সম্প্রতি কুখ্যাত মার্কিন অর্থলগ্নিকারী জেফ্রি এপস্টিনের ব্যক্তিগত ইমেইল ও নথি ধাপে ধাপে প্রকাশ পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও বিস্ময়কর বয়ান সামনে এসেছে। এসব নথিতে কোথাও ইমরান খানকে কোনো অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। বরং সেখানে তাকে এমন এক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যাকে নিয়ে এপস্টিন নিজেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
২০১৮ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ইমরান খানের বিজয়ের পরপরই লেখা এক চিঠিতে এপস্টিন তাকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কিংবা রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের চেয়েও ‘শান্তির জন্য বড় হুমকি’ বলে উল্লেখ করেন। এই মন্তব্য ইমরান খানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার বদলে বরং তাকে এমন এক দৃঢ় জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরে, যিনি আন্তর্জাতিক ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে আপস করতে নারাজ—এবং ঠিক এই কারণেই প্রভাবশালী বৈশ্বিক অভিজাতদের কাছে অস্বস্তিকর।
এপস্টিনের কথিত ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে ইমরান খানকে ‘খুবই খারাপ খবর’ এবং ‘একজন ধর্মপ্রাণ ইসলামপন্থী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়—যিনি জনতাকে সংগঠিত ও উজ্জীবিত করতে সক্ষম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও হাউস ওভারসাইট কমিটির প্রকাশিত হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, ইমরান খানের সঙ্গে এপস্টিনের অপরাধচক্রের কোনো যোগসূত্রের প্রমাণ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এসব উল্লেখ আসলে ইমরান খানের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতিই ইঙ্গিত করে—যেখানে পশ্চিমা স্বার্থের প্রতি নতিস্বীকারের বদলে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ইমরান খান হয়ে ওঠেন সেই বিরল নেতা, যিনি প্রচলিত বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানান। তার শাসনামলে গৃহীত ‘এহসাস’ কর্মসূচি—যার আওতায় ২০২২ সালের মধ্যে ৮ কোটিরও বেশি মানুষ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়—এই জাতীয়তাবাদী ও জনমুখী ভাবমূর্তিকে আরও সুদৃঢ় করে।
২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রিত্বকাল ছিল ইমরান খানের রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও মহামারির চাপ সত্ত্বেও এই সময়ে পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে বার্ষিক ৫.৮ শতাংশে পৌঁছায়। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে শত শত বিলিয়ন রুপি উদ্ধার, ‘বিলিয়ন ট্রি সুনামি’ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশগত সাফল্য এবং জাতিসংঘের স্বীকৃতি—সব মিলিয়ে আত্মনির্ভরতার পথে অগ্রসর এক রাষ্ট্রনায়কের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে প্রকাশিত ইমেইলগুলোর একটিতে ১৯৯০-এর দশকের একটি ছবির কথাও উঠে আসে, যেখানে ইমরান খানকে ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়। এটি এপস্টিন কেলেঙ্কারির বহু আগের ঘটনা। সরকারি বিশ্লেষণগুলো নিশ্চিত করেছে—এই দূরবর্তী সামাজিক যোগাযোগ ইমরান খানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনৈতিকতার ইঙ্গিত বহন করে না। বরং এটি তার ক্রিকেট তারকা ও সমাজসেবক পরিচয়েরই স্বাভাবিক প্রতিফলন।
শওকত খানুম ক্যান্সার হাসপাতাল, যেখানে ১৯৯৪ সাল থেকে অধিকাংশ রোগী বিনা খরচে চিকিৎসা পাচ্ছেন, ইমরান খানের মানবিক নেতৃত্বের আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এপস্টিন যে ‘জনতাকে উজ্জীবিত করার ক্ষমতা’-র কথা বলেছেন, বিশ্লেষকদের মতে, সেটি আসলে ইমরান খানের প্রকৃত গণভিত্তিরই এক অনিচ্ছাকৃত স্বীকৃতি।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইমরান খানের নিরপেক্ষ অবস্থান, পশ্চিমা চাপ উপেক্ষা করে মস্কো সফর এবং সংলাপের আহ্বান তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়। একইভাবে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে সিপেক প্রকল্পে বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও ছিল পশ্চিমা নির্ভরতা কমানোর কৌশলের অংশ।
এই অবস্থানই তাকে বৈশ্বিক অভিজাত গোষ্ঠীর চোখে ‘হুমকি’ করে তোলে। অথচ দেশের অভ্যন্তরে তার জনসমর্থন ছিল সুদৃঢ়—যার প্রতিফলন বিভিন্ন জরিপ ও নির্বাচনী ফলাফলেও দেখা যায়।
উপসংহার
ডিক্লাসিফায়েড নথিতে জেফ্রি এপস্টিনের ব্যক্তিগত মতামতগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবেই ইমরান খানের বৈশ্বিক প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কোনো বাস্তব অভিযোগ ছাড়াই তাকে ‘হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা মূলত সেইসব নেতার ভাগ্যই নির্দেশ করে, যারা অস্বচ্ছ বৈশ্বিক ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে আপস করতে অস্বীকৃতি জানান।
এপস্টিন যা অবমাননা হিসেবে উচ্চারণ করেছিলেন, সময়ের প্রবাহে তা অনেকের চোখে সম্মানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এভাবেই ইমরান খান ইতিহাসে এমন এক জাতীয়তাবাদী আইকন হিসেবে নিজের স্থান নিশ্চিত করেছেন, যার প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে যায় এবং যিনি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক অবিচল প্রতীক হয়ে থাকেন।
Reporter Name 
























