ঢাকা ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বিনামূল্যে চক্ষুসেবা পেলেন ভাসানটেক-কড়াইল-সাততলা বস্তির প্রায় ১ হাজার মানুষ ক্লাব বদলাতে ব্যর্থ হয়ে এজেন্টকে ছাঁটাই করলেন মার্তিনেজ লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করায় মধুপুর পীর সাহেবের কড়া প্রতিবাদ ও হুঁশিয়ারি হংকংয়ে ২০০ কোটি ডলারের তহবিল গঠন করবে বাংলাদেশ: অর্থমন্ত্রী চাঁদাবাজির সঙ্গে পুলিশের কোনও সদস্য জড়িত থাকলে ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সচল এক্সিলারেট, বাড়ছে গ্যাস সরবরাহ: একদিন আগেই এলো এলএনজিবাহী জাহাজ পরীমণির গাড়ি বিতর্কে আলোচিত ‘মাসরুর’ পুতুলের সাবেক স্বামী ১১৭ বছরে পা দিলেন বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ নারী কলকাতার সেই হোটেল ‘শিখা ইন’ এর মালিক গ্রেপ্তার তুরস্কের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে ইসরায়েল, যুদ্ধ কি সত্যিই আসছে

নির্ভরযোগ্য আমলা খুঁজতে হিমশিম সরকার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৭:০৯:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪ বার

শীর্ষ পদে বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ৭৯ সচিবের ২৩ জনই চুক্তিতে

হাওর বার্তা ডেক্সঃ ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তা বাছাইয়ের জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, পদায়ন ও পদোন্নতির পুরোনো কাঠামো এবং কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা যাচাইয়ের কারণে শীর্ষ পদে নিয়োগ দিতে গিয়ে এক ধরনের আস্থার সংকটে পড়তে হচ্ছে সরকারকে।

প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে তাদের মধ্য থেকে নতুন করে কর্মকর্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও কর্মদক্ষতা—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন প্রশাসনের বাইরে থাকা বা অবসরে যাওয়া অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদেরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিনিয়র সচিব, সচিব ও সমমর্যাদার পদে কর্মরত ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক। অর্থাৎ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ২৯ শতাংশ পদেই এখন চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে রদবদল অব্যাহত রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তে নানা জটিলতায় তা আটকে যাচ্ছে।

কোনো কোনো কর্মকর্তার বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অনুমোদন মিলছে না। আবার যাদের এসিআর ভালো, তাদের অনেকের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পূর্ব অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।

সরকারের এক সিনিয়র সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের একাংশ নিজেদের বিএনপিপন্থী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে আরেকটি অংশ দাবি করছেন, তারা বিগত সরকারের সময়ে রোষানলের শিকার হয়েছেন। তবে সরকার এসব দাবি যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা সম্পর্কে সরকার যথেষ্ট অবগত বলেও জানান তিনি।

প্রশাসনে ‘পুরোনো আনুগত্য’ নিয়ে সতর্ক সরকার
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহও সম্প্রতি প্রশাসনের ভেতরে আগের সরকারের অনুগত কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন।

সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগের সরকারের অনুগত কিছু ব্যক্তি এখনো প্রশাসনে রয়েছেন। তাদের চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে দফায় দফায় পরিবর্তন এনেছে সরকার। সর্বশেষ সচিব পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে রদবদল করা হয়েছে। তাদের সবাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগ থেকে রফিকুল আই মোহাম্মদকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব করা হয়েছে। একই বিভাগের সচিব মোহা. শওকত রশীদ চৌধুরীকে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। আর বোর্ডের চেয়ারম্যান এজেএম সালাহউদ্দিন নাগরীকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব পদে বদলি করা হয়েছে।

