ঢাকা ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাল সনদে ১২৮ শিক্ষক, ফেরত দিতে হবে টাকা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:৩৫:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
  • ৪ বার

খুলনার পল্লীমঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন কর্মরত সহকারী শিক্ষক (গণিত) রাবেয়া বেগম (ছদ্মনাম)। এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে তিনি সরকারের কাছ থেকে বেতন – ভাতা পাচ্ছেন । তবে তাঁর জমা দেওয়া শিক্ষক নিবন্ধন সনদটি ভুয়া বলে চিহ্নিত হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে। বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা এখন তাঁকে ফেরত দিতে হবে।

এই শিক্ষকের মতো এমপিওভুক্ত মোট ১২৮ জন শিক্ষকের সনদ জাল বলে ধরা পড়েছে ডিআইএর তদন্তে । তাই তাঁদের কাছ থেকে বেতন – ভাতা হিসেবে সরকার থেকে নেওয়া ২৯ কোটি টাকার বেশি ফেরত নেওয়া এবং তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ । ডিআইএ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তদন্ত করে । এ সময়ে মোট ৯৭৩ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করে এসব তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি । গত রোববার এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ডিআইএ ।

এর আগে ২০২৪ সালে ডিআইএর তদন্তে (২০২১ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) ১৫৪ জন এবং ২০২৩ সালের ১৮ মে ডিআইএর তদন্তে (তদন্তের কালপর্ব ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত) চিহ্নিত জাল সনদধারী জাল সনদে ১২৮ শিক্ষক ফেরত ৬৭৮ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত, বেতন-ভাতার সরকারি অংশের অর্থ ফেরত নেওয়া এবং ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া ডিআইএ ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের ২৫ মে পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৫৬ জন জাল সনদধারী শিক্ষককে শনাক্ত করেছিল। পরে এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ।

ডিআইএর প্রধান কাজ স্কুল , কলেজ , মাদ্রাসা , কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থা পরিদর্শন এবং নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা । পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম , দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় । এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় । ডিআইএর একের পর এক তদন্তে শিক্ষকদের জাল সনদের তথ্য বেরিয়ে আসায় শিক্ষাবিদেরা বিস্মিত । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষকতা একটি মহান পেশা।এই পেশায় আসার ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া ঘৃণিত অপরাধ।

এদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ” শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন , শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার আগে এবং নিরীক্ষার সময় শিক্ষাগত সব সনদ যথাযথভাবে যাচাই করার কথা । কিন্তু জাল সনদ জানার পরও ‘ অবৈধ সুবিধা নিয়ে বিষয়টি চেপে যান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ( মাউশি ) অধিদপ্তর এবং ডিআইএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা । তবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ( এনটিআরসিএ ) মাধ্যমে অনলাইনে সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার পর জাল সনদের হার কিছু কমেছে । ডিআইএ সূত্র বলছে , সম্প্রতি ডিআইএর সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল সনদে শিক্ষকতা করার প্রমাণ পেলেও ‘ অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে তা বাদ দেওয়ার অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে।

জানতে চাইলে ৩ মার্চ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ যদি কারও সনদ জাল হয় , সেটা কেউই ছাড়তে পারবে না । সনদ অফিস থেকে অটোমেটিক যাচাই হয় । মানুষ খুশি হয়ে বা একটু ভয়ে সম্মান করল বা যা – ই করল , সেটা আলাদা জিনিস ; কিন্তু সনদে কেউ ছাড় দিতে পারবে না । ‘ তিনি আরও বলেন , “ আসেন একটু চা – টা খাই , সামনাসামনি কথা বললে অনেক জিনিস কিন্তু ইয়ে হয় । জানতে চাইলে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গত ২ মার্চ আজকের পত্রিকাকে বলেন , গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিদর্শন করা ৯৭৩ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্তে ১২৮ জন শিক্ষকের জাল সনদ ধরা পড়েছে । তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে । এখন নিয়ম অনুযায়ী চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ।

ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি থেকে জানা যায় , যে ১২৮ শিক্ষকের সনদ জাল চিহ্নিত হয়েছে , তাঁদের মধ্যে ৯৩ জন স্কুল – কলেজের শিক্ষক এবং বাকি ৩৫ জন মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক । তাঁদের বেতন – ভাতা হিসেবে নেওয়া মোট ২৯ কোটি ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ১৫৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে । একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে ডিআইএ । সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব ( নিরীক্ষা ও আইন ) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান গত ২ মার্চ বলেন , “ জাল সনদধারী শিক্ষকদের বিষয়ে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর । এর আগেও তদন্তে বের হওয়া জাল সনদধারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । এবারও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে । ’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জাল সনদে ১২৮ শিক্ষক, ফেরত দিতে হবে টাকা

