ঢাকা ০১:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বনজ সম্পদ রক্ষা : ইসলাম কী বলে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৭:৩৯:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ অক্টোবর ২০১৯
  • ৩৭৫ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ  মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে বিশ্বজুড়ে আজ বন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠছে। বিশেষত বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত জলবায়ুর ক্রম পরিবর্তনের কারণে বিশ্বনেতারা ও বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। চলছে নানা গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ। হচ্ছে নানা সভা, বৈঠক ও সম্মেলন। গৃহীত হচ্ছে অনেক সিদ্ধান্ত, প্রটোকল ও চুক্তি। বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ব সমাজ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হবে বাংলাদেশ ও এর জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক এসব উদ্যোগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করছে।
গাছপালা ও বনজঙ্গল আমাদের জীবনে আল্লাহর বড় দান। আল্লাহ তায়ালা এগুলো দান করে আমাদের জীবনকে ধন্য করেছেন। গাছপালা, বনজঙ্গল, তরুলতা ও উদ্ভিদ মানুষের জীবনের বড় অনুষঙ্গ। মানুষের জীবন এগুলো ছাড়া কল্পনা করা যায় না। ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, অফিস-আদালত, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সব কিছুতে গাছের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। রান্নাবান্না ও জ্বালানির অন্যতম উৎস এ গাছ। যে কোনো প্রাণী অক্সিজেন ছাড়া বাঁচে না। আর এ অক্সিজেনের সম্পূর্ণটাই আসে গাছপালা থেকে। গাছ ছাড়া মানুষের জীবন তাই অর্থহীন। মানুষের পরম বন্ধু এ গাছ সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) আমাদের বৃক্ষরোপণ ও এর যতœ নিতে বলেছেন।
নবী (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমান যদি কোনো একটি গাছ অথবা ফসল ফলায় আর সেখান থেকে যদি কোনো প্রাণী কিংবা মানুষ ফল কিংবা ফসল খায় অল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকটি ফলের বিনিময়ে সদকার সমান ছওয়াব দান করবেন।’ (তিরমিজি)। আল্লাহ তায়ালা সুন্দর কথাবার্তাকে সুন্দর গাছের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘তুমি কি লক্ষ কর না, আল্লাহ তায়ালা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেনÑ পবিত্র বাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মতো। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত।’ (সূরা ইবরাহিম : ২৪)। নবী (সা.) কেয়ামত সংঘটিত হওয়া অবস্থায়ও বৃক্ষরোপণের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি তোমাদের কারও ওপর কেয়ামত সংঘটিত হয় আর তার হাতে যদি একটি চারাগাছ রোপণ করার সময় থাকে সে যেন তা লাগিয়ে নেয়।’ (মসনদে আহমাদ)। অর্থাৎ একজন মুসলমান তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ মুহূর্তেও যদি সুযোগ পায়, সে একটি গাছ লাগাতে পারবে তাহলে এ সুযোগটি সে হাতছাড়া করবে না।
হাদিসের এই অমিয় শিক্ষার বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে আমাদের মাতৃভূমিতে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৮৬২ সালে গঠিত প্রাচীনতম সরকারি বিভাগগুলোর একটি বাংলাদেশ বন বিভাগ মান্ধাতা আমলের সাংগঠনিক কাঠামো আর সক্ষমতা দিয়ে মাত্র দশ হাজার জনবল দিয়ে প্রায় ৪৪ লাখ একর রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চল এবং চরাঞ্চলে সৃজিত ৩ লাখ একর বনাঞ্চল রক্ষা করার প্রাণন্তকর হাস্যকর চেষ্টা করেই যাচ্ছে। এছাড়া আছে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার সড়ক, সংযোগ সড়ক, রেলপথ, বেড়িবাঁধের বন বাগান পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণ। বাংলাদেশের কমপক্ষে এক দশমাংশ ভূমির ব্যবস্থাপনার বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে আর শুধু সমালোচিতই হয়েছে। কিন্তু সমস্যা নির্ণয়ে ও সমাধানে কোনো সরকারই এগিয়ে আসেনি। কোনো উদ্যোগও নেয়নি। এভাবে দোষ আর বোঝা চাপিয়ে নির্বিকার চলতে থাকলে যেমনি রাষ্ট্রীয় বনভূমি ক্রমাগত ভূমিদস্যুদের ও ভূমিহীনদের (রাজনৈতিক আচ্ছাদনে) দখলে চলে যাবে, তেমনি বন তথা প্রকৃতির আচ্ছাদন উজাড় হয়ে মাটির গুণগত মান ও উর্বরা শক্তি হারাবে। ছড়া, খাল, জলপ্রবাহ শুকিয়ে গিয়ে সাংবাৎসরিক জলপ্রবাহ কমে যাবে। বৃষ্টিপাতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। অল্প বৃষ্টিতেই বন্যা হবে। কৃষিভূমিতে প্রয়োজনের সময় পানি সরবরাহ থাকবে না। পানির স্তর নেমে যাবে, খাল, ছড়াগুলো উপচে কৃষিভূমিতে বালু পড়বে, সমুদ্রের লোনা পানি অভ্যন্তরীণ নদী, খাল, বিলে ঢুকে পড়ে সামগ্রিকভাবে কৃষিভূমি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে।
অথচ ইসলাম পরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মিশরের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা সাইয়েদ তানতাবী তার এক বইতে লিখেছেন, আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনের মধ্যে পাঁচশতবার পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতিকে বলেছেন, এই পৃথিবী তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা একে আবাদ কর। তিনি বলেন, ‘তিনিই জমিন থেকে তোমাদের পয়দা করেছেন এবং তন্মধ্যে তোমাদের বসতি দান করেছেন।’ (সূরা হুদ : ৬১)।
পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবী আবাদ হতে পারে; মানুষের বসবাসের উপযোগী হতে পারে। আর পরিবেশ যখন সংরক্ষণ করা হবে না তখন এই দুনিয়া বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
আল্লাহ তায়ালা পাহাড়-পর্বতকে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে পাহাড়-পর্বতের কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পাহাড়-পর্বত সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘আর পাহাড়কে আমি পেরেক হিসেবে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আন নাবা : ৭)। তিনি আরও বলেন, ‘এবং তিনি (আল্লাহ) পাহাড়গুলোতে তোমাদের জন্য আত্মগোপনের জায়গা করেছেন।’ (সূরা আন-নাহল : ৮১)।
এ দেশের স্বার্থে, আগামী প্রজন্মের স্বার্থে এই পাহাড় এবং বনকে টিকিয়ে রাখতে হবে ও সমৃদ্ধ করতে হবে। বন বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। বাস্তবতার আলোকে মতবিনিময় বা বৈঠক করে, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই করে অবিলম্বে এ ব্যাপারে সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। সংশ্লিষ্ট মহলের অবহেলা, উদাসীনতা ও নির্লিপ্ততার পরিণাম জাতির জন্য ভয়াবহ হতে পারে বলে সবাই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
পাহাড়-পর্বত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। জমিনকে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচানোর জন্যই এই পাহাড়ের সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা গোটা দুনিয়াকে হেফাজতের জন্য যেখানে যতটুকু পাহাড় তৈরি করা দরকার সেখানে ততটুকু তৈরি করেছেন। বর্তমানে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা পাহাড় কাটাকে পরিবেশের জন্য হুমকি মনে করছেন। সব দেশেই পাহাড়-পর্বত কাটা নিষিদ্ধ। আমাদের দেশে আইন অমান্য করে অবাধে পাহাড় কাটার কারণে পাহাড় ধসে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। দিন দিন পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়-পর্বতকে নষ্ট করে আমরা আমাদের ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করছি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইলে আমাদের এখনই পাহাড়-পর্বত কাটা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে তাই নষ্ট না করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
