পীর হাবিবুর রহমান
স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ হাঁটা ছাত্রলীগের মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রথম সম্মেলনে ভাঙনের মধ্য দিয়ে মেধাবী সাহসী তারুণ্যের বিপ্লবের স্লোগান নিয়ে যে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল তার নাম জাসদ। বাহাত্তরের জুলাইয়ে ছাত্রলীগের ভাঙনে এই শক্তি সারা দেশের ছাত্র সমাজের মধ্যে বারুদের মতো জ্বলে উঠেছিল। তারুণ্যনির্ভর সেই শক্তি অক্টোবরে জাসদ গঠনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য প্রথম বিদ্রোহের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান তুলে দেশের তরুণ সমাজকে কাছে টেনে রোমান্টিক হঠকারী উগ্রমূর্তির রূপ নিয়ে যেমন আবির্ভূত হয়েছিল, তেমনি মুজিব সরকারকে উত্খাত করতে গিয়ে কঠিন দমননীতির পথে পতিত হয়েছিল। একদিকে সরকারের দমননীতি, অন্যদিকে জাসদের হঠকারী রাজনীতির পথে হাজার হাজার তরুণ আত্মাহুতি দিয়েছে। এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের নিউক্লিয়াস এবং মুজিব বাহিনীর পতাকাবাহী এই শক্তির দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ হবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পরিচালনা করবে বিপ্লবী সরকার। সেই স্বপ্ন পূরণ দূরে থাক যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বুকে সেদিন জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের বুকে ভাঙনই ধরেনি, সংঘাত ও বিপ্লবের তুফান উঠেছিল। এই দল গঠনে নেপথ্য শক্তি ছিলেন মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান, ষাটের দশকের ছাত্রলীগের রাজনীতির সবচেয়ে মেধাবী সংগঠক, রাজনীতির রহস্য পুরুষ খ্যাত সিরাজুল আলম খান। অগণিত ভক্ত আর তার ভাবদর্শনে বিশ্বাসী কর্মী তৈরি হলেও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ ছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ বা জাসদের সাংগঠনিক কমিটিতে সদস্য পদও কখনো নেননি। বাহাত্তরের অক্টোবরের কাউন্সিলে প্রতিষ্ঠিত জাসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) এমএ জলিল। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক ডাকসু ভিপি ও স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা আ স ম আবদুর রব। সহসভাপতি পদে একটি ঘর খালি রাখা হয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল (অবঃ) তাহের বীর উত্তমের জন্য। ৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে জাসদ প্রার্থীদেরকে নির্বিঘ্নে ভোট করার লেভেল প্লেইং ফিল্ড না দেওয়া যেমন ছিল সরকারের ভুল নীতি, কঠোর হস্তে দমনের পথগ্রহণ ছিল ক্ষমতার উন্নাসিকতা, তেমনি জাসদকে আন্ডারগ্রাউন্ড নিয়ে সশস্ত্র গণবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে সরকার উত্খাতের উগ্র হঠকারী রোমান্টিক রাস্তাটি ছিল অন্ধকার। যা কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনেনি। সরকারের দমননীতি ও জাসদ নেতৃত্বের ভ্রান্তনীতি রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সংঘাতময় অশান্ত করেছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই জাসদের শীর্ষ নেতৃত্বসহ অনেকেই কারাগারে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যুত্থানের পথে খালেদ মোশাররফের হাতে বন্দি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে জাসদের সৈনিক সংস্থাকে বিপ্লবের সম্মুখে ঠেলে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন গণবাহিনীর চিফ অব কমান্ড কর্নেল তাহের। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝোলান, নেতাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে জেল খাটান। ক্ষমতার অংশীদারিত্বের বদলে জাসদের কপালে জোটে শাসকের দমন নির্যাতন। ৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে সংগঠন গোছানোর কাজে হাত দেয় জাসদ। ৭৩ সালের ডাকসুর গণরায় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ছিনতাই করে নিলেও এবার ডাকসুসহ শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জয়ের ধারায় ভাগ বসায় জাসদ। কিন্তু নিয়তি, তত্ত্ব আর নেতৃত্বের ভ্রান্ত নীতির ধারায় ভাঙন আসে জাসদে। জাসদ ভেঙে তৈরি হয় বাসদ।
আজকের মূলধারার জাসদের মশাল নিয়ে পথ হাঁটা সভাপতি হাসানুল হক ইনু সেদিনও জাসদের বড় নেতা ছিলেন না। পরবর্তীতে জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এমএ জলিল ধর্মের লেবাস নিয়ে ইসলামপন্থি রাজনীতির ধারায় চলে যান। চরম আদর্শিক বিচ্যুতি ঘটে তার। পাকিস্তানি সেনাশাসক আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানকেই নন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভয় পেয়ে কথা বলেননি জাসদ সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রব। সেই তিনি আলাদা হয়ে সেনাশাসক এরশাদের সঙ্গে হাত মেলান। কার্ল মার্কসের ভাষায় সংসদকে শুয়োরের খোঁয়াড় বললেও প্রধান রাজনৈতিক শক্তির বর্জনের মুখে একতরফা নির্বাচনে গঠিত ৮৮ সালের সংসদে গৃহপালিত বিরোধীদলের নেতার আসনে বসেন। ৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে শাজাহান সিরাজ জাসদের একাংশ নিয়ে ভোটযুদ্ধে চলে গেলে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে জাসদকে নিয়ে রাজপথে অবিচল থাকেন হাসানুল হক ইনু, অগ্রজ কাজী আরিফ আহমেদদের নিয়ে।