এর আগে গত ১০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগে সচিব পদে পরিবর্তন আনা হয়। একই সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা রফিকুল আই মোহাম্মদকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খানকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিভাগীয় কমিশনার-ডিসি পদেও পরিবর্তন
শুধু সচিব পর্যায়েই নয়, মাঠ প্রশাসনেও চলছে ব্যাপক রদবদল। গত ১৮ আগস্ট রাতে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং নাটোর, গাইবান্ধা ও রংপুরের জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. এএনএম বজলুর রশীদকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।

একইভাবে নাটোরের ডিসি আসমা শাহীন, গাইবান্ধার ডিসি মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা এবং রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রুহুল আমিনকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফের চুক্তিতে নিয়োগ
শীর্ষ প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতার আরেকটি দৃষ্টান্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

গত ১৬ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির এবং পরদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হকের দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু ১৭ আগস্টই গুরুত্বপূর্ণ দুই পদে তাদের আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব রয়েছে।

রাজনৈতিকীকরণের পুরোনো ক্ষত, সামনে প্রশাসন পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক আনুগত্য পদায়ন ও পদোন্নতির অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। এর ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক পেশাদার কাঠামো দুর্বল হয়েছে বলে মনে করেন তারা।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বহু সচিব ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরেও পাঠানো হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিকভাবে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

গত দুই বছরে সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধান পদে একাধিক দফায় পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে আমলাতন্ত্রে ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণ হয়েছিল এবং মেধাকে অবমূল্যায়নের প্রভাব প্রশাসনে স্পষ্টভাবে পড়েছে।

তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে প্রশাসনকে নতুন করে গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। অভিযুক্ত অনেক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে, পাশাপাশি দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

ভারসাম্য রাখার পরামর্শ সাবেক আমলার
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।

তার মতে, দীর্ঘদিন বঞ্চিত বা উপেক্ষিত হলেও অনেক দক্ষ কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পান। একই সঙ্গে প্রশাসনে কর্মরত নিয়মিত কর্মকর্তাদেরও অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামো ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে এবং ভারসাম্যপূর্ণভাবে এগিয়ে নেওয়াই প্রশাসনিক বাস্তবতা।

সব মিলিয়ে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—অতীতের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে প্রশাসনের জন্য দক্ষ, অভিজ্ঞ ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের একটি কার্যকর দল গড়ে তোলা। একদিকে পুরোনো কাঠামো ভাঙার চাপ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখার বাস্তব প্রয়োজন—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এগোতে হচ্ছে সরকারকে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিনামূল্যে চক্ষুসেবা পেলেন ভাসানটেক-কড়াইল-সাততলা বস্তির প্রায় ১ হাজার মানুষ

নির্ভরযোগ্য আমলা খুঁজতে হিমশিম সরকার

আপডেট টাইম : ০৭:০৯:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

শীর্ষ পদে বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ৭৯ সচিবের ২৩ জনই চুক্তিতে

হাওর বার্তা ডেক্সঃ ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আস্থাভাজন ও দক্ষ কর্মকর্তা বাছাইয়ের জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, পদায়ন ও পদোন্নতির পুরোনো কাঠামো এবং কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকা যাচাইয়ের কারণে শীর্ষ পদে নিয়োগ দিতে গিয়ে এক ধরনের আস্থার সংকটে পড়তে হচ্ছে সরকারকে।

প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে তাদের মধ্য থেকে নতুন করে কর্মকর্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও কর্মদক্ষতা—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন প্রশাসনের বাইরে থাকা বা অবসরে যাওয়া অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদেরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিনিয়র সচিব, সচিব ও সমমর্যাদার পদে কর্মরত ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জনই চুক্তিভিত্তিক। অর্থাৎ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় ২৯ শতাংশ পদেই এখন চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে রদবদল অব্যাহত রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তে নানা জটিলতায় তা আটকে যাচ্ছে।

কোনো কোনো কর্মকর্তার বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অনুমোদন মিলছে না। আবার যাদের এসিআর ভালো, তাদের অনেকের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পূর্ব অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।

সরকারের এক সিনিয়র সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের একাংশ নিজেদের বিএনপিপন্থী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে আরেকটি অংশ দাবি করছেন, তারা বিগত সরকারের সময়ে রোষানলের শিকার হয়েছেন। তবে সরকার এসব দাবি যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা সম্পর্কে সরকার যথেষ্ট অবগত বলেও জানান তিনি।

প্রশাসনে ‘পুরোনো আনুগত্য’ নিয়ে সতর্ক সরকার
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহও সম্প্রতি প্রশাসনের ভেতরে আগের সরকারের অনুগত কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন।

সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগের সরকারের অনুগত কিছু ব্যক্তি এখনো প্রশাসনে রয়েছেন। তাদের চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে দফায় দফায় পরিবর্তন এনেছে সরকার। সর্বশেষ সচিব পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে রদবদল করা হয়েছে। তাদের সবাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগ থেকে রফিকুল আই মোহাম্মদকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব করা হয়েছে। একই বিভাগের সচিব মোহা. শওকত রশীদ চৌধুরীকে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। আর বোর্ডের চেয়ারম্যান এজেএম সালাহউদ্দিন নাগরীকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব পদে বদলি করা হয়েছে।

এর আগে গত ১০ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগে সচিব পদে পরিবর্তন আনা হয়। একই সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা রফিকুল আই মোহাম্মদকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খানকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিভাগীয় কমিশনার-ডিসি পদেও পরিবর্তন
শুধু সচিব পর্যায়েই নয়, মাঠ প্রশাসনেও চলছে ব্যাপক রদবদল। গত ১৮ আগস্ট রাতে রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং নাটোর, গাইবান্ধা ও রংপুরের জেলা প্রশাসককে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. এএনএম বজলুর রশীদকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।

একইভাবে নাটোরের ডিসি আসমা শাহীন, গাইবান্ধার ডিসি মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা এবং রংপুরের ডিসি মোহাম্মদ রুহুল আমিনকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফের চুক্তিতে নিয়োগ
শীর্ষ প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতার আরেকটি দৃষ্টান্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

গত ১৬ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির এবং পরদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এহছানুল হকের দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু ১৭ আগস্টই গুরুত্বপূর্ণ দুই পদে তাদের আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব রয়েছে।

রাজনৈতিকীকরণের পুরোনো ক্ষত, সামনে প্রশাসন পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক আনুগত্য পদায়ন ও পদোন্নতির অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। এর ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক পেশাদার কাঠামো দুর্বল হয়েছে বলে মনে করেন তারা।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বহু সচিব ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরেও পাঠানো হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিকভাবে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

গত দুই বছরে সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধান পদে একাধিক দফায় পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে আমলাতন্ত্রে ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণ হয়েছিল এবং মেধাকে অবমূল্যায়নের প্রভাব প্রশাসনে স্পষ্টভাবে পড়েছে।

তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে প্রশাসনকে নতুন করে গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। অভিযুক্ত অনেক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে, পাশাপাশি দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

ভারসাম্য রাখার পরামর্শ সাবেক আমলার
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।

তার মতে, দীর্ঘদিন বঞ্চিত বা উপেক্ষিত হলেও অনেক দক্ষ কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পান। একই সঙ্গে প্রশাসনে কর্মরত নিয়মিত কর্মকর্তাদেরও অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের দীর্ঘদিনের কাঠামো ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন একদিনে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে এবং ভারসাম্যপূর্ণভাবে এগিয়ে নেওয়াই প্রশাসনিক বাস্তবতা।

সব মিলিয়ে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—অতীতের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে প্রশাসনের জন্য দক্ষ, অভিজ্ঞ ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের একটি কার্যকর দল গড়ে তোলা। একদিকে পুরোনো কাঠামো ভাঙার চাপ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখার বাস্তব প্রয়োজন—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই এগোতে হচ্ছে সরকারকে।