হাওর বার্তা ডেস্কঃ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়েছেন ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু, ভ্যাটিকান সিটির রাষ্ট্রপ্রধান পোপ ফ্রান্সিস। গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর দরবার হলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে দেয়া বক্তব্যে তিনি এ আহবান জানান। স্প্যানিশ ভাষায় তার দেয়া বক্তব্যের ইংরেজি অনুলিপি অনুষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়।
পোপ ফ্রান্সিস বলেন, এটা ছোট কোনো বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের সামনেই এটি ঘটেছে। পুরো পরিস্থিতি, মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা আমাদের ভাই-বোন, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু, তাদের ঝুঁকির গুরুত্ব বুঝতে আমরা কেউই ব্যর্থ হইনি। তিনি আরো বলেন, কঠিন এই সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তবে শুধু রাজনৈতিক বিষয় সমাধানই নয়, বাংলাদেশে দ্রুত মানবিক সহায়তাও দিতে হবে। এরপর বঙ্গভবনে তার সম্মানে রাষ্ট্রপতির নৈশভোজে অংশ নেন সারাবিশ্বের ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। এর আগে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বিকেল তিনটায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। সেখানে তাকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। এসময় বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। স্মৃতিসৌধ থেকে রওনা হয়ে বিকেল পাঁচটার দিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘরে পৌঁছান ভ্যাটিকান সিটির রাষ্ট্রপ্রধান। এসময় তিনি যাদুঘরের বিভিন্ন প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন এবং সেখানে রাখা পরিদর্শন বইয়ে সই করেন। আজ (১ ডিসেম্বর) সকাল ১০টায় তিনি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খ্রিস্টধর্মীয় উপাসনা এবং যাজক অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। দুপুর সোয়া ২টায় তিনি ভ্যাটিকান দূতাবাসে যাবেন। সেখানেই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। দূতাবাস থেকে ফিরে বিকেল চারটায় রমনার প্রবীণ যাজক ভবনে বাংলাদেশের বিশপদের বিশেষ সভায় বক্তব্য দেবেন পোপ। বিকেল পাঁচটায় আর্চবিশপ হাউসের মাঠে শান্তির জন্য আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃমা-লিক সমাবেশেও বক্তব্য দেবেন তিনি। ২ ডিসেম্বর পোপ ফ্রান্সিস তেজগাঁও মাদার তেরেসা ভবন, তেজগাঁও কবরস্থান, পুরাতন গির্জা পরিদর্শন এবং সবশেষে নটর ডেম কলেজে যুব সমাবেশে বক্তব্য দেবেন। তিনদিনের সফর শেষে ২ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটায় রোমের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন পোপ ফ্রান্সিস।
পোপ ফ্রান্সিসের সফরে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে : ১৯৮৬ সালে পোপ জন পলের (দুই) সফরের ৩ দশক পর একজন পোপ হিসেবে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন ফ্রান্সিস। ভ্যাটিক্যান সিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে এসেছেন তিনি। বাংলাদেশের আর্চ বিশপ কার্ডিনাল ডি রোজারিও জানিয়েছেন, সফরে বিপন্ন রোহিঙ্গা ও জলবায়ু উদ্বাস্তুসহ দরিদ্র মানুষদের ভাগ্যোন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেবেন পোপ। সফরে ধর্মীয় সম্প্রীতি আর সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অধিকারের সুরক্ষার প্রশ্ন তুলতে পারেন তিনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পোপের সফরে বিভিন্ন বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা থাকলেও গুরুত্বের কেন্দ্রে থাকবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যহত মানুষেরা। সমন্বয়বাদী কূটনৈতিক কৌশলে মিয়ানমার সফর শেষে গতকাল (৩০ নভেম্বর) বিকাল ৩টায় তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান পোপ ফ্রান্সিস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ক্যাথলিক বিশপের আমন্ত্রণে ঢাকা সফরে এসেছেন তিনি। মার্কিন ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের জাতীয় সাপ্তাহিক ‘আমেরিকা’য় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে প্রতিবেদক জানিয়েছেন, পোপ বাংলাদেশে থাকা সমস্ত গরীব মানুষের প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের আর্চ বিশপ কার্ডিনাল ডি রোজারিওকে উদ্ধৃত করে আমেরিকা ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, বিপন্ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শরণার্থী, গার্মেন্টস শ্রমিক আর জলবায়ু উদ্বাস্তুতে রূপান্তরিত মানুষের হয়ে কথা বলবেন তিনি। একইভাবে এশিয়ার ক্যাথলিক মুখপত্র ইউসিএ-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন, আধুনিক দাসত্ব, সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়সহ ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিপন্নতা পোপের সফরে প্রাধান্য পাবে। কার্ডিনাল রোজারিওকে উদ্ধৃত করে আমেরিকা ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, গরীবদের প্রতিনিধি হয়ে আসছেন পোপ ফ্রান্সিস। আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নে যে মানুষেরা জীবনসংগ্রাম করছেন পোপের এই সফর তাদের জন্য। রোজারিও আরও বলেছেন, গার্মেন্টস শ্রমিক, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিপন্ন মানুষ আর মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ’র জন্য আশার বার্তা নিয়ে আসছেন ফ্রান্সিস। আমেরিকা ম্যাগাজিনের খবর অনুযায়ী, মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত রানা প্লাজার আহত শ্রমিক আর নিহতের স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন পোপ। বাংলাদেশ একটি নিম্নাঞ্চলীয় ভূমি। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া শীর্ষ ছয়টি দেশের মধ্যে রয়েছে দেশটি। বাংলাদেশের আর্চ বিশপ রোজারিও’র বরাত দিয়ে আমেরিকা ম্যাগাজিন জানিয়েছে, কেবল রোহিঙ্গাদের নয়, সফরে পরিবেশগত কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া বিপন্ন মানুষদের নিয়েও কথা বলবেন পোপ। ‘আমি নিশ্চিত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নেওয়া বাংলাদেশের পদক্ষেপকে পোপ স্বাগত জানাবেন। দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন রোজারিও। বার্তা সংস্থা এপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোপের সফরে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও গুরুত্বের কেন্দ্রে থাকবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ক্যাথলিক চার্চের অর্থায়নে বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা দেয় কারিতাস নামের একটি সহায়তা সংগঠন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ৪০,০০০ মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে সংগঠনটি। সংগঠনটির আশা, পোপের সফরের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের মনে আশার সঞ্চার হবে। তিনি আসছেন সমন্বয়ের একজন প্রতীক হয়ে। আমরা আশা করছি তার সফর মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার সংকট উত্তোরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। সাক্ষাৎকারে এপিকে বলেন কারিতাসের আঞ্চলিক প্রধান জেমস গোমেজ। এদিকে শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, পোপ যদি দক্ষিণাঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করতেন, তিনি তাদের বিপন্নতা বুঝতে পারতেন।
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে বিশ্বকে আহ্বান পোপের
-
Reporter Name - আপডেট টাইম : ১১:৫৯:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর ২০১৭
- ৩৬৯ বার
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ






















