ঢাকা ০৮:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভাসতে ভাসতে ভাটি বাংলায়? বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৬:২৪:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০১৫
  • ৩১৬ বার
অবস্থানের ১৩০তম দিনে কিভাবে যে কাকতালীয়ভাবে ভাসতে ভাসতে ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র ইটনায় গিয়ে পড়েছিলাম- সে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ব্রিটিশ ভারতে ধ্যান-জ্ঞান-সাধনার প্রাণকেন্দ্র ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ। ভাইসরয়ের পিভি কাউন্সিলের সাত সদস্যের পাঁচজনই একসময় ছিলেন ময়মনসিংহের। জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ জর্জ বিশ্বাস, কমিউনিস্ট নেতা মণি সিং, তৈলক্ষ নাথ মহারাজ, নগেন সরকার, আনন্দমোহন বোস, গুরু দয়াল সরকার কেউ কিশোরগঞ্জের, কেউ নেত্রকোনার, টাঙ্গাইল, শেরপুর, জামালপুর, কারো বাড়ি ময়মনসিংহ সদর। স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম পুরোধা, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের যশোধর। জয় সিদ্ধির স্যার আনন্দ মোহন বোস, ধলপুরের গুরু দয়াল সরকার, ঠিক তেমনি ইটনার একসময়ের প্রজাহিতৈষী জমিদার মহেষ গুপ্তের ছেলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ভূপেশ গুপ্ত। আরো কতজন যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন ভাবা যায় না। মসনদওয়ালা ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি, ১১ সিন্ধুর বীরত্বগাথা আজো অনেকের স্মৃতিতে অম্লান। চামটাঘাট থেকে রওনার সময় ভেবেছিলাম, রাস্তায় কোথাও জুমার নামাজ আদায় করব। গত ৩-৪ বছর ২-১ বার ওয়াক্তের নামাজ ছুট গেলেও জুমার নামাজ বাদ পড়েনি। চলতে চলতে বেলা পৌনে ১টায় ট্রলারচালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আর কত সময় লাগবে?’ ছেলেটি বলেছিল, ‘১৫ মিনিট।’ কিন্তু ইটনা পৌঁছতে ৪০ মিনিট লেগে যায়। তাই মনটা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছুটে গিয়ে এক রাকাত ফরজ নামাজ ইমামের পেছনে আদায় করি, আরেক রাকাত একাই পড়েছি। নামাজে দাঁড়াবার আগে যে বেদনাবোধ করছিলাম, নামাজ পেয়ে তা অনেকটাই কেটে যায়। দু’টা বেজে গিয়েছিল তাই বেশ ক্ষুধা অনুভব করছিলাম। করিমগঞ্জের বহু পুরনো কর্মী আদম আলী ট্রলারে খাবার দিয়ে দিয়েছিল। প্রথম উঠেছিলাম মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রাবাসে। একেবারে পরিত্যক্ত অপরিষ্কার। তবু সেখানেই খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ভারতের রাজ্যসভার আজীবন সদস্য ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের বাড়ি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কিছু দিন আগে ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের আত্মীয়স্বজন এক বিয়েতে অংশ নিতে কলকাতা গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় দুই দেশের যুদ্ধ বাধে। তারপর তাদের আর ইটনায় ফেরা হয়নি। হালের গরু, বাড়ির উঠোনে শত শত মণ ধান অনেক দিন পড়ে থাকে। সেই বাড়িটি ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম, ‘মাগনা পেলে কেউ কেউ জুতোর কালি খেতেও দ্বিধা করে না।’ বিনা পরিশ্রমে কোনো কিছু পেলে আমরা যে তা রেখে খেতে পারি না- ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের এই বাড়ি তারই প্রমাণ। ৬০-৬৫ বছর ধরে বাড়িটি সরকারের হেফাজতে। রক্ষণাবেক্ষণ করলে সেটি এখনো ঝকঝকে তকতকে থাকত। ৪০ ইঞ্চি মোটা সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ত না, ৩০ ইঞ্চির ভবনের দেয়ালগুলো খসে যেত না। সোনারগাঁ পানাম নগরীর যে দশা দেখেছি, এখানেও সেই একই অবস্থা।
শ্রী ভূপেশ চন্দ্র গুপ্ত ভারত উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক পথিকৃৎ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বিলেতে লেখাপড়া করতেন। দু’জনের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক ছিল। এখন মুক্তিযুদ্ধের কত ইতিহাস রচিত হয়, ডিপি. ধর, পি.এন. হাক্সার ছিলেন সরকারি কর্মচারী। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দূত হিসেবে সারা দুনিয়া চষে বেড়িয়েছিলেন ভারতের দ্বিতীয় গান্ধী সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ। কত নাম নিয়ে আলোচনা হয় কিন্তু ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের নাম আসে না, আসে না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শান্তিময় রায়ের নাম।
ইটনার ভূপেশ চন্দ্র গুপ্ত এবং সরিষাবাড়ীর শান্তিময় রায়কে স্বাধীনতার পরপরই চিনতাম। ’৭২-এর জানুয়ারিতে শান্তিময় রায় টাঙ্গাইলে আমার কাছে এসেছিলেন তার গ্রামের বাড়ি সরিষাবাড়ী যেতে। তাকে লোকজন দিয়ে গাড়ি করে তার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম। এরপর শান্তিময় রায় যখন যেভাবে পেরেছেন আমাকে সহায়তা করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে আমার যখন কোনো ঠিকানা ছিল না, মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তখন তিনি তার যাদবপুরের বাড়িতে আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি ভূপেশ গুপ্তও একজন মহান মানুষ। ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতনের পর আমার যখন চরম দুর্দিন, চার দিকে নিদারুণ অন্ধকার, অথৈ পানিতে যেন ভাসছিলাম, কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন নেতাজী সুভাষ বোসের ছায়াসঙ্গী ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা সমর গুহ এমপি এবং ইটনার জমিদারপুত্র এই ভূপেশ গুপ্ত লোকসভা ও রাজ্যসভায় একের পর এক প্রশ্নবাণে মোরারজি দেশাইয়ের জনতা পার্টির সরকারকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামীদের যাতে জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেয়া না হয় তার জন্য লোকসভা এবং রাজ্যসভায় একের পর এক প্রস্তাব তুলেছিলেন। আমার বর্ধমানের বাড়িতে একদিন ভূপেশ দা ছুটে এসেছিলেন। তাই তার ইটনার জরাজীর্ণ বাড়ির দক্ষিণে তাঁবু ফেলে রাত কাটানো এবং সেখানে বসে দু’কথা লিখতে গিয়ে সত্যিই পরোপকারী ভূপেশ দার কথা বার বার মনে পড়ছে। এই অঞ্চলে স্কুল-কলেজ-খেলার মাঠ যেখানে যা প্রয়োজন তার পূর্ব পুরুষরা করেছেন। ইটনার তার পৈতৃক বাড়ি সরকারি হেফাজতে থাকত, তাতে কোনো দোষ ছিল না। কিন্তু যদি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হতো, উপজেলা তহসিল অফিস বানিয়ে ধ্বংস করা না হতো- সেটা হতো সম্মানের। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের একসময়ের নির্বাচনী এলাকা ইটনা। এমপি হিসেবে কিছু করতে পারেননি সেটা মেনে নেয়া গেলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিছুই করতে পারবেন না সেটা কিন্তু মেনে নেয়া যাবে না। অপেক্ষায় রইলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা রাখা প্রাতঃস্মরণীয় এই মানুষটির পৈতৃক নিবাস আরো কিছুকাল সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি মহাকালের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইটনা আসার আগে ছিলাম করিমগঞ্জের বৌলাই। সে এক মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনা। আজ থেকে ১৫ বছর আগে ১৪ জুলাই করিমগঞ্জে এক জনসভার আহ্বান করা হয়েছিল। নতুন দল সবার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ভাটি