হাওর বার্তা ডেস্কঃ রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কিশামত ছাওলা গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন। এবার ২ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছিলেন। কিন্তু পাঁচ দফা বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় তার ধান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন তিনি। তবে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিকল্প উপায় খুঁজে নেন আমজাদ হোসেন। নতুন করে দুই বিঘা জমিতেই আলু চাষ করছেন। বাজারে এবার আলুর দাম ভালো থাকায় তিনি আলু চাষে ঝুঁকেছেন। আশা করছেন আলু বিক্রি করে বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ধান আবাদ করি বানের পানিত ধরা খাইছি। এবার আলুর দাম ভালো ছিল। তাই প্রথম বার আলু আবাদ করছি। আশা করছি তা থেকে লাভও হবে।’
শুধু আমজাদ হোসেন নন, তার মতো অনেক কৃষক বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ও অধিক লাভের আশায় নতুন করে সবজি চাষে মাঠে নেমেছেন। আলুসহ বিভিন্ন রবিশস্যের চাষ শুরু করেছেন।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্র জানায়, পাঁচ দফা বন্যা হলেও উপজেলা কৃষি বিভাগ তিন দফা বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে। এতে বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত হয় প্রায় ২ হাজার হেক্টর রোপা আমন ও ১২৫ হেক্টর অন্যান্য ফসল। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমির রোপা আমন ও ৭২ হেক্টর জমির রবিশস্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এতে স্থানীয় কৃষি বিভাগ প্রায় ১০ হাজার কৃষকের ২০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে। উপজেলা কৃষি বিভাগ কৃষকদের ২০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করলেও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ ছিল আরো বেশি।
তবে কৃষি বিভাগ বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রবিশস্যের দিকে জোর দিয়েছে। এ জন্য ৫ হাজার ৭ শ ১০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে সরিষা, মশুর, খেসারি, মুগ ডাল, সূর্যমুখী, গম, টমেটো, মরিচের বীজ ও সার।
এ বছর উপজেলায় ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলুসহ রবিশস্য আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় এক হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বেশি আলু চাষ করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যে আশায় কৃষকরা আলু চাষে ঝুঁকছে তা পূরণ নাও হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে চাহিদার অতিরিক্ত আলু উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করা হলেও কৃষকরা শুনছেন না। তারা বাজারে দাম ভালো থাকায় আলু চাষে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন।
গতকাল বুধবার উপজেলার ছাওলা ও তাম্বুলপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরের কৃষকরা সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পাড় করছে। অনেককে জমি তৈরিসহ সার প্রয়োগ ও আলু রোপণ করতে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ রোপণ করা আলু ক্ষেতের পরিচর্যা করছে।
কৃষকরা জানান, বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা আলু চাষের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। তবে এ বছর আলুর বীজের দাম বেশি। ফলে উৎপাদনে খরচও বেশি হবে।
শিবদেব চরের কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘চরে সব ধরনের আবাদ করা সম্ভব হয় না। তবে চরের জমিতে আলু বেশি চাষ হয়। তাই সকলে আলু চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কৃষকদের স্বপ্ন আলু চাষের মাধ্যমে বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।’
তাম্বুলপুর ইউনিয়নের রহমতের চরের কৃষক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম বেশি। তাই যারা কখনও আলু চাষ করেনি তারও এবার আলু চাষ করছে। এতো আলু উৎপাদন হলে তো দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। এর আগে ভালো দাম পেয়ে পরের মৌসুমে বেশি আলু চাষ করে পথে বসেছেন অনেক কৃষক।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামিমুর রহমান বলেন, ‘চরের মাটি আলু চাষের জন্য উপযোগী। আলুর ফলনও ভালো হয়। এবার বাজারে আলুর দাম ভালো থাকায় চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। তবে বেশি দাম পাওয়ার আশায় অধিক আলু চাষ করা ঠিক হবে না।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সারোয়ারুল হক বলেন, ‘এ বছর আলুর দাম ভালো হলেও কতদিন স্থির থাকবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। তাই চাহিদার অতিরিক্ত আলু উৎপাদনের প্রয়োজন নেই। আমরা কৃষি অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের অতিরিক্ত আলু চাষে নিরুৎসাহিত করছি। তাদের ভুট্টাসহ বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।’
Reporter Name 

























