,

মেয়েরা এভাবেই হারিয়ে যায়

ডা. মাহজাবীনের বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় পুলিশ আবারো চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে এবং তার বিরুদ্ধে বাদী অর্থাৎ সামারুখ মাহজাবীনের বাবা পুলিশ প্রতিবেদনের উপর নারাজি দাখিল করেন । যা বিজ্ঞ আদালত গ্রহণ করেন নি । পুলিশ প্রতিবেদন গ্রহণ করে এই মামলা থেকে তিন অভিযুক্ত খান টিপু সুলতান, তার স্ত্রী জেসমিন আরা বেগম ও তাদের ছেলে হুমায়ুন সুলতান সাদাবকে বিজ্ঞ আদালত খালাস দিয়েছেন।
এই পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে সবই আইন সম্মত ভাবেই ঘটেছে। মাহজাবীনের মৃত্যু (?) এর পর আমি এই বিষয়ে একটি লেখায় যা লিখেছিলাম তারই ধারাবাহিকতায় আবার আজ এই লেখা।
বিজ্ঞ আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলার নাই। কারণ তদন্ত কর্মকর্তা দুইবার তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। ময়না তদন্ত প্রতিবেদন ও দুইবারই এক এসেছে। সুতরাং আইন অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালতের কিছুই করার নাই। তারও হাত বাধা আইনের কাছে। আইনের বাইরে তিনি যেতে পারেন না। এই বিষয় আমার নয়। তবে আমার ফোকাস অন্যদিকে ।
মেয়েরা এই ভাবেই হারিয়ে যায়। আমাদের দেশে , আমাদের সমাজে আমাদের মেয়েরা যখন – তখন, দিনে রাতে, যেখানে – সেখানে, যখন – তখন আমাদের মেয়েরা এইভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে। সেটা তাঁর নিজের ইচ্ছায়ই হোক বা হোক অপরের ইচ্ছায়। সেটা  আদৌ কেউ কোনোদিন  আমলে নেয় নি বা নিবে বলে মনে হয় না ।
আমাদের দেশে যখনই কোন কন্যা শিশু তার কৈশোরে পা রাখে তখন থেকেই তার শুরু হয় তার দুর্গম পথ চলা। এই দুর্গম পথ চলা তার শেষ হয় না মরণ অব্দি। তা  সে হোক সাধারণ কোন মেয়ে বা সম্ভাবনাময়ী কেউ । মেয়েদের জন্যে পথ কোনদিন সুগম হল না।
একথা বলছি কেন? পুরুষের আদিম লোভের শিকার তো ছয় মাসের কন্যা শিশুও হয়েছে এই দেশে বার বার।  আমি বিস্মিত হচ্ছি বার বার, ধাক্কা মেরে কেউ যেন আমায় ঠেলে ফেলে দিতে চাইছে – মাহজাবীন মরতে গেল কেন? কী শিক্ষা পেল সে ? এই শিক্ষার কী দাম ? জীবনের চেয়ে মরণ ভাল ? মরণ ভাল হলে যার কোন দরকার নাই এই জগত সংসারে সে চলে যাক – তোমার মত সম্পদ কেন যাবে ?
বেশ কিছুদিন আগে এই দেশে একটা হিড়িক লেগেছিল – পুরুষের টিজের শিকার হলেই মেয়েরা আত্মহত্যা করত।  ভেবেছিলাম কিছুটা হলেও মেয়েরা বোধহয় বুঝেছে নাহ – জীবন শেষ করাই শেষ কথা নয়। আবারো বুঝলাম , আমি ভুল।
মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস স্কুলের প্রথম শ্রেণির একজন শিশু ও ৫ম শ্রেণির আরেকজন শিশু ধর্ষিত হয়েছে সুইপারের কাছে । প্রথম বার এই ঘটনা ঘটানোর পর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নেয়নি বরং স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রতিটি ক্লাসে ঘুরে ঘুরে মেয়েদের বলেছে – সংবাদপত্রে যা বের হচ্ছে সব মিথ্যা। তোমরা এই সব বিষয় আমলে নেবে না । বাহ ! কী বিচিত্র এই দেশ !
যার ফলে সেই সুইপার আবারো সাহস পেল এই দুঃসাহস দেখাবার। অবশেষে ৫ম শ্রেণির মেয়েটি আইসিইউতে চিকিৎসা রত অবস্থায় মারাই গেল!  মামলা চলছে আর স্কুল কর্তৃপক্ষ সব ছাত্রীকে বলে দিয়েছে ‘এই সব মিডিয়ার রটনা, রচনা?’