বাংলার এক অবিসংবাদিত নেতা, মিঠামইনের অ্যাডভোকেট ফরিদ, কিশোরগঞ্জের হান্নান মোল্লা, ফারুক আহমেদ, অ্যাডভোকেট আজিজ আরো কতজন নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের গামছা ধরেছিল। কিশোরগঞ্জের শহীদী মসজিদে নামাজ পড়ে অ্যাডভোকেট আজিজের বাড়িতে খাবার খেয়ে করিমগঞ্জের পথে রওনা হয়েছিলাম। তখনকার দাপুটে নেতা করিমগঞ্জের হর্তাকর্তা বিধাতা অধ্যাপক মিজানুর রহমানের লোকজন বৌলাতে আমাদের বাধা দেয়। তারা স্লোগান তোলে, ‘করিমগঞ্জের মাটি, মিজান স্যারের ঘাঁটি।’ শুধু মিজান স্যারই করিমগঞ্জে থাকবেন, আর কেউ নয়। আসর, মাগরিব, এশার নামাজ আদায় করে সেখান থেকে ফিরেছিলাম। করিমগঞ্জের ওসি, ইউএনও, কিশোরগঞ্জের এডিসি আরো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা তামাশা দেখতে গিয়েছিল। রাস্তায় বাধা দেয়ার জন্য থানায় ডায়েরি করলেও তার কোনো প্রতিকার হয়নি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, থানার ডায়েরিতে কাজ না হলেও আল্লাহর ডায়েরিতে কাজ হয়েছে। করিমগঞ্জ এখন আর মিজান স্যারের ঘাঁটি নেই, মিজান স্যারও নেই। দয়াময় আল্লাহ সেদিন যেমন দয়া করেছিলেন, আজো একইরকম করছেন।
এবার শবেবরাতের জন্য ১, ২, ৩ তারিখ একনাগাড়ে ভাটগাঁওয়ে জিয়াউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে ঈদগাহ মাঠে ছিলাম। গাছপালা না থাকায় রোদে পুড়লেও বাতাস ছিল নির্মল। তিনটা দিন তিনটা রাত এলাকার মানুষ বড় আপন করে নিয়েছিল। তাঁবুর পাশের আরমান ক্লাস ফাইভের ছোট্ট একটি ছেলে হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। তা ছাড়া সাবেক সৈনিক নুরুদ্দীন, তার ভাই এবং বিএনপি সমর্থক স্কুলের নৈশপ্রহরী এলাকার সম্মানী ব্যক্তি আব্দুস সাত্তারকে খুবই ভালো লেগেছে। চলে আসার সময় নুরুদ্দীনের মায়ের সাথে দেখা। সে এক অভাবনীয় ব্যাপার। শবেবরাতের আগে কটিয়াদী মধ্যপাড়া স্কুলের পাশে শ্মশানঘাটে ছিলাম আর ভাটগাঁওয়ে ছিলাম কবরস্থানের পাশে। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর আমরা প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে না তুললে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের হাতে আওয়ামী লীগের মুসলমান নেতাদের জায়গা হতো কবরে, হিন্দুদের শ্মশানে। কী করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যেমন প্রতারণা করা হয়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামীদের সাথে একইরকম করা হয়েছে। যাদের জন্য বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন, তারা আজ জননেত্রীর কল্যাণে ক্ষমতায় আর যারা হত্যার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করেছে তারা শত্রু। সবই আল্লাহর ইচ্ছা, সবই আল্লাহর কুদরত। তিনি ফকিরকে বাদশা, বাদশাকে ফকির করেন।
বছরটা মনে নেই, বৌলাই অবরোধের পর করিমগঞ্জ গিয়েছিলাম। কলেজ মাঠে মিটিং ছিল। সোহেল নামে ছোট এক শিশু আকুল হয়ে ক্াঁদছিল। ‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করতেই সে বলেছিল, ভৈরব রেলস্টেশনে মোবাইল কোর্ট তার বাবাকে ধরে জেলে পাঠিয়েছে। তখনই গাজীপুরের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকীকে বলেছিলাম, জেলে গিয়ে জরিমানা দিয়ে সোহেলের বাবাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে। রেল বিভাগের কাগজ জেলগেটে ছিল না। তাই সে রাতে সে বেরুতে পারেনি। কমলাপুর স্টেশনের লোকজন খুব সাহায্য করেছিল। পরদিন সকালে তারা স্পেশাল ম্যাসেঞ্জার দিয়ে কাগজপত্র গাজীপুর পাঠিয়েছিল। যে কারণে সে সকালেই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছিল। এখন সোহেল বাপের সাথে চায়ের দোকান করে। অপূর্ব সুন্দর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এক যুবক। কিন্তু সেদিন তার দু’চোখের পানিতে বুক ভাসছিল। অনেক বছর পর বাপ-বেটাকে একসাথে দেখে কী যে ভালো লাগল লিখে বুঝাতে পারব না। লিখলে অনেকেই কেমন ভাববেন জানি না, কিন্তু তবু ব্যাপারটি সত্য। ’৭১-এর ১৮ ডিসেম্বর পল্টনে সভা করতে যাওয়ার পথে যখন তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম, তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও বাবার জন্য আকুল হয়ে কেঁদেছিলেন। কখন কে কাঁদে আর কে হাসে সবই সময়ের ব্যাপার। বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের বাড়ি যখন যেতাম ভাবী খালেদা জিয়াও কত যতœ করতেন। তিনিও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এখন তো তারাই দেশের নেতা। কত কিছু দেখলাম, আল্লাহ কত কিছু দেখালেন। ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র ইটনায় ভূপেশ গুপ্তের বাড়ির আঙ্গিনায় তাঁবুতে বসে লিখতে গিয়ে কত কথা মনে পড়ছে। বিকেলে একটি অনির্ধারিত মতবিনিময় সভায় তিল ধরার জায়গা ছিল না। এর আগে যতবার এসেছি, ফজলুর রহমানের সাথে এসেছি। এবারই প্রথম আল্লাহর ভরসায় তাকে ছাড়া অল্প বয়সী কিছু কর্মীর সাথে এসেছি। শুনতে এসেছিলাম, জানতে এসেছিলাম হাওরে-বাঁওড়ে যে শত শত গামছায় উড়ত তারা কি সবাই ফজলুর রহমানের সাথে চলে গেছে, নাকি মানুষের গামছায় এখনো মানুষ আছে। বড় খুশি হয়েছি, ফজলুর রহমান গামছা ছেড়ে গেলেও ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামের মানুষ তাদের গামছা ছাড়েনি। ব্যাপারটা দেখে হৃদয় মন আনন্দে নেচে উঠেছে।
গতকালকের দিনটা আমাদের খুব একটা ভালো যায়নি। ইটনার নেতা আবুল খায়ের ভালো ট্রলারচালক দিতে পারেনি, একেবারেই রাস্তা চেনে না। পাঁচ মাসের কর্মসূচিতে গতকালই আমাদের খুব বেশি এলোমেলো হয়েছে। ঘাগরা বাজারে কিছু সময় থেমেছিলাম। সেখান থেকে ঘুরতে ঘুরতেই প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা চলে যায়। আব্দুল্লাহপুর বাজারে পথপ্রদর্শক বাচ্চু মিয়াকে না পেলে কী যে বিশ্রী অবস্থা হতো ভাবাই যায় না। আব্দুল্লাহপুর, আদমপুর পুরে পুরে মিল থাকলেও দূরত্ব অনেক। আমাদের রিফাতুল ইসলাম দীপ সব গুলিয়ে ফেলতে গিয়েছিল। তবু ভাগ্যিস, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় অষ্টগ্রাম নদীর ঘাটে তাঁবু ফেলতে পেরেছিলাম। বাঙ্গালপাড়ার নবাবকে প্রথম যেবার ছোট্ট শিশুটি পেয়েছিলাম, এখন তার দুটি শিশু থাকলেও আগের মতোই অচল অটল আছে। এর আগে প্রতিবার অষ্টগ্রামে এলে ফজলুর রহমান, মনসুরুল কাদের সাথে থাকত। এবার কিশোরগঞ্জের সভাপতি আমিনুল ইসলাম তারেক ও অন্যান্য কর্মীরা রয়েছে। আল্লাহকে ভরসা করে এসেছি। অষ্টগ্রামেও দেখলাম মনসুরুল কাদের এবং ফজলুর রহমান এদিক ওদিক গেলেও যারা সত্যিকার গামছায় ছিলেন তারা তেমনি আছেন। ত্রুটি তাদের নয়, যোগাযোগ না রাখার ত্রুটি আমাদের। সাড়া পেয়ে মনটা ভরে গেছে।
প্রতিবেশী মহান ভারতের মহান নেতা শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি রক্তের দামে কেনা আমাদের বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আমরা দু’হাত প্রসারিত করে তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে চাই। তিনি সমগ্র বাংলার প্রসারিত উষ্ণ বুকে জায়গা খুঁজছেন, নাকি কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর উত্তাপ বুকে লালন করবেন- সেটা তার ওপরই নির্ভর করে। তবে আমার বিশ্বাস, বাবার সাথে চায়ের দোকানে হাত লাগাতে লাগাতে যিনি এত দূর এসেছেন, তার দৃষ্টি ঝাপসা হবে না। তিনি বাংলা এবং বাঙালির হৃদয় জয় করতে তার এই সফরকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন- এটাই আমাদের কায়মনে প্রার্থনা।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ভাসতে ভাসতে ভাটি বাংলায়? বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

আপডেট টাইম : ০৬:২৪:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০১৫
অবস্থানের ১৩০তম দিনে কিভাবে যে কাকতালীয়ভাবে ভাসতে ভাসতে ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র ইটনায় গিয়ে পড়েছিলাম- সে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ব্রিটিশ ভারতে ধ্যান-জ্ঞান-সাধনার প্রাণকেন্দ্র ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ। ভাইসরয়ের পিভি কাউন্সিলের সাত সদস্যের পাঁচজনই একসময় ছিলেন ময়মনসিংহের। জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ জর্জ বিশ্বাস, কমিউনিস্ট নেতা মণি সিং, তৈলক্ষ নাথ মহারাজ, নগেন সরকার, আনন্দমোহন বোস, গুরু দয়াল সরকার কেউ কিশোরগঞ্জের, কেউ নেত্রকোনার, টাঙ্গাইল, শেরপুর, জামালপুর, কারো বাড়ি ময়মনসিংহ সদর। স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম পুরোধা, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের যশোধর। জয় সিদ্ধির স্যার আনন্দ মোহন বোস, ধলপুরের গুরু দয়াল সরকার, ঠিক তেমনি ইটনার একসময়ের প্রজাহিতৈষী জমিদার মহেষ গুপ্তের ছেলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ভূপেশ গুপ্ত। আরো কতজন যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন ভাবা যায় না। মসনদওয়ালা ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি, ১১ সিন্ধুর বীরত্বগাথা আজো অনেকের স্মৃতিতে অম্লান। চামটাঘাট থেকে রওনার সময় ভেবেছিলাম, রাস্তায় কোথাও জুমার নামাজ আদায় করব। গত ৩-৪ বছর ২-১ বার ওয়াক্তের নামাজ ছুট গেলেও জুমার নামাজ বাদ পড়েনি। চলতে চলতে বেলা পৌনে ১টায় ট্রলারচালককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আর কত সময় লাগবে?’ ছেলেটি বলেছিল, ‘১৫ মিনিট।’ কিন্তু ইটনা পৌঁছতে ৪০ মিনিট লেগে যায়। তাই মনটা বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছুটে গিয়ে এক রাকাত ফরজ নামাজ ইমামের পেছনে আদায় করি, আরেক রাকাত একাই পড়েছি। নামাজে দাঁড়াবার আগে যে বেদনাবোধ করছিলাম, নামাজ পেয়ে তা অনেকটাই কেটে যায়। দু’টা বেজে গিয়েছিল তাই বেশ ক্ষুধা অনুভব করছিলাম। করিমগঞ্জের বহু পুরনো কর্মী আদম আলী ট্রলারে খাবার দিয়ে দিয়েছিল। প্রথম উঠেছিলাম মুক্তিযোদ্ধা ছাত্রাবাসে। একেবারে পরিত্যক্ত অপরিষ্কার। তবু সেখানেই খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ভারতের রাজ্যসভার আজীবন সদস্য ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের বাড়ি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কিছু দিন আগে ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের আত্মীয়স্বজন এক বিয়েতে অংশ নিতে কলকাতা গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় দুই দেশের যুদ্ধ বাধে। তারপর তাদের আর ইটনায় ফেরা হয়নি। হালের গরু, বাড়ির উঠোনে শত শত মণ ধান অনেক দিন পড়ে থাকে। সেই বাড়িটি ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম, ‘মাগনা পেলে কেউ কেউ জুতোর কালি খেতেও দ্বিধা করে না।’ বিনা পরিশ্রমে কোনো কিছু পেলে আমরা যে তা রেখে খেতে পারি না- ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের এই বাড়ি তারই প্রমাণ। ৬০-৬৫ বছর ধরে বাড়িটি সরকারের হেফাজতে। রক্ষণাবেক্ষণ করলে সেটি এখনো ঝকঝকে তকতকে থাকত। ৪০ ইঞ্চি মোটা সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ত না, ৩০ ইঞ্চির ভবনের দেয়ালগুলো খসে যেত না। সোনারগাঁ পানাম নগরীর যে দশা দেখেছি, এখানেও সেই একই অবস্থা।
শ্রী ভূপেশ চন্দ্র গুপ্ত ভারত উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক পথিকৃৎ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বিলেতে লেখাপড়া করতেন। দু’জনের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক ছিল। এখন মুক্তিযুদ্ধের কত ইতিহাস রচিত হয়, ডিপি. ধর, পি.এন. হাক্সার ছিলেন সরকারি কর্মচারী। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দূত হিসেবে সারা দুনিয়া চষে বেড়িয়েছিলেন ভারতের দ্বিতীয় গান্ধী সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ। কত নাম নিয়ে আলোচনা হয় কিন্তু ভূপেশ চন্দ্র গুপ্তের নাম আসে না, আসে না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শান্তিময় রায়ের নাম।
ইটনার ভূপেশ চন্দ্র গুপ্ত এবং সরিষাবাড়ীর শান্তিময় রায়কে স্বাধীনতার পরপরই চিনতাম। ’৭২-এর জানুয়ারিতে শান্তিময় রায় টাঙ্গাইলে আমার কাছে এসেছিলেন তার গ্রামের বাড়ি সরিষাবাড়ী যেতে। তাকে লোকজন দিয়ে গাড়ি করে তার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম। এরপর শান্তিময় রায় যখন যেভাবে পেরেছেন আমাকে সহায়তা করেছেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হলে আমার যখন কোনো ঠিকানা ছিল না, মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, তখন তিনি তার যাদবপুরের বাড়িতে আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি ভূপেশ গুপ্তও একজন মহান মানুষ। ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতনের পর আমার যখন চরম দুর্দিন, চার দিকে নিদারুণ অন্ধকার, অথৈ পানিতে যেন ভাসছিলাম, কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন নেতাজী সুভাষ বোসের ছায়াসঙ্গী ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা সমর গুহ এমপি এবং ইটনার জমিদারপুত্র এই ভূপেশ গুপ্ত লোকসভা ও রাজ্যসভায় একের পর এক প্রশ্নবাণে মোরারজি দেশাইয়ের জনতা পার্টির সরকারকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামীদের যাতে জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেয়া না হয় তার জন্য লোকসভা এবং রাজ্যসভায় একের পর এক প্রস্তাব তুলেছিলেন। আমার বর্ধমানের বাড়িতে একদিন ভূপেশ দা ছুটে এসেছিলেন। তাই তার ইটনার জরাজীর্ণ বাড়ির দক্ষিণে তাঁবু ফেলে রাত কাটানো এবং সেখানে বসে দু’কথা লিখতে গিয়ে সত্যিই পরোপকারী ভূপেশ দার কথা বার বার মনে পড়ছে। এই অঞ্চলে স্কুল-কলেজ-খেলার মাঠ যেখানে যা প্রয়োজন তার পূর্ব পুরুষরা করেছেন। ইটনার তার পৈতৃক বাড়ি সরকারি হেফাজতে থাকত, তাতে কোনো দোষ ছিল না। কিন্তু যদি যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হতো, উপজেলা তহসিল অফিস বানিয়ে ধ্বংস করা না হতো- সেটা হতো সম্মানের। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের একসময়ের নির্বাচনী এলাকা ইটনা। এমপি হিসেবে কিছু করতে পারেননি সেটা মেনে নেয়া গেলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিছুই করতে পারবেন না সেটা কিন্তু মেনে নেয়া যাবে না। অপেক্ষায় রইলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকা রাখা প্রাতঃস্মরণীয় এই মানুষটির পৈতৃক নিবাস আরো কিছুকাল সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি মহাকালের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইটনা আসার আগে ছিলাম করিমগঞ্জের বৌলাই। সে এক মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনা। আজ থেকে ১৫ বছর আগে ১৪ জুলাই করিমগঞ্জে এক জনসভার আহ্বান করা হয়েছিল। নতুন দল সবার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা। অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ভাটি বাংলার এক অবিসংবাদিত নেতা, মিঠামইনের অ্যাডভোকেট ফরিদ, কিশোরগঞ্জের হান্নান মোল্লা, ফারুক আহমেদ, অ্যাডভোকেট আজিজ আরো কতজন নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের গামছা ধরেছিল। কিশোরগঞ্জের শহীদী মসজিদে নামাজ পড়ে অ্যাডভোকেট আজিজের বাড়িতে খাবার খেয়ে করিমগঞ্জের পথে রওনা হয়েছিলাম। তখনকার দাপুটে নেতা করিমগঞ্জের হর্তাকর্তা বিধাতা অধ্যাপক মিজানুর রহমানের লোকজন বৌলাতে আমাদের বাধা দেয়। তারা স্লোগান তোলে, ‘করিমগঞ্জের মাটি, মিজান স্যারের ঘাঁটি।’ শুধু মিজান স্যারই করিমগঞ্জে থাকবেন, আর কেউ নয়। আসর, মাগরিব, এশার নামাজ আদায় করে সেখান থেকে ফিরেছিলাম। করিমগঞ্জের ওসি, ইউএনও, কিশোরগঞ্জের এডিসি আরো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা তামাশা দেখতে গিয়েছিল। রাস্তায় বাধা দেয়ার জন্য থানায় ডায়েরি করলেও তার কোনো প্রতিকার হয়নি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, থানার ডায়েরিতে কাজ না হলেও আল্লাহর ডায়েরিতে কাজ হয়েছে। করিমগঞ্জ এখন আর মিজান স্যারের ঘাঁটি নেই, মিজান স্যারও নেই। দয়াময় আল্লাহ সেদিন যেমন দয়া করেছিলেন, আজো একইরকম করছেন।
এবার শবেবরাতের জন্য ১, ২, ৩ তারিখ একনাগাড়ে ভাটগাঁওয়ে জিয়াউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে ঈদগাহ মাঠে ছিলাম। গাছপালা না থাকায় রোদে পুড়লেও বাতাস ছিল নির্মল। তিনটা দিন তিনটা রাত এলাকার মানুষ বড় আপন করে নিয়েছিল। তাঁবুর পাশের আরমান ক্লাস ফাইভের ছোট্ট একটি ছেলে হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। তা ছাড়া সাবেক সৈনিক নুরুদ্দীন, তার ভাই এবং বিএনপি সমর্থক স্কুলের নৈশপ্রহরী এলাকার সম্মানী ব্যক্তি আব্দুস সাত্তারকে খুবই ভালো লেগেছে। চলে আসার সময় নুরুদ্দীনের মায়ের সাথে দেখা। সে এক অভাবনীয় ব্যাপার। শবেবরাতের আগে কটিয়াদী মধ্যপাড়া স্কুলের পাশে শ্মশানঘাটে ছিলাম আর ভাটগাঁওয়ে ছিলাম কবরস্থানের পাশে। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর আমরা প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে না তুললে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের হাতে আওয়ামী লীগের মুসলমান নেতাদের জায়গা হতো কবরে, হিন্দুদের শ্মশানে। কী করা যাবে, মুক্তিযুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যেমন প্রতারণা করা হয়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ সংগ্রামীদের সাথে একইরকম করা হয়েছে। যাদের জন্য বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন, তারা আজ জননেত্রীর কল্যাণে ক্ষমতায় আর যারা হত্যার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করেছে তারা শত্রু। সবই আল্লাহর ইচ্ছা, সবই আল্লাহর কুদরত। তিনি ফকিরকে বাদশা, বাদশাকে ফকির করেন।
বছরটা মনে নেই, বৌলাই অবরোধের পর করিমগঞ্জ গিয়েছিলাম। কলেজ মাঠে মিটিং ছিল। সোহেল নামে ছোট এক শিশু আকুল হয়ে ক্াঁদছিল। ‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করতেই সে বলেছিল, ভৈরব রেলস্টেশনে মোবাইল কোর্ট তার বাবাকে ধরে জেলে পাঠিয়েছে। তখনই গাজীপুরের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকীকে বলেছিলাম, জেলে গিয়ে জরিমানা দিয়ে সোহেলের বাবাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে। রেল বিভাগের কাগজ জেলগেটে ছিল না। তাই সে রাতে সে বেরুতে পারেনি। কমলাপুর স্টেশনের লোকজন খুব সাহায্য করেছিল। পরদিন সকালে তারা স্পেশাল ম্যাসেঞ্জার দিয়ে কাগজপত্র গাজীপুর পাঠিয়েছিল। যে কারণে সে সকালেই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছিল। এখন সোহেল বাপের সাথে চায়ের দোকান করে। অপূর্ব সুন্দর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এক যুবক। কিন্তু সেদিন তার দু’চোখের পানিতে বুক ভাসছিল। অনেক বছর পর বাপ-বেটাকে একসাথে দেখে কী যে ভালো লাগল লিখে বুঝাতে পারব না। লিখলে অনেকেই কেমন ভাববেন জানি না, কিন্তু তবু ব্যাপারটি সত্য। ’৭১-এর ১৮ ডিসেম্বর পল্টনে সভা করতে যাওয়ার পথে যখন তাদের বাড়ি গিয়েছিলাম, তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও বাবার জন্য আকুল হয়ে কেঁদেছিলেন। কখন কে কাঁদে আর কে হাসে সবই সময়ের ব্যাপার। বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের বাড়ি যখন যেতাম ভাবী খালেদা জিয়াও কত যতœ করতেন। তিনিও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এখন তো তারাই দেশের নেতা। কত কিছু দেখলাম, আল্লাহ কত কিছু দেখালেন। ভাটি বাংলার প্রাণকেন্দ্র ইটনায় ভূপেশ গুপ্তের বাড়ির আঙ্গিনায় তাঁবুতে বসে লিখতে গিয়ে কত কথা মনে পড়ছে। বিকেলে একটি অনির্ধারিত মতবিনিময় সভায় তিল ধরার জায়গা ছিল না। এর আগে যতবার এসেছি, ফজলুর রহমানের সাথে এসেছি। এবারই প্রথম আল্লাহর ভরসায় তাকে ছাড়া অল্প বয়সী কিছু কর্মীর সাথে এসেছি। শুনতে এসেছিলাম, জানতে এসেছিলাম হাওরে-বাঁওড়ে যে শত শত গামছায় উড়ত তারা কি সবাই ফজলুর রহমানের সাথে চলে গেছে, নাকি মানুষের গামছায় এখনো মানুষ আছে। বড় খুশি হয়েছি, ফজলুর রহমান গামছা ছেড়ে গেলেও ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামের মানুষ তাদের গামছা ছাড়েনি। ব্যাপারটা দেখে হৃদয় মন আনন্দে নেচে উঠেছে।
গতকালকের দিনটা আমাদের খুব একটা ভালো যায়নি। ইটনার নেতা আবুল খায়ের ভালো ট্রলারচালক দিতে পারেনি, একেবারেই রাস্তা চেনে না। পাঁচ মাসের কর্মসূচিতে গতকালই আমাদের খুব বেশি এলোমেলো হয়েছে। ঘাগরা বাজারে কিছু সময় থেমেছিলাম। সেখান থেকে ঘুরতে ঘুরতেই প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা চলে যায়। আব্দুল্লাহপুর বাজারে পথপ্রদর্শক বাচ্চু মিয়াকে না পেলে কী যে বিশ্রী অবস্থা হতো ভাবাই যায় না। আব্দুল্লাহপুর, আদমপুর পুরে পুরে মিল থাকলেও দূরত্ব অনেক। আমাদের রিফাতুল ইসলাম দীপ সব গুলিয়ে ফেলতে গিয়েছিল। তবু ভাগ্যিস, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় অষ্টগ্রাম নদীর ঘাটে তাঁবু ফেলতে পেরেছিলাম। বাঙ্গালপাড়ার নবাবকে প্রথম যেবার ছোট্ট শিশুটি পেয়েছিলাম, এখন তার দুটি শিশু থাকলেও আগের মতোই অচল অটল আছে। এর আগে প্রতিবার অষ্টগ্রামে এলে ফজলুর রহমান, মনসুরুল কাদের সাথে থাকত। এবার কিশোরগঞ্জের সভাপতি আমিনুল ইসলাম তারেক ও অন্যান্য কর্মীরা রয়েছে। আল্লাহকে ভরসা করে এসেছি। অষ্টগ্রামেও দেখলাম মনসুরুল কাদের এবং ফজলুর রহমান এদিক ওদিক গেলেও যারা সত্যিকার গামছায় ছিলেন তারা তেমনি আছেন। ত্রুটি তাদের নয়, যোগাযোগ না রাখার ত্রুটি আমাদের। সাড়া পেয়ে মনটা ভরে গেছে।
প্রতিবেশী মহান ভারতের মহান নেতা শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি রক্তের দামে কেনা আমাদের বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আমরা দু’হাত প্রসারিত করে তাকে বুকে জড়িয়ে নিতে চাই। তিনি সমগ্র বাংলার প্রসারিত উষ্ণ বুকে জায়গা খুঁজছেন, নাকি কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর উত্তাপ বুকে লালন করবেন- সেটা তার ওপরই নির্ভর করে। তবে আমার বিশ্বাস, বাবার সাথে চায়ের দোকানে হাত লাগাতে লাগাতে যিনি এত দূর এসেছেন, তার দৃষ্টি ঝাপসা হবে না। তিনি বাংলা এবং বাঙালির হৃদয় জয় করতে তার এই সফরকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন- এটাই আমাদের কায়মনে প্রার্থনা।