ঢাকা ০৫:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধদিনের পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী জেনে সংসার ভাঙে বিভা রানীর

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:৫৮:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭
  • ৪৮২ বার
হাওর বার্তা ডেস্কঃ বিয়ের পর যুদ্ধদিনের পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী জানার পর বীরঙ্গনা বিভা রানীকে নিয়ে সংসার করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে একমাত্র প্রতিবন্ধী পুত্র সন্তানসহ বিভা রানীকে ত্যাগ করে ভারতে পারি জমায় বিভার স্বামী অনুকুল মজুমদার।

সেই থেকে প্রতিবন্ধী পুত্র সাগরকে নিয়ে অথৈ সাগরে ভাসা বিভা রানী সেলাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সংসারের চাকা সচল রাখতে মাঝে মধ্যে তাকে ধাত্রীর কাজ করতে হয়। জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী সন্তান সাগরকে নিয়ে বিভা রানীর আরেক সংগ্রাম। আজও স্বীকৃতি মেলেনি এ বীরঙ্গনার।

বরিশালের আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদী সংলগ্ন গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দরের বাসিন্দা মৃত উমেশ চন্দ্রের আড়াই কাঠা জমিতে টিনের ঘর। এ টিনের ঘরেই একমাত্র ভাই উপেন্দ্র নাথ মন্ডলকে নিয়ে বিভা রানী সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসতেই বিভা রানী অনেকটা আনমনা হয়ে যান। বলেন, আমার বাবা টরকীরচরে বহুদিন ধরে বসবাস করেছেন। সে ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। এখানে আমরা চার বোন ও এক ভাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি টরকী হাইস্কুলে অস্টম শ্রেণীর ছাত্রী। জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে পাকিস্তানী মিলিটারীদের নিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকাররা। চারিদিকে আগুন দিতে শুরু করে। লোকজন যে যেদিক পারে ছোটাছুঁটি করছিলো। আমার বাবা তখন পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

এমন সময় সবাই বাবাকে স্থান ত্যাগ করতে বললে বাবা আমাদের নিয়ে পাশ্ববর্তী কালকিনির রমজানপুরের দিকে ছুটলেন। কিন্তু তখন আমরা দ্বিগবিদ্বিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরেছিলাম। আমিসহ বেশ কিছু (সঙ্গত কারনেই নাম উল্লেখ করা হলোনা) আখক্ষেতের মাঠে রাজাকারদের হাতে ধরা পরে যাই। সেদিন ওদের হাত থেকে আমরা কেউ রেহাই পাইনি। পাশবিক নির্যাতনে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরবর্তীতে আমাকে বাবা খুঁজে ঘরে নিয়ে আসে। টরকী বন্দরে এসে আমরা দেখতে পাই বন্দরটি পাকিস্তানী আর্মিরা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে।

বিভা রানী আরও বলেন, শ্রাবন মাসে একই গ্রামের অনুকুল মজুমদারের সাথে আমার বিয়ে দেন। পরবর্তীতে আমরা দুটি পরিবারের ১০জন সদস্য টরকী থেকে নৌকাযোগে আটদিন পর ভারতে গিয়ে পৌঁছি। দেশ স্বাধীনের পর সবাই আবার দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে আমার স্বামী যুদ্ধচলাকালীন সময়ে আমার ওপর পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী জানতে পেরে আমাকে নিয়ে সংসার করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। এরইমধ্যে আমাদের সংসারে সাগর জন্ম নেয়ার পর সে (অনুকুল মজুমদার) আমাকে ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে কোন রকম বেঁচে আছি।

ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভা রানী বলেন, যুদ্ধের সময়ে সম্ভ্রম হারানোর কারণে আমার সংসার জীবন ভেঙ্গে গেছে। আজও সরকারীভাবে আমি কোন সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। এমনকি আমার নামও তালিকাভুক্ত করা হয়নি। অথচ আমার জীবনের করুন কাহিনী স্থানীয় সকল মুক্তিযোদ্ধারা জানেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধদিনের পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী জেনে সংসার ভাঙে বিভা রানীর

আপডেট টাইম : ০৩:৫৮:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭
হাওর বার্তা ডেস্কঃ বিয়ের পর যুদ্ধদিনের পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী জানার পর বীরঙ্গনা বিভা রানীকে নিয়ে সংসার করতে রাজি হয়নি তার স্বামী। ফলে একমাত্র প্রতিবন্ধী পুত্র সন্তানসহ বিভা রানীকে ত্যাগ করে ভারতে পারি জমায় বিভার স্বামী অনুকুল মজুমদার।

সেই থেকে প্রতিবন্ধী পুত্র সাগরকে নিয়ে অথৈ সাগরে ভাসা বিভা রানী সেলাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সংসারের চাকা সচল রাখতে মাঝে মধ্যে তাকে ধাত্রীর কাজ করতে হয়। জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী সন্তান সাগরকে নিয়ে বিভা রানীর আরেক সংগ্রাম। আজও স্বীকৃতি মেলেনি এ বীরঙ্গনার।

বরিশালের আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা পালরদী নদী সংলগ্ন গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দরের বাসিন্দা মৃত উমেশ চন্দ্রের আড়াই কাঠা জমিতে টিনের ঘর। এ টিনের ঘরেই একমাত্র ভাই উপেন্দ্র নাথ মন্ডলকে নিয়ে বিভা রানী সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসতেই বিভা রানী অনেকটা আনমনা হয়ে যান। বলেন, আমার বাবা টরকীরচরে বহুদিন ধরে বসবাস করেছেন। সে ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। এখানে আমরা চার বোন ও এক ভাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি টরকী হাইস্কুলে অস্টম শ্রেণীর ছাত্রী। জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে পাকিস্তানী মিলিটারীদের নিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকাররা। চারিদিকে আগুন দিতে শুরু করে। লোকজন যে যেদিক পারে ছোটাছুঁটি করছিলো। আমার বাবা তখন পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

এমন সময় সবাই বাবাকে স্থান ত্যাগ করতে বললে বাবা আমাদের নিয়ে পাশ্ববর্তী কালকিনির রমজানপুরের দিকে ছুটলেন। কিন্তু তখন আমরা দ্বিগবিদ্বিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরেছিলাম। আমিসহ বেশ কিছু (সঙ্গত কারনেই নাম উল্লেখ করা হলোনা) আখক্ষেতের মাঠে রাজাকারদের হাতে ধরা পরে যাই। সেদিন ওদের হাত থেকে আমরা কেউ রেহাই পাইনি। পাশবিক নির্যাতনে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরবর্তীতে আমাকে বাবা খুঁজে ঘরে নিয়ে আসে। টরকী বন্দরে এসে আমরা দেখতে পাই বন্দরটি পাকিস্তানী আর্মিরা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে।

বিভা রানী আরও বলেন, শ্রাবন মাসে একই গ্রামের অনুকুল মজুমদারের সাথে আমার বিয়ে দেন। পরবর্তীতে আমরা দুটি পরিবারের ১০জন সদস্য টরকী থেকে নৌকাযোগে আটদিন পর ভারতে গিয়ে পৌঁছি। দেশ স্বাধীনের পর সবাই আবার দেশে ফিরে আসি। দেশে ফিরে আমার স্বামী যুদ্ধচলাকালীন সময়ে আমার ওপর পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী জানতে পেরে আমাকে নিয়ে সংসার করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। এরইমধ্যে আমাদের সংসারে সাগর জন্ম নেয়ার পর সে (অনুকুল মজুমদার) আমাকে ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে কোন রকম বেঁচে আছি।

ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভা রানী বলেন, যুদ্ধের সময়ে সম্ভ্রম হারানোর কারণে আমার সংসার জীবন ভেঙ্গে গেছে। আজও সরকারীভাবে আমি কোন সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। এমনকি আমার নামও তালিকাভুক্ত করা হয়নি। অথচ আমার জীবনের করুন কাহিনী স্থানীয় সকল মুক্তিযোদ্ধারা জানেন।