ইসলামের দৃষ্টিতে বন উজাড় করা অন্যায়। বন উজাড় করা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করার সমান। আল্লাহ বলেন, ‘জমিনে ফ্যাসাদ তৈরি করতে যেও না। আল্লাহ তায়ালা ফ্যাসাদকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আল-ক্বাসাস : ৭৭)। এই ফ্যাসাদ সৃষ্টির একটি ব্যাখ্যা হলো অপ্রয়োজনে গাছপালা কাটা, বন উজাড় করা, জমিনের পরিবেশ নষ্ট করা।
আল্লাহ পাক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পাখপাখালি, পশু, হিংস্র জন্তু, বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছু সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়। যেই এলাকার জন্য যতটুকু বিষাক্ত জন্তু সৃষ্টি করা প্রয়োজন আল্লাহ ততটুকুই সৃষ্টি করেছেন। এরা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ধ্বংস করে। এ জন্য নবী (সা.) বিষাক্ত সাপকেও বিনা কারণে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।
অতএব আমরা যদি পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা মানতে পারি তাহলে আমাদেরই কল্যাণ হবে। অন্যথায় আমরা নিজেরাই আমাদের মরণ ডেকে আনব। আমাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে পতিত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ জাতির স্বার্থে, আগামী প্রজন্মের স্বার্থে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও পরিবর্তিত বিশ্বের আলোকে আধুনিক ও সক্ষম একটি বন বিভাগ গঠন করা অতি জরুরি। শুধু মিটিং করে বেড়ালে এর সমাধান হবে না। পাশপাশি ব্যাপক প্রচারণা ও মোটিভেশনাল কাজ করতে হবে। আসুন আমরা যে যেভাবে যতটুকু পারি জাতীয় বন সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অংশগ্রহণ করি ও সামান্য হলেও ভূমিকা রাখি। বেসরকারি বন সৃজন করি। বনজসম্পদের অপচয় বন্ধ করি। ওয়ান টাইম বোতলের ব্যবহার, কাগজের ব্যবহার কমাই। ইন্টারনেটে পত্রপত্রিকা পড়ি, লিখি। বিলাস ও ভোগের মাত্রা কমাই। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশকে কম বিরক্ত করে প্রকৃতির মতো করে থাকতে দিই। নতুবা প্রকৃতির প্রতিশোধ বড়ই ভয়ংকর।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বনজ সম্পদ রক্ষা : ইসলাম কী বলে

আপডেট টাইম : ০৭:৩৯:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ অক্টোবর ২০১৯

হাওর বার্তা ডেস্কঃ  মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে বিশ্বজুড়ে আজ বন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠছে। বিশেষত বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত জলবায়ুর ক্রম পরিবর্তনের কারণে বিশ্বনেতারা ও বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। চলছে নানা গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ। হচ্ছে নানা সভা, বৈঠক ও সম্মেলন। গৃহীত হচ্ছে অনেক সিদ্ধান্ত, প্রটোকল ও চুক্তি। বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ব সমাজ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হবে বাংলাদেশ ও এর জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক এসব উদ্যোগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করছে।
গাছপালা ও বনজঙ্গল আমাদের জীবনে আল্লাহর বড় দান। আল্লাহ তায়ালা এগুলো দান করে আমাদের জীবনকে ধন্য করেছেন। গাছপালা, বনজঙ্গল, তরুলতা ও উদ্ভিদ মানুষের জীবনের বড় অনুষঙ্গ। মানুষের জীবন এগুলো ছাড়া কল্পনা করা যায় না। ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, অফিস-আদালত, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সব কিছুতে গাছের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। রান্নাবান্না ও জ্বালানির অন্যতম উৎস এ গাছ। যে কোনো প্রাণী অক্সিজেন ছাড়া বাঁচে না। আর এ অক্সিজেনের সম্পূর্ণটাই আসে গাছপালা থেকে। গাছ ছাড়া মানুষের জীবন তাই অর্থহীন। মানুষের পরম বন্ধু এ গাছ সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) আমাদের বৃক্ষরোপণ ও এর যতœ নিতে বলেছেন।
