দেখে শুনে মনে হচ্ছে ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠুভাবেই অনুষ্ঠিত হবে। ভোটের দিন দেশি-বিদেশী শক্তি এবং নির্বাচন বানচালের চক্রান্তকারীরা প্রতিবন্ধকতা না করলে এবং মানুষ ভোট দিতে পারলে ফলাফল কি হবে তা প্রায় পরিস্কার। নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয় অথবা প্রত্যাশ্যিত আসন না পেলেও বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন এটা প্রায় বলাই যায়। কিন্তু এখন থেকেই বিএনপির নির্ধারকদের এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনের পর দেশ পরিচালনার সুচিন্তিত চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। নির্বাচনের পর পরাজিত প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা এবং দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে গতিশীল করতে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে হবে। এবারের নির্বাচনে তুরস্ক, পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জামায়াতকে যে সমর্থন দিচ্ছে; বিএনপি কিন্তু সে ধরনের সমর্থন আদায় করতে পারেনি। বিএনপির একমাত্র পুঁজি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ইমেজ, দীর্ঘ ১৮ বছর নানামুখি পৈশাচিক নির্যাতন সহ্য করে রাজপথে টিকে থাকা নেতাকর্মীদের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভুতি এবং তারেক রহমানের ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব। পর্দার আড়ালে থেকেই কিছু দেশ যেভাবে জামায়াতকে নানামুখি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, বিএনপির সেটা নেই বললেই চলে। বিএনপি কার্যত; কেবল দেশের মানুষের উপর নির্ভরশীল।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে নানা পন্থায় প্রশাসনকে কব্জা করেছে জামায়াত। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর মাধ্যমে জামায়াতের পুনঃজন্ম ঘটলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলের এই দেড় বছর দলটি সবচেয়ে সুসময় পেয়েছে। প্রায় সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে শিবিরের বিজয়ের পর জামায়াত ধরে নেয় তারা জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসছে। দলটির কেন্দ্র থেকে শুরু করে শেকড় পর্যায়ের নেতা-নেত্রীদের আচরণ এবং ক্ষমতায় যাওয়ার ‘আওয়াজ’ দলটির কর্মী সমর্থকদের আরো বেপরোয়া করে তোলে। বট-বাহিনীকে নামিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দলটি ঝড় তোলে। সেই সঙ্গে ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে সাধারণ ভোটার ও নারীদের ভোট দিলে বেহেস্ত পাওয়ার লোভ দেখানো এবং ঘরে ঘরে গিয়ে দরিদ্র ও গৃহিণী ভোটারদের নানান সুযোগ-সুবিধা দেয়। ভোটারদের আইডি কার্ড নেয়া এবং বিকাশ নম্বর নেয়ার খবর সবাই জানেন। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীরা জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করলেও শেষ বিকেলে তারাও অর্থ লোভ সংবরণ করতে না পেরে নির্বাচনী জোটে গিয়ে জামায়াতের বি-টীম হয়ে যায়। যা আগামী দিনে ছাত্র রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা ঘটবে। তারপরও বিএনপির পক্ষ্যে গণজোয়ার উঠায় সংস্কারের পর নির্বাচন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন, আগে গণভোট পরে নির্বাচন ইত্যাদি দাবিতে আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়। তারপরও জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়ার ‘আওয়াজ’ এখনো অতি উচ্চস্তরে। দলটির শীর্ষ নেতারা মুখে যতই দাবি করুক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাবেন কিন্তু মাঠের চিত্র ও বাস্তবতা তারা বোঝেন এবারের নির্বাচনে জামায়াতের বিপুল পরিমান ভোট বাড়লেও বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়। তবে এটা ঠিক হেফাজতের আমীরসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা এবং ইসলামী স্করারগণ ‘দাড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেস্তের টিকেট’ মিথ্যা আশ্বাসের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। তারা ‘জামায়াতের লক্ষ্য ইসলাম না ক্ষমতা’ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আলেমরা বলেছেন, ভোটের জন্য ইসলামের অপব্যবহার করে জামায়াত নেতারা গোমরাহি করেছেন। একই সঙ্গে দাড়িপাল্লার প্রতীকের এক পাল্লায় আমেরিকা অন্য পাল্লায় ভারতকে রেখে বদনীতি ভরা চেতনা ধারণ করায় তাদের ভোট দেয়া হারাম বক্তব্য দিয়েছেন আলেম সমাজ। নির্বাচনের চালচিত্রে আগাম বার্তা বলছে বিএনপি ক্ষমতায় যাচ্ছে; অথচ দেশের অর্থনীতি চরম দূরবস্থায়। আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস দীর্ঘ দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা করে অর্থনীতি গতিশীল করতে পারেননি। বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারেননি। তিনি ও তার উপদেষ্টারা কেবল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের উপর দায় চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করে দীর্ঘ সময় পার করেছে।