রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা এখন তুঙ্গে। নানা মহলে সম্ভাব্য নাম নিয়ে চলছে গুঞ্জন আর চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। দলীয় সূত্রও বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ‘প্রায় চূড়ান্ত’।
যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। আগামীকাল ১২ আগস্ট এ বিষয়ে ঘোষণা আসার কথা থাকলেও দলীয় সূত্রগুলোর বক্তব্যে সিদ্ধান্ত ও ঘোষণার সময় নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হলে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, এ নিয়েও রয়েছে আলোচনা। এ পদেও বেশ কয়েকজন হেভিওয়েটের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়টি নিয়েও দলটি এখন কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। এ নিয়ে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও এ মুহূর্তে কথা বলতে রাজি নন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম বিবেচনায় চূড়ান্ত করেছেন। ১২ আগস্ট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে।
দলটির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জাগো নিউজকে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন কে পাচ্ছেন, তা দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না। সম্ভবত ১৩ আগস্ট এ বিষয়ে জাতি জানতে পারবে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম যেভাবে আলোচনায় রয়েছে, আলোচনায় আসতেই পারে।
দলীয় আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, ১২ আগস্ট রাতে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর ১৩ আগস্ট সকাল ৯টার পর প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হতে পারে। ফলে ১২ আগস্ট ঘোষণার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সিদ্ধান্তের ভার তারেক রহমানের ওপর
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিএনপির ভেতরে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় ছিল। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল নিজেই সাংবাদিকদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং সালাহউদ্দিন আহমদের নামও রয়েছে আলোচনায়।—দলীয় সূত্রের ভাষ্য
এরপর থেকেই রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত হিসেবে বিবেচনা করতে চাইছে না বিএনপির একটি অংশ।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ, প্রার্থী নিয়ে নীরবতা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী আগামী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এর আগে রোববার বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র দুটি সংগ্রহ করেন। তবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। একটি মনোনয়নপত্রে কোনো ত্রুটি থাকলে অন্যটি ব্যবহারের সুযোগ রাখতেই সাধারণত একাধিক মনোনয়নপত্র নেওয়া হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে এবার কিছুটা ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিএনপির পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যও প্রার্থী দিয়েছে। ওই জোটের প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী বৈধ থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোট হবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন—এমন রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে।
মির্জা ফখরুলের নাম কেন সামনে
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। দলের কঠিন রাজনৈতিক সময়েও তিনি প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকা এবং তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করার সময় দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল।
রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম যেভাবে আলোচনায় রয়েছে, আলোচনায় আসতেই পারে।—বেগম সেলিমা রহমান
দলীয় পর্যায়ের আলোচনায় রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম বিবেচনার ক্ষেত্রে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি একটি সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় পদ হওয়ায় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের ভাষ্য।
ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে পরবর্তী মহাসচিব কে
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে বিএনপির সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্ন তৈরি হবে—দলের মহাসচিবের দায়িত্ব নেবেন কে?
দলীয় পর্যায়ের আলোচনায় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম এক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার সক্রিয় ভূমিকা দৃশ্যমান। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে রিজভীর পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নামও মহাসচিব পদে আলোচনায় রয়েছে।
আবার এসব নামের বাইরে মহাসচিব পদে চমক হিসেবেও আসতে পারে অন্য কারও নাম। যদিও এসব বিষয়ে এখনো দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন কে পাচ্ছেন, তা দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না। সম্ভবত ১৩ আগস্ট এ বিষয়ে জাতি জানতে পারবে।—শায়রুল কবির খান
এদিকে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দলের নতুন মহাসচিব পদে কে আসতে পারেন তা নিয়ে একাধিক নাম আলোচনায় থাকলেও বিএনপির কোনো নেতা এ বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে চাইছেন না।
সম্ভাব্য পরিবর্তনের ব্যাপ্তি
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর পাশাপাশি সরকারের দায়িত্ব বণ্টনেও পরিবর্তন আসতে পারে। মহাসচিবের দায়িত্ব ছাড়ার পাশাপাশি সরকারের দায়িত্ব থেকেও তাকে সরে দাঁড়াতে হবে। ফলে মন্ত্রিসভায়ও পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে তার সংসদীয় আসন শূন্য হলে সেখানে উপ-নির্বাচনের বিষয়টিও সামনে আসবে।
ফলে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী নির্ধারণের বিষয়টি শুধু একটি সাংবিধানিক পদে মনোনয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সম্ভাব্য সিদ্ধান্তটি দলের সাংগঠনিক কাঠামো এবং সরকারের দায়িত্ব বণ্টন—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন মূল নজর ১২ ও ১৩ আগস্টের দিকে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনায় থাকলেও বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হচ্ছে না। দলীয় সূত্রগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, ১২ আগস্ট রাতে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে ১৩ আগস্ট সকাল ৯টার পরও প্রার্থীর নাম ঘোষণা হতে পারে।
ফলে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন, তার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় এবং মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেলে এরপর দলের মহাসচিব পদে সম্ভাব্য পরিবর্তন—উভয় বিষয়ই এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে।
Reporter Name 



















