ঢাকা ১১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিসিআইসির সার যাচ্ছে কালোবাজারে, নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৭:৫৪:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫
  • ৪০ বার

খুলনার বিভিন্ন ঘাটে খালাস হওয়া ইউরিয়া সার যাচ্ছে কালোবাজারে। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গায় প্রায় ২০ টন সার জব্দের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এর বাইরে প্রতিনিয়ত কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে এসব সার। সরকারি গুদামের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পরিবহণ ব্যবসায়ীরাই এই চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়। অতি মুনাফা লাভের আসায় অসাধু চক্রটি এই অঞ্চলের কৃষি খাতকে বিপর্যয়ে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বিষয়টি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস করপোরেশন (বিসিআইসি) কর্তৃপক্ষ জেনেবুঝেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) খুলনা ক্যাম্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুলনার ঘাটগুলোতে চলতি বছরে এক লাখ ৩৩ হাজার ৬৫০ টন সার খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ বছর চারটি জাহাজে করে সার আসছে দেশে। এগুলো হচ্ছে অলিম্পিয়া লগার, গ্লোবাল এম্বিশন, নিকোলাস এ এবং লটিকা নারি। দেশের ৩৪টি গুদামে চাহিদা অনুযায়ী এসব সার পৌঁছে দিচ্ছে সামিট অ্যাসোসিয়েটস। সামিট অ্যাসোসিয়েটস আবার সাব-কন্টাক্টে জুয়েল ট্রান্সপোর্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরিবহণ করাচ্ছে। জাহাজগুলো মংলা বন্দরে ভিড়লে সেখান থেকে ফিডার ভেসেলে করে সেগুলো নির্দিষ্ট ঘাট বা পয়েন্টে আনলোড করা হয়। সেখান থেকে বস্তায় ভরে চলে যায় দেশের সার গুদামগুলোতে। নির্দিষ্ট গুদাম থেকে ডিলাররা বরাদ্দ অনুযায়ী সার তুলে কৃষকের কাছে বিক্রি করেন। এই প্রক্রিয়ায় কৃষকরা সার পেয়ে থাকে। বেসরকারিভাবে কোনো সার দেশে আমদানি হয় না। ফলে আমদানি থেকে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই বাস্তবায়ন হয় সরকারি তত্ত্বাবধানে। তবে সার সরবরাহের এই প্রক্রিয়ার পেছনে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।

সার ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছে, খুলনার ঘাটগুলোতে নামানো ইউরিয়া সার প্রতিনিয়ত কালোবাজারে বিক্রি হয়। এসব সার গুদামে সরবরাহ করার কথা বলে ট্রাকে ভরে সেগুলো কমদামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে গুদাম কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহণ ব্যবসায়ীরা। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাগজে-কলমে সংরক্ষণ দেখিয়ে বাইরে কমদামে সার বিক্রি করে। এতে অঞ্চলভেদে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পক্ষান্তরে পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হচ্ছে।

খুলনার শিরোমনি ঘাটের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্রান্সপোর্ট মালিক ও গুদামের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ থাকে। ট্রাক ট্রাক সার গুদামে না গিয়ে বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়ে যায়। ২০ টনের এক ট্রাক সার কালোবাজারে বিক্রি করলে কমপক্ষে আট লাখ টাকা লাভ থাকে। উভয়ে ভাগাভাগি করে উপার্জন করছে।

সম্প্রতি খুলনার ঘাট থেকে নিয়ে যাওয়া এক ট্রাক ইউরিয়া সার ধরা পড়েছে চুয়াডাঙ্গায়। ৮ নভেম্বর গভীর রাতে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গোষ্টবিহার গ্রাম থেকে এসব সার উদ্ধার করে উপজেলা কৃষি বিভাগ। ওই সারবোঝাই ট্রাকটি স্থানীয় ব্যবসায়ী শামীম রেজার গুদামে যাচ্ছিল। পরে ব্যবসায়ী শামীম রেজাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ী শামীম রেজা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তাকে জরিমানা করা হয়েছে। তবে আমরা সার কোথা থেকে এলো কীভাবে এখানে এলো এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে পারিনি। যখন ব্যবসায়ী দায় স্বীকার করছে তখন আর এই তথ্যগুলো জানার প্রয়োজন মনে করিনি। এটা আমাদের ভুল হয়েছে।

জানা যায়, চুয়াডাঙ্গায় যে ট্রাক গেছে সেটি জুয়েল ট্রান্সপোর্টের। ওই সময় দেশে যে সার ঢুকেছে তা সামিট অ্যাসোসিয়েটসের। গেল সপ্তাহে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সার দেশে আসেনি। ফলে এই চোরাবাজারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ না কেউ জড়িত। যা নিয়ে আর কোনো তদন্ত হয়নি।

তবে সামিট অ্যাসোসিয়েটস এর ম্যানেজার মো. শামীম আহসান বলেন, ‘জুয়েল ট্রান্সপোর্টকে দিয়ে আমরা সার গুদামে পৌঁছাই। যে ট্রাক সেখানে গেছে সেটিও জুয়েল ট্রান্সপোর্টের। তবে ডিলার স্বীকার করে নিয়েছে যে সার তার, সেজন্য আমরা জুয়েল ট্রান্সপোর্টকে দোষী বলতে পারছি না।’

এদিকে চোরাবাজারে সার চলে যাওয়ার বিষয়ে বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) সেরনিয়াবাত রেজাউল বারী বলেন, আমরা দেখি চাহিদা অনুযায়ী মাল গুদামে পৌঁছেছে কি না। বিষয়টি নিয়ে সামিট অ্যাসোসিয়েটস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা চাহিদা অনুযায়ী সার দেবে বলে জানিয়েছে। ফলে ওই বিষয় নিয়ে আর তদন্ত হয়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

বিসিআইসির সার যাচ্ছে কালোবাজারে, নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

আপডেট টাইম : ০৭:৫৪:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫

খুলনার বিভিন্ন ঘাটে খালাস হওয়া ইউরিয়া সার যাচ্ছে কালোবাজারে। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গায় প্রায় ২০ টন সার জব্দের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এর বাইরে প্রতিনিয়ত কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে এসব সার। সরকারি গুদামের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পরিবহণ ব্যবসায়ীরাই এই চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়। অতি মুনাফা লাভের আসায় অসাধু চক্রটি এই অঞ্চলের কৃষি খাতকে বিপর্যয়ে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বিষয়টি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিস করপোরেশন (বিসিআইসি) কর্তৃপক্ষ জেনেবুঝেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) খুলনা ক্যাম্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুলনার ঘাটগুলোতে চলতি বছরে এক লাখ ৩৩ হাজার ৬৫০ টন সার খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ বছর চারটি জাহাজে করে সার আসছে দেশে। এগুলো হচ্ছে অলিম্পিয়া লগার, গ্লোবাল এম্বিশন, নিকোলাস এ এবং লটিকা নারি। দেশের ৩৪টি গুদামে চাহিদা অনুযায়ী এসব সার পৌঁছে দিচ্ছে সামিট অ্যাসোসিয়েটস। সামিট অ্যাসোসিয়েটস আবার সাব-কন্টাক্টে জুয়েল ট্রান্সপোর্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পরিবহণ করাচ্ছে। জাহাজগুলো মংলা বন্দরে ভিড়লে সেখান থেকে ফিডার ভেসেলে করে সেগুলো নির্দিষ্ট ঘাট বা পয়েন্টে আনলোড করা হয়। সেখান থেকে বস্তায় ভরে চলে যায় দেশের সার গুদামগুলোতে। নির্দিষ্ট গুদাম থেকে ডিলাররা বরাদ্দ অনুযায়ী সার তুলে কৃষকের কাছে বিক্রি করেন। এই প্রক্রিয়ায় কৃষকরা সার পেয়ে থাকে। বেসরকারিভাবে কোনো সার দেশে আমদানি হয় না। ফলে আমদানি থেকে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই বাস্তবায়ন হয় সরকারি তত্ত্বাবধানে। তবে সার সরবরাহের এই প্রক্রিয়ার পেছনে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।

সার ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছে, খুলনার ঘাটগুলোতে নামানো ইউরিয়া সার প্রতিনিয়ত কালোবাজারে বিক্রি হয়। এসব সার গুদামে সরবরাহ করার কথা বলে ট্রাকে ভরে সেগুলো কমদামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে গুদাম কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহণ ব্যবসায়ীরা। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাগজে-কলমে সংরক্ষণ দেখিয়ে বাইরে কমদামে সার বিক্রি করে। এতে অঞ্চলভেদে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পক্ষান্তরে পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হচ্ছে।

খুলনার শিরোমনি ঘাটের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ট্রান্সপোর্ট মালিক ও গুদামের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ থাকে। ট্রাক ট্রাক সার গুদামে না গিয়ে বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়ে যায়। ২০ টনের এক ট্রাক সার কালোবাজারে বিক্রি করলে কমপক্ষে আট লাখ টাকা লাভ থাকে। উভয়ে ভাগাভাগি করে উপার্জন করছে।

সম্প্রতি খুলনার ঘাট থেকে নিয়ে যাওয়া এক ট্রাক ইউরিয়া সার ধরা পড়েছে চুয়াডাঙ্গায়। ৮ নভেম্বর গভীর রাতে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গোষ্টবিহার গ্রাম থেকে এসব সার উদ্ধার করে উপজেলা কৃষি বিভাগ। ওই সারবোঝাই ট্রাকটি স্থানীয় ব্যবসায়ী শামীম রেজার গুদামে যাচ্ছিল। পরে ব্যবসায়ী শামীম রেজাকে এক মাসের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ী শামীম রেজা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তাকে জরিমানা করা হয়েছে। তবে আমরা সার কোথা থেকে এলো কীভাবে এখানে এলো এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে পারিনি। যখন ব্যবসায়ী দায় স্বীকার করছে তখন আর এই তথ্যগুলো জানার প্রয়োজন মনে করিনি। এটা আমাদের ভুল হয়েছে।

জানা যায়, চুয়াডাঙ্গায় যে ট্রাক গেছে সেটি জুয়েল ট্রান্সপোর্টের। ওই সময় দেশে যে সার ঢুকেছে তা সামিট অ্যাসোসিয়েটসের। গেল সপ্তাহে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সার দেশে আসেনি। ফলে এই চোরাবাজারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ না কেউ জড়িত। যা নিয়ে আর কোনো তদন্ত হয়নি।

তবে সামিট অ্যাসোসিয়েটস এর ম্যানেজার মো. শামীম আহসান বলেন, ‘জুয়েল ট্রান্সপোর্টকে দিয়ে আমরা সার গুদামে পৌঁছাই। যে ট্রাক সেখানে গেছে সেটিও জুয়েল ট্রান্সপোর্টের। তবে ডিলার স্বীকার করে নিয়েছে যে সার তার, সেজন্য আমরা জুয়েল ট্রান্সপোর্টকে দোষী বলতে পারছি না।’

এদিকে চোরাবাজারে সার চলে যাওয়ার বিষয়ে বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) সেরনিয়াবাত রেজাউল বারী বলেন, আমরা দেখি চাহিদা অনুযায়ী মাল গুদামে পৌঁছেছে কি না। বিষয়টি নিয়ে সামিট অ্যাসোসিয়েটস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা চাহিদা অনুযায়ী সার দেবে বলে জানিয়েছে। ফলে ওই বিষয় নিয়ে আর তদন্ত হয়নি।