,

ইউটিউব-ফেসবুকে দর্শক বাড়াতে গাড়ির রেস

হাওর বার্তা ডেস্কঃ মহাসড়কগুলোতে চলছে রীতিমতো মরণখেলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক-ইউটিউবে ভিউয়ার্স (দর্শক) বাড়াতে চলেছে গতির প্রতিযোগিতা। এটা যেন পরিণত হয়েছে এক ধরনের নেশায়। মোটরসাইকেল-প্রাইভেট কার ছাড়াও দূরপাল্লার বাসের চালক-হেলপারদের প্রতিযোগিতায় নামানো হচ্ছে। রেসের ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়ে এক শ্রেণির তরুণ-যুবক আর্থিকভাবে লাভবান হলেও চরম ঝুঁকিতে যাত্রীরা। দিনের বেলায় মহাসড়কে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ স্পিডগান ব্যবহার করলেও রাতে তা থাকে না। আর এই সুযোগে রাতে চালকরা যানবহনের গতি বাড়াচ্ছে যে যার মতো করে। এতে কেবল যাত্রী, চালক-হেলপারদেরই প্রাণ যাচ্ছে না। নিহত হচ্ছেন মাহসড়কে দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরাও। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

মহাসড়কে ওভারস্পিডে গাড়ি চালানোর জন্য ইতোমধ্যে যেসব বাসের চালক নাম-ডাক খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে ঢাকা-খাগড়াছড়ি রুটে জসিম ওরফে বাউলি জসিম সালাহউদ্দিন ওরফে সালু উল্লেখযোগ্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ইকবাল, ফারুক, হান্নান এবং বরিশাল রুটে হায়দার আলী বেশ জনপ্রিয়। এসব চালকসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে রেসের বাজি ধরেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপের সদস্যরা। তারা গাড়ি চালানোর এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের গা শিউরে উঠছে। ইউটিউব ও ফেসবুক চ্যানেলে ‘বাসের রেস’, ‘সেরা বাউলি’, ‘বাউলি মাস্টার’ ইত্যাদি নামে বহু ভিডিও রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান এবং বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ইদানীং বিপুলসংখ্যক গাড়ি ওভারস্পিডে চলছে। দিনে গতি ৮০ কিলোমিটারের বেশি হলেই ধরা পড়ছে স্পিডগানে। ধরা পড়া গাড়িগুলোকে জরিমানা করছি। সতর্ক করছি। কিন্তু রাতে স্পিডগান ব্যবহার করতে পারি না। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে গাড়ি থামাতে গেলে পুলিশ সদস্যদের ওপরও গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি দায়িত্ব পালনকালে পৃৃথক ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য ওভারস্পিডের বলি হয়েছেন।

তিনি বলেন, আমাদের জনবল খুব কম। কিন্তু রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অনেক। কখন কোন গাড়ি প্রতিযোগিতা করবে তা আমাদের আগে থেকে জানা থাকে না। যখন আমরা যে ঘটনাটি আমরা জানতে পারি, তখন সেই ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সম্প্রতি দেখতে পারছি, রেস প্রতিযোগিতার ভিডিও ফেসবুক-ইউটিউবে দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওগুলো আমরা পর্যালোচনা করছি। যারা এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে এবং ভিডিও ধারণ করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার (এসপি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অনেক সময় দেখা যাচ্ছে ওভার স্পিডের কারণে অনেক গাড়ি খালে পড়ে যাচ্ছে। নিজে নিজেই ধাক্কা খাচ্ছে সড়কের পাশের গাছের সঙ্গে। কখনো কখনো দেখা যায়, বাসের অসচেতন যাত্রীরাও চালককে উত্তেজিত করে। তখন চালক অন্য গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এ বিষয়ে প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে। তিনি আরও বলেন, গত এক বছরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তিনজন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন অতিরিক্ত গতির গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে।

সূত্র জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লর চৌদ্দগ্রামে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। মধ্য রাতেই ওই দুর্ঘটনার কিছু ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যে বাসটি দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে সেই বাস এবং তার পেছনে থাকা অপর একটি বাস থেকে চালককে উসকানি দিয়ে রেসের ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা থেকে বান্দরবানে ঘুরতে যান কিছু তরুণ। যারা ‘বাস লাভার’ নামে পরিচিত। তাদের ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ ‘বিডি বাস জোন’ ওই ট্যুরের আয়োজন করে। ৪৫ সদস্যের ওই গ্রুপটি হানিফ এন্টারপ্রাইজ থেকে ট্যুরের জন্য একটি বাস ভাড়া নেয়। ট্যুর শেষে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে ওই বাসটি নিয়ে তারা ঢাকায় ফিরছিল। শুরু থেকেই বেশ বেপরোয়া ছিল সদস্যরা। তারা বাসের ইঞ্জিনকাভারে (বনেট) বসে চালককে দ্রুতগতিতে যাওয়ার জন্য উসকানি দিতে থাকে। রাত ৩টার দিকে বাসটি যখন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় আসে তখন তারা ইমাদ পরিবহণের একটি বাস দেখতে পায়। ওই বাসটিও ছিল ট্যুরের। ইমাদ পরিবহণ অফিশিয়াল ফেসবুক গ্রুপের সদস্যরা কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরছিল। ওইদিন একসঙ্গে বিভিন্ন গ্রুপের ছয়টি বাস ঢাকায় ফিরছিল। এর পরই হানিফ আর ইমাদ পরিবহণ কে কার আগে যাবে-তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। একপর্যায়ে হানিফ পরিবহণে থাকা ট্যুরের সদস্যদের কথামতো ওই বাসের চালক সজল ইমাদ পরিবহণের চালককে হাত দিয়ে ইশারা দেন বাসটি থামানোর জন্য। তখন ইমাদের সামনে থাকা ট্যুরের সদস্যদের কথায় বাসের চালক হানিফের পাশে বাসটি থামান। তখন তাদের ‘ফেয়ার খেলা’র আহ্বান জানানো হয়। এতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন ইমাদ পরিবহণে থাকা সদস্যরা। তারা চালককে দ্রুত বাস চালাতে বলেন এবং আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলতে থাকে দুটি গাড়ি। পড়ে দুর্ঘটনার মুখে পড়ে হানিফ পরিবহণের বাসটি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর