পীর হাবিবুর রহমান-
মাহবুবুল হক শাকিল আড্ডার আসরে বসলেই বলতেন, ‘আমি মারা গেলে পীর হাবিব ভাই আমাকে নিয়ে প্রথম লেখাটি লিখবেন আমি জানি।’ শাকিলের পাগলামি কথায় কখনও গুরুত্ব দেইনি। মনে করতাম নাটকীয়তায় ভরপুর জীবনে মাহবুবুল হক শাকিলের এ নাটকীয় কথাবার্তারই অংশ। ভাবিনি অফিসে এসে বসতে না বসতেই একের পর এক আপনজনেরা শোক বিহ্বল হয়ে শাকিলের মৃত্যুর সংবাদ শুনিয়ে স্তব্ধ করে দেবেন। সর্বত্র শোকের ছায়া। আপনজনের মৃত্যুতে আমি অস্থির, অশান্ত। বিচলিত হয়ে অসুস্থ বোধ করি শাকিলের এই মৃত্যুতে। রাগ কষ্ট হচ্ছে। পাগলটা এটা একটা কাজ করলো? এভাবে বিনা নোটিশে আকস্মিক চলে যাবো, মরে যাবো বলে সত্যি সত্যি শাকিল চলে গেলো! অভিমানের খেয়ায় শাকিলের চিরবিদায়। শাহজাদি এলা এবার একাই পৃথিবী উপভোগ করুক।
প্রিয়জনের লাশের মুখ আমি দেখতে পারি না। গুলশানের সামদাদো রেস্তোরাঁয় মাহবুবুল হক শাকিল নিয়মিত আড্ডায় বসতেন। দু’ একবার সেই আড্ডায় আমিও গেছি। সেখানেই সোমবার রাত থেকে শাকিল আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই তার মতো করে বোহেমিয়ান জীবনের পোড় খাওয়া হৃদয়ের প্রেমিক ও কবির দহন নিয়ে রাতটি উপভোগ করেছেন।
দুপুর থেকে খবর ছড়িয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। শাকিলকে যখন উদ্ধার করা হয়েছে তখন নীরব, নিথর হিমশীতল দেহমাত্র। সেই প্রাণবন্ত জীবনের কোনো স্পন্দন নেই। একে একে স্বজনেরা সেখানে ডাকেন। আমি যেতে পারি না। আমার অস্থিরতা বাড়ে। তার যে মুখে কথা নেই, হাসি নেই, প্রাণ নেই, যে চোখে উজ্জ্বল দৃষ্টি নেই, সেই শাকিলের চির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাবার সাহস আমার নেই।
মাহবুবুল হক শাকিলএভাবে অকালে তিলে তিলে একটি সুন্দর তরতাজা জীবনকে নিঃশেষই করেননি, একটি সুন্দর জীবনকে তুচ্ছ ও রহস্যময় করে চীর বিদায় নিয়েছেন শাকিল। যেন জোড় করেই সকলের মায়া মমতা আবেগ, ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করে কী এক অভিমানে আকস্মিক চলে গেছেন। বহুবার বলেছেন, মরে যাবো, চলে যাবো! অভিমানের খেয়ায় বলতে বলতে চলেই গেলেন। যেন তার চির বিদায়ের মধ্য দিয়ে জীবন ও পৃথিবীকে উপভোগ করার সকল চুক্তিনামা বিনা নোটিশে বাতিল করে গেলেন। আর তার কোমল হৃদপিণ্ডের রক্ত দিয়ে আঁকা শাহজাদি এলার মতো প্রেমিকাকে চির মুক্তি দিয়ে যেন পৃথিবী উপভোগ করার একক অধিকার দিয়ে গেলেন। তার আদরের কন্যাটিকে এতিম করে সারাজীবনের জন্য বাবার আদরহীন করে দিলেন। এ কী হলো শাকিল!
মাহবুবুল হক শাকিল আমার দেখা ক্ষ্যাপাটে, জেদি, একরোখা অথচ কোমল বোহেমিয়ান, বন্ধুবৎসল, হৃদয়বান, এক প্রেমিক, কবি ও বন্ধু ছাড়া কিছু নয়, ভেতরটা তার শিশুর মতো সরল। বয়সে অনেক ছোট, একাডেমিক জীবনেও অনুজ, চিন্তা ও চেতনায় মনস্তাত্ত্বিক জায়গায় খুব কাছে থেকে চেনা এক বন্ধু। মেধাবী পড়াশোনা জানা রুচিশীল স্মার্ট এক তরুণ এমন বাউন্ডুলে অনিয়মিত জীবনযাপন কেন করে? কেন?
কতোবার ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েছি। কতোবার ক্ষুব্ধ হয়েছি। জয় করার সম্মোহনী শক্তি যার তীব্র, সামনে এলেই সব জল হয়ে যেতো। বিগত বছর থার্টিফার্স্ট নাইটে তার সঙ্গে বড় ধরনের ঝগড়া হয়ে গেছে। সাত সকালেই শাকিলের ফোন। ক্ষমা চাওয়া শিশুদের মতো কান্না! অবুঝ শিশু যেন একখান। প্রচুর পড়াশোনা করতেন। ইদানিং লেখালেখিতে ডুবে ছিলেন খুব। কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে গেল একুশে বইমেলায় ‘মনখারাপের গাড়ি’। অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, অন্য প্রকাশের মাযহারুল ইসলামের সঙ্গে আজ লন্ডন তো কাল কলকাতার বইমেলা। পরশু পদ্মা পাড়ে হাসান আজিজুল হকের বাড়ির আঙিনায়। প্রেম ও দ্রোহের কবি হয়ে উঠেছিলেন অভিমানী শাকিল। যখন তখন অভিমান, রাগ, প্রেম, আবেগ, হাসি-কান্না হয়ে উঠেছিল তার চরিত্রের অলঙ্কার।
দু’ তিনদিন আগেও রাতে তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। আজ মৃত্যুর দিন দুপুরে ঢাকা ক্লাবে মঞ্জু ভাইদের সঙ্গে তার খাওয়ার কথা ছিল। আগের দিন বেলা পৌনে ১১টায় সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামকে জানিয়েছিলেন ব্যস্ততায় যেতে পারবেন না। অভিমানের খুনসুটিও করেছিলেন। লেখালেখি ও সাহিত্য অঙ্গনে ইদানিং সুখ পেয়ে বিচরণ বাড়িয়ে ছিলেন। হাওড়, নদী, জোছনা, প্রকৃতি ও বইয়ের সঙ্গে ছিল তার নিবিড় প্রেম। কবি নজরুলের মতোই আগ্রাসী প্রেমিক শাকিল। তার আবেগ আপ্লুত সময়ে জড়িয়ে ধরে বলতেন সবার বিরুদ্ধে লিখুন। শুধু দুই আপার বিরুদ্ধে না। তার দুই আপা মানে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। তার সরলতা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হলেও এর ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে হাঁটেননি। বদলাননি নিজেকে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিজের মতো করে উপভোগ করে কতোটা তৃপ্ত হয়েছেন জানি না । অবিনাশী প্রেমের যন্ত্রনায় দগ্ধ ও ক্ষত বিক্ষত হয়েছেন। স্ত্রী ও কন্যা্ সন্তানকে ভালোবাসলেও বৈষয়িক ছিলেন না। ক্ষমতার পাদপ্রদীপে থেকে আখের গোছোনোর মতলব ছিল না তার।
হাঁসতে হাঁসতে, কাঁদতে কাঁদতে পথ হেটেছেন। হাঁসতে হাঁসতে, কাঁদতে কাঁদতেই চলে গেছেন। কবি রুদ্রর ভাষায় বলা যায়: অভিলাসী মন চন্দ্রে না পাক জোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই।
নিয়মিত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতেন, কবিতা দিতেন। সর্বশেষ সোমবার রাত ১১টা ২৭ মিনিটে ফেসবুকে তিনি কবিতা আপ করেন:
“এলা, ভালবাসা, তোমার জন্য
কোন এক হেমন্ত রাতে অসাধারণ
সঙ্গম শেষে ক্লান্ত তুমি, পাশ ফিরে শুবে।
তৃপ্ত সময় অখন্ড যতিবিহীন ঘুম দিবে।
তার পাশে ঘুমাবে তুমি আহ্লাদী বিড়ালের মতো,
তার শরীরে শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে, মাঝরাতে।
তোমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে এক প্রগাঢ় দীর্ঘশ্বাস,
আরো একবার তোমাদের মোথিত চুম্বন দেখবে বলে।
মৃতদের কান্নার কোন শব্দ থাকে না, থাকতে নেই,
নেই কোন ভাষা, কবরের কোন ভাষা নেই।
হতভাগ্য সে মরে যায় অকস্মাৎ বুকে নিয়ে স্মৃতি,
তোমাদের উত্তপ্ত সৃষ্টিমুখর রাতে।”
মাহবুবুল হক শাকিল
এটি পাঠ করলে মনে হয় কী এক অন্তহীন বেদনায় অভিমানে দহনে দহনে অতৃপ্ত আত্মার ক্রন্দনে একজন কবি যেন তার মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যেন কবি প্রেমিক শাকিল এভাবেই নিঃশেষ হয়। আর শাহজাদি এলার জন্য মুক্ত পাখির মতো পৃথিবী রেখে যায় উপভোগ করতে। তবে কি অবচেতনভাবেই মৃত্যু ভাবনা নায়কের মনোজগতে জানান ছিল বলেই নায়িকার বাসর দরজায় তপ্ত দীর্ঘশ্বাসটুকু রেখে গেছেন।
মাহবুবুল হকের শাকিলের রহস্যময় চিরবিদায়ের সংবাদে স্তব্ধ আমি একা নই, সবাই। শাকিলের সঙ্গে কবে, কখন, কোথায় প্রথম পরিচয় সেটি মনে নেই। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ইতি টেনে নব্বই উত্তর গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সংবাদকর্মী হিসেবে যখন পেশার তারে নিজেকে জড়িয়েছি, মাহবুবুল হক শাকিল তখন ছাত্রলীগের মিছিলের মুখ। শ্যাম বর্ণের মিষ্টি চেহারা আকর্ষণীয় এক সুদর্শন তরুণ। শাকিলের মাথা ভর্তি কোকড়ানো চুল, পরনে জিন্স, পায়ে ট্রেনার, কখনও লংস্লিভ শার্ট, কখনও টি শার্ট; উজ্জ্বল চোখের দ্যুতি নানান চঞ্চলতা ও দুষ্টুমিতে দ্রুতই জয় করেছিল দিনে দিনে সবাইকে।
আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিরোধীদলের নেত্রী, আমরা তখন সংবাদ সংগ্রহের জন্য সফরসঙ্গী হয়ে সারা দেশ ঘুরেছি। দলের অনেক নেতাকর্মীই নয়, ছাত্রলীগের একটি গ্রুপও সেই সফরে যেতেন। মাহবুবুল হক শাকিল ছিলেন তাদেরই একজন। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র তীরে বেড়ে ওঠা শাকিলের বই পড়ার নেশা ছিল তখন থেকেই। তার মায়ের হাতেই বই পড়ার সুখ নেওয়া। বইয়ের সঙ্গে কখনও বিচ্ছেদ হয়নি তার। বিনয়ী, ভদ্র ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার মিশেলে মিষ্টি বাচনভঙ্গি রোমান্টিক হাঁসি আর ব্যবহারে সহজেই আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার।
মাহবুবুল হক শাকিল
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তার থাকার কথা ছিল। হয়েও তার নেতৃত্বে অভিষেক হয়নি। সহসভাপতি ছিলেন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের গবেষণা সেলে তিনি জড়িয়ে যান। বিরোধীদলের নেত্রী শেখ হাসিনার ডেপুটি প্রেস সচিব হলেন। নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। দেখা হয়। আড্ড হয়। সব আড্ডায় বই নিয়ে কথা হতো। বই পড়তেন নিয়মিত। মায়ের ভক্ত ছেলে শাকিল স্নেহ কুড়াতে জানতেন। ২০০৫ সালে আমার ‘অফ দ্য রেকর্ড’ বই বের হয়। আজিজ সুপার মার্কেটের বইপত্র থেকে একদিন সন্ধ্যায় শাকিলের ফোন। আপনার একটি বই নিয়ে নিলাম। নিয়ে যাও। পরদিন সকাল নটায় ফোন। শাকিলের কী উত্তেজনা! আবেগ। সারারাতে পড়া শেষ করেছি বস। নস্টালজিক। আমার অন্দর আমার অতীতকে খুঁজেছি। পেয়েছি।
ঢাকা ক্লাবে মোজাম্মেল বাবু মনির আড্ডায় কাজের চাপে নিয়মিত যেতে পারি না। মাঝে মধ্যে রাতে হানা দেই। অফিস শেষে। রাজনীতি এখন উর্মিমুখর। একরাতে শাকিল গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে গভীর মমতায় বলে, ভাই তোমাকে জীবিকার টানে এ নগরে মানায় না। তুমি হাওড়ে জলে ভাসবে। গা্ন শোনবে। আর লিখবে। তুমি হাওড়ে যাও। খান আতার মেয়েকে ডেকে বললো, আমার ভাইয়ের জন্য তুমি দু’তিনটি গান গাও। তুমি গাও। আমরা শুনি। সে গায়। আমরা শুনি। এবারই সুনামগঞ্জের হাওরে তাকে নিয়ে যাবার কথা ছিল। গান শোনার কথা ছিল। তার আগেই শাকিল চলে গেল। যতো দিন বাঁচবো রোদে পুড়বো, বৃষ্টিতে ভিজবো, জোছনায় মুগ্ধ হবো। গানের রাতে আসর বসলেই শাকিলকে খুব মনে পড়বে। শাকিল এভাবে চলে গেলে কেন? তোমাকে খুব মিস করছি। যে রহস্যপুরীতেই যাও, হুরপরীদের নিয়ে ভালো থেকো।
Reporter Name 

