আমার প্রথম প্রশ্ন-গার্লস স্কুলে মেয়ে সুইপার নাই কেন? যেখানে সিটি কর্পোরেশনেও অসংখ্য নারীকর্মী দিন রাত মহানগর পরিষ্কার করছে সেখানে মেয়েদের ওয়াশ রুম নারী কর্মী ওয়াশ করতে পারবে না?
আমার মেয়েকে মাঝে মাঝে স্কুলে আনতে যাবার সুযোগ হয় আমার । তখন দেখি বিশাল দেহী পুরুষ দারোয়ান গেটে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে কিশোরী মেয়েগুলো জড়সড় হয়ে গেট পার হতে পারলেই যেন বাঁচে ! আর স্কুলের সামনে ফুটপাথে নানান রকমের জিনিস পত্রের পসরা সাজিয়ে বসে আছে এক দল ছোকড়া দোকানদার । তাদের যত না জিনিস বিক্রি করার দায় তারচেয়ে বেশি আকর্ষণ কিশোরী মেয়ে গুলোকে স্ক্যানিং করার । এই বিষয়ে কেউই কিছু বলে না। এই সবই হয় আমাদের জন্যে। কারণ আমরা যারা পণ্য লোভী তারা মেয়েদের স্কুলে দেবার ছলে দল বেধে কেনা কাটা করতে বসে যাই । ভাবি না যে, এই ভাবে মেয়েদের স্কুলের ফুটপথে সস্তায় আমরা পণ্য কিনছি না, আমরা আমাদের মেয়েদেরকে সস্তা – সুলভ করে দিচ্ছি এই দোকানী বেশধারী লোভী পুরুষের চোখে। একদিন হঠাৎ কোন অঘটন ঘটলে আমরা একবারও নিজেদের দুষবো না । দোষ দিব আমাদের কিশোরীদের। যেমন- মাহজাবীন ৪৫ মিনিট ধরে তার বাবাকে ফোনে ঢাকায় আসার অনুরোধ করার পরেও প্রকৌশলী নূরুল ইসলাম ( যশোরে যে খুব সুনামের সাথে কাজ করছে বলে আমি শুনিনি ) ২৮ মিনিটে প্লেনে করে উড়ে আসতে পারেনি। তাহলে কি ধরে নেবো পিতার কাছেও কন্যার জীবন এর মূল্য নাই ? এমন কি মায়েদের কাছেও কন্যা শিশুর শরীরের নিরাপত্তার চাইতেও ভোগ্য পণ্য বেশি মূল্যবান ? আমরা মায়েরাও  মেয়েকে শুধুই শিক্ষা দেই-  মেনে নাও , মানিয়ে নাও , মেয়েদের শেষ ঠিকানা শশুর বাড়ি ইত্যাদি।
কেন ? মেয়েদের শেষ এবং প্রথম বলে কিছু নেই । শুরুতেই সে একা এবং একজন । তাকে কেন আমরা এই কথা শেখাই না – তোমার জীবন মহা মূল্যবান। তোমাকে নিজের পায়ের দাঁড়াতে হবে। নিজের জন্যে বাঁচতে হবে ? তোমার শরীর তোমাকেই রক্ষা করতে হবে ? কেন শেখাই না জীবনটা কত মূল্যবান ?
যে মেয়েগুলো সম্প্রতি চলে গেল তাদের তালিকায় আরেকটি নাম টুসি । তাকে নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হচ্ছে ফেসবুকে । ফেসবুকের ঝড় আমাকে শক্তি যোগায় আর যে মেয়েটি তার নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুইপারের হাতে ধর্ষিত হল – মারা গেল ? তার কী হবে ? আরো অসংখ্য জানা – অজানা আমাদের কন্যা শিশুরা ?
কবে আমরা আমাদের মেয়েদের এই সুশিক্ষা দেবো যে চিৎকার কর, সবাইকে বল কে তোমাকে ধর্ষণ করেছে? মেয়ে তোমার কোন লজ্জা নাই এখানে। লজ্জা তার যে এই কুকাজ করেছে। আমরা কি একদিনের জন্যেও আমাদের মেয়েদেরকে এই শিক্ষাটি দিতে পারি না?
অপেক্ষায় রইলাম।
Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর