# সোয়া লাখ মানুষের জন্য একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা সংখ্যা মাত্র ১০
# ছয় বছরেও শেষ হয়নি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনের কাজ
# ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও মাত্র ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান
# ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন
# সাতজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন

এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. ছাবের বলেন, দীঘিনালা স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির জন্য জনবল নিয়োগ, ওষুধ সংকট নিরসন ও নতুন ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগির সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।
নতুন ভবনের নির্মাণ কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় ১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভবন নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুই বছরের মধ্যে ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও মাত্র ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষ করতে না পারায় ১০ লাখ টাকার বেশি জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অপারেশন মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে এবং দুই মাসের মধ্যেই ভবনের বাকি কাজ শুরু হওয়ার আশা রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ৪৫ বছর আগের জরাজীর্ণ ভবনেই বহির্বিভাগ ও জরুরি সেবা চলছে। ভবনের দেয়ালের সিমেন্ট-বালুর আস্তরণ খসে পড়েছে, টিনের ছাউনিতে মরিচা ধরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে কক্ষের ভেতরে পড়ে। এতে চিকিৎসকদের স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং রোগীরাও বাড়তি দুর্ভোগে পড়ছেন।
এলাকাবাসী ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে এসে তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। এক্সরে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হাসপাতালের ভেতরে না হওয়ায় এসব বাইরের প্রতিষ্ঠানে করাতে হচ্ছে। একইভাবে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। ফলে আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি রোগী ও তাদের স্বজনরা অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। হাসপাতালের পর্যাপ্ত সেবা, যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অনেককে বাধ্য হয়ে জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাতজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং জরুরি বিভাগে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জনবল সংকটের কারণে তিন শিফটেই এই তিনজন চিকিৎসককে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ছোট বারান্দায় রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। শিশু ও বৃদ্ধ রোগীরা বেশি ভোগান্তির শিকার হন। আলাদা আলাদা বিভাগ না থাকায় গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সবার।
হাসপাতালে ১৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৭ জন, ৪৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। হাসপাতালটির ৪৪ জন মাঠকর্মীর বিপরীতে মাত্র ১৩ জন মাঠকর্মী রয়েছে। হাসপাতালটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট হওয়ায় নেই মেডিসিন, সার্জারি, এনেস্থেসিয়া, চর্মরোগ ও শিশু বিশেষজ্ঞ। ফলে রোগীদের জটিল ক্ষেত্রে জেলা সদর হাসপাতালে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক রোগী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। কেউ কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে অসুস্থতা নিয়েই দিন পার করছেন।
হাসপাতালে এক্সরে সেবার জন্য টেকনোলজিস্ট থাকলেও প্রয়োজনীয় জায়গা ও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এক্সরে মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ইকোকার্ডিওগ্রাফার নেই এবং ইসিজি মেশিন থাকলেও নেই টেকনোলজিস্ট। ফলে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে রোগীদের বাইরের ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে জটিল রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। এ ছাড়া রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে হাসপাতাল। ফলে প্রান্তিক অসহায় ও গরিব মানুষদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে তাদের বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে।
দীঘিনালা উপজেলার পার্শ্ববর্তী রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলা থেকে আসা রোগীদের বাড়তি চাপও সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে। হাসপাতালের অসম্পূর্ণ নতুন ভবনের টয়লেটগুলো রোগীদের কেবিনের ঠিক পাশে হওয়ায় দুর্গন্ধে রোগী ও স্বজনরা নাজেহাল।
ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগী নবমিত্র চাকমা বলেন, আমি তিন দিন ধরে এখানে ভর্তি আছি। চিকিৎসা পেলেও টয়লেটের দুর্গন্ধে অসুস্থতা আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাহেরা বেগম বলেন, আমি প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে চিকিৎসা পেয়েছি। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ব্যথা আরও বেড়েছে। দুই ধরনের ওষুধ পেলেও কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়েছে। ডাক্তার আমাকে এক্সরে, ইসিজিসহ কিডনির পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেখাতে বলেছেন। পরীক্ষা করানোর মতো অর্থ ও সামর্থ্য কোনোটাই নেই আমার।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকার যেন দ্রুত ৫০ শয্যা হাসপাতালটি চালু করার ব্যবস্থা করে দেয় এবং খালি থাকা শূন্যপদগুলোতে জনবল নিয়োগ দেয়। দীঘিনালার মতো প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ যেন কোনো রকম ভোগান্তির শিকার না হয়ে আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
Reporter Name 
























