চাঁদাবাজি নয় বরং ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব থেকেই পুরান ঢাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। গতকাল শনিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
হত্যার কারণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, মামলার এক নম্বর অসামি গ্রেফতারকৃত মহিনসহ অন্যরা একসময় সোহাগের সঙ্গে একসঙ্গে কিছু দিন ব্যবসা করেছেন। তাদের দুজনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে তারা নিজেদের মতো করে ব্যবসা করতে চান। তখন লেনদেন নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আর সেখান থেকেই ঘটে এই হত্যাকাণ্ড। তবে কী কারণে এমন বীভৎসভাবে হত্যা করা হলো এর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে র্যাব দুজনকে এবং পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে।
পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃতরা হলেন- মাহমুদুল হাসান মহিন (৪১), তারেক রহমান রবিন (২২) ও মো. টিটন গাজী (৩২)। অন্যদিকে র্যাবের হাতে গ্রেফতাররা হলেনÑআলমগীর (২৮) ও মনির ওরফে ছোট মনির (২৫)।
এদিকে সিসি ক্যামেরার ছবি দেখে পুলিশ ও স্থানীয়রা আরও চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে বলে জানা গেছে। তারা হলেনÑমিটফোর্ড হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মচারী মো. মনির, অ্যাম্বুলেন্স চালক নান্নু, চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদ্য বহিষ্কৃত সদস্য সচিব অপু দাস ও চকবাজার থানা যুবদলের সাবেক সদস্য সরোয়ার হোসেন টিটু।
হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে ডিসি, লালবাগ বলেন, অপরাধের তদন্তে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়। আমরা এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত হতে পারিনি, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কি না। ভিকটিম কিংবা অভিযুক্ত কারও রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও গ্রেফতাররা রাজনৈতিক কোনো দলের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা এখনও স্বীকার করেনি। এই ঘটনার সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো তথ্য পুলিশ পায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, এটি ছিল একান্তই ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি বা সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য নেই।
মামলা থেকে তিনজনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে- যুবদলের এমন অভিযোগের বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এখানে পুলিশের কোনো স্বার্থ নেই। আমাদের মূল লক্ষ্য এ ঘটনার মোটিভ উদঘাটন এবং আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা। পুলিশ সেভাবেই কাজ করছে।
মামলা নিতে দেরি হয়েছে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে লালবাগ বিভাগের ডিসি বলেন, পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ঘটনায় পদক্ষেপ নিয়েছে। ঘটনার ১০ মিনিটের মধ্যেই তিনি নিজেসহ কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। প্রথমে ভিকটিমের সাবেক স্ত্রী পরবর্তীতে তার এক সৎভাই মামলার বাদী হওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেন। কিন্তু আমার চাচ্ছিলাম আরও নিকটাত্মীয় কেউ বাদী হোক। তখন নিহতের বড় বোন বাদী হন। এ জন্যই মামলা নিতে বিলম্ব হয়েছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন, সংশ্লিষ্ট সব অপরাধী গ্রেফতার এবং ভিকটিম কেন এই ঘটনার শিকার হলো তা উদঘাটনের জন্য একটি চৌকস টিম গঠন করা হয়েছে।
ডিসি জসীম উদ্দিন জানান, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় ৬ থেকে ১১ জন। যাদের কেউ গ্রেফতার, বাকিরা নজরদারির ভেতর আছেন। ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী পুলিশের স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকেই স্পষ্টভাবে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বড় মনির ও ছোট মনির মরদেহের ওপর লাফায়। আর আলমগীর ও বড় মনিরসহ আকাশি রঙের শার্ট পরিহিত আরেকজন সিমেন্টের ব্লক দিয়ে সোহাগকে আঘাত করে। তবে আকাশি রঙের শার্ট পরিহিত হামলাকারীকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি বলে জানান তিনি।
এদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ একজন সাক্ষী পাওয়া গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই তাকে প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ এই সাক্ষীর নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
দ্বন্দ্বের নেপথ্যে : নিহত সোহাগের পরিবার ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্টের আগে সোহাগ পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিমের সেল্টারে ব্যবসা করতেন। তার এই ব্যবসার অংশীদার ছিল হামলায় অংশ নেওয়া গ্রেফতারকৃত মাহমুদুল হাসান মহিনও। তবে সোহাগ লাভের ৭০ ভাগ টাকা একাই নিতেন। তিনি তার মেয়ে সোহানার নামে ‘সোহানা মেটাল’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেন। যেখানে পুরোনো তামার তার কেনাবেচা করতেন। মূলত চোরাই তামার তার ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল তার। ৫ আগস্টের পর মহিন ব্যবসার ৫০ ভাগ দাবি করেন। তখন সোহাগ মহানগর যুবদল (দক্ষিণ) নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের শেল্টারে চলে যান। আর মহিন ছিলেন আরেক যুবদল নেতা ইসহাক সরকারে গ্রুপে। সোহাগ নয়নের দাপটে পুরো ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ একাই রাখতে চাচ্ছিলেন।
ঘটনার এক দিন আগে সোহাগ কয়েক লাখ টাকার চোরাই তামার তার ক্রয় করেন। এই সংবাদ জানার পর মহিন ২ লাখ টাকা দাবি করেন সোহাগের কাছে। কিন্তু এই অর্থ দিতে চাচ্ছিলেন না সোহাগ। সেদিন মহিন দলবল নিয়ে যান সোহাগের দোকানে। সেখানে গুলির ঘটনা ঘটে। পরদিন বুধবার আবারও সোহাগের দোকানে যান মহিন ও তার সঙ্গীরা। সেখানে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। সোহাগকে মারধর করা হয়। তাদের সঙ্গে অস্ত্র ছিল। সোহাগ প্রাণ বঁচাতে দোকান থেকে দৌড় দেন। এ সময় হামলাকারীরা ধর্ষক বলে ধাওয়া করে সোহাগকে। এক পর্যায়ে রাস্তায় পড়ে গেলে তাকে ইট ও কংক্রিটের সøাব দিয়ে উপর্যপুরি আঘাতে করতে থাকে সবাই মিলে। তার মৃত্যুর পর তার শরীরে উঠে লাফায় হামলাকারীরা। পুলিশ জানায়, হামলার ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে ১১ জন অংশ নেয়। এর মধ্যে শনিবার পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয় পাঁচজনকে।
ছাত্রদল নেতা রবিনের দায় স্বীকার : এদিকে হত্যার ঘটনায় করা অস্ত্র আইনের মামলায় ছাত্রদল নেতা তারেক রহমান রবিন আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া হত্যা মামলায় আরেক আসামি মো. টিটন গাজীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
শনিবার বিকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিদের হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. নাসির উদ্দিন আসামি টিটন গাজীকে হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ত্র আইনের মামলায় দুই দিনের রিমান্ড শেষে আসামি তারেক রহমান রবিনকে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মনির হোসেন জীবন। এরপর রবিন স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মতি হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন এ তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ গিয়াসের আদালতে স্বেচ্ছায় এ জবানবন্দি দেন তিনি। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। জানা যায়, আসামি তারেক রহমান রবিন রাজধানীর চকবাজার থানার ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক।
রবিনের জবানবন্দি রেকর্ড শেষে বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে এজলাসে ওঠেন বিচারক। আদালতে প্রথমে হত্যা মামলায় গ্রেফতার টিটন গাজীর সাত দিনের রিমান্ড বিষয়ে শুনানি করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর কাইয়ুম হোসেন নয়ন ও এম কাওসার আহমেদ রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তবে এদিন আসামি পক্ষের কোনো আইনজীবী ছিল না। এ সময় বিচারক আসামি টিটন গাজীকে জিজ্ঞেস করেন আপনি কিছু কি বলতে চান? তখন তিনি বলেন, জি স্যার, আমার কোনো আইনজীবী নেই। আপনি (বিচারক) যে ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখেছেন, সেখানে আমাকে দেখা যাচ্ছে। আমি কাউকে আঘাত করিনি। আমাকে মোবাইলে ফোন করে ডাকা হয়েছিল। ফোন পেয়ে সেখানে যাই। আমি কাউকে আঘাত করিনি। ভিকটিমকে আঘাত করার জন্য হুকুমও দিইনি। আমি শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি নির্দোষ স্যার। বিচারক শুনানি শেষে আসামির পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সিএমএম হাজতখানা থেকে টিটন গাজীকে এজলাসে উঠানোর সময় সাংবাদিকদের বলেন, আমাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গেছে। আমি কিছুই জানি না। আমি নির্দোষ।
জানা যায়, গত ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনে পাকা রাস্তার ওপর প্রকাশ্যে লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে পাথর ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে হত্যা করে এক দল দুর্বৃত্ত। খবর পাওয়ার পরপরই কোতোয়ালি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। অপরদিকে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করা হয়।
Reporter Name 

























