জাতিসংঘের ইতিহাসে অন্যতম গভীর অর্থ সংকটের সতর্কবার্তা দিলেন সংস্থটির মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। বার্ষিক চাঁদা বকেয়া ও তহবিল ঘাটতির কারণে জাতিসংঘ ‘অত্যাসন্ন আর্থিক ধসের’ মুখে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এই সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের মতো মানবিক সহায়তা-নির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশে জাতিসংঘের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জলবায়ু অভিযোজন এবং নারী ও শিশুর সুরক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এর পর রয়েছে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাত।
টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য ও অপুষ্টি মোকাবিলায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা অর্থায়ন করে থাকে। পাশাপাশি দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫ খাতে প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ব্যবস্থাপনা
এটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ খাত। বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মূলত জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা (ইউএনএইচসিআর, ডব্লিউএফপি, ইউনিসেফ) পরিচালনা করে। তহবিলের অভাবে ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের খাদ্য বরাদ্দ কমানো হয়েছে এবং প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়েছে।
শান্তিরক্ষা মিশন
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৈন্য প্রেরণে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। আর্থিক সংকটের কারণে জাতিসংঘ তাদের মিশনগুলোতে শান্তিরক্ষীর সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছে। এতে বাংলাদেশের প্রায় ১ হাজার ৩০০ শান্তিরক্ষী কর্মসংস্থান হারাতে পারেন এবং দেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ মোকাবিলা
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির ব্যবস্থা, বন্যা ও সাইক্লোন মোকাবিলায় জাতিসংঘের সংস্থাগুলো (যেমন- ইউএনডিপি) কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। তহবিল সংকটে এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বন্ধ বা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন প্রকল্প
দারিদ্র্য বিমোচন, মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার উন্নয়নে জাতিসংঘের বহু প্রকল্প বাংলাদেশে চালু রয়েছে। তহবিল সংকটে ইউএসএইডের মতো দাতাদের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই অনেক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
অর্থনৈতিক প্রভাব
জাতিসংঘের মাধ্যমে আসা বৈদেশিক সহায়তা ও অনুদান দেশের রিজার্ভ এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রবাহ কমে গেলে দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশ ইতিমধ্যেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সম্ভাব্য এই আর্থিক সংকট বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতিসংঘের অর্থ সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধতার কারণে ক্লিনিক, ওষুধ ও টিকাদান কর্মসূচি সংকুচিত হতে পারে। শিশু ও নারী-বান্ধব প্রকল্পে কাটছাঁট হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বিশেষ করে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মাতৃ ও শিশুসেবা, টিকাদান এবং শরণার্থী সহায়তা খাতে বাংলাদেশে যে আর্থিক সহায়তা দেয়, তা হঠাৎ কমে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। সরকার এককভাবে সব খাতের ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা. আমানুল্লাহ বলেন, ‘জাতিসংঘের সহায়তার বড় একটি অংশ বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। বৈদেশিক সহায়তা কমে গেলে সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে অথবা ভর্তুকি কমাতে হবে, যার প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানে।’
Reporter Name 
