আপডেট টাইম : ০১:৩৫:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

খুলনার পল্লীমঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন কর্মরত সহকারী শিক্ষক (গণিত) রাবেয়া বেগম (ছদ্মনাম)। এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে তিনি সরকারের কাছ থেকে বেতন – ভাতা পাচ্ছেন । তবে তাঁর জমা দেওয়া শিক্ষক নিবন্ধন সনদটি ভুয়া বলে চিহ্নিত হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে। বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা এখন তাঁকে ফেরত দিতে হবে।

এই শিক্ষকের মতো এমপিওভুক্ত মোট ১২৮ জন শিক্ষকের সনদ জাল বলে ধরা পড়েছে ডিআইএর তদন্তে । তাই তাঁদের কাছ থেকে বেতন – ভাতা হিসেবে সরকার থেকে নেওয়া ২৯ কোটি টাকার বেশি ফেরত নেওয়া এবং তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ । ডিআইএ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তদন্ত করে । এ সময়ে মোট ৯৭৩ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করে এসব তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি । গত রোববার এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে ডিআইএ ।

এর আগে ২০২৪ সালে ডিআইএর তদন্তে (২০২১ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) ১৫৪ জন এবং ২০২৩ সালের ১৮ মে ডিআইএর তদন্তে (তদন্তের কালপর্ব ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত) চিহ্নিত জাল সনদধারী জাল সনদে ১২৮ শিক্ষক ফেরত ৬৭৮ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত, বেতন-ভাতার সরকারি অংশের অর্থ ফেরত নেওয়া এবং ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া ডিআইএ ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের ২৫ মে পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১৫৬ জন জাল সনদধারী শিক্ষককে শনাক্ত করেছিল। পরে এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ।

ডিআইএর প্রধান কাজ স্কুল , কলেজ , মাদ্রাসা , কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থা পরিদর্শন এবং নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা । পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম , দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় । এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় । ডিআইএর একের পর এক তদন্তে শিক্ষকদের জাল সনদের তথ্য বেরিয়ে আসায় শিক্ষাবিদেরা বিস্মিত । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষকতা একটি মহান পেশা।এই পেশায় আসার ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া ঘৃণিত অপরাধ।

এদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ” শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন , শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার আগে এবং নিরীক্ষার সময় শিক্ষাগত সব সনদ যথাযথভাবে যাচাই করার কথা । কিন্তু জাল সনদ জানার পরও ‘ অবৈধ সুবিধা নিয়ে বিষয়টি চেপে যান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ( মাউশি ) অধিদপ্তর এবং ডিআইএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা । তবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ( এনটিআরসিএ ) মাধ্যমে অনলাইনে সনদ যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার পর জাল সনদের হার কিছু কমেছে । ডিআইএ সূত্র বলছে , সম্প্রতি ডিআইএর সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল সনদে শিক্ষকতা করার প্রমাণ পেলেও ‘ অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে তা বাদ দেওয়ার অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে।

জানতে চাইলে ৩ মার্চ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ যদি কারও সনদ জাল হয় , সেটা কেউই ছাড়তে পারবে না । সনদ অফিস থেকে অটোমেটিক যাচাই হয় । মানুষ খুশি হয়ে বা একটু ভয়ে সম্মান করল বা যা – ই করল , সেটা আলাদা জিনিস ; কিন্তু সনদে কেউ ছাড় দিতে পারবে না । ‘ তিনি আরও বলেন , “ আসেন একটু চা – টা খাই , সামনাসামনি কথা বললে অনেক জিনিস কিন্তু ইয়ে হয় । জানতে চাইলে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গত ২ মার্চ আজকের পত্রিকাকে বলেন , গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিদর্শন করা ৯৭৩ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদন্তে ১২৮ জন শিক্ষকের জাল সনদ ধরা পড়েছে । তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে । এখন নিয়ম অনুযায়ী চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ।

ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি থেকে জানা যায় , যে ১২৮ শিক্ষকের সনদ জাল চিহ্নিত হয়েছে , তাঁদের মধ্যে ৯৩ জন স্কুল – কলেজের শিক্ষক এবং বাকি ৩৫ জন মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক । তাঁদের বেতন – ভাতা হিসেবে নেওয়া মোট ২৯ কোটি ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ১৫৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে । একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে ডিআইএ । সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব ( নিরীক্ষা ও আইন ) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান গত ২ মার্চ বলেন , “ জাল সনদধারী শিক্ষকদের বিষয়ে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর । এর আগেও তদন্তে বের হওয়া জাল সনদধারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । এবারও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে । ’