ঢাকা ০২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুষ্টচক্রের ফাঁদে অর্থনীতি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:২৪:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩৭ বার

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির ক্ষতি তত বাড়বে বলে একাধিকবার উল্লেখ করেছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেছিলেন- একটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি ও রাজনীতি পাশাপাশি চলে, একে অপরের পরিপূরক। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির ক্ষতি তত বাড়বে। স্বল্প মেয়াদি সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়। তাই আর্থিকখাতের শৃৃঙ্খলার জন্য দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার দরকার।

ড. ফাহমিদা খাতুনের মত দেশের অধিকাংশ গবেষক ও আর্থিকখাতের বিশেষজ্ঞরা অন্তর্বর্তী সরকারকে একই সতর্কতা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর অতিক্রম করেছে। এই সময়ে সুপরিকল্পিতভাবে একটি গোষ্ঠী নানাবিধ ফাঁদে ফেলে দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছেন। যা আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত। অবশেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছে। ভোট গ্রহণের সব ধরণের প্রস্তুতি চলমান। যদিও সুশীল সমাজ, আর্থিকখাত, রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সর্বত্রই আশঙ্কা ভর করেছে দেশের আগামীর অর্থনীতি নিয়ে। এক কথায় আগামী সরকারের জন্য একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি অপেক্ষা করছে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশের সার্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা জরুরি। আর এক্ষেত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোন বিকল্প নেই। নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার দায়িত্ব পালন করতে এসে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এই সময়ে মূল্যস্ফীতির লাগাত টানতে পারেনি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, এলসি নেই, নতুন করে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না, শ্রমিক অসন্তোষসহ পরিবেশ না থাকায় ছোট-বড় শত শত শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো কিছু বন্ধের পথে। অনেক কারখানায় ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে। নেই উৎপাদন, বেকার হয়েছেন কয়েক লাখ শ্রমিক। একই সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকা-ে ব্যয় করেছে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। চলতি অর্থবছরেও এডিপি বাবদ বাজেটে বরাদ্দ কম রাখা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা এবং সেখান থেকেও আশানুরূপ ব্যয় হচ্ছে না। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এডিপির বরাদ্দের ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা এযাবতকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক ধারা দেখা দিয়েছে। যা আগামী সরকারের ওপর দেশের উন্নয়ন কর্মকা- ত্বরান্বিত করার জন্য বাড়তি ব্যয়ের চাপ থাকবে। এমনকি বাংলাদেশিদের জন্য বিভিন্ন দেশের ভিসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনশক্তি রফতানিতে বাড়ানো তো দূরের কথা, একাধিক দেশের আগের আগের নিষেধাজ্ঞাই তুলতে পারেনি বর্তমান সরকার। যা আগামী দিনে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। সার্বিক এই বিষয়গুলোর কারণে বাড়ছে বৈষম্য ও অস্থিরতা; এই বৈষম্যের কারণেই স্বৈরাচার হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। বৈষম্যের কারণেই হাসিনার মতো ভেনজুয়েলা ও ইরানে অস্থিরতা। অন্য দেশ হস্তক্ষেপ বা অস্থিরতা তৈরির সুযোগ পাচ্ছে। যা আগামী দিনেও বাংলাদেশের জন্য একটি হুমকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি। একই সঙ্গে আগামীর সরকারের প্রধান কাজ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তাদের মতে, এখনকার বিনিয়োগ স্থবিরতা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের উচ্চ সুদহার ও বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে বলে উল্লেখ করেছেন তারা। এছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন সরকারকে রমজানের চড়া বাজারদর সামাল দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু নীতি সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন গত শনিবার এক প্রবন্ধে বলেছেন, বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়বে। তিনি বলেন, সমাজে যদি ন্যায়সংগত সুযোগ না থাকে, তাহলে একদিকে বৈষম্য তৈরি হয়, অন্যদিকে অস্থিরতা দেখা দেয়। উদাহরণ দিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে সরকার বিরোধী আন্দোলন হয়, তার পেছনেও এই বাস্তবতা কাজ করেছে। একই সঙ্গে ওই সময়ে বাজারে চাকরি ছিল না, সরকারি চাকরিই ছিল একমাত্র ভরসা (সেখানেও ছিল কোটা-সংকট)। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে প্রবল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল। ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, আগের এ বাস্তবতায় বর্তমান অর্থনীতিতে যে বিনিয়োগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে আমরা যদি বেরোতে না পারি, তাহলে এই সমস্যাগুলো জিইয়ে থাকবে। যা আগামী সরকারের জন্য ‘অশনি সংকেত’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান খাত এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই আগামী দিনে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে, এমন ঝুঁকি আছে।

সূত্র মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিভিন্নভাবে সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সাধারণ ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন ভাতা বাড়ানো হয়েছে। গঠন করা হয়েছে নতুন বেতন কমিশন। এছাড়া উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিদ্যুতের ভর্তুকি ও জ্বালানি তেল আমদানির দায়সহ বিভিন্ন বকেয়া পরিশোধ করে বিপুল ঋণের বোঝা সৃষ্টি করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসৃচি ও সারের ভর্তুকিও। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয় কম করেছে। সে কারণে দেশের ভেতরের চাহিদা কমে গেছে। এডপি’র ব্যয়ে গতি আনতেও নির্বাচিত সরকারকে বেগ পেতে হবে। রাজস্ব আয় সংগ্রহের নিম্নগতি থেকে উত্তরণ হবে আরেক চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের কর্মকা- নিষিদ্ধ করেছে; কিন্তু আওয়ামী লীগ এদেশের বড় রাজনৈতিক দলের একটি ছিল। একই সঙ্গে বর্তমানে যারা নির্বাচনের বিরোধীতা করছে এ রকম দলগুলো চাইলে আগামী সরকারকে বিপাকে ফেলতে তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখবে। ফলে এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করা সরকারের জন্য সহজ হবে না।

বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার দায়িত্ব পালনে অন্তর্বর্তী সরকার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করলেও দেড় বছরে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দিক থেকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল। ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে। জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ২০২৬ সালের সম্ভাবনা শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এখন ব্যাংক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৫ শতাংশ। এই সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প ও ব্যবসা বাড়ানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে কর-শুল্কও বেশি। এ অবস্থায় দেশি বিনিয়োগকারীরা হাত গুটিয়ে রয়েছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় আছে নির্বাচিত সরকারের। বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। এদিকে ব্যাংক খাতের একটি বড় সংকট খেলাপি ঋণ। এ ঋণ এখন ছয় লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা বিতরণ করা ঋণের ৩৫ শতাংশের বেশি। মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলোকে ভয়াবহ তারল্য সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ব্যাংক যদি সবল না থাকে, তবে অর্থনীতি সবল থাকতে পারে না। শেয়ার বাজার বিনিয়োগের একটা ক্ষেত্র এবং বিনিয়োগযোগ্য অর্থের শক্তিশালী উৎসও বটে। পতিত স্বৈরচারের আমলে শেয়ার বাজার দফায় দফায় লুণ্ঠিত হয়েছে। এখন শেয়ার বাজারে যেমন বিনিয়োগ আসছে না, তেমনি শেয়ার বাজার বিনিয়োগযোগ্য অর্থের যোগানদাতার ভূমিকাও রাখতে পারছে না। সামষ্টিক অর্থনীতির নাজুক হাল বড় রকমে উদ্বেগের কারণে পরিণত হয়েছে।

এদিকে স্বৈরাচার সরকারের ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। অথচ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল বা ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলো তিন থেকে পাঁচ বছর পর বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। সেগুলোর চুক্তি বারবার নবায়ন করা হয়েছে। ফলে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় ১৫ বছর পরও চালু রয়েছে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক হাসান মেহেদীর মতে, এটি ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার ফল। এ বিষয়ে সরকারকে বারবার সতর্ক করা হলেও কাজ হয়নি। এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। সেই আলোচনায় অবশ্য দেশটি বিদ্যুতের দাম কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এখনো এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ওপর। বিদ্যুৎ কেনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ বেড়ে গেছে ব্যাপক হারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৩৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও পিডিবির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

২০২৪ সালের জানুয়ারির পর থেকে যুক্ত হওয়া আড়াই হাজার মেগাওয়াট জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর চালু করে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার অব্যাহত রেখেছে, যেগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা চার হাজার ৭১৪ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্র চালু হওয়ার কথা। সিপিডি গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যেও দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ২৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকার যদি বর্তমান পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ না বাড়ায়, তাহলে অতিরিক্ত সক্ষমতার যে সংকট, তা আরো গভীর হবে।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সেজন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে, যা সহজ কাজ নয়। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে, আস্থা অর্জন করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রথমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর কাজে হাত দিতে হবে। দুটো কাজই আপাতদৃষ্টিতে কঠিন। তিনি বলেন, সরকার ব্যয় বাড়ালে তা মূল্যষ্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। সেটি সামলানোও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, সামগ্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ থাকবে। রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে বিদেশি ঋণের পুরানো বৃত্তেই থাকতে হতে পারে। যা আগামীর অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

দুষ্টচক্রের ফাঁদে অর্থনীতি

আপডেট টাইম : ১১:২৪:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির ক্ষতি তত বাড়বে বলে একাধিকবার উল্লেখ করেছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেছিলেন- একটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি ও রাজনীতি পাশাপাশি চলে, একে অপরের পরিপূরক। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির ক্ষতি তত বাড়বে। স্বল্প মেয়াদি সরকার দীর্ঘায়িত হওয়া অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়। তাই আর্থিকখাতের শৃৃঙ্খলার জন্য দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার দরকার।

ড. ফাহমিদা খাতুনের মত দেশের অধিকাংশ গবেষক ও আর্থিকখাতের বিশেষজ্ঞরা অন্তর্বর্তী সরকারকে একই সতর্কতা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর অতিক্রম করেছে। এই সময়ে সুপরিকল্পিতভাবে একটি গোষ্ঠী নানাবিধ ফাঁদে ফেলে দেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছেন। যা আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত। অবশেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছে। ভোট গ্রহণের সব ধরণের প্রস্তুতি চলমান। যদিও সুশীল সমাজ, আর্থিকখাত, রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সর্বত্রই আশঙ্কা ভর করেছে দেশের আগামীর অর্থনীতি নিয়ে। এক কথায় আগামী সরকারের জন্য একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি অপেক্ষা করছে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশের সার্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা জরুরি। আর এক্ষেত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোন বিকল্প নেই। নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার দায়িত্ব পালন করতে এসে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এই সময়ে মূল্যস্ফীতির লাগাত টানতে পারেনি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, এলসি নেই, নতুন করে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না, শ্রমিক অসন্তোষসহ পরিবেশ না থাকায় ছোট-বড় শত শত শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো কিছু বন্ধের পথে। অনেক কারখানায় ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে। নেই উৎপাদন, বেকার হয়েছেন কয়েক লাখ শ্রমিক। একই সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন কর্মকা-ে ব্যয় করেছে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। চলতি অর্থবছরেও এডিপি বাবদ বাজেটে বরাদ্দ কম রাখা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে দুই লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা এবং সেখান থেকেও আশানুরূপ ব্যয় হচ্ছে না। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এডিপির বরাদ্দের ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে, যা এযাবতকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক ধারা দেখা দিয়েছে। যা আগামী সরকারের ওপর দেশের উন্নয়ন কর্মকা- ত্বরান্বিত করার জন্য বাড়তি ব্যয়ের চাপ থাকবে। এমনকি বাংলাদেশিদের জন্য বিভিন্ন দেশের ভিসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনশক্তি রফতানিতে বাড়ানো তো দূরের কথা, একাধিক দেশের আগের আগের নিষেধাজ্ঞাই তুলতে পারেনি বর্তমান সরকার। যা আগামী দিনে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। সার্বিক এই বিষয়গুলোর কারণে বাড়ছে বৈষম্য ও অস্থিরতা; এই বৈষম্যের কারণেই স্বৈরাচার হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। বৈষম্যের কারণেই হাসিনার মতো ভেনজুয়েলা ও ইরানে অস্থিরতা। অন্য দেশ হস্তক্ষেপ বা অস্থিরতা তৈরির সুযোগ পাচ্ছে। যা আগামী দিনেও বাংলাদেশের জন্য একটি হুমকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি। একই সঙ্গে আগামীর সরকারের প্রধান কাজ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তাদের মতে, এখনকার বিনিয়োগ স্থবিরতা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের উচ্চ সুদহার ও বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে বলে উল্লেখ করেছেন তারা। এছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নতুন সরকারকে রমজানের চড়া বাজারদর সামাল দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু নীতি সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে উঠছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন গত শনিবার এক প্রবন্ধে বলেছেন, বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়বে। তিনি বলেন, সমাজে যদি ন্যায়সংগত সুযোগ না থাকে, তাহলে একদিকে বৈষম্য তৈরি হয়, অন্যদিকে অস্থিরতা দেখা দেয়। উদাহরণ দিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে সরকার বিরোধী আন্দোলন হয়, তার পেছনেও এই বাস্তবতা কাজ করেছে। একই সঙ্গে ওই সময়ে বাজারে চাকরি ছিল না, সরকারি চাকরিই ছিল একমাত্র ভরসা (সেখানেও ছিল কোটা-সংকট)। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে প্রবল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল। ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, আগের এ বাস্তবতায় বর্তমান অর্থনীতিতে যে বিনিয়োগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে আমরা যদি বেরোতে না পারি, তাহলে এই সমস্যাগুলো জিইয়ে থাকবে। যা আগামী সরকারের জন্য ‘অশনি সংকেত’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান খাত এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই আগামী দিনে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে, এমন ঝুঁকি আছে।

