ঢাকা ০৯:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

জুমের জমিতে ফলের নীরব বিপ্লব

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:২৪:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
  • ১৩ বার

একসময় বান্দরবানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল জুম চাষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই বাস্তবতা। অধিক লাভ, বাজারে বাড়তে থাকা চাহিদা ও সরকারি সহায়তায় থাকায় জুমের জায়গা দখল করছে নানা দেশি-বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক আবাদ। এতে শুধু কৃষি পদ্ধতিই নয়, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি, কৃষকের জীবনযাত্রা এবং ভূমি ব্যবহারের ধরন। বান্দরবানের পাহাড়ে এই পরিবর্তন এখন কৃষি খাতের এক নীরব বিপ্লবের গল্প।

জানা গেছে, আম, মাল্টা, ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ও কফির মতো লাভজনক আবাদ পাহাড়ি অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তুলছে।

জেলা সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়িসহ সাত উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় এখন চোখে পড়ে কাজুবাদাম, কফি, আম, কাঁঠাল, কলা, আনারস, ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো, মাল্টা, কমলা, লেবু ও পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের বাগান। গত কয়েক বছর আগেও যেখানে জুম চাষের জন্য পাহাড় পরিষ্কার করা হতো, এখন সেখানে সারি সারি ফলের গাছ সবুজে ঢেকে দিয়েছে পাহাড়ের ঢাল।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, জুম চাষ সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অধিকাংশ সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ফলের বাগান একবার প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বছরের পর বছর দীর্ঘ মেয়াদে আয় পাওয়া সম্ভব। ফলে অনেক কৃষক জুম চাষ কমিয়ে ফলের আবাদে ঝুঁকছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে জুমের আবাদ হয়েছিল ১৭২ হেক্টর জমিতে,বিভিন্ন ফলের বাগান ছিল ৪ হাজার ৫৮৩ হেক্টর। ২০২২-২৩ এ জুম ১৬৩ হেক্টর,ফলের আবাদ ৪ হাজার ৯৮৪ হেক্টর। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে জুম ১৪০, ফল ৫ হাজার ৭। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুম ১৪৫, ফল ৫ হাজার ১১৪।২০২৫-২৬ অর্থ বছরে জুম ১৫৫, ফলের আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৩০২ হেক্টর জমতে।

‘বান্দরবানের পাহাড়ি জলবায়ু ও মাটি বিভিন্ন ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের চারা বিতরণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফল উৎপাদন ও চাষের পরিধি প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

বিশেষ করে বিদেশি ফল কাজু, কফি, আম, বরই ও অ্যাভোকাডোর মতো উচ্চ মূল্যের বাণিজ্যিক ফল আবাদ কৃষকদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। পাশাপাশি ড্রাগন ফল, মাল্টা ও কমলার আবাদও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব ফল স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

জুমের জমিতে ফলের নীরব বিপ্লব

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুম চাষ থেকে ফলভিত্তিক কৃষিতে রূপান্তর শুধু কৃষকের আয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং পাহাড়ের মাটির ক্ষয়রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে ফল চাষ সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে ভবিষ্যতে বান্দরবান দেশের অন্যতম প্রধান ফল উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হবে। পাহাড়ে জুমের জমিতে ফলের এই বিস্তৃতি তাই কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।

চিম্বুক ১২ মাইল এলাকার বাগান চাষি ঙই ম্রো বলেন, গত তিন বছর আগে ওই এলাকায় ১০ একর জমিতে জুমের আবাদ করেছি। সে সময় এই জমিতে ৩শ’ আঁড়ি (প্রতি আঁড়িতে ১০ কেজি) ধানের সঙ্গে অন্যান্য সাথী ফসল পেতেন। যার বাজার মূল্য প্রায় দেড় লাখ টাকা। পরে সেখান থেকে ৩ একর জমিতে আম, জাম্বুরা, চন্দ্রগীরী জাতের কফির আবাদ করেন। এতে এই ফল বিক্রি করে বর্তমানে বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হয়। এতে পরিবারে অনেকটা স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সদর উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা দিপ্তিময় তঞ্চগ্যা বলেন, তাদের পৈত্রিক জমিতে যেখানে আগে শুধুমাত্র জুমের আবাদ করতেন সেখান থেকে পাঁচ একর জায়গায় গত দুই বছর আগে সাড়ে ৯০০ বলসুন্দরী ও কাশ্মীরি বরইয়ের চারা রোপণ করেন। কলম চারা হওয়ায় রোপণের প্রথম বছরেই ফলন আসে। সে বছর ৬ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন। মোট খরচ হয়েছিল আড়াই লাখ টাকা। পরের বছর আরও সাড়ে ৮০০ বলসুন্দরী চারা লাগানো হয়েছিল। সেগুলোতেও সে বছরের তুলনায় চারগুণ বেশি ফলন এসেছে। এই ৫ একর জায়গায় বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ এর বেশি বরই গাছ আছে। সে হিসেব অনুযায়ী জুমের চাইতে কয়েক গুন বেশি লাভবান হচ্ছে।

বলিপাড়া ইউনিয়নের বাজেরুং ত্রিপুরা জানান, আগে শুধু জুম চাষ করতেন তিনি। গত দুই বছর আগে ওই জুমের কিছু অংশে লাগানো ৮০০ কাজু বাদাম গাছ থেকে মণ প্রতি ৬ হাজার টাকা হিসেবে ২০ মণ করে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। পরের বছরও ৪০ মণ বিক্রি করেছিলেন।

‘গত তিন বছর আগে চিম্বুক ১২ মাইল এলাকায় ১০ একর জমিতে জুমের আবাদ করেছি। সে সময় এই জমিতে ৩শ’ আঁড়ি (প্রতি আঁড়িতে ১০ কেজি) ধানের সঙ্গে অন্যান্য সাথী ফসল পেতেন। যার বাজার মূল্য প্রায় দেড় লাখ টাকা। পরে সেখান থেকে ৩ একর জমিতে আম, জাম্বুরা, চন্দ্রগীরী জাতের কফির আবাদ করেন। এতে এই ফল বিক্রি করে বর্তমানে বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হয়। এতে পরিবারে অনেকটা স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

থানচি উপজেলা সদরের দিংতে পাড়া এলাকার রিংয়িং ম্রো বলেন, ২০১০ সালে জুমের ৫ একর জায়গায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কাজু বাদামের আবাদ করেছিলাম। এ বছর এই বাগান থেকে প্রায় ১৫০ মণ কাজু বাদাম বিক্রি করেছে। যা তাদের পরিবারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে। জুম চাষ থেকে অধিকতর লাভবান হওয়ায় বর্তমানে জুম চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলদ বাগান আবাদ করছি।

জুমের জমিতে ফলের নীরব বিপ্লব

দীপ্ত এগ্রোর মালিক ইফতেখার সেলিম অগ্নি জানান, বান্দরবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলার জারুলিয়া এলাকায় লিজ নেওয়া ১০০ একর জমিতে মালটা-কমলা, অ্যাভাকাডো, ১২ মাসের সজনে, কাজুবাদাম ও চুইঝালসহ নানা ফলের আবাদ করেছেন। ৪ বছর আগে আবাদ করা এইসব বাগানের অধিকাংশ গাছ থেকে ফলন দিতে শুরু করেছে।

আগামীতে এই বাগান থেকে আশানুরূপ লাভবান হবেন বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করেও কোন প্রকার তথ্য দিতে রাজি হননি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান, বান্দরবানের পাহাড়ি জলবায়ু ও মাটি বিভিন্ন ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের চারা বিতরণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফল উৎপাদন ও চাষের পরিধি প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জুম চাষিদের পরামর্শের পাশাপাশি প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

জুমের জমিতে ফলের নীরব বিপ্লব

আপডেট টাইম : ১১:২৪:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

একসময় বান্দরবানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল জুম চাষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই বাস্তবতা। অধিক লাভ, বাজারে বাড়তে থাকা চাহিদা ও সরকারি সহায়তায় থাকায় জুমের জায়গা দখল করছে নানা দেশি-বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক আবাদ। এতে শুধু কৃষি পদ্ধতিই নয়, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি, কৃষকের জীবনযাত্রা এবং ভূমি ব্যবহারের ধরন। বান্দরবানের পাহাড়ে এই পরিবর্তন এখন কৃষি খাতের এক নীরব বিপ্লবের গল্প।

জানা গেছে, আম, মাল্টা, ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ও কফির মতো লাভজনক আবাদ পাহাড়ি অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তুলছে।

জেলা সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়িসহ সাত উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় এখন চোখে পড়ে কাজুবাদাম, কফি, আম, কাঁঠাল, কলা, আনারস, ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো, মাল্টা, কমলা, লেবু ও পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের বাগান। গত কয়েক বছর আগেও যেখানে জুম চাষের জন্য পাহাড় পরিষ্কার করা হতো, এখন সেখানে সারি সারি ফলের গাছ সবুজে ঢেকে দিয়েছে পাহাড়ের ঢাল।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, জুম চাষ সম্পূর্ণ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অধিকাংশ সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ফলের বাগান একবার প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বছরের পর বছর দীর্ঘ মেয়াদে আয় পাওয়া সম্ভব। ফলে অনেক কৃষক জুম চাষ কমিয়ে ফলের আবাদে ঝুঁকছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় ২০২১-২২ অর্থবছরে জুমের আবাদ হয়েছিল ১৭২ হেক্টর জমিতে,বিভিন্ন ফলের বাগান ছিল ৪ হাজার ৫৮৩ হেক্টর। ২০২২-২৩ এ জুম ১৬৩ হেক্টর,ফলের আবাদ ৪ হাজার ৯৮৪ হেক্টর। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে জুম ১৪০, ফল ৫ হাজার ৭। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুম ১৪৫, ফল ৫ হাজার ১১৪।২০২৫-২৬ অর্থ বছরে জুম ১৫৫, ফলের আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৩০২ হেক্টর জমতে।

‘বান্দরবানের পাহাড়ি জলবায়ু ও মাটি বিভিন্ন ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের চারা বিতরণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফল উৎপাদন ও চাষের পরিধি প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

বিশেষ করে বিদেশি ফল কাজু, কফি, আম, বরই ও অ্যাভোকাডোর মতো উচ্চ মূল্যের বাণিজ্যিক ফল আবাদ কৃষকদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। পাশাপাশি ড্রাগন ফল, মাল্টা ও কমলার আবাদও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব ফল স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

জুমের জমিতে ফলের নীরব বিপ্লব

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুম চাষ থেকে ফলভিত্তিক কৃষিতে রূপান্তর শুধু কৃষকের আয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং পাহাড়ের মাটির ক্ষয়রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে ফল চাষ সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে ভবিষ্যতে বান্দরবান দেশের অন্যতম প্রধান ফল উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হবে। পাহাড়ে জুমের জমিতে ফলের এই বিস্তৃতি তাই কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।

চিম্বুক ১২ মাইল এলাকার বাগান চাষি ঙই ম্রো বলেন, গত তিন বছর আগে ওই এলাকায় ১০ একর জমিতে জুমের আবাদ করেছি। সে সময় এই জমিতে ৩শ’ আঁড়ি (প্রতি আঁড়িতে ১০ কেজি) ধানের সঙ্গে অন্যান্য সাথী ফসল পেতেন। যার বাজার মূল্য প্রায় দেড় লাখ টাকা। পরে সেখান থেকে ৩ একর জমিতে আম, জাম্বুরা, চন্দ্রগীরী জাতের কফির আবাদ করেন। এতে এই ফল বিক্রি করে বর্তমানে বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হয়। এতে পরিবারে অনেকটা স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সদর উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা দিপ্তিময় তঞ্চগ্যা বলেন, তাদের পৈত্রিক জমিতে যেখানে আগে শুধুমাত্র জুমের আবাদ করতেন সেখান থেকে পাঁচ একর জায়গায় গত দুই বছর আগে সাড়ে ৯০০ বলসুন্দরী ও কাশ্মীরি বরইয়ের চারা রোপণ করেন। কলম চারা হওয়ায় রোপণের প্রথম বছরেই ফলন আসে। সে বছর ৬ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন। মোট খরচ হয়েছিল আড়াই লাখ টাকা। পরের বছর আরও সাড়ে ৮০০ বলসুন্দরী চারা লাগানো হয়েছিল। সেগুলোতেও সে বছরের তুলনায় চারগুণ বেশি ফলন এসেছে। এই ৫ একর জায়গায় বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ এর বেশি বরই গাছ আছে। সে হিসেব অনুযায়ী জুমের চাইতে কয়েক গুন বেশি লাভবান হচ্ছে।

বলিপাড়া ইউনিয়নের বাজেরুং ত্রিপুরা জানান, আগে শুধু জুম চাষ করতেন তিনি। গত দুই বছর আগে ওই জুমের কিছু অংশে লাগানো ৮০০ কাজু বাদাম গাছ থেকে মণ প্রতি ৬ হাজার টাকা হিসেবে ২০ মণ করে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। পরের বছরও ৪০ মণ বিক্রি করেছিলেন।

‘গত তিন বছর আগে চিম্বুক ১২ মাইল এলাকায় ১০ একর জমিতে জুমের আবাদ করেছি। সে সময় এই জমিতে ৩শ’ আঁড়ি (প্রতি আঁড়িতে ১০ কেজি) ধানের সঙ্গে অন্যান্য সাথী ফসল পেতেন। যার বাজার মূল্য প্রায় দেড় লাখ টাকা। পরে সেখান থেকে ৩ একর জমিতে আম, জাম্বুরা, চন্দ্রগীরী জাতের কফির আবাদ করেন। এতে এই ফল বিক্রি করে বর্তমানে বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হয়। এতে পরিবারে অনেকটা স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

থানচি উপজেলা সদরের দিংতে পাড়া এলাকার রিংয়িং ম্রো বলেন, ২০১০ সালে জুমের ৫ একর জায়গায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কাজু বাদামের আবাদ করেছিলাম। এ বছর এই বাগান থেকে প্রায় ১৫০ মণ কাজু বাদাম বিক্রি করেছে। যা তাদের পরিবারে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে। জুম চাষ থেকে অধিকতর লাভবান হওয়ায় বর্তমানে জুম চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলদ বাগান আবাদ করছি।

জুমের জমিতে ফলের নীরব বিপ্লব

দীপ্ত এগ্রোর মালিক ইফতেখার সেলিম অগ্নি জানান, বান্দরবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলার জারুলিয়া এলাকায় লিজ নেওয়া ১০০ একর জমিতে মালটা-কমলা, অ্যাভাকাডো, ১২ মাসের সজনে, কাজুবাদাম ও চুইঝালসহ নানা ফলের আবাদ করেছেন। ৪ বছর আগে আবাদ করা এইসব বাগানের অধিকাংশ গাছ থেকে ফলন দিতে শুরু করেছে।

আগামীতে এই বাগান থেকে আশানুরূপ লাভবান হবেন বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করেও কোন প্রকার তথ্য দিতে রাজি হননি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান, বান্দরবানের পাহাড়ি জলবায়ু ও মাটি বিভিন্ন ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের চারা বিতরণ এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ফল উৎপাদন ও চাষের পরিধি প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জুম চাষিদের পরামর্শের পাশাপাশি প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।