ঢাকা ০৩:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নাজমুন নাহারের ১৮৪ দেশ ভ্রমণের সাহসী গল্প

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:৫৩:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩৮ বার

ভ্রমণ মানেই কেবল নতুন জায়গা দেখা নয়- ভ্রমণ মানে নিজেকে ভাঙা, আবার নতুন করে গড়ে তোলা। ভ্রমণ মানে ভয়কে জয় করা, অচেনা পথে বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে একজন নারী যখন একা বেরিয়ে পড়েন বিশ্বজয়ের পথে, তখন সেই যাত্রা আর শুধুই ব্যক্তিগত থাকে না- তা হয়ে ওঠে সাহস, প্রতিবাদ ও সম্ভাবনার প্রতীক। সমাজের প্রচলিত সীমারেখা, নিরাপত্তাহীনতা, প্রশ্নবাণ আর সংশয়কে উপেক্ষা করে যে নারী পৃথিবীর মানচিত্রে নিজের নাম লিখে দেন, তার গল্প অনিবার্যভাবেই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

ঠিক তেমনই এক ইতিহাস গড়েছেন নাজমুন নাহার। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে নিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন বিশ্বের ১৮৪টি দেশ- একাই, দৃঢ় প্রত্যয়ে, অদম্য সাহসে। প্রথম বাংলাদেশি ও মুসলিম নারী হিসেবে এই অসাধারণ কীর্তি শুধু ভ্রমণের রেকর্ড নয়; এটি নারীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও বৈশ্বিক উপস্থিতির এক শক্তিশালী ঘোষণা। তিনি সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, নারীর স্বপ্ন কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকে না- যদি থাকে সাহস, অধ্যবসায় আর বিশ্বাস। নাজমুন নাহার বাংলাদেশের নারী ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যুক্ত করলেন। সর্বশেষ বাহামা সফরের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। তার এই অসাধারণ অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে বাহামার ফার্স্ট লেডি প্যাট্রিসিয়া মিনিস তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানান। গত বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর- এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই নাজমুন নাহার পাড়ি দিয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ওশেনিয়ার সামোয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিমুর-লেস্তে, ক্যারিবীয় অঞ্চলের অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, সেন্ট কিটস ও নেভিস, দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা এবং দ্বীপরাষ্ট্র বাহামা- প্রতিটি ভ্রমণই ছিল ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন বাস্তবতা ও ভিন্ন চ্যালেঞ্জে ভরা।

২০০০ সালে ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের সূচনা। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছরের যাত্রায় তিনি একক ভ্রমণকারী হিসেবে প্রধানত সড়কপথেই পাড়ি দিয়েছেন দেশ থেকে দেশে। এই পথে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অসংখ্য ঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা এবং কখনও কখনও প্রাণঘাতী পরিস্থিতিও। তবু থেমে যাননি তিনি। বরং প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাই তার যাত্রাকে করেছে আরও দৃঢ় ও অর্থবহ। ভেনেজুয়েলা সফর স্মরণ করে নাজমুন নাহার বলেন, ‘এটি আমার জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর ভ্রমণ ছিল।’ সাইমন বলিভার আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে তিনি ১৭টি শহর ঘুরেছেন। আন্দিজ পর্বত, সবুজ উপত্যকা, নির্মল সমুদ্র, মরুভূমি এবং স্থানীয় মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তায় ভেনেজুয়েলাকে তিনি দেখেছেন বৈচিত্র্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ হিসেবে। সামোয়া থেকে বাহামা- প্রতিটি দেশই তাকে দিয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা, পাশাপাশি বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া। নাজমুন নাহারের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে তার যাত্রা। ভেনেজুয়েলার লা নাসিওন, ক্যারিবিয়ান ডব্লিউআইসি নিউজ, তিমুর-লেস্তের সুয়ারা তিমুর লোরোসায়ে, পর্তুগালের লুসাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ম্যাগাজিনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ পেয়েছে তার গল্প।

ভ্রমণের পাশাপাশি নাজমুন নাহার বিশ্বদরবারে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের পরিচয়। লাল-সবুজ পতাকা হাতে তিনি বহন করছেন শান্তি স্থাপন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাল্যবিবাহ বন্ধের মতো সামাজিক বার্তা। তিনি বিশ্বাস করেন, ভ্রমণ কেবল গন্তব্যে পৌঁছানো নয়- এটি মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। এর আগে ২০১৮ সালে জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি শততম দেশ পূর্ণ করেন। ২০২১ সালে সাওটোমে তার ১৫০তম দেশ, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রিন্সিপে ১৭৫তম দেশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা হয়ে ওঠে তার ১৮৪তম দেশ। নাজমুন নাহার যুক্তরাষ্ট্রের পিস টর্চ বেয়ারার অ্যাওয়ার্ড, যুক্তরাজ্যের উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ ৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া এই বিশ্বপরিব্রাজক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। গবেষক, মোটিভেশনাল বক্তা ও শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নাজমুন নাহার বিশ্বজুড়ে শিশু ও তরুণদের সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাচ্ছেন। ১৮৪ দেশ, এক পতাকা, এক সাহস- নাজমুন নাহারের যাত্রা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক আগামীর প্রজন্মের জন্য। তার যাত্রা প্রমাণ করে- সাহস, অধ্যবসায় আর বিশ্বাস থাকলে একজন নারী একাই বদলে দিতে পারেন ইতিহাস।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

নাজমুন নাহারের ১৮৪ দেশ ভ্রমণের সাহসী গল্প

আপডেট টাইম : ০৯:৫৩:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

ভ্রমণ মানেই কেবল নতুন জায়গা দেখা নয়- ভ্রমণ মানে নিজেকে ভাঙা, আবার নতুন করে গড়ে তোলা। ভ্রমণ মানে ভয়কে জয় করা, অচেনা পথে বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে একজন নারী যখন একা বেরিয়ে পড়েন বিশ্বজয়ের পথে, তখন সেই যাত্রা আর শুধুই ব্যক্তিগত থাকে না- তা হয়ে ওঠে সাহস, প্রতিবাদ ও সম্ভাবনার প্রতীক। সমাজের প্রচলিত সীমারেখা, নিরাপত্তাহীনতা, প্রশ্নবাণ আর সংশয়কে উপেক্ষা করে যে নারী পৃথিবীর মানচিত্রে নিজের নাম লিখে দেন, তার গল্প অনিবার্যভাবেই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

ঠিক তেমনই এক ইতিহাস গড়েছেন নাজমুন নাহার। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে নিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন বিশ্বের ১৮৪টি দেশ- একাই, দৃঢ় প্রত্যয়ে, অদম্য সাহসে। প্রথম বাংলাদেশি ও মুসলিম নারী হিসেবে এই অসাধারণ কীর্তি শুধু ভ্রমণের রেকর্ড নয়; এটি নারীর সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও বৈশ্বিক উপস্থিতির এক শক্তিশালী ঘোষণা। তিনি সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, নারীর স্বপ্ন কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকে না- যদি থাকে সাহস, অধ্যবসায় আর বিশ্বাস। নাজমুন নাহার বাংলাদেশের নারী ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যুক্ত করলেন। সর্বশেষ বাহামা সফরের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। তার এই অসাধারণ অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে বাহামার ফার্স্ট লেডি প্যাট্রিসিয়া মিনিস তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানান। গত বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর- এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই নাজমুন নাহার পাড়ি দিয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ওশেনিয়ার সামোয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিমুর-লেস্তে, ক্যারিবীয় অঞ্চলের অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, সেন্ট কিটস ও নেভিস, দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা এবং দ্বীপরাষ্ট্র বাহামা- প্রতিটি ভ্রমণই ছিল ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন বাস্তবতা ও ভিন্ন চ্যালেঞ্জে ভরা।

২০০০ সালে ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের সূচনা। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছরের যাত্রায় তিনি একক ভ্রমণকারী হিসেবে প্রধানত সড়কপথেই পাড়ি দিয়েছেন দেশ থেকে দেশে। এই পথে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অসংখ্য ঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা এবং কখনও কখনও প্রাণঘাতী পরিস্থিতিও। তবু থেমে যাননি তিনি। বরং প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাই তার যাত্রাকে করেছে আরও দৃঢ় ও অর্থবহ। ভেনেজুয়েলা সফর স্মরণ করে নাজমুন নাহার বলেন, ‘এটি আমার জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর ভ্রমণ ছিল।’ সাইমন বলিভার আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে তিনি ১৭টি শহর ঘুরেছেন। আন্দিজ পর্বত, সবুজ উপত্যকা, নির্মল সমুদ্র, মরুভূমি এবং স্থানীয় মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তায় ভেনেজুয়েলাকে তিনি দেখেছেন বৈচিত্র্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ হিসেবে। সামোয়া থেকে বাহামা- প্রতিটি দেশই তাকে দিয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা, পাশাপাশি বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছোঁয়া। নাজমুন নাহারের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে তার যাত্রা। ভেনেজুয়েলার লা নাসিওন, ক্যারিবিয়ান ডব্লিউআইসি নিউজ, তিমুর-লেস্তের সুয়ারা তিমুর লোরোসায়ে, পর্তুগালের লুসাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ম্যাগাজিনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ পেয়েছে তার গল্প।

ভ্রমণের পাশাপাশি নাজমুন নাহার বিশ্বদরবারে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের পরিচয়। লাল-সবুজ পতাকা হাতে তিনি বহন করছেন শান্তি স্থাপন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাল্যবিবাহ বন্ধের মতো সামাজিক বার্তা। তিনি বিশ্বাস করেন, ভ্রমণ কেবল গন্তব্যে পৌঁছানো নয়- এটি মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। এর আগে ২০১৮ সালে জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি শততম দেশ পূর্ণ করেন। ২০২১ সালে সাওটোমে তার ১৫০তম দেশ, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রিন্সিপে ১৭৫তম দেশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা হয়ে ওঠে তার ১৮৪তম দেশ। নাজমুন নাহার যুক্তরাষ্ট্রের পিস টর্চ বেয়ারার অ্যাওয়ার্ড, যুক্তরাজ্যের উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ ৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া এই বিশ্বপরিব্রাজক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। গবেষক, মোটিভেশনাল বক্তা ও শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নাজমুন নাহার বিশ্বজুড়ে শিশু ও তরুণদের সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাচ্ছেন। ১৮৪ দেশ, এক পতাকা, এক সাহস- নাজমুন নাহারের যাত্রা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক আগামীর প্রজন্মের জন্য। তার যাত্রা প্রমাণ করে- সাহস, অধ্যবসায় আর বিশ্বাস থাকলে একজন নারী একাই বদলে দিতে পারেন ইতিহাস।