সূত্র মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে বিভিন্নভাবে সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সাধারণ ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কমিটিতে দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন ভাতা বাড়ানো হয়েছে। গঠন করা হয়েছে নতুন বেতন কমিশন। এছাড়া উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিদ্যুতের ভর্তুকি ও জ্বালানি তেল আমদানির দায়সহ বিভিন্ন বকেয়া পরিশোধ করে বিপুল ঋণের বোঝা সৃষ্টি করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসৃচি ও সারের ভর্তুকিও। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয় কম করেছে। সে কারণে দেশের ভেতরের চাহিদা কমে গেছে। এডপি’র ব্যয়ে গতি আনতেও নির্বাচিত সরকারকে বেগ পেতে হবে। রাজস্ব আয় সংগ্রহের নিম্নগতি থেকে উত্তরণ হবে আরেক চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগের কর্মকা- নিষিদ্ধ করেছে; কিন্তু আওয়ামী লীগ এদেশের বড় রাজনৈতিক দলের একটি ছিল। একই সঙ্গে বর্তমানে যারা নির্বাচনের বিরোধীতা করছে এ রকম দলগুলো চাইলে আগামী সরকারকে বিপাকে ফেলতে তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখবে। ফলে এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করা সরকারের জন্য সহজ হবে না।

বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার দায়িত্ব পালনে অন্তর্বর্তী সরকার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করলেও দেড় বছরে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দিক থেকে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল। ২০২৬ সালেও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে। জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ২০২৬ সালের সম্ভাবনা শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এখন ব্যাংক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৫ শতাংশ। এই সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প ও ব্যবসা বাড়ানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে কর-শুল্কও বেশি। এ অবস্থায় দেশি বিনিয়োগকারীরা হাত গুটিয়ে রয়েছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষায় আছে নির্বাচিত সরকারের। বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। এদিকে ব্যাংক খাতের একটি বড় সংকট খেলাপি ঋণ। এ ঋণ এখন ছয় লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যা বিতরণ করা ঋণের ৩৫ শতাংশের বেশি। মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এ মুহূর্তে ব্যাংকগুলোকে ভয়াবহ তারল্য সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ব্যাংক যদি সবল না থাকে, তবে অর্থনীতি সবল থাকতে পারে না। শেয়ার বাজার বিনিয়োগের একটা ক্ষেত্র এবং বিনিয়োগযোগ্য অর্থের শক্তিশালী উৎসও বটে। পতিত স্বৈরচারের আমলে শেয়ার বাজার দফায় দফায় লুণ্ঠিত হয়েছে। এখন শেয়ার বাজারে যেমন বিনিয়োগ আসছে না, তেমনি শেয়ার বাজার বিনিয়োগযোগ্য অর্থের যোগানদাতার ভূমিকাও রাখতে পারছে না। সামষ্টিক অর্থনীতির নাজুক হাল বড় রকমে উদ্বেগের কারণে পরিণত হয়েছে।

এদিকে স্বৈরাচার সরকারের ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। অথচ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল বা ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলো তিন থেকে পাঁচ বছর পর বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। সেগুলোর চুক্তি বারবার নবায়ন করা হয়েছে। ফলে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায় ১৫ বছর পরও চালু রয়েছে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক হাসান মেহেদীর মতে, এটি ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার ফল। এ বিষয়ে সরকারকে বারবার সতর্ক করা হলেও কাজ হয়নি। এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। সেই আলোচনায় অবশ্য দেশটি বিদ্যুতের দাম কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এখনো এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ওপর। বিদ্যুৎ কেনার দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ বেড়ে গেছে ব্যাপক হারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ৩৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও পিডিবির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

২০২৪ সালের জানুয়ারির পর থেকে যুক্ত হওয়া আড়াই হাজার মেগাওয়াট জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর চালু করে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার অব্যাহত রেখেছে, যেগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা চার হাজার ৭১৪ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্র চালু হওয়ার কথা। সিপিডি গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যেও দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ২৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সরকার যদি বর্তমান পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ না বাড়ায়, তাহলে অতিরিক্ত সক্ষমতার যে সংকট, তা আরো গভীর হবে।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। সেজন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে, যা সহজ কাজ নয়। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে, আস্থা অর্জন করতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রথমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর কাজে হাত দিতে হবে। দুটো কাজই আপাতদৃষ্টিতে কঠিন। তিনি বলেন, সরকার ব্যয় বাড়ালে তা মূল্যষ্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। সেটি সামলানোও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, সামগ্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ থাকবে। রাজস্ব সংগ্রহের চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে বিদেশি ঋণের পুরানো বৃত্তেই থাকতে হতে পারে। যা আগামীর অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত।