ঢাকা ১২:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসায় ভারতীয় গণমাধ্যম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে মঈন খানকে হাসপাতালে দেখতে গেলেন মির্জা আব্বাস সৃজনশীল শিল্পকে মূলধারার অর্থনীতিতে পরিণত করতে চায় সরকার : অর্থমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহায়তায় নতুন গতির আশা জাপানের সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় ইমামদের সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন: জাতীয় ইমাম সম্মেলনে ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ মাদ্রাসা শিক্ষককে চড় মারা রুমিকে গ্রেপ্তার করতে চায় পুলিশ এইচএসসির ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর সরাইলের ঘটনায় মামলা হলে আমাকেই যেন প্রধান আসামি করা হয় ১১ জেলের কাছ থেকে উদ্ধার ৬০ কেজি ইলিশ এতিমখানায় বিতরণ

বেতন বৃদ্ধির চাপ পড়বে নতুন সরকারের ওপর

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৩৩ বার

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে। প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন হবে সর্বনি¤œ ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। বর্তমান বেতনের চেয়ে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণের বেশি বাড়ায় বিশাল ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। মূল্যস্ফিতি বাড়বে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কা বাড়াবে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের উপর নতুন চাপ বাড়বে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, বেতন কমিশন ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং অস্বাভাবিক। বেতন বৃদ্ধির এ সুপারিশ অত্যন্ত বেশি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবীদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এত বড় ব্যয় মেটানোর জন্য কোনো সুস্পষ্ট অর্থের উৎস দেখা যাচ্ছে না। আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন কঠিন। গড়ে ১০৪ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাস্তবায়ন কঠিন, ঋণ করে বা টাকা ছাপিয়ে এই ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।

জানা গেছে, নতুন বেতন সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বেতনের ধাপ শেষ পর্যন্ত ২০টিই থাকছে। এদিকে সরকার পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিমাণ চূড়ান্ত করতে একটি কমিটি গঠন করবে। এরপর ওই প্রস্তাব নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত পে-স্কেল অনুমোদন করা হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে বিষয়টির সুরাহা হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে যেতে পারবে। কিন্তু সবকিছু চূড়ান্ত হবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ে। কার্যত সরকারি কর্মচারীদের বিশাল ব্যয় বৃদ্ধির চাপ পড়বে নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর। এছাড়া নির্বাচনি বছরের প্রতিশ্রুতির কারণে এই আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা খাতের সংস্কার এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি পিছিয়ে রয়েছে।

দেশে দীর্ঘদিন থেকে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির এবং রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় রাজস্ব সংগ্রহে চাপ বাড়ছে। এর বিপরীতে দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধ ও সুদের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ফলে সরকারের জন্য দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানোও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই জাতীয় পে কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। খোদ সরকারের একাধিক উপদেষ্টা উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই বিশাল বেতন বৃদ্ধি বৈষম্যমূলক হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব। এমনকি প্রস্তাবগুলো তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলেও প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তি জোগান দিতে হবে, যা দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সাড়ে তিন মাসের সমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, পে কমিশনের সুপারিশ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি-দুটোই একসঙ্গে বাস্তবায়নের মতো সক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। এতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বেসরকারি খাত এক ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হচ্ছেন না। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেসরকারি খাতের সংকটকে আরও গভীর করছে। ছোট-ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এককথায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। আগামী কয়েক মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির স্থবিরতা কাটবে, সেই প্রত্যাশাও কম।

সরকারি হিসাবে দেশে এখন বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। কিন্তু পছন্দমতো কাজ পান না, এমন লোকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। তাদের ছদ্মবেকার বলা হয়।
আইএমএফ, স্ট্যাটিস্টা ও জেপি মরগান রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির গড় হার নেমে এসেছে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও গত বছর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ভারতের মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ১ শতাংশের নিচে, শ্রীলঙ্কায় তা প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি আর পাকিস্তানে ৬ শতাংশের নিচে। অথচ বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৯ শতাংশের ঘরে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে টানা তিন বছর ১০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। বাজারে জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে তা বেড়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কারণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। এতে সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার চাপ
জাতীয় পে কমিশন তাদের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ ধাপের নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সর্বনি¤œ মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের হিসাবে, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হলে বর্তমানে বেতন ও পেনশন খাতে ব্যয় হওয়া ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে আরও অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, ভাতা ব্যবস্থার যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের সুপারিশ করেছে।

এ ছাড়া কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে (পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ দুই সন্তান) মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে ২০০ টাকা টিফিন ভাতা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে আরও ২ হাজার কোটি টাকা লাগবে। ফলে মোট অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্বের চিত্র : চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন ও পেনশন খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ২ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর থেকে মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে, যা মাসে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এই হারে রাজস্ব আদায় হলে প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করতেই সরকারের প্রায় সাড়ে তিন মাসের মোট রাজস্ব ব্যয় হয়ে যাবে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সমস্যাটি শুধু ব্যয়ের পরিমাণ নয়, বরং এটি স্থায়ী ব্যয় হয়ে যাবে-এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলেও প্রতিবছর গড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগবে। এটি এককালীন ব্যয় নয়, এটি পরিচালন ব্যয়, যা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবীদ বলেন, ঋণ করে বা টাকা ছাপিয়ে এই ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। ঋণ করলে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়বে, আর টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, তাহলে সরকারের সামনে দুটি পথ থাকে-রাজস্ব বাড়ানো অথবা অন্য খরচ কমানো। কিন্তু অন্য খাতে এত টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ নেই, আর এত বড় অঙ্কের রাজস্ব স্বল্পমেয়াদে বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, গড়ে ১০৪ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কোনো অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নেই। ২০১৭ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি, সুযোগ-সুবিধা এবং কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাব ধরলেও সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন সমন্বয় যুক্তিযুক্ত হতো। ড. জাহিদ বলেন, সরকার যদি যোগ্য জনবল আকর্ষণের যুক্তি দেখায়, তাহলে বেসরকারি খাতের বেতন-ভাতাও পর্যালোচনা করা দরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি খাতে মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসায় ভারতীয় গণমাধ্যম

বেতন বৃদ্ধির চাপ পড়বে নতুন সরকারের ওপর

আপডেট টাইম : ১০:০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করেছে। প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন হবে সর্বনি¤œ ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। বর্তমান বেতনের চেয়ে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণের বেশি বাড়ায় বিশাল ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। মূল্যস্ফিতি বাড়বে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কা বাড়াবে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের উপর নতুন চাপ বাড়বে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, বেতন কমিশন ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং অস্বাভাবিক। বেতন বৃদ্ধির এ সুপারিশ অত্যন্ত বেশি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবীদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এত বড় ব্যয় মেটানোর জন্য কোনো সুস্পষ্ট অর্থের উৎস দেখা যাচ্ছে না। আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন কঠিন। গড়ে ১০৪ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাস্তবায়ন কঠিন, ঋণ করে বা টাকা ছাপিয়ে এই ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।

জানা গেছে, নতুন বেতন সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে বেতনের ধাপ শেষ পর্যন্ত ২০টিই থাকছে। এদিকে সরকার পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিমাণ চূড়ান্ত করতে একটি কমিটি গঠন করবে। এরপর ওই প্রস্তাব নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত পে-স্কেল অনুমোদন করা হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে বিষয়টির সুরাহা হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে যেতে পারবে। কিন্তু সবকিছু চূড়ান্ত হবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ে। কার্যত সরকারি কর্মচারীদের বিশাল ব্যয় বৃদ্ধির চাপ পড়বে নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর। এছাড়া নির্বাচনি বছরের প্রতিশ্রুতির কারণে এই আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা খাতের সংস্কার এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি পিছিয়ে রয়েছে।

দেশে দীর্ঘদিন থেকে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির এবং রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় রাজস্ব সংগ্রহে চাপ বাড়ছে। এর বিপরীতে দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধ ও সুদের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ফলে সরকারের জন্য দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানোও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই জাতীয় পে কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। খোদ সরকারের একাধিক উপদেষ্টা উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই বিশাল বেতন বৃদ্ধি বৈষম্যমূলক হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব। এমনকি প্রস্তাবগুলো তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলেও প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তি জোগান দিতে হবে, যা দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সাড়ে তিন মাসের সমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, পে কমিশনের সুপারিশ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি-দুটোই একসঙ্গে বাস্তবায়নের মতো সক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। এতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বেসরকারি খাত এক ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হচ্ছেন না। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেসরকারি খাতের সংকটকে আরও গভীর করছে। ছোট-ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এককথায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। আগামী কয়েক মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির স্থবিরতা কাটবে, সেই প্রত্যাশাও কম।

সরকারি হিসাবে দেশে এখন বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। কিন্তু পছন্দমতো কাজ পান না, এমন লোকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। তাদের ছদ্মবেকার বলা হয়।
আইএমএফ, স্ট্যাটিস্টা ও জেপি মরগান রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির গড় হার নেমে এসেছে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও গত বছর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ভারতের মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ১ শতাংশের নিচে, শ্রীলঙ্কায় তা প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি আর পাকিস্তানে ৬ শতাংশের নিচে। অথচ বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৯ শতাংশের ঘরে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে টানা তিন বছর ১০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। বাজারে জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে তা বেড়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কারণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। এতে সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার চাপ
জাতীয় পে কমিশন তাদের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ ধাপের নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সর্বনি¤œ মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের হিসাবে, ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হলে বর্তমানে বেতন ও পেনশন খাতে ব্যয় হওয়া ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে আরও অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, ভাতা ব্যবস্থার যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নের সুপারিশ করেছে।

এ ছাড়া কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে (পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ দুই সন্তান) মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে ২০০ টাকা টিফিন ভাতা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে আরও ২ হাজার কোটি টাকা লাগবে। ফলে মোট অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্বের চিত্র : চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন ও পেনশন খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ২ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর থেকে মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে, যা মাসে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এই হারে রাজস্ব আদায় হলে প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করতেই সরকারের প্রায় সাড়ে তিন মাসের মোট রাজস্ব ব্যয় হয়ে যাবে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সমস্যাটি শুধু ব্যয়ের পরিমাণ নয়, বরং এটি স্থায়ী ব্যয় হয়ে যাবে-এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, তিন বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলেও প্রতিবছর গড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগবে। এটি এককালীন ব্যয় নয়, এটি পরিচালন ব্যয়, যা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবীদ বলেন, ঋণ করে বা টাকা ছাপিয়ে এই ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। ঋণ করলে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়বে, আর টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, তাহলে সরকারের সামনে দুটি পথ থাকে-রাজস্ব বাড়ানো অথবা অন্য খরচ কমানো। কিন্তু অন্য খাতে এত টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ নেই, আর এত বড় অঙ্কের রাজস্ব স্বল্পমেয়াদে বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, গড়ে ১০৪ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কোনো অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নেই। ২০১৭ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি, সুযোগ-সুবিধা এবং কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাব ধরলেও সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন সমন্বয় যুক্তিযুক্ত হতো। ড. জাহিদ বলেন, সরকার যদি যোগ্য জনবল আকর্ষণের যুক্তি দেখায়, তাহলে বেসরকারি খাতের বেতন-ভাতাও পর্যালোচনা করা দরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি খাতে মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।