একসময় ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ শাসন করেছিল। সংখ্যায় তারা কত ছিল? দশ হাজার, কিংবা তারও কম। অথচ সে সময় ভারতবর্ষের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ কোটি। এই পরিসংখ্যানই প্রশ্ন তোলে—আসলে কে কাকে শাসন করেছিল?
ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশরা একা ভারত শাসন করেনি। তাদের শাসনের প্রধান শক্তি ছিল এখানকার মানুষই। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশ গঠিত হয়েছিল ভারতীয়দের নিয়ে। দেশপ্রেমের তাগিদে নয়, বরং জীবিকার প্রয়োজনে তারা এই বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। রুটির বিনিময়ে তারা মেনে নিয়েছিল দাসত্ব—যা ছিল দেহের নয়, আত্মার।
ব্রিটিশ জেনারেল যখন “ফায়ার” কমান্ড দিয়েছেন, তখন সেই গুলি চালিয়েছে ভারতীয় সৈনিকরাই। গুলি ছুটেছে নিজেদের মানুষের বুকেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বন্দুক উল্টো করে শাসকের দিকে তাক করার সাহস তখন খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছিল।
এই চিত্র নতুন নয়। মোগল আমলেও একই বাস্তবতা দেখা গেছে। মোগলরা অল্পসংখ্যক হয়ে ভারতবর্ষে এলেও, তারা এখানকার মানুষ দিয়েই সেনাবাহিনী ও প্রশাসন গড়ে তুলেছিল। সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত—সব শ্রেণি থেকেই তারা সহযোগিতা পেয়েছিল।
বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হলো শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিণতি। তাঁকে বন্দী করে যখন অপমানজনকভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরানো হচ্ছিল, তখন বাঙালিরা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। প্রতিবাদের কোনো উচ্চারণ শোনা যায়নি।
অন্যদিকে ইতিহাসের আরেক প্রান্তে ভিন্ন চিত্র। ব্রিটিশরা যখন হংকং কিংবা সিঙ্গাপুরে গিয়েছিল, স্থানীয় জনগণ তাদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়নি। লোভের কাছে তারা মাথা নত করেনি। ফলস্বরূপ, ব্রিটিশ শাসন সেখানে স্থায়ী হতে পারেনি।
ইতিহাসের এই পাঠ আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। সামনে নির্বাচন। সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীন—সব শ্রেণির মানুষই কি তাদের অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে? অভিযোগ রয়েছে, কেউ বিনামূল্যের বিদ্যুৎ, কেউ এক বোতল মদ, কেউ বা একটি কম্বলের বিনিময়ে নিজের ভোট বিক্রি করে দিচ্ছে। যদিও সবাই এমন নয়, ব্যতিক্রম আছে—তবে সংখ্যাটি নগণ্য।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত আমলাতন্ত্রের মধ্যে। একটি ভালো পোস্টিং কিংবা পদবীর আশায় কেউ কেউ নির্লজ্জভাবে নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। দিনে বিপ্লবী চেহারা, আর রাতে ক্ষমতার সঙ্গে হাত মেলানোর সংস্কৃতি নতুন নয়। একটি পদ পাওয়ার জন্য এমন কোনো অপকর্ম নেই—যা করা হচ্ছে না।
গত ১৭ বছর ধরে যারা বিবেক বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করেছে, তারাই আজ নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ হতে মরিয়া। আবার সেই পুরোনো বর্ণচোরা গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁধারে আঁধারে হাত মিলিয়ে কেউ কেউ আরও বড় দায়িত্বও বাগিয়ে নিচ্ছে।
ইতিহাস তাই বারবার একই সতর্কবার্তা দেয়—
শাসক বদলালেও, যদি মানসিকতার পরিবর্তন না হয়, তবে দাসত্ব থেকেই যায়।
সতর্ক থাকাই এখন সময়ের দাবি।
লেখকঃ
প্রফেসর কাজী মোঃ আবু কাইয়ুম শিশির
পরিচালকঃ
মনিটরিং এন্ড ইভালুয়েশান উইং
Reporter Name 
























