যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা বে এলাকার একটি সেতুর নিচ থেকে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মার্কিন নাগরিক ও জামিলের রুমমেটকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। শনিবার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের হিলসবোরো শেরিফের কার্যালয় এই তথ্য জানিয়েছে।
জামিল লিমন ও তার বন্ধু নাহিদা বৃষ্টিকে পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র দিয়ে হত্যার অভিযোগে হিশাম আবুঘারবিয়েহ নামের ওই রুমমেটের বিরুদ্ধে দু’টি ফাস্ট ডিগ্রি মার্ডার মামলা করা হয়েছে।
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় বলেছে, স্টেট অ্যাটর্নি অফিসে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের পর আবুঘারবিয়েহর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ পর ওই দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীর বিষয়ে এই তথ্য সামনে এলো। হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় বলেছে, শুক্রবার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতু থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বৃষ্টি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় তদন্তকারী কর্মকর্তারা বাংলাদেশে বৃষ্টির পরিবারকে টেলিফোনে জানিয়েছেন, লিমন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তির ভাগাভাগি করে থাকা অ্যাপার্টমেন্টে যে পরিমাণ রক্ত পাওয়া গেছে, তাতে বৃষ্টিও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃষ্টির ভাই মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সহযোগী সংবাদ সংস্থা ডব্লিউটিএসপিকে ওই তথ্য জানিয়েছেন।
শুক্রবার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতুর কাছে পানিতে বৃষ্টির সন্ধানে শেরিফ অফিসের মেরিন ও ডাইভ টিমকে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে। শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার এক বিবৃতিতে বলেছেন, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি ঘটনা; যা আমাদের পুরো কমিউনিটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আবুঘারবিয়েহকে শুক্রবার সকালে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। শেরিফ অফিসের প্রধান ডেপুটি জোসেফ মাউরের বলেন, পারিবারিক সহিংসতার একটি ঘটনার খবর পেয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আবুঘারবিয়ের বাড়িতে যান। পরে শুক্রবার সকালে সেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শেরিফের কার্যালয় বলেছে, ২৬ বছর বয়সী ইউএসএফের সাবেক শিক্ষার্থী আবুঘারবিয়েহর বিরুদ্ধে এর আগে মারধর, অবৈধভাবে আটকে রাখা, প্রমাণ বিকৃত করা, মৃত্যুর খবর জানাতে ব্যর্থ হওয়া এবং বেআইনিভাবে মৃতদেহ সরানোর অভিযোগ ছিল।
এর আগে ২০১৫ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি ইউএসএফের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে এর আগে মারধর, অবৈধভাবে আটকে রাখা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা এবং মরদেহ সরানোর মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল।
গত ১৬ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় লিমন ও বৃষ্টিকে শেষবার দেখা যায়। এর একদিন পর ১৭ এপ্রিল তাদের এক পারিবারিক বন্ধু নিখোঁজের বিষয়টি পুলিশকে জানান। লিমনের মৃত্যুর কারণ ও ময়নাতদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন তদন্তকারীরা।
ইউএসএফের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম এক বার্তায় শিক্ষার্থীদের পরিবার ও বন্ধুদের জন্য দোয়া চেয়েছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। লিমনের পরিবার সিএনএনকে বলেছে, সবসময় হাশিখুশি থাকা ও সম্ভাবনাময় তরুণ এই গবেষকের সঙ্গে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে জানতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
বৃষ্টির সন্ধানে তদন্ত ও তল্লাশি অব্যাহত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম বলেছেন, তার সহকর্মীরা শিক্ষার্থীদের প্রিয়জনদের সহায়তা প্রদানের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এক বার্তায় তিনি বলেন, দয়া করে জামিলের পরিবার, বন্ধু এবং নাহিদার নিরাপদে ফিরে আসার জন্য আমার সঙ্গে প্রার্থনা করুন।
• তদন্তকারীদের নজরে ছিলেন সেই রুমমেট
গ্রেপ্তারের আগে আবুঘারবিয়েহকে অন্তত দু’বার জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। শুরুতে সহযোগিতা করলেও বৃহস্পতিবার থেকে তিনি অসহযোগিতা শুরু করেন। পরে শুক্রবার তদন্তকারী কর্মকর্তারা লিমনের মরদেহের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার যোগসূত্র খুঁজে পান।
