ঢাকা ১২:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে ৬৪ মিলিয়ন মশা ছাড়ার পরিকল্পনা করছে গুগল

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৩১:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
  • ৬ বার

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া এবং ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ব্যাকটেরিয়া-আক্রান্ত মশা পরিবেশে অবমুক্ত করার একটি আবেদন পর্যালোচনা করছে দেশটির পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ)।

আপাতদৃষ্টিতে এটি বিপজ্জনক মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন—এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবদেহে রোগ ছড়ানো মশার বংশবৃদ্ধি চিরতরে ঠেকানো সম্ভব।

প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের জীবন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প ‘ডিবাগ’-এর অধীনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত কোটি কোটি পুরুষ মশার শরীরে ‘ওলবাকিয়া’ নামের একটি সাধারণ ও প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে তা প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া।

যেভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি 

এই পুরো প্রক্রিয়াটি মশার একটি বিশেষ জৈবিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সম্পন্ন করা হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সাইটোপ্লাজমিক ইনকম্প্যাটিবিলিটি’ বলা হয়।

ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত একটি পুরুষ মশা যখন প্রকৃতির কোনো সাধারণ (ব্যাকটেরিয়াহীন) স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তাদের ডিম্বাণু নিষিক্ত হয় না। ফলে স্ত্রী মশাটি কোনো ডিম পাড়তে পারে না এবং তার বংশবৃদ্ধি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

পুরুষ মশা কেন? 

পুরুষ মশা কখনো মানুষকে কামড়ায় না। এরা বেঁচে থাকার জন্য কেবল ফুলের মধু এবং ফলের রস শোষণ করে। তাই কোটি কোটি পুরুষ মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলেও মানুষের কামড় খাওয়ার বা কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নেই।

গুগল মূলত এই অভিযানের মাধ্যমে ‘সাউদার্ন হাউস মস্কিটো’ নামক একটি ক্ষতিকারক মশার প্রজাতিকে টার্গেট করছে, যা ক্যালিফোর্নিয়া এবং ফ্লোরিডায় মানুষের শরীরে মারাত্মক ‘ওয়েস্ট নীল ভাইরাস’ ছড়ানোর জন্য দায়ী।

পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা কেন উদ্বিগ্ন নন? 

সাধারণত বিপুল পরিমাণ পতঙ্গ প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার কথা শুনলে পরিবেশবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, গুগলের এই প্রকল্পে বিজ্ঞানীরা উল্টো বেশ উৎসাহ দেখাচ্ছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের চেয়ে এটি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। কেননা এই প্রক্রিয়ায়-

কোনো ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন নেই: ওলবাকিয়া কোনো কৃত্রিম বা জিনগতভাবে পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া নয়। বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ কীটপতঙ্গের শরীরে এটি এমনিতেই প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান থাকে।

নির্দিষ্ট প্রজাতিকে টার্গেট: রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করলে মশার পাশাপাশি মৌমাছি বা প্রজাপতির মতো উপকারী পরাগায়নকারী পতঙ্গও মারা যায়। কিন্তু ওলবাকিয়া পদ্ধতিটি কেবল নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার ওপর কাজ করায় অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষতি হয় না।

খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব নেই: পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে ব্যাঙ, মাছ বা পাখি মশা খেলেও তারা কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। ফলে এই মশার সংখ্যা কমলে বাস্তুতন্ত্রে কোনো বিপর্যয় নামবে না।

গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের ব্যবহার 

ল্যাবরেটরিতে কোটি কোটি মশা উৎপাদন করা এবং নিখুঁতভাবে পুরুষ ও স্ত্রী মশাকে আলাদা করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কারণ ভুলবশত যদি একটি ওলবাকিয়া-আক্রান্ত স্ত্রী মশাও প্রকৃতিতে চলে যায়, তবে এই পুরো মিশনটি ব্যর্থ হয়ে যাবে।

এই জটিল কাজটি সম্পন্ন করতে গুগল ব্যবহার করছে নিজস্ব রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম। বিশেষ সেন্সর এবং এআই-চালিত ক্যামেরার সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ত্রী মশাকে বাদ দিয়ে কেবল শতভাগ পুরুষ মশা আলাদা করে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হবে।

গুগলের এই পদ্ধতিটি কিন্তু একদম নতুন নয়। এর আগে সিঙ্গাপুর এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেসনোতে অন্য এক প্রজাতির মশার ওপর এই পরীক্ষা চালিয়ে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার মানুষ ওয়েস্ট নীল ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ক্যালিফোর্নিয়াতেই ২০০৩ সালের পর থেকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৪০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে মশার ক্রমবর্ধমান কীটনাশক প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হওয়ার এই সময়ে বিজ্ঞানীদের আশা—গুগলের এই পরিবেশবান্ধব জৈবিক প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

সূত্র: লাইভসায়েন্স 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রে ৬৪ মিলিয়ন মশা ছাড়ার পরিকল্পনা করছে গুগল

আপডেট টাইম : ১২:৩১:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া এবং ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ব্যাকটেরিয়া-আক্রান্ত মশা পরিবেশে অবমুক্ত করার একটি আবেদন পর্যালোচনা করছে দেশটির পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ)।

আপাতদৃষ্টিতে এটি বিপজ্জনক মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন—এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবদেহে রোগ ছড়ানো মশার বংশবৃদ্ধি চিরতরে ঠেকানো সম্ভব।

প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের জীবন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প ‘ডিবাগ’-এর অধীনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত কোটি কোটি পুরুষ মশার শরীরে ‘ওলবাকিয়া’ নামের একটি সাধারণ ও প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে তা প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া।

যেভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি 

এই পুরো প্রক্রিয়াটি মশার একটি বিশেষ জৈবিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সম্পন্ন করা হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সাইটোপ্লাজমিক ইনকম্প্যাটিবিলিটি’ বলা হয়।

ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত একটি পুরুষ মশা যখন প্রকৃতির কোনো সাধারণ (ব্যাকটেরিয়াহীন) স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তাদের ডিম্বাণু নিষিক্ত হয় না। ফলে স্ত্রী মশাটি কোনো ডিম পাড়তে পারে না এবং তার বংশবৃদ্ধি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

পুরুষ মশা কেন? 

পুরুষ মশা কখনো মানুষকে কামড়ায় না। এরা বেঁচে থাকার জন্য কেবল ফুলের মধু এবং ফলের রস শোষণ করে। তাই কোটি কোটি পুরুষ মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলেও মানুষের কামড় খাওয়ার বা কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নেই।

গুগল মূলত এই অভিযানের মাধ্যমে ‘সাউদার্ন হাউস মস্কিটো’ নামক একটি ক্ষতিকারক মশার প্রজাতিকে টার্গেট করছে, যা ক্যালিফোর্নিয়া এবং ফ্লোরিডায় মানুষের শরীরে মারাত্মক ‘ওয়েস্ট নীল ভাইরাস’ ছড়ানোর জন্য দায়ী।

পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা কেন উদ্বিগ্ন নন? 

সাধারণত বিপুল পরিমাণ পতঙ্গ প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার কথা শুনলে পরিবেশবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, গুগলের এই প্রকল্পে বিজ্ঞানীরা উল্টো বেশ উৎসাহ দেখাচ্ছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের চেয়ে এটি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। কেননা এই প্রক্রিয়ায়-

কোনো ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন নেই: ওলবাকিয়া কোনো কৃত্রিম বা জিনগতভাবে পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া নয়। বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ কীটপতঙ্গের শরীরে এটি এমনিতেই প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান থাকে।

নির্দিষ্ট প্রজাতিকে টার্গেট: রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করলে মশার পাশাপাশি মৌমাছি বা প্রজাপতির মতো উপকারী পরাগায়নকারী পতঙ্গও মারা যায়। কিন্তু ওলবাকিয়া পদ্ধতিটি কেবল নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার ওপর কাজ করায় অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষতি হয় না।

খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব নেই: পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে ব্যাঙ, মাছ বা পাখি মশা খেলেও তারা কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। ফলে এই মশার সংখ্যা কমলে বাস্তুতন্ত্রে কোনো বিপর্যয় নামবে না।

গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের ব্যবহার 

ল্যাবরেটরিতে কোটি কোটি মশা উৎপাদন করা এবং নিখুঁতভাবে পুরুষ ও স্ত্রী মশাকে আলাদা করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কারণ ভুলবশত যদি একটি ওলবাকিয়া-আক্রান্ত স্ত্রী মশাও প্রকৃতিতে চলে যায়, তবে এই পুরো মিশনটি ব্যর্থ হয়ে যাবে।

এই জটিল কাজটি সম্পন্ন করতে গুগল ব্যবহার করছে নিজস্ব রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম। বিশেষ সেন্সর এবং এআই-চালিত ক্যামেরার সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ত্রী মশাকে বাদ দিয়ে কেবল শতভাগ পুরুষ মশা আলাদা করে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হবে।

গুগলের এই পদ্ধতিটি কিন্তু একদম নতুন নয়। এর আগে সিঙ্গাপুর এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্রেসনোতে অন্য এক প্রজাতির মশার ওপর এই পরীক্ষা চালিয়ে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার মানুষ ওয়েস্ট নীল ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ক্যালিফোর্নিয়াতেই ২০০৩ সালের পর থেকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৪০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে মশার ক্রমবর্ধমান কীটনাশক প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হওয়ার এই সময়ে বিজ্ঞানীদের আশা—গুগলের এই পরিবেশবান্ধব জৈবিক প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

সূত্র: লাইভসায়েন্স