সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদায়নের আগেই বিদ্যমান শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিস্থাপন জটিলতায় আটকে থাকা হাজারও শিক্ষদের দুর্ভোগের অবসান হবে এমনটাই নিশ্চিত করেছে সূত্রটি।
শনিবার বিকালে সূত্রটি জানিয়েছে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদায়নের আগে বিদ্যমান শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া প্রতিস্থান বদলি আদেশধারীদেরও মুক্ত করার বিষয়েও চুড়ান্ত আলোচনা চলছে। মন্ত্রণালয়ও বিষয়টিতে অবগত। তবে ঠিক কবে থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি।
মোংলা উপজেলার শিক্ষক পিয়া বাড়ই বলেন, ২০১৭ সাল থেকে একই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। স্কুল পিতার বাড়ি থেকে ১০ কিমি দক্ষিণে সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থিত। রাস্তার বেহাল দশার কারণে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শত কিলোমিটার দুরে স্বামীর ঠিকানা, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে স্বামী-সংসার থেকে আলাদা আছি। স্বামীর ঠিকানায় বদলির জন্য অনেক চেষ্টা করে অবশষে ২০২৫ সালে প্রতিস্থাপন বদলির আদেশ পেলেও মুক্তি মেলেনি।
এ বিষয়ে শিক্ষকরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ প্রতিস্থাপন বদলির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবেন এবং দীর্ঘদিনের জটিলতার স্থায়ী সমাধান দেবেন। শিক্ষকরা বলেন, প্রতিস্থাপন বদলি আদেশ পাওয়া নারী শিক্ষকদের মধ্যে অধিকাংশ তাদের পিতার ঠিকানায় চাকরি পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তারা স্বামীর ঠিকানায় না যেতে পেরে স্বামী-সন্তান-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। কেউ কেউ পদায়নের সময় কাছের বিদ্যালয়ের পদ শূণ্য না থাকায় অনেক দুরে পদায়ন পেয়েছিলেন, তারাও পছন্দমতো বিদ্যালয়ে বদলির আদেশ পেয়েছেন কয়েক বছর আগে। কিন্তু নিজ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকায় তারা ছাড়পত্র পাননি।
নোয়াখালীর শিক্ষক মো. আব্দুল আজিজ বলেন, আমি ২০২০ সাল থেকে ২০ কিলোমিটার দুরের ধুলিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত আছি। ২০২৪ সালে প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলির আদেশ পেলেও এখন পর্যন্ত নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে পারিনি।
২০২৪-২০২৫ সালের বড় নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখনো শিক্ষক পদায়ন সম্পন্ন না হওয়ায় আমাকে অবমুক্ত করা হচ্ছে না। ফলে বদলির আদেশ থাকা সত্ত্বেও আগের কর্মস্থলেই আটকে আছি। নতুন শিক্ষক পদায়নের আগে সমাধান না পেলে অবসরের আগে স্বাভাবিক কর্মজীবন পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে যাবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলির আদেশপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা ৭ হাজার ৯৫ জন। এর মধ্যে অনেকেই প্রতিস্থাপক পেয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যেতে পেরেছেন। অধিকাংশের বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকায় তাদের বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করানো যাচ্ছে না। ফলে বদলির আদেশ কাগজে থাকলেও বাস্তবে শিক্ষকরা বছরের পর বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্গম চর, হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এর আগে একাধিকবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বদলি আদেশ হাতে থাকলেও প্রতিস্থাপক না আসায় যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূর-দুরান্তের দুর্গম অঞ্চলে কর্মরত আছেন, তাদের বিষয়ে অধিদপ্তর অবগত এবং বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বদলির কারণে কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট সৃষ্টি না করে কীভাবে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের দ্রুত অবমুক্ত করা যায় সে বিষয়ে ইতিবাচক অধিদপ্তর। পদায়নের আগেই তাদের সমাধান করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দেশ রুপান্তরকে বলেন, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা যে কোনও উপায়ে ভালো কর্মস্থলে যেতে চাইবেন। কোন কোন ডিপিওই অনৈতিক সুবিধা নিয়ে শিক্ষকদের পদায়ন দিবেন। পদায়নের আগে প্রতিস্থাপন বদলি সমাধান না হলে তারা আদৌ নিজ ঠিকানার নিকটবর্তী যেতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে।
গাইবান্ধার শিক্ষক মোছা. ফাতেমা জান্নাত কেয়া বলেন, গত তিন বছর ধরে বিদ্যালয়ে কর্মরত আছি। আমার বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। দুর্গম চরাঞ্চল ও যোগাযোগের কষ্টের কারণে দুই বছরের শিশুকে নিয়ে স্কুলের পাশেই ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানে ভালো বাসস্থান নেই, চিকিৎসা সেবা নেই, বাজার-ব্যবস্থা নেই, রাস্তা ও পরিবহন সুবিধাও নেই। আমার বাম হাত ভাঙা বর্ষার দিনে শিশুকে কোলে নিয়ে ছাতা ধরতেও পারি না। এমনকি ওই এলাকায় আমার নিজের কোনো স্বজনও নেই। ডিজি মহোদয় সবসময় শিক্ষকদের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। শিক্ষার মান উন্নয়নে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়, তিনি আমাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কেও অবগত আছেন। আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত এ দীর্ঘদিনের প্রতিস্থাপন জটিলতার সমাধান হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
প্রসঙ্গত, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ফলাফল ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাতে প্রকাশ করা হয়েছে। চূড়ান্তভাবে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। যারা পদায়নের অপেক্ষায় আছেন।
Reporter Name 
