গ্রেপ্তারের সময় তিনি একটি ঘরের ভেতরে ব্যারিকেড তৈরি করেছিলেন, যা সরাতে সোয়াত টিম এবং সংকট নিরসনকারী মধ্যস্থতাকারীদের প্রয়োজন হয়। গ্রেপ্তারের ভিডিওতে দেখা যায়, সাঁজোয়া যানের সামনে তিনি দুই হাত তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন।
আবুঘারবিয়েহকে তার পারিবারিক বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বাড়িতে ভাইয়ের করা পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের ঘটনায় আদালতের নির্দেশে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল তার।
আদালতের নথি অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ওই মার্কিন নাগরিক ২০২৩ সালে মারধরের অভিযোগে দু’বার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওই অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু সেসব ঘটনার একটির পর তার ভাই ফের নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। আদালত আবুঘারবিয়েহকে ভাইয়ের বাড়ির কাছে আসায় নিষেধাজ্ঞা দেন। আদালতে দাখিল করা নথিতে তার ভাই অভিযোগ করেন, তর্ক-বিতর্কের সময় বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলায় আবুঘারবিয়েহ তাকে এবং তার মায়ের ওপর চড়াও হন।
গত মে মাসে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ায় আবুঘারবিয়েহর ফিরে আসার ঝুঁকি নিতে চান না বলে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আদালতে আবেদন করেন তার ভাই। কিন্তু আদালত সেই আবেদন নাকচ করে দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে বলেছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইউএসএফে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়াশোনা করছিলেন।
• লিমনের পরিবারে আর্তনাদ
গত সপ্তাহ থেকে লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ থাকায় ফ্লোরিডায় থাকা তাদের বন্ধু ও বাংলাদেশে আত্মীয়রা এর কারণ খুঁজতে শুরু করেন। লিমনের মরদেহ খুঁজে পাওয়ার আগে তার ভাই সিএনএনকে জানিয়েছিলেন, তাদের পরিবার গভীর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ বলেছিলেন, আমরা অসাড় হয়ে যাচ্ছি। যেকোনও কিছুই ঘটতে পারে। আমরা শুধু সত্যিটা অথবা তাদের সাথে কী হয়েছিল তা জানতে চাই। দু’জন শিক্ষার্থী হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাবে, এটা অসম্ভব।
স্থানীয় পুলিশ বলেছে, লিমনকে সর্বশেষ গত ১৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় তিন ব্লক দূরে ক্যাম্পাসের বাইরের তার বাড়িতে দেখা গিয়েছিল। তিনি ২০২৪ সালের শরৎকাল থেকে ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি শুরু করেছিলেন।
লিমনকে দেখা যাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক ও পরিবেশ বিজ্ঞান ভবনে শেষবার দেখা গিয়েছিল বৃষ্টিকে। তিনি গত শরৎকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এবং রাসায়নিক প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছিলেন।
পরদিন পরিবারের এক বন্ধু ওই দু’জনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে ক্যাম্পাস পুলিশকে খবর দেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিখোঁজ এই দুই শিক্ষার্থীর সন্ধানে বিভিন্ন সূত্র ধরে একাধিক স্থানে তল্লাশি চালান। পরে বৃহস্পতিবার হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় নতুন তথ্যের ভিত্তিতে ওই দু’জনের অবস্থাকে ‘‘বিপদাপন্ন’’ হিসেবে ঘোষণা দেয়।
• বৃষ্টিকে বিয়ের কথা ভেবেছিলেন লিমন
লিমন বাংলাদেশে তার পরিবারের কাছে বৃষ্টির সম্পর্কে অনেক প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বৃষ্টির সঙ্গে প্রেম করছেন এবং তারা বিয়ের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
লিমনের ভাই আহমেদ বলেন, ‘‘সে বলেছিল বৃষ্টি খুব ভালো মেয়ে এবং তার অনেক প্রতিভা আছে। সে ভালো গান গাইতে ও রান্না করতে পারে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘লিমন গত দুই বছর ধরে তার থিসিস নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছিল। সে দক্ষিণ ফ্লোরিডার সঙ্কুচিত জলাভূমি পর্যবেক্ষণে জেনারেটিভ এআই কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করছিল।’’
আহমেদ বলেন, ‘‘আমার ভাই খুব ভদ্র এবং সহজ-সরল একজন মানুষ। তার মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকত। পিএইচডি শেষ করার পর লিমন বাংলাদেশে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে চাকরি করতে চেয়েছিল।’’
সূত্র: সিএনএন।
Reporter Name 























