদের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে অটোবাইক ও মোটরসাইকেল চালকসহ খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বাড়তি আয়ের মুখ দেখছেন।
বিলের পানিতে নেমে শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহের কথা জানান গীতা রানী দাস ও তাঁর মেয়ে শর্মিলা। তারা বলেন, ‘মা-মেয়ে মিলে বিকেলে বিলের বুকসমান পানিতে নেমে শাপলা তুলি। পাইকারদের কাছে প্রতি মুঠো শাপলা মাত্র পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচশ টাকা আয় হয়। বর্ষার তিন-চার মাস শাপলা বিক্রি করে আমাদের সংসার চলে।’
পাইকারি শাপলা বিক্রেতা দীনেশ ঠাকুর বলেন, ‘আমরা বিলের সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সরাসরি শাপলা কিনে উজিরপুর, বরিশাল শহরসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করি।’
স্থানীয় আব্দুল মন্নান ব্যাপারী (৮০) বলেন, ‘আমাদের ছোটোবেলা থেকেই এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখি। আগে মানুষ তেমন আসত না। প্রতিবছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটক আসেন।’
পর্যটনের প্রভাবে ব্যবসার প্রসারের কথা জানিয়ে স্থানীয় এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী বলেন, ‘বর্ষায় সাতলা বিলে পর্যটকের ভিড় বাড়লে আমাদের ব্যবসাও বেশ জমে ওঠে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর দর্শনার্থী আসেন। এতে আমাদের খাবারের বিক্রি যেমন বাড়ে, তেমনি স্থানীয় কয়েকজন মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়।’
শাপলার রাজ্যে নৌকায় ভ্রমণ
সাতলা ইউনিয়নের এই বিল মূলত সন্ধ্যা নদীর প্লাবনভূমি। বর্ষায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই থেকে ফুটতে শুরু করে লাল শাপলা। নভেম্বর পর্যন্ত বিলজুড়ে থাকে শাপলার রাজত্ব। লাল শাপলার পাশাপাশি সাদা ও বেগুনি শাপলাও দেখা যায়। ভোরের আলোয় ফুলের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য। নৌকায় করে বিল ঘুরলে চোখে পড়ে বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোকরাসহ দেশি নানা প্রজাতির পাখি।
বিলের মাঝেই যাদের বসতি, তাদের অনেকের যাতায়াতের প্রধান বাহন নৌকা। বর্ষায় পুরো এলাকা পানিতে ডুবে গেলে মনে হয়, লাল শাপলার ওপর দিয়েই নৌকা চলছে। ফুলের সঙ্গে পানির মৃদু ঢেউ, পাখির ডাক আর গ্রামীণ পরিবেশ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. এটিএম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাতলার মূল সম্পদ তার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শাপলা। পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যদি জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়, তাহলে একসময় এই আকর্ষণ হারিয়ে যেতে পারে। সে জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নৌযান নিয়ন্ত্রণ ও স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে।’
শুক্রবার বানারীপাড়া শহর থেকে লাল শাপলার বিলে ঘুরতে আসা কবি ও ছড়াকার অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘চারদিকে শুধু লাল শাপলার মেলা। পানির ওপর ফুটে থাকা অসংখ্য শাপলা আর নৌকার ধীরগতির চলাচল মিলিয়ে মনে হচ্ছে প্রকৃতির খুব কাছে চলে এসেছি। এই সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করারও। শাপলা বিলের অপরূপ দৃশ্যে সত্যিই আমি মুগ্ধ।’
বাবুগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা কলেজশিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার সুইটি বলেন, ‘এত সুন্দর একটি জায়গা যে বরিশালে আছে, এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না। পানির ওপর লাল শাপলার সারি দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো ছবির ভেতর দিয়ে নৌকায় ভেসে চলেছি। চারপাশের শান্ত পরিবেশ আর শাপলার সৌন্দর্য মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দিচ্ছে।’
একই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন আরও কয়েকজন পর্যটক। তাদের ভাষ্য, শাপলার বিলের সৌন্দর্য একবার দেখলে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে।
সৌন্দর্য থাকুক, পর্যটন হোক পরিকল্পিত
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে সাতলার শাপলার বিল শুধু বরিশাল নয়, দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগও বাড়বে। তবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত পর্যটক, প্লাস্টিক বর্জ্য, নৌযানের শব্দ কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনা যাতে শাপলার স্বাভাবিক বিস্তার ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি না করে, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
বিলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘ইদানীং ‘টিকটকার’ ও পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকসহ নানা অপচনশীল বর্জ্যের কারণে বিলটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। তাই পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে বিলকে গুছিয়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে ভাবার সঠিক সময় এখনই।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, ‘শাপলা বিলকে মানসম্মত ও পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিলে যেন প্লাস্টিক, পলিথিন বা কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিবেশ দূষিত করা না হয়, সে বিষয়ে পর্যটকদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।’
বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু বলেন,’উজিরপুরের সাতলার অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি লাল শাপলার বিল ভ্রমণপিয়াসী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ বিলকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র বিনির্মাণে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে লাল শাপলার এ বিলকে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।’
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সাতলার শাপলার বিলকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকার যানজট নিরসনে ৭ নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জলের বুকে লাল শাপলার নকশিকাঁথা

আপডেট টাইম : ১০:৫১:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
সকালের নরম রোদে টলটল পানি। তাতে ফুটে রয়েছে শাপলা। যেন বিছিয়ে রাখা হয়েছে লাল-সবুজ নকশিকাঁথা। ভোরের আলোয় সেই নকশিকাঁথার বুক চিরে এগিয়ে চলে ছোট ছোট নৌকা। বাতাসে দুলতে থাকা অগণিত শাপলা, মৃদু ঢেউ আর চারপাশে পাখির ডাক–সব মিলিয়ে বরিশালের উজিরপুরের সাতলা বিল হয়ে ওঠে প্রকৃতির এক মায়াময় চিত্রকর্ম। মায়াবী এ রূপের টানেই প্রতিবছর দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো মানুষ।
তবে সাতলার এই সৌন্দর্য শুধু চোখ জুড়ানোর নয়, স্থানীয় মানুষের আয়েরও উৎস হয়ে উঠেছে। শাপলা দেখতে আসা পর্যটকদের নিয়ে অর্ধশতাধিক নৌকা চলে বিলে; শাপলা বিক্রি করেও আয় করেন স্থানীয়রা।
নতুন সাজে সাতলার শাপলা বিল
প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে নতুন সাজ। সাতলার শাপলার বিলকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে প্রবেশদ্বারে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন গেট ও ভিউ পয়েন্ট। পাশাপাশি পর্যটকদের নৌভ্রমণ ও চলাচলের সুবিধায় ঘাটলাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। ফলে লাল শাপলার নকশিকাঁথার ওপর এখন আঁকা হচ্ছে সম্ভাবনাময় স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ছবি।
গত বছর ১৫ লাখ ও চলতি বছর ৫ লাখ টাকার কাজ হচ্ছে। পটিবাড়ি ও মুড়িবাড়ি দুটি ভিউ পয়েন্ট। বর্তমানে মুড়িবাড়ি ভিউ পয়েন্টে তোরণ নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। শুধু টাইলসের কাজ রয়েছে; যা চলতি সপ্তাহে শেষ হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রবেশপথ, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পর্যটকদের বসার স্থান, নিরাপদ নৌযান চলাচল, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থাও করা হবে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুরের পর্যটন সম্ভাবনাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে সাতলা বিলে দশ হাজার একরজুড়ে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলের সৌন্দর্য নিয়ে স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র তৈরি এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের আশা, পরিকল্পিত এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাতলার শাপলার বিল আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই সাতলার বিল পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র হলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় নানা ভোগান্তিতে পড়তে হতো দর্শনার্থীদের। নতুন গেট, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মিত হলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় নৌকার মাঝি চয়ন (৩৫) বলেন, ‘শাপলা ফোটার সময় প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। পর্যটক বাড়লে নৌকা চালানো, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রি– সবকিছুর ব্যবসা বাড়বে। অনেক পরিবার এ থেকে আয় করতে পারবে।’
বিল ঘিরে আয়ের উৎস
সাতলার লাল শাপলার বিল এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের নকশিকাঁথা নয়, স্থানীয় মানুষের আয়েরও একটি মৌসুমি ক্ষেত্র। শাপলা ফোটার মৌসুমে বিলে পর্যটকদের ঘোরাতে চারটি স্পটে অর্ধশতাধিক নৌকা চলাচল করে। দিনে তাদের সম্মিলিত দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস নৌকা চলাচল ধরে হিসাব করলে মৌসুমে মোট আয় হয় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা।
নৌকার মাঝি ইদ্রিস আলী ব্যাপারী, নাসির উদ্দিন, সবুজ ঘরামী, লিয়াকত আলীসহ কয়েকজন জানান, প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার পর্যটক আসেন। শুক্র ও শনিবার এ সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
শুধু নৌকা ভাড়াই নয়, বিলের লাল শাপলাও এখন স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। শাপলা তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন স্থানীয় শতাধিক পরিবার, যার একটি বড় অংশই নারী। দিনভর বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে তারা গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। সংগ্রাহকদের কাছ থেকে পাইকাররা এসব শাপলা কিনে নিয়ে উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, কোটালীপাড়া, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ, বরিশাল শহরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতিমুঠো ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন।
এমনকি রাজধানীর বাজারেও পৌঁছে যায় সাতলার এই শাপলা। শাপলা তুলে দৈনিক মোট ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, যা পুরো চার মাসের মৌসুমে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া পর্যটকদের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে অটোবাইক ও মোটরসাইকেল চালকসহ খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বাড়তি আয়ের মুখ দেখছেন।
বিলের পানিতে নেমে শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহের কথা জানান গীতা রানী দাস ও তাঁর মেয়ে শর্মিলা। তারা বলেন, ‘মা-মেয়ে মিলে বিকেলে বিলের বুকসমান পানিতে নেমে শাপলা তুলি। পাইকারদের কাছে প্রতি মুঠো শাপলা মাত্র পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচশ টাকা আয় হয়। বর্ষার তিন-চার মাস শাপলা বিক্রি করে আমাদের সংসার চলে।’
পাইকারি শাপলা বিক্রেতা দীনেশ ঠাকুর বলেন, ‘আমরা বিলের সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সরাসরি শাপলা কিনে উজিরপুর, বরিশাল শহরসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করি।’
স্থানীয় আব্দুল মন্নান ব্যাপারী (৮০) বলেন, ‘আমাদের ছোটোবেলা থেকেই এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখি। আগে মানুষ তেমন আসত না। প্রতিবছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটক আসেন।’
পর্যটনের প্রভাবে ব্যবসার প্রসারের কথা জানিয়ে স্থানীয় এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী বলেন, ‘বর্ষায় সাতলা বিলে পর্যটকের ভিড় বাড়লে আমাদের ব্যবসাও বেশ জমে ওঠে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর দর্শনার্থী আসেন। এতে আমাদের খাবারের বিক্রি যেমন বাড়ে, তেমনি স্থানীয় কয়েকজন মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়।’
শাপলার রাজ্যে নৌকায় ভ্রমণ
সাতলা ইউনিয়নের এই বিল মূলত সন্ধ্যা নদীর প্লাবনভূমি। বর্ষায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই থেকে ফুটতে শুরু করে লাল শাপলা। নভেম্বর পর্যন্ত বিলজুড়ে থাকে শাপলার রাজত্ব। লাল শাপলার পাশাপাশি সাদা ও বেগুনি শাপলাও দেখা যায়। ভোরের আলোয় ফুলের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য। নৌকায় করে বিল ঘুরলে চোখে পড়ে বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোকরাসহ দেশি নানা প্রজাতির পাখি।
বিলের মাঝেই যাদের বসতি, তাদের অনেকের যাতায়াতের প্রধান বাহন নৌকা। বর্ষায় পুরো এলাকা পানিতে ডুবে গেলে মনে হয়, লাল শাপলার ওপর দিয়েই নৌকা চলছে। ফুলের সঙ্গে পানির মৃদু ঢেউ, পাখির ডাক আর গ্রামীণ পরিবেশ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. এটিএম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাতলার মূল সম্পদ তার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও শাপলা। পর্যটন বাড়াতে গিয়ে যদি জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়, তাহলে একসময় এই আকর্ষণ হারিয়ে যেতে পারে। সে জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নৌযান নিয়ন্ত্রণ ও স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে।’
শুক্রবার বানারীপাড়া শহর থেকে লাল শাপলার বিলে ঘুরতে আসা কবি ও ছড়াকার অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘চারদিকে শুধু লাল শাপলার মেলা। পানির ওপর ফুটে থাকা অসংখ্য শাপলা আর নৌকার ধীরগতির চলাচল মিলিয়ে মনে হচ্ছে প্রকৃতির খুব কাছে চলে এসেছি। এই সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করারও। শাপলা বিলের অপরূপ দৃশ্যে সত্যিই আমি মুগ্ধ।’
বাবুগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা কলেজশিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার সুইটি বলেন, ‘এত সুন্দর একটি জায়গা যে বরিশালে আছে, এখানে না এলে বুঝতে পারতাম না। পানির ওপর লাল শাপলার সারি দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো ছবির ভেতর দিয়ে নৌকায় ভেসে চলেছি। চারপাশের শান্ত পরিবেশ আর শাপলার সৌন্দর্য মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দিচ্ছে।’
একই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন আরও কয়েকজন পর্যটক। তাদের ভাষ্য, শাপলার বিলের সৌন্দর্য একবার দেখলে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে।
সৌন্দর্য থাকুক, পর্যটন হোক পরিকল্পিত
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে সাতলার শাপলার বিল শুধু বরিশাল নয়, দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এতে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগও বাড়বে। তবে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত পর্যটক, প্লাস্টিক বর্জ্য, নৌযানের শব্দ কিংবা অপরিকল্পিত স্থাপনা যাতে শাপলার স্বাভাবিক বিস্তার ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি না করে, সেদিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
বিলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘ইদানীং ‘টিকটকার’ ও পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকসহ নানা অপচনশীল বর্জ্যের কারণে বিলটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। তাই পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে বিলকে গুছিয়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে ভাবার সঠিক সময় এখনই।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, ‘শাপলা বিলকে মানসম্মত ও পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিলে যেন প্লাস্টিক, পলিথিন বা কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিবেশ দূষিত করা না হয়, সে বিষয়ে পর্যটকদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।’
বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু বলেন,’উজিরপুরের সাতলার অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি লাল শাপলার বিল ভ্রমণপিয়াসী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ বিলকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র বিনির্মাণে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে লাল শাপলার এ বিলকে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।’
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই সাতলার শাপলার বিলকে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’