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি দূরের কথা অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে চলতি অর্থ বছরে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ইতোমধ্যেই সরকারের ঋণ সুদ-আসলে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিদেশী ঋণের হিসেবের খাতায় চোখ মেলালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট বিদেশী ঋণ শতকরা ৯২ শতাংশ বেড়ে ৯ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। অথচ ২০২২ সালে এই ঋণের পরিমান ছিল অর্ধেকের কিছু বেশি। শুধু বিদ্যুৎ সেক্টরে রেন্টাল কুইক রেন্টালে সরকারের কাছে সামিট, এস আলম ও আদানীসহ কয়েকটি কোম্পানির বকেয়া পড়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ খাদে পড়ে থাকা অর্থনীতির মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে; যা নতুন সরকারকে কার্যকর করতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ আর্থিক খাতকে চরম বিপর্যয়কর অবস্থায় রেখে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পরাজিত হলে জামায়াত ‘অর্থনীতির দূরবস্থার’ সেই সুযোগ নেবে। নতুন সরকারকে বিপর্যন্ত অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করতে হবে। সে বাস্তবতা বুঝেই নির্বাচনে পরাজিতরা নতুন সরকারকে ‘হানিমুন পিরিয়ড’ও স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে জামায়াত। তারেক রহমানকে এখন থেকেই সেই ভাবনা মাথায় রাখতে হবে। বুঝতে হবে এখন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ্যে কেবল দেশের জনগণ। আর জামায়াতের পক্ষে একাধিক প্রভাবশালী ইসলামী দেশ ও তাদের অর্থে পরিচালিত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। নির্বাচনে অনেক দেশ পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না; অথচ তুরস্ক, নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশ অতি উৎসাহী হয়ে পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে। যাদের নিজের দেশে গণতন্ত্র ভঙ্গুর তারা বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে। এমনকি বোকাহারামের দেশ নাইজেরিয়া এবার নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে। শুধু কি তাই, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা নির্বাচন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ এলেও বেশি সংখ্যায় এসেছে জামায়াতের রাজনীতি চেতনায় বিশ্বাসী গণমাধ্যম কর্মীরা। তারা যাতে জামায়াতের দৃষ্টিতে একচোখা দৃষ্টিতে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে না পারেন সে জন্য বিএনপির মিডিয়া সেলকে বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তাদের সঙ্গে লেগে থাকতে হবে।
নির্বাচনী প্রচারণায় বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত যেভাবে অর্থ আর মিথ্যার ডালি নিয়ে মাঠে নেমেছে; নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারলে পরাজয়ের ক্ষোভ থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে মাঠে নামবে। এ সময় তাদের পক্ষ্যে নির্বাচনে পরাজিত অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলো একাট্টা হয়ে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে নামতে পারে। বিএনপির নেতৃত্বকে এখনই সেগুলো মোকাবিলার সুচিন্তিত পথরেখা প্রণয়ন করতে হবে। যেহেতু দেশের অর্থনীতি চরমভাবে বিপর্যস্ত এবং নির্বাচনের পর এক বছরের মধ্যে নির্বাচনে দেয়া বিএনপির বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হবে না সে জন্য জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার কৌশল বিএনপিকে অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে নির্বাচনী ইস্তেহারে বিএনপি যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সেগুলো ধরে ধরে জামায়াত প্রচারণা চালিয়ে তারেক রহমান ও বিএনপিকে বিপদে ফেলার অপচেষ্টা করবে। ফলে নির্বাচনের পরেও জামায়াতকে বাদ দিয়েই বিএনপিকে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে হবে। কারণ বিএনপি দেশজ রাজনৈতিক দল হলেও জামায়াত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংগঠন। ভারতে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ, পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান রয়েছে। সেই আদলে বাংলাদেশের জামায়াত এবং তাদের পিছনে ওই সব দেশের ওই দলগুলো সক্রিয়। ফলে জামায়াতের শক্তিকে খাটো করে দেখা উচিত হবে না। এখানে আরেকটি কথা প্রাসঙ্গিক। তাহলো প্রধানমন্ত্রীর দৌঁড়ে তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমানের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। শফিকুর রহমানের সঙ্গে দলের সিনিয়র নেতাসহ যে কেউ যখন-তখন দেখা সাক্ষাৎ করতে পারেন। তারা মাঠের প্রকৃত চিত্র তার কাছে তুলে ধরেন। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। পক্ষান্তরে নিরাপত্তাজনীত কারণে তারেক রহমানের কাছে অনেকেই যেতে পারেন না। দলের সিনিয়র নেতারা পর্যন্ত যখন-তখন দেখা করতে পারেন না। তারেক রহমানকে তার অফিসের কর্মচারীদের দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এতে অনেক সময় প্রকৃত চিত্র তিনি জানতে পারেন না। সে জন্যই বিএনপির সিনিয়র নেতারা যাতে যখন তখন তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারেন সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া আবশ্যক।
Reporter Name 

