নবী (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমান যদি কোনো একটি গাছ অথবা ফসল ফলায় আর সেখান থেকে যদি কোনো প্রাণী কিংবা মানুষ ফল কিংবা ফসল খায় অল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকটি ফলের বিনিময়ে সদকার সমান ছওয়াব দান করবেন।’ (তিরমিজি)। আল্লাহ তায়ালা সুন্দর কথাবার্তাকে সুন্দর গাছের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘তুমি কি লক্ষ কর না, আল্লাহ তায়ালা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেনÑ পবিত্র বাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মতো। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত।’ (সূরা ইবরাহিম : ২৪)। নবী (সা.) কেয়ামত সংঘটিত হওয়া অবস্থায়ও বৃক্ষরোপণের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি তোমাদের কারও ওপর কেয়ামত সংঘটিত হয় আর তার হাতে যদি একটি চারাগাছ রোপণ করার সময় থাকে সে যেন তা লাগিয়ে নেয়।’ (মসনদে আহমাদ)। অর্থাৎ একজন মুসলমান তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ মুহূর্তেও যদি সুযোগ পায়, সে একটি গাছ লাগাতে পারবে তাহলে এ সুযোগটি সে হাতছাড়া করবে না।
হাদিসের এই অমিয় শিক্ষার বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হচ্ছে আমাদের মাতৃভূমিতে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৮৬২ সালে গঠিত প্রাচীনতম সরকারি বিভাগগুলোর একটি বাংলাদেশ বন বিভাগ মান্ধাতা আমলের সাংগঠনিক কাঠামো আর সক্ষমতা দিয়ে মাত্র দশ হাজার জনবল দিয়ে প্রায় ৪৪ লাখ একর রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চল এবং চরাঞ্চলে সৃজিত ৩ লাখ একর বনাঞ্চল রক্ষা করার প্রাণন্তকর হাস্যকর চেষ্টা করেই যাচ্ছে। এছাড়া আছে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার সড়ক, সংযোগ সড়ক, রেলপথ, বেড়িবাঁধের বন বাগান পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণ। বাংলাদেশের কমপক্ষে এক দশমাংশ ভূমির ব্যবস্থাপনার বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে আর শুধু সমালোচিতই হয়েছে। কিন্তু সমস্যা নির্ণয়ে ও সমাধানে কোনো সরকারই এগিয়ে আসেনি। কোনো উদ্যোগও নেয়নি। এভাবে দোষ আর বোঝা চাপিয়ে নির্বিকার চলতে থাকলে যেমনি রাষ্ট্রীয় বনভূমি ক্রমাগত ভূমিদস্যুদের ও ভূমিহীনদের (রাজনৈতিক আচ্ছাদনে) দখলে চলে যাবে, তেমনি বন তথা প্রকৃতির আচ্ছাদন উজাড় হয়ে মাটির গুণগত মান ও উর্বরা শক্তি হারাবে। ছড়া, খাল, জলপ্রবাহ শুকিয়ে গিয়ে সাংবাৎসরিক জলপ্রবাহ কমে যাবে। বৃষ্টিপাতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। অল্প বৃষ্টিতেই বন্যা হবে। কৃষিভূমিতে প্রয়োজনের সময় পানি সরবরাহ থাকবে না। পানির স্তর নেমে যাবে, খাল, ছড়াগুলো উপচে কৃষিভূমিতে বালু পড়বে, সমুদ্রের লোনা পানি অভ্যন্তরীণ নদী, খাল, বিলে ঢুকে পড়ে সামগ্রিকভাবে কৃষিভূমি চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে।
অথচ ইসলাম পরিবেশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মিশরের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা সাইয়েদ তানতাবী তার এক বইতে লিখেছেন, আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনের মধ্যে পাঁচশতবার পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতিকে বলেছেন, এই পৃথিবী তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা একে আবাদ কর। তিনি বলেন, ‘তিনিই জমিন থেকে তোমাদের পয়দা করেছেন এবং তন্মধ্যে তোমাদের বসতি দান করেছেন।’ (সূরা হুদ : ৬১)।
পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবী আবাদ হতে পারে; মানুষের বসবাসের উপযোগী হতে পারে। আর পরিবেশ যখন সংরক্ষণ করা হবে না তখন এই দুনিয়া বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
আল্লাহ তায়ালা পাহাড়-পর্বতকে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে পাহাড়-পর্বতের কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পাহাড়-পর্বত সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘আর পাহাড়কে আমি পেরেক হিসেবে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আন নাবা : ৭)। তিনি আরও বলেন, ‘এবং তিনি (আল্লাহ) পাহাড়গুলোতে তোমাদের জন্য আত্মগোপনের জায়গা করেছেন।’ (সূরা আন-নাহল : ৮১)।
এ দেশের স্বার্থে, আগামী প্রজন্মের স্বার্থে এই পাহাড় এবং বনকে টিকিয়ে রাখতে হবে ও সমৃদ্ধ করতে হবে। বন বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। বাস্তবতার আলোকে মতবিনিময় বা বৈঠক করে, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই করে অবিলম্বে এ ব্যাপারে সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। সংশ্লিষ্ট মহলের অবহেলা, উদাসীনতা ও নির্লিপ্ততার পরিণাম জাতির জন্য ভয়াবহ হতে পারে বলে সবাই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
পাহাড়-পর্বত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। জমিনকে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচানোর জন্যই এই পাহাড়ের সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা গোটা দুনিয়াকে হেফাজতের জন্য যেখানে যতটুকু পাহাড় তৈরি করা দরকার সেখানে ততটুকু তৈরি করেছেন। বর্তমানে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা পাহাড় কাটাকে পরিবেশের জন্য হুমকি মনে করছেন। সব দেশেই পাহাড়-পর্বত কাটা নিষিদ্ধ। আমাদের দেশে আইন অমান্য করে অবাধে পাহাড় কাটার কারণে পাহাড় ধসে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। দিন দিন পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়-পর্বতকে নষ্ট করে আমরা আমাদের ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করছি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইলে আমাদের এখনই পাহাড়-পর্বত কাটা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে তাই নষ্ট না করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
ইসলামের দৃষ্টিতে বন উজাড় করা অন্যায়। বন উজাড় করা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করার সমান। আল্লাহ বলেন, ‘জমিনে ফ্যাসাদ তৈরি করতে যেও না। আল্লাহ তায়ালা ফ্যাসাদকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আল-ক্বাসাস : ৭৭)। এই ফ্যাসাদ সৃষ্টির একটি ব্যাখ্যা হলো অপ্রয়োজনে গাছপালা কাটা, বন উজাড় করা, জমিনের পরিবেশ নষ্ট করা।
আল্লাহ পাক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পাখপাখালি, পশু, হিংস্র জন্তু, বিষাক্ত সাপ ও বিচ্ছু সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হয়। যেই এলাকার জন্য যতটুকু বিষাক্ত জন্তু সৃষ্টি করা প্রয়োজন আল্লাহ ততটুকুই সৃষ্টি করেছেন। এরা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ধ্বংস করে। এ জন্য নবী (সা.) বিষাক্ত সাপকেও বিনা কারণে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।
অতএব আমরা যদি পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা মানতে পারি তাহলে আমাদেরই কল্যাণ হবে। অন্যথায় আমরা নিজেরাই আমাদের মরণ ডেকে আনব। আমাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মধ্যে পতিত হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ জাতির স্বার্থে, আগামী প্রজন্মের স্বার্থে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও পরিবর্তিত বিশ্বের আলোকে আধুনিক ও সক্ষম একটি বন বিভাগ গঠন করা অতি জরুরি। শুধু মিটিং করে বেড়ালে এর সমাধান হবে না। পাশপাশি ব্যাপক প্রচারণা ও মোটিভেশনাল কাজ করতে হবে। আসুন আমরা যে যেভাবে যতটুকু পারি জাতীয় বন সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অংশগ্রহণ করি ও সামান্য হলেও ভূমিকা রাখি। বেসরকারি বন সৃজন করি। বনজসম্পদের অপচয় বন্ধ করি। ওয়ান টাইম বোতলের ব্যবহার, কাগজের ব্যবহার কমাই। ইন্টারনেটে পত্রপত্রিকা পড়ি, লিখি। বিলাস ও ভোগের মাত্রা কমাই। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশকে কম বিরক্ত করে প্রকৃতির মতো করে থাকতে দিই। নতুবা প্রকৃতির প্রতিশোধ বড়ই ভয়ংকর।