,

image-466238-1631914556

জেলা-উপজেলায় দ্বন্দ্ব তৃণমূলের বিরোধ মেটাতে মাঠে আওয়ামী লীগ

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কোথাও কোথাও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সংসদ সদস্যের (এমপি) বিরোধ, কোথাও জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। আবার কোথাও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় নেতা ও এমপিরা বিরোধে জড়াচ্ছেন। জেলা-উপজেলায় পদ, টেন্ডার ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তারসহ নানা বিষয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ৮ মাসে ৫৮টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে আটজন নিহত এবং আট শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ে একদিকে যেমন দল জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে অন্যদিকে অভিমানে দূরে সরে যাচ্ছেন দলের ত্যাগী, পরিশ্রমী ও পরীক্ষিত নেতারা। দুর্বল হচ্ছে দলের সাংগঠনিক অবস্থা। এসব দ্বন্দ্ব মেটাতে হিমশিম অবস্থা কেন্দ্রীয় নেতাদের। তবে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যেকোনো মূল্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে চায় আওয়ামী লীগ। দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের পর এ কাজে বেশি মনোযোগী দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। ইতোমধ্যে বিরোধপূর্ণ জেলার নেতাদের নিয়ে ডেকে বিরোধ মীমাংসার দিক- নির্দেশনাও দেওয়া শুরু হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি হলে প্রয়োজনে ওই সব জেলা-উপজেলায় দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসার পরিকল্পনাও রয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় সভাপতির নির্দেশে সব অভ্যন্তরীণ সমস্যা মিটিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ ও আরও শক্তিশালী করতে তারা মাঠে নেমেছেন। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, আমরা এখন দল গোছানোর কাজকে আরও বেগবান এবং সাংগঠনিকভাবে দলকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে মনোযোগী হয়েছি। যেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি আছে সেগুলোর সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যেখানে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব আছে সেখানে তা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আট সাংগঠনিক বিভাগের জন্য আমাদের আটটি সাংগঠনিক টিম আছে। তারা বিষয়গুলো দেখছে। আমরা আশা করছি- খুব শিগগিরই বিষয়গুলো সমাধান করে ফেলতে পারব।

জানা গেছে, তৃণমূলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। দ্বন্দ্বে জর্জরিত প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলা। কোথায় জেলার-সভাপতি সাধারণ সম্পাদক বিরোধ, কোথায় বিরোধ এমপির সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের। রাজনৈতিক পদ-পদবি ছাড়াও স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় টেন্ডার, দখল, বালুমহল নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে দ্বন্দ্ব-বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগে ৫৮টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আটজন নিহত এবং ৮০২ জন আহত হয়েছেন।

২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে অধ্যক্ষ খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিমকে সভাপতি এবং একরামুল করিম চৌধুরী এমপিকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। এরপর ওই বছরই ৭৫ সদস্যের প্রস্তাবিত কমিটি অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এখনো পর্যন্ত সেই কমিটি অনুমোদন হয়নি। এরইমধ্যে এ কমিটি নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে বিস্তর অভিযোগ জমা পড়ে। এদিকে বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা এবং এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। কাদের মির্জা ও একারমুল চৌধুরীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে জেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এরইমধ্যে এ জেলায় অভ্যন্তরীণ বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। হতাহতের ঘটনাও ঘটে।

অপরদিকে, নাটোরের রাজনীতিতে অস্থিরতা অনেকদিন ধরে। সভাপতি আবদুল কুদ্দস ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুলের দ্বন্দ্ব চরমে। সম্প্রতি এ জেলার সভাপতি একটি লাইভ অনুষ্ঠানে কান্না করে সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন জেলার বাকি সংসদ সদস্য ও নেতারাও। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায়ও আলোচনা হয়। এ জেলায় দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতেও অভ্যন্তরণীর বিরোধ রয়েছে। এ জেলার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।

দলীয় সূত্র ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- নোয়াখালী, পাবনা, নাটোরের মতো-কক্সবাজার, বরিশাল, যশোর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, নরসিংদী, রংপুর, বগুড়া, চট্টগ্রাম মহানগর, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা উত্তর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাটসহ বেশ কিছু এলাকায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে। এসব এলাকায় বেশ কয়েক বছর ধরে একাধিক গ্রুপ বিভাজিত হয়ে দলীয় রাজনীতি চলছে। এসবের সূত্র ধরে বরিশাল, নোয়াখালী ও নাটোরসহ দেশের বেশকিছু জেলায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। আওয়ামী লীগের বিগত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সাংগঠনিক সম্পাদকদের প্রতিবেদনে অন্তত ২৫টি জেলায় অভ্যন্তরীণ তীব্র বিরোধের কথা উঠে আসে। ওই সভায় দলীয় সংসদ সদস্যদের ‘বাড়াবাড়ি’ ও ‘খবরদারি’ না করার নির্দেশনা দেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের পর দল গোছানো কাজে গতি ফিরেছে। দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাও তাদের কাজ শুরু করেছেন। বিরোধপূর্ণ জেলার নেতাদের ডেকে তারা সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দিচ্ছেন। করছেন বর্ধিত সভা। নির্দেশনা না মানলে তাদের বিষয়ে দলের হাইকমান্ডের কাছে পরবর্তী করণীয় প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হবে। এর আগে নিজেদের মধ্যেকার বিরোধ মেটাতে না পারায় সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ভারপ্রাপ্তকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সামনের দিনেও এমন আরও কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে।

খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক  বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। ২২ সেপ্টেম্বরের পর এ বিভাগের মেয়াদোত্তীর্ণ চার জেলায় বর্ধিত সভা করা হবে। এরপর আমরা বাকি উপজেলা-থানা-পৌর সম্মেলন করব। অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে সম্মেলনগুলো করে ফেলব। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা কাজ করছি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন  বলেন, রাজশাহী বিভাগে ৮৩টি উপজেলা ও থানার মধ্যে ৩০টির মতো সম্মেলন হয়েছে। এখনো ৫৩টি উপজেলা ও থানার সম্মেলন বাকি। এছাড়া এ বিভাগের চারটি জেলার সম্মেলন বাকি আছে। কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তে- পাবনা ও নাটোরের সম্মেলন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া চলতি মাসেই বেশ কয়েকটি উপজেলার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক  বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। ১৯ তারিখ গাইবান্ধা এবং ২০ তারিখ রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা করা হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমরা করে ফেলব। নির্বাচনের আগে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন, নিজেদের মধ্যেকার ভুল বোঝাবুঝিগুলো অবসানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নেত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিরোধপূর্ণ জেলা-উপজেলার নেতাদের নিয়ে আমরা (বিভাগীয় টিম) বসব এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব। পরবর্তী সময় হাইকমান্ডের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।

আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল  বলেন, কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিংয়ে সব বিভাগের সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরাও আমাদের সাংগঠনিক প্রতিবেদন তুলে ধরেছি। তিনি বলেন, বৈঠকের পর পরিকল্পনা অনুযায়ী সাংগঠনিক কাজ শুরু করেছি। আমরা প্রতি মাসেই বসি। এ মাসেও আমরা শেরপুর জেলা ও ময়মনসিংহ মহানগর নেতাদের ডেকেছি। ২৪ তারিখ ময়মনসিংহ মহানগরের বর্ধিত সভা করব।

 

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর