ভারতের রাজস্থান ও গুজরাট রাজ্যে লোকগীতিতে এই পাখির বর্ণনা করা হয়েছে।
মিসরীয় পুরাণে পাতিসারসকে সূর্যপাখি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। গ্রিক পুরাণে ক্রেন সূর্যদেবতা অ্যাপোলো এবং পৃথিবী ও উর্বরতার দেবী ডিমিটারের পাশাপাশি বসন্ত ও আলোর বার্তাবাহক হার্মিসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ক্রেনকে সতর্কতা ও প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। সুইডেনে সৌভাগ্যের পাখি শব্দটি বসন্তের অগ্রদূত হিসেবে ক্রেনের আগমন থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা উষ্ণতা, আলো এবং প্রচুর খাদ্যের সূচনা করে।
প্রাচীন চীনে ক্রেন দীর্ঘ জীবন, প্রজ্ঞা, বার্ধক্য এবং পিতা-পুত্রের সম্পর্কের প্রতীক ছিল। চীনা পুরাণে এটিকে স্বর্গীয় ক্রেন বা আশীর্বাদপ্রাপ্ত ক্রেন হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। জাপানে ক্রেন সৌভাগ্য ও দীর্ঘায়ুর প্রতীক। পাতিসারস ১৯৭৮ সালে জার্মানিতে, ১৯৯৭ সালে এস্তোনিয়ায়, ২০১০ সালে আর্মেনিয়ায় এবং ২০২০ সালে রাশিয়ায় ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার’ হয়েছিল। পাতিসারসের সৌন্দর্য এবং তাদের দর্শনীয় নাচ প্রাচীনকাল থেকেই মানুষকে মুগ্ধ করেছে।
শীতের সময় বাংলাদেশে অনেক প্রজাতির পাখি পরিযায়ী হয়ে আসে। কিন্তু পাতিসারস নিয়মিত নয়। তবে কয়েক বছর ধরে বিরতি দিয়ে দু-তিনটি করে পাতিসারসের সন্ধান পাওয়া গেছে রাজশাহী ও সিলেট জেলায়। এ বছর সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে শীতের সময় তিনটি পাতিসারস দেখা গেছে। পাতিসারস স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং উত্তর-পূর্ব ইউরোপ থেকে চীন ও রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলে রয়েছে। এ ছাড়া তুরস্ক এবং ককেশাস এলাকা, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে দেখা যায়। শীতকালে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ, উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান, ভারত, চীনের উষ্ণ এলাকায় পরিযায়ী হয়। ২০২০ সালে জার্মানিতে প্রথম পাতিসারস দেখি একটি নলবনঘেরা জলাশয়ে।
বিশ্বব্যাপী পাতিসারসের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। সামগ্রিকভাবে ইউরোপে এদের সংখ্যা বাড়ছে বসতি সংরক্ষণের কারণে। তবে শীতকালীন আবাসে জলাভূমির ওপর মানুষের চাপ, কৃষিজমির ব্যবহারের পরিবর্তন এবং ফসলের ক্ষতি হ্রাস করার উদ্দেশ্যে নিপীড়ন এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে শিকার উদ্বেগের বিষয়। ইউরোপে প্রতিবছর পাতিসারসের সংখ্যা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পাতিসারস মূলত সারা জীবনের জন্য জোড়া বাঁধে। মধ্য ইউরোপে আগমনের তিন থেকে ছয় সপ্তাহ পর প্রজনন শুরু করে। সাধারণত মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে দুই থেকে তিন দিনের ব্যবধানে দুটি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে ছানা আসতে ৩০ দিন সময় লাগে। ছানা ফোটার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর ছানাগুলো দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারে। ছানাদের খাওয়ানো এবং নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব মা-বাবা উভয়েরই। প্রাথমিকভাবে ছানাগুলোর দারচিনি-বাদামি নিচের পালক থাকে। প্রায় ১০ সপ্তাহ পর ছানারা উড়তে সক্ষম হয় এবং প্রায় প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বড় হয়।
পরিযায়ন শুরুর আগে এরা প্রচুর ডাক দেয় এবং নাচানাচি করে। খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে এরা পরিযায়ন শুরু করে। একটি দলে কয়েক হাজার পাতিসারস থাকে। ওড়ার সময় ক্রেনগুলো ভি-গঠন, অসম কোণ বা তির্যক রেখায় ওড়ে। এইভাবে বায়ু প্রতিরোধকে হ্রাস করে এবং নিজেরে গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ নিশ্চিত করে।
অভিবাসন সাধারণত পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন হয়। কারণ পাখিরা আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় এবং পথে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের স্টপওভার করে। এরা সর্বভুক। বিশেষত প্রজনন মৌসুম বাদে শিকড়, রাইজোম, কন্দ, ডালপালা, অঙ্কুর, পাতা, বেরি, জলাভূমির উদ্ভিদের বীজ, ঘাস, বাদাম, শিম, বর্জ্য শস্য ও চাল খেয়ে থাকে।
গ্রীষ্মকালীন খাদ্যতালিকায় আছে প্রধানত অমেরুদণ্ডী প্রাণী, যার মধ্যে রয়েছে শামুক, পোকা-মাকড় এবং এ ধরনের অন্যান্য প্রাণী। এ ছাড়া ব্যাঙ, সাপ, টিকটিকি, মাছ ও ইঁদুর খায়।
লেখক : নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান এরোস্পেস সেন্টার