ঢাকা ০৯:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গর্বের টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৫০:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১২৩ বার

শাড়ি পছন্দ করেন না, এমন বাঙালি নারী কমই আছেন। আর সেই পছন্দের শাড়ির তালিকার অনেকটাই দখল করে থাকে টাঙ্গাইল শাড়ি। টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের ঐতিহ্য। সম্প্রতি টাঙ্গাইল শাড়ি পেল ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি আমাদের করেছে গর্বিত। টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহাসিক এই অর্জন নিয়ে আয়না সময়ের আজকের প্রতিবেদন লিখেছেন লাবণ্য লিপি

টাঙ্গাইল শাড়ির তাঁতিরা মূলত ঐতিহ্যবাহী মসলিন তাঁতশিল্পীদের বংশধর। তাদের বসবাস ছিল ঢাকার ধামরাই এলাকার আশপাশে। টাঙ্গাইলের জমিদারদের আমন্ত্রণে তারা সেখানে গিয়ে কাজ শুরু করেন। পরে তারা টাঙ্গাইলে বসবাস শুরু করেন। ধীরে ধীরে বিস্তৃতি বাড়তে থাকে টাঙ্গাইল শাড়ির। একটি শাড়ি শুধু একটি বস্ত্র নয়। এ যেন রঙিন সুতোয় বোনা হাজার জীবনের গল্প। নারীর হাতে চড়কা কাটা থেকে শুরু করে তাঁতের খটখট আওয়াজে কারিগর নিখুঁতভাবে শুধু শাড়িরই বোনেন না, তার সঙ্গে মিশে থাকে তাদের প্রতিদিনের পাওয়াÑ না পাওয়ার গল্প। টাঙ্গাইল জেলা তাঁতশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এই জেলার তাঁতি বা বুনন শিল্পীদের হাতেই টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তি। জানা যায়, উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের শুরুতে টাঙ্গাইল শাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এক সময়ে এটি আটপৌঢ়ে শাড়ি হিসেবেই পরিচিত ছিল। গ্রামাঞ্চলের নারীরা এই শাড়ি ঘরে পরতেন। কিন্তু টাঙ্গাইল শাড়ি তার নিজস্ব যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছে অভিজাত মহলে। এখন যে কোনো উৎসব, পার্বণে টাঙ্গাইল শাড়ি থাকে প্রথম পছন্দে। এখন শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও টাঙ্গাইল শাড়ির কদর অনেক বেশি।

এই শাড়ির বুনন শৈলি, নকশার বৈচিত্র্য নজর কাড়ে গ্রাহকের। আধুনিক ফ্যাশনে টাঙ্গাইল শাড়ি এখন অন্যতম অনুষঙ্গ। এ প্রসঙ্গে কথা হয় ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী বিপ্লব সাহার সঙ্গে। বিপ্লব বলেন, দেশীয় ফ্যাশন খাতকে চাঙ্গা বা শক্তিশালী করতে টাঙ্গাইল শাড়ির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার জানা মতে, টাঙ্গাইল শাড়ির মতো এত জনপ্রিয়তা অন্য কোনো অঞ্চলের কাপড়ের নেই। আমি গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে দেশীয় ফ্যাশন নিয়ে কাজ করছি। আমার মনে হয় আমি বা আমারও অগ্রজ যারা আছেন এই ইন্ডাস্ট্রিতে তারা বলবেন যে, টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পীদের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। একটা সময় তো অভিজাতরা বিদেশি কাপড় পরত। এখন সেই জায়গায় পৌঁছে গেছে টাঙ্গাইল শাড়ি। এটা সম্ভব হয়েছে তাদের মানসম্পন্ন কাজের জন্য। টাঙ্গাইল শাড়ির কাপড়ের কোয়ালিটি, বাহারি নকশা, রঙের বৈচিত্র্য, তাঁত উদ্যোক্তাদের এসব কিছুই মানুষের মন জয় করেছে।

এ ক্ষেত্রে দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উৎসব-পার্বণে তাঁতের শাড়ি পরার প্রচলন কিন্তু দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোই করে দেয়। তারকা থেকে সাধারণ নারী, সবার কাছে টাঙ্গাইল শাড়ি পৌঁছে দিয়েছে ফ্যাশন খাতের উদ্যোক্তা ও ডিজাইনাররা। বর্তমানে শুধু বড় উদ্যোক্তা নয়, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এই টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে কাজ করে সফল হয়েছেন। টাঙ্গাইল শাড়ির এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের শুধু গর্বিতই করেনি, উৎসাহও বাড়িয়েছে অনেক। টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের আরও অনেক সাফল্য এনে দেবে, সেই প্রত্যাশা রইল।

টেলিভিশনে একটা রান্নার অনুষ্ঠান ভীষণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শারমিন লাকী টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি পরে উপস্থাপনা করতেন। তার সেই লুক অনেক নারীকে তাঁতের শাড়ির প্রতি আগ্রহী করে। কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন লাকী। তিনি বলেন, টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি আমার ভীষণ প্রিয়। আর এটা আমি ক্যারি করতে পারি ভালো। আমার মনে হয়েছিল ওই অনুষ্ঠানের থিমে দেশীয় তাঁতের শাড়িটাই যায়। তাই পরা শুরু করলাম। প্রতি পর্বে আমার সাজ নিয়ে দর্শকরা প্রশংসা করতেন। কোন শাড়ি, কোথা থেকে কিনেছি, কত যে প্রশ্ন শুনেছি। আমি তো একজন আবৃত্তিশিল্পীও। আবৃত্তি পরিবেশনার সঙ্গেও দেশীয় তাঁতের শাড়ির সাজটাই মানানসই। সেখানেও আমি তাঁতের শাড়িই পরি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়িতে আমি অসংখ্যবার মডেল হয়েছি। ডিজাইনাররা যেন ধরেই নিয়েছিল তাঁতের শাড়ির মডেল মানেই শারমিন লাকী! তবে এটা সত্যি, টাঙ্গাইল শাড়ির খ্যাতি এই যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে, এর পেছনে তাঁতশিল্পী, উদ্যোক্তা, ডিজাইনার, মডেল এবং দেশের সাধারণ মানুষ, সবার ভালোবাসা ও ভূমিকা আছে। দেশের এ অর্জনে আমরা ভীষণ গর্বিত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

গর্বের টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি

আপডেট টাইম : ১১:৫০:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫

শাড়ি পছন্দ করেন না, এমন বাঙালি নারী কমই আছেন। আর সেই পছন্দের শাড়ির তালিকার অনেকটাই দখল করে থাকে টাঙ্গাইল শাড়ি। টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের ঐতিহ্য। সম্প্রতি টাঙ্গাইল শাড়ি পেল ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি আমাদের করেছে গর্বিত। টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহাসিক এই অর্জন নিয়ে আয়না সময়ের আজকের প্রতিবেদন লিখেছেন লাবণ্য লিপি

টাঙ্গাইল শাড়ির তাঁতিরা মূলত ঐতিহ্যবাহী মসলিন তাঁতশিল্পীদের বংশধর। তাদের বসবাস ছিল ঢাকার ধামরাই এলাকার আশপাশে। টাঙ্গাইলের জমিদারদের আমন্ত্রণে তারা সেখানে গিয়ে কাজ শুরু করেন। পরে তারা টাঙ্গাইলে বসবাস শুরু করেন। ধীরে ধীরে বিস্তৃতি বাড়তে থাকে টাঙ্গাইল শাড়ির। একটি শাড়ি শুধু একটি বস্ত্র নয়। এ যেন রঙিন সুতোয় বোনা হাজার জীবনের গল্প। নারীর হাতে চড়কা কাটা থেকে শুরু করে তাঁতের খটখট আওয়াজে কারিগর নিখুঁতভাবে শুধু শাড়িরই বোনেন না, তার সঙ্গে মিশে থাকে তাদের প্রতিদিনের পাওয়াÑ না পাওয়ার গল্প। টাঙ্গাইল জেলা তাঁতশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এই জেলার তাঁতি বা বুনন শিল্পীদের হাতেই টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তি। জানা যায়, উনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের শুরুতে টাঙ্গাইল শাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এক সময়ে এটি আটপৌঢ়ে শাড়ি হিসেবেই পরিচিত ছিল। গ্রামাঞ্চলের নারীরা এই শাড়ি ঘরে পরতেন। কিন্তু টাঙ্গাইল শাড়ি তার নিজস্ব যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছে অভিজাত মহলে। এখন যে কোনো উৎসব, পার্বণে টাঙ্গাইল শাড়ি থাকে প্রথম পছন্দে। এখন শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও টাঙ্গাইল শাড়ির কদর অনেক বেশি।

এই শাড়ির বুনন শৈলি, নকশার বৈচিত্র্য নজর কাড়ে গ্রাহকের। আধুনিক ফ্যাশনে টাঙ্গাইল শাড়ি এখন অন্যতম অনুষঙ্গ। এ প্রসঙ্গে কথা হয় ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী বিপ্লব সাহার সঙ্গে। বিপ্লব বলেন, দেশীয় ফ্যাশন খাতকে চাঙ্গা বা শক্তিশালী করতে টাঙ্গাইল শাড়ির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার জানা মতে, টাঙ্গাইল শাড়ির মতো এত জনপ্রিয়তা অন্য কোনো অঞ্চলের কাপড়ের নেই। আমি গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে দেশীয় ফ্যাশন নিয়ে কাজ করছি। আমার মনে হয় আমি বা আমারও অগ্রজ যারা আছেন এই ইন্ডাস্ট্রিতে তারা বলবেন যে, টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পীদের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে। একটা সময় তো অভিজাতরা বিদেশি কাপড় পরত। এখন সেই জায়গায় পৌঁছে গেছে টাঙ্গাইল শাড়ি। এটা সম্ভব হয়েছে তাদের মানসম্পন্ন কাজের জন্য। টাঙ্গাইল শাড়ির কাপড়ের কোয়ালিটি, বাহারি নকশা, রঙের বৈচিত্র্য, তাঁত উদ্যোক্তাদের এসব কিছুই মানুষের মন জয় করেছে।

এ ক্ষেত্রে দেশীয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উৎসব-পার্বণে তাঁতের শাড়ি পরার প্রচলন কিন্তু দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলোই করে দেয়। তারকা থেকে সাধারণ নারী, সবার কাছে টাঙ্গাইল শাড়ি পৌঁছে দিয়েছে ফ্যাশন খাতের উদ্যোক্তা ও ডিজাইনাররা। বর্তমানে শুধু বড় উদ্যোক্তা নয়, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এই টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে কাজ করে সফল হয়েছেন। টাঙ্গাইল শাড়ির এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের শুধু গর্বিতই করেনি, উৎসাহও বাড়িয়েছে অনেক। টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের আরও অনেক সাফল্য এনে দেবে, সেই প্রত্যাশা রইল।

টেলিভিশনে একটা রান্নার অনুষ্ঠান ভীষণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শারমিন লাকী টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি পরে উপস্থাপনা করতেন। তার সেই লুক অনেক নারীকে তাঁতের শাড়ির প্রতি আগ্রহী করে। কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন লাকী। তিনি বলেন, টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি আমার ভীষণ প্রিয়। আর এটা আমি ক্যারি করতে পারি ভালো। আমার মনে হয়েছিল ওই অনুষ্ঠানের থিমে দেশীয় তাঁতের শাড়িটাই যায়। তাই পরা শুরু করলাম। প্রতি পর্বে আমার সাজ নিয়ে দর্শকরা প্রশংসা করতেন। কোন শাড়ি, কোথা থেকে কিনেছি, কত যে প্রশ্ন শুনেছি। আমি তো একজন আবৃত্তিশিল্পীও। আবৃত্তি পরিবেশনার সঙ্গেও দেশীয় তাঁতের শাড়ির সাজটাই মানানসই। সেখানেও আমি তাঁতের শাড়িই পরি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়িতে আমি অসংখ্যবার মডেল হয়েছি। ডিজাইনাররা যেন ধরেই নিয়েছিল তাঁতের শাড়ির মডেল মানেই শারমিন লাকী! তবে এটা সত্যি, টাঙ্গাইল শাড়ির খ্যাতি এই যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে, এর পেছনে তাঁতশিল্পী, উদ্যোক্তা, ডিজাইনার, মডেল এবং দেশের সাধারণ মানুষ, সবার ভালোবাসা ও ভূমিকা আছে। দেশের এ অর্জনে আমরা ভীষণ গর্বিত।