জাসদের রাজনীতিতে হঠকারিতা, উগ্রতা ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। সেই ব্যর্থতার দায় জাসদের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের কাঁধেই যায়। কিন্তু ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব নিয়ে উঠে আসা হাসানুল হক ইনুই মূলধারার জাসদ রাজনীতির মশালপ্রজ্বলিত করে রাখেন। সামরিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী বৃহত্তর গণমুখী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে পায়ে পায়ে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের পথে হাঁটেন।
ইসলামি ধারার রাজনীতিতে গিয়ে জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মেজর (অবঃ) এমএ জলিল বহু আগেই ইন্তেকাল করেছেন। তার দলও বিলুপ্ত। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রব ঐক্য জাসদের সভাপতি হয়ে এলেও আলাদা হয়ে পরবর্তীতে অতিশয় দুর্বলই হননি, নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছেন গোলটেবিল সংবাদ সম্মেলন আর বিবৃতিতে। মাঠে ময়দানে তার জাসদ নেই বললেই চলে। বহুধা বিভক্ত বাসদে কারো অস্তিত্ব নেই, কেউবা তোপখানা রোডে সীমিত। আজকের শরীফ নুরুল আম্বিয়া আ স ম রবের সঙ্গে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ইনুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মূলধারার জাসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে লাইমলাইটে আসেন। মইনউদ্দিন খান বাদল পড়াশোনা জানা এবং চেহারা ও বাগ্মিতায় নজর কাড়তে জানেন। ছিলেন বাসদে। ইনুর মূল ধারায় ফিরে না আসলে হারিয়ে যেতেন। জাসদের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী রাকসুর সাবেক পত্রিকা সম্পাদক এবিএম জাকিরুল হক টিটনের ভাষায় ‘১০টি জেলার নেতাদের নাম তিনি বলতে পারবেন না।’ তার নির্বাচনি এলাকায় ব্যক্তি বা সাংগঠনিক ভিত্তিও ছিল না। ইনুর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নৌকায় চড়ে দুই দুইবার সংসদে আসার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছেন। জাসদ থেকে যারা নৌকায় চড়ে সংসদে এসেছেন তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু মূলধারার জাসদ যাই থাকুক তা সংগঠিত রেখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল গঠনে হাসানুল হক ইনুর ভূমিকায় যে তাদের সুযোগ করে দিয়েছে সেটি দেশবাসীও জানেন। জাসদের বিগত কাউন্সিলে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের জাসদ ছাত্রলীগের সভানেত্রী শিরিন আখতার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। সেবার গোপন ব্যালটে কাউন্সিলরদের ভোটে শরীফ নুরুল আম্বিয়া নির্বাচিত হন। জাসদের রাজনীতিতে হাসানুল হক ইনুর বিকল্প সভাপতি প্রার্থী যে নেই সেটি চলমান বিদ্রোহীরাও জানেন। শুভাকাঙ্ক্ষীদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে আর্থিক সাহায্য নিয়ে হাসানুল হক ইনু সংগঠনটি ধরে রেখেছেন। এবারের কাউন্সিলের আগে সারা দেশ ঘুরে ঘুমন্ত জাসদ কর্মীদের জাগিয়ে দলটিকে সুসংগঠিত করে অনেকটাই শক্তিশালী করে এনেছিলেন। কাউন্সিলরদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। পরিবেশ ছিল উত্সবমুখর। শেষ মুহূর্তে কাউন্সিল অধিবেশন চলাকালে শিরিন আখতার সাধারণ সম্পাদক হয়ে যাচ্ছেন দেখে শরীফ নুরুল আম্বিয়া, মইনউদ্দিন খান বাদল, সাবেক ডাকসু জিএস ডা. মোস্তাক হোসেন ও ৯০ এর ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাজমুল হক প্রধানসহ হাতেগোনা কয়েকজন ওয়াকআউট করে পাল্টা কমিটি ঘোষণা করেন। সারা দেশের জেলা নেতৃত্ব বা কাউন্সিলরদের সম্মতি ছাড়া এভাবে কমিটি ঘোষণা গঠনতন্ত্র ও নীতি পরিপন্থিই নয়, এটি আত্মস্বীকৃত নেতার অভিলাষ মাত্র। নেতৃত্বে আসার যোগ্যতা তাদের রয়েছে, কিন্তু মূলধারায় যুক্ত থেকেই দলের ঐক্য বজায় রেখে কাউন্সিলরদের সম্মতিতে নেতৃত্বে অভিষিক্ত হওয়া গৌরবের। সেই পথই গণতন্ত্রের পথ। সেই পথে না গিয়ে ৪/৫ জন ওয়াকআউট করে কমিটি ঘোষণা কর্মীদেরই হতাশ করেনি, গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা লালনেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে প্রগতিশীল ছোট দলগুলোর শক্তিশালী রূপ যারা চান তাদেরকেও ব্যথিত করেছে। নাজমুল হক প্রধানও দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তিনি যেমন ভেসে আসেননি, তেমনি নির্বাচিত শিরিন আখতারও নয়। দুজনেরই অতীত গৌরবের। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যেভাবে একজন আগে একজন পরে এসেছেন তেমনি জাসদ নেতৃত্বেও আসতে পারেন। নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা দায়িত্বহীন কথাবার্তায় বিভক্তির ঘা না বাড়িয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মূল দলে যুক্ত থেকে দলের বৃহত্তর স্বার্থে ভূমিকা রাখা যেমন সময়ের দাবি তেমনি তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য কল্যাণকর। বাস্তবতা হচ্ছে এটি জাসদের প্রতিষ্ঠা লগ্নের সিনিয়র নেতারা যেখানে সংগঠনের মূল ধারা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে দ্বিতীয় সারি থেকে উঠে এসে মূল ধারার জাসদের নেতৃত্ব দিয়ে মশাল প্রজ্বলিত রেখেছেন হাসানুল হক ইনু। সৌজন্যে: ইত্তেফাক
Reporter Name 

























