ঢাকা ০৭:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

রাজনীতির আগুনে ফল বিপর্যয়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০৮:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০১৫
  • ৩৭৯ বার

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল বিপর্যয় ঘটেছে। এর পেছনে প্রধান সাতটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও ৫টি কারণ উল্লেখ করেছেন। দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ, শিক্ষা প্রশাসক, বোর্ড চেয়ারম্যানসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে কারণগুলো শনাক্ত করা হয়। এদের সবাই বছরের শুরুতে তিন মাসের রাজনৈতিক সহিংসতাকে দায়ী করেছেন। এর বাইরে গত বছরের সঙ্গে এবারের ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণেও বেরিয়ে এসেছে ফল বিপর্যয় সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য। ফল বিপর্যয়ের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় উৎসবের আমেজে ভাটা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে।
বছরের শুরুতে টানা তিন মাস হরতাল-অবরোধের কারণে প্রস্তুতি পর্বে শিক্ষার্থীরা হোঁচট খেয়েছে। ছয় বছরেও সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি ঠিকমতো না বোঝা। লেখাপড়া বাদ দিয়ে ফেসবুক-ইন্টারনেটে অতিমাত্রায় আসক্তি। পাঠ্যবইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনীহা। লটারির মাধ্যমে প্রশ্ন নির্ধারণ। প্রশ্নফাঁস না হওয়া এবং উদারভাবে উত্তরপত্রে নম্বর না দেয়ার কারণেও পাসের হার কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ বাইরে থেকে বলা কঠিন। তবে আমরা আশা করি শতভাগ শিক্ষার্থীই পাস করুক। কেননা যারা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় তাদের বাছাই করেই পাঠানো হয়। তিনি বলেন, পাসের হার হ্রাস বা বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার মানের সম্পর্ক নেই। তাই পাসের হার বা জিপিএ-৫ নিয়ে চিন্তার চেয়ে শিক্ষার মান বেড়েছে কিনা- তা নিয়ে চিন্তা করাই শ্রেয়।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অকপটেই ফল বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেন। রোববার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এবার এসএসসি পরীক্ষা নেয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ওই সময়েই এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নেয়ার মূল সময় ছিল। কিন্তু হরতাল-অবরোধ আর মানুষ পোড়ানোর মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত আতংক সৃষ্টি করে। তাই এ সময়ে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও বিশেষ ক্লাসে যেতে পারেনি। প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিতে পারেনি। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিকে উন্নতমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ফল বিপর্যয়ে। তিনি বলেন, এর আগে এইচএসসিতে প্রশ্নফাঁস হয়েছে। এবার তা হয়নি। এসবের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। কিন্তু এবার তা দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। নিজেদের প্রণীত প্রশ্নে কোনো বোর্ডেই এবার পরীক্ষা নিতে পারেনি। ১৬ সেট প্রশ্ন ছাপার পর লটারির মাধ্যমে বোর্ডগুলোকে ভাগ করে দেয়া হয়। প্রতি বোর্ডকে দুই সেট করে প্রশ্ন দেয়া হয়েছিল। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার বাংলা, ইংরেজি, পদার্থ, রসায়নসহ ৬ বিষয়ের পাসের হার গত বছরের চেয়ে কম। এছাড়া নতুন বিষয় তথ্যপ্রযুক্তিতেও শিক্ষার্থীরা তেমন ভালো করতে পারেনি। ঢাকাসহ তিন বোর্ডের পাসের হার গত বছরের চেয়ে কমেছে। এছাড়া মানবিক বিভাগের ফলও এবার নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রতি বছর প্রশ্নফাঁস হয় এবার তা হয়নি। তবে প্রশ্নফাঁসের গুজব থাকায় অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে গুজবের পেছনে ছুটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঠ্যবইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের কম আগ্রহ। পাঠ্যবই বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের গাইড বই ও টেস্ট বইয়ের প্রতি ঝোঁক। আবার শিক্ষকরাও সৃজনশীল পদ্ধতির উত্তরপত্র মূল্যায়নে সমস্যায় পড়ছেন। যে কারণে উত্তরপত্রের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি বলে ফল বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে।
এদিকে ফল বিপর্যয়ের বিষয়ে অনেক শিক্ষক এবং সচেতন অভিভাবকরা মনে করছেন, বর্তমানে ছাত্রছাত্রীরা অতিমাত্রায় ইন্টারনেটমুখী। বিশেষ করে টিনএজারদের মধ্যে ফেসবুক আসক্তি আশংকাজনক হারে বেড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে ফেসবুক-ইন্টারনেট ছাড়া ছাত্রছাত্রী খুঁজে পাওয়াই দায়। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে এই প্রবণতা বেড়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীরা কেবল পাঠ্যবই বিমুখই নয়, সৃজনশীলতা চর্চা থেকেও দূরে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মহসিন হাওলাদার বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। কিন্তু এরপরও অনেক শিক্ষার্থী লুকিয়ে ফোন ব্যবহার করে। অনেকে কেবল কলেজেই নয়, বাসায় রাত জেগে মোবাইলে ফেসবুক ব্যবহার করে। তার মতে, বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর এই সমস্যা রয়েছে। এটা লেখাপড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন অভিভাবক বলেন, বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের কথা শোনে না। আগে যেমন বাবা-মা মারধর করে হলেও লেখাপড়ায় নিবিষ্ট রাখতেন। এখন আর তা পারা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটের কুফল। তাদের মতে, এই কুফল রোধ করা না গেলে দিন দিন খারাপ ফলের হার আরও বাড়বে।
এইচএসসিতে গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ১০ ভাগ কম পাস করেছে। আর জিপিএ-৫ কম পেয়েছে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থী। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার প্রধান ৭টি বিষয়েই শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে। এবার ঢাকা বোর্ডে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় এই বোর্ডে এবার পাসের হার কমেছে শতকরা ১৬ দশমিক ৩৮ ভাগ। এছাড়া কুমিল্লা বোর্ডে ১০ দশমিক ৩৪ এবং যশোর বোর্ডে ১৪ দশমিক ১৩ ভাগ পাসের হার কমেছে। এই তিন বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ড ইংরেজি ও অ্যাকাউন্টিং, কুমিল্লা বোর্ডে বাংলা, রসায়ন ও অ্যাকাউন্টিং এবং যশোর বোর্ড ইংরেজি ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করেছে। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ১৩ দশমিক ৪৯ ভাগ কম। অ্যাকাউন্টিংয়ে পাসের হার কমেছে প্রায় ৭ ভাগ। কুমিল্লায় অ্যাকাউন্টিংয়ে প্রায় ১১ ভাগ এবং যশোরে ইংরেজিতে ১৫ ভাগ, পদার্থে ১১ ভাগ পাসের হার কমেছে। এসব বিষয়ে খারাপ করায় মোট পাসের হারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এই তিন বোর্ডের তুলনামূলক খারাপ ফলের হিসাব ১০ বোর্ডের মোট পাসের হারে প্রভাব ফেলেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু বক্কর ছিদ্দিক ফল বিপর্যয়ের বিষয়ে বলেন, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে উদ্ভাবনী ও চিন্তাশক্তি এবং সমস্যা সমাধানের জ্ঞান থাকতে হবে। পাঠ্যবই নিবিড়ভাবে পড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে গাইড বই আর টেস্ট পেপার নির্ভরতা কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্লাসে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের আন্তরিকতাপূর্ণ পাঠদান থাকতে হবে। এসবের যত জাগরণ ঘটবে, পাসের হার তত বাড়বে। কিন্তু আমরা উল্লিখিত সব ক’টি বিষয়ের প্রতিই উপেক্ষা লক্ষ্য করেছি। এতে ফলে যা হওয়ার কথা, তাই হয়েছে।
এবার ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার যশোর বোর্ডে ৪৬.৪৫ শতাংশ। ২০০৩ সালের পর এবারই প্রথম পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ বিষয়ে বোর্ডটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মজিদ বলেন, বোর্ডগুলোর মধ্যে এবার প্রশ্ন বণ্টন করা হয়েছে লটারির মাধ্যমে। এতে করে যশোর বোর্ড অন্য বোর্ডের প্রণীত প্রশ্নপত্র পেয়েছে। এই প্রশ্নে পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার কেন্দ্রেই জানিয়েছিল।
তবে ওই বোর্ডের শিক্ষকরা আরও বেশকিছু কারণ উল্লেখ করেছেন। সরকারি এমএম কলেজের অধ্যক্ষ নমিতা রানী বিশ্বাসের মতে, ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়ানো হয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে প্রশ্নের পেছনে ছোটে। কেউ কেউ ভুয়া প্রশ্নও সংগ্রহ করে। শিক্ষার্থীদের ফেল করার ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
ঢাকা বোর্ডের ফল বিপর্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান বদরুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকে। শিক্ষকদের অনেকের মধ্যে নিয়মিত ক্লাস না নেয়ার ঘটনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে নোট-গাইডের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যায়। এমন নানা কারণে শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হতে পারে।
তবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে এখনও শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। বিষয়টি উভয় পক্ষই কম বোঝে। পরীক্ষায় এর প্রভাব পড়েছে। তারা বলেন, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোতে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। সৃজনশীল পদ্ধতির সঙ্গে এসব শিক্ষার্থী পুরোপুরি পরিচিত নয়। উপযুক্ত ধারণা অর্জন করতে পারেনি অনেকে। যার প্রভাব পড়েছে পরীক্ষার ফলে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনীতির আগুনে ফল বিপর্যয়

আপডেট টাইম : ১২:০৮:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০১৫

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল বিপর্যয় ঘটেছে। এর পেছনে প্রধান সাতটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও ৫টি কারণ উল্লেখ করেছেন। দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ, শিক্ষা প্রশাসক, বোর্ড চেয়ারম্যানসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে কারণগুলো শনাক্ত করা হয়। এদের সবাই বছরের শুরুতে তিন মাসের রাজনৈতিক সহিংসতাকে দায়ী করেছেন। এর বাইরে গত বছরের সঙ্গে এবারের ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণেও বেরিয়ে এসেছে ফল বিপর্যয় সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য। ফল বিপর্যয়ের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় উৎসবের আমেজে ভাটা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা গেছে।
বছরের শুরুতে টানা তিন মাস হরতাল-অবরোধের কারণে প্রস্তুতি পর্বে শিক্ষার্থীরা হোঁচট খেয়েছে। ছয় বছরেও সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি ঠিকমতো না বোঝা। লেখাপড়া বাদ দিয়ে ফেসবুক-ইন্টারনেটে অতিমাত্রায় আসক্তি। পাঠ্যবইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনীহা। লটারির মাধ্যমে প্রশ্ন নির্ধারণ। প্রশ্নফাঁস না হওয়া এবং উদারভাবে উত্তরপত্রে নম্বর না দেয়ার কারণেও পাসের হার কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ বাইরে থেকে বলা কঠিন। তবে আমরা আশা করি শতভাগ শিক্ষার্থীই পাস করুক। কেননা যারা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয় তাদের বাছাই করেই পাঠানো হয়। তিনি বলেন, পাসের হার হ্রাস বা বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার মানের সম্পর্ক নেই। তাই পাসের হার বা জিপিএ-৫ নিয়ে চিন্তার চেয়ে শিক্ষার মান বেড়েছে কিনা- তা নিয়ে চিন্তা করাই শ্রেয়।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অকপটেই ফল বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করেন। রোববার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এবার এসএসসি পরীক্ষা নেয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ওই সময়েই এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নেয়ার মূল সময় ছিল। কিন্তু হরতাল-অবরোধ আর মানুষ পোড়ানোর মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত আতংক সৃষ্টি করে। তাই এ সময়ে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও বিশেষ ক্লাসে যেতে পারেনি। প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিতে পারেনি। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিকে উন্নতমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ফল বিপর্যয়ে। তিনি বলেন, এর আগে এইচএসসিতে প্রশ্নফাঁস হয়েছে। এবার তা হয়নি। এসবের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। কিন্তু এবার তা দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। নিজেদের প্রণীত প্রশ্নে কোনো বোর্ডেই এবার পরীক্ষা নিতে পারেনি। ১৬ সেট প্রশ্ন ছাপার পর লটারির মাধ্যমে বোর্ডগুলোকে ভাগ করে দেয়া হয়। প্রতি বোর্ডকে দুই সেট করে প্রশ্ন দেয়া হয়েছিল। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার বাংলা, ইংরেজি, পদার্থ, রসায়নসহ ৬ বিষয়ের পাসের হার গত বছরের চেয়ে কম। এছাড়া নতুন বিষয় তথ্যপ্রযুক্তিতেও শিক্ষার্থীরা তেমন ভালো করতে পারেনি। ঢাকাসহ তিন বোর্ডের পাসের হার গত বছরের চেয়ে কমেছে। এছাড়া মানবিক বিভাগের ফলও এবার নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রতি বছর প্রশ্নফাঁস হয় এবার তা হয়নি। তবে প্রশ্নফাঁসের গুজব থাকায় অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে গুজবের পেছনে ছুটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাঠ্যবইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের কম আগ্রহ। পাঠ্যবই বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের গাইড বই ও টেস্ট বইয়ের প্রতি ঝোঁক। আবার শিক্ষকরাও সৃজনশীল পদ্ধতির উত্তরপত্র মূল্যায়নে সমস্যায় পড়ছেন। যে কারণে উত্তরপত্রের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি বলে ফল বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে।
এদিকে ফল বিপর্যয়ের বিষয়ে অনেক শিক্ষক এবং সচেতন অভিভাবকরা মনে করছেন, বর্তমানে ছাত্রছাত্রীরা অতিমাত্রায় ইন্টারনেটমুখী। বিশেষ করে টিনএজারদের মধ্যে ফেসবুক আসক্তি আশংকাজনক হারে বেড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর যুগে ফেসবুক-ইন্টারনেট ছাড়া ছাত্রছাত্রী খুঁজে পাওয়াই দায়। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে এই প্রবণতা বেড়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীরা কেবল পাঠ্যবই বিমুখই নয়, সৃজনশীলতা চর্চা থেকেও দূরে। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মহসিন হাওলাদার বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ। কিন্তু এরপরও অনেক শিক্ষার্থী লুকিয়ে ফোন ব্যবহার করে। অনেকে কেবল কলেজেই নয়, বাসায় রাত জেগে মোবাইলে ফেসবুক ব্যবহার করে। তার মতে, বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর এই সমস্যা রয়েছে। এটা লেখাপড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন অভিভাবক বলেন, বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের কথা শোনে না। আগে যেমন বাবা-মা মারধর করে হলেও লেখাপড়ায় নিবিষ্ট রাখতেন। এখন আর তা পারা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটের কুফল। তাদের মতে, এই কুফল রোধ করা না গেলে দিন দিন খারাপ ফলের হার আরও বাড়বে।
এইচএসসিতে গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ১০ ভাগ কম পাস করেছে। আর জিপিএ-৫ কম পেয়েছে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থী। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার প্রধান ৭টি বিষয়েই শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে। এবার ঢাকা বোর্ডে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় এই বোর্ডে এবার পাসের হার কমেছে শতকরা ১৬ দশমিক ৩৮ ভাগ। এছাড়া কুমিল্লা বোর্ডে ১০ দশমিক ৩৪ এবং যশোর বোর্ডে ১৪ দশমিক ১৩ ভাগ পাসের হার কমেছে। এই তিন বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ড ইংরেজি ও অ্যাকাউন্টিং, কুমিল্লা বোর্ডে বাংলা, রসায়ন ও অ্যাকাউন্টিং এবং যশোর বোর্ড ইংরেজি ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করেছে। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ১৩ দশমিক ৪৯ ভাগ কম। অ্যাকাউন্টিংয়ে পাসের হার কমেছে প্রায় ৭ ভাগ। কুমিল্লায় অ্যাকাউন্টিংয়ে প্রায় ১১ ভাগ এবং যশোরে ইংরেজিতে ১৫ ভাগ, পদার্থে ১১ ভাগ পাসের হার কমেছে। এসব বিষয়ে খারাপ করায় মোট পাসের হারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এই তিন বোর্ডের তুলনামূলক খারাপ ফলের হিসাব ১০ বোর্ডের মোট পাসের হারে প্রভাব ফেলেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু বক্কর ছিদ্দিক ফল বিপর্যয়ের বিষয়ে বলেন, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে উদ্ভাবনী ও চিন্তাশক্তি এবং সমস্যা সমাধানের জ্ঞান থাকতে হবে। পাঠ্যবই নিবিড়ভাবে পড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে গাইড বই আর টেস্ট পেপার নির্ভরতা কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্লাসে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের আন্তরিকতাপূর্ণ পাঠদান থাকতে হবে। এসবের যত জাগরণ ঘটবে, পাসের হার তত বাড়বে। কিন্তু আমরা উল্লিখিত সব ক’টি বিষয়ের প্রতিই উপেক্ষা লক্ষ্য করেছি। এতে ফলে যা হওয়ার কথা, তাই হয়েছে।
এবার ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার যশোর বোর্ডে ৪৬.৪৫ শতাংশ। ২০০৩ সালের পর এবারই প্রথম পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ বিষয়ে বোর্ডটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মজিদ বলেন, বোর্ডগুলোর মধ্যে এবার প্রশ্ন বণ্টন করা হয়েছে লটারির মাধ্যমে। এতে করে যশোর বোর্ড অন্য বোর্ডের প্রণীত প্রশ্নপত্র পেয়েছে। এই প্রশ্নে পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার কেন্দ্রেই জানিয়েছিল।
তবে ওই বোর্ডের শিক্ষকরা আরও বেশকিছু কারণ উল্লেখ করেছেন। সরকারি এমএম কলেজের অধ্যক্ষ নমিতা রানী বিশ্বাসের মতে, ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়ানো হয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে প্রশ্নের পেছনে ছোটে। কেউ কেউ ভুয়া প্রশ্নও সংগ্রহ করে। শিক্ষার্থীদের ফেল করার ক্ষেত্রে একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।
ঢাকা বোর্ডের ফল বিপর্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান বদরুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকে। শিক্ষকদের অনেকের মধ্যে নিয়মিত ক্লাস না নেয়ার ঘটনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে নোট-গাইডের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যায়। এমন নানা কারণে শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হতে পারে।
তবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে এখনও শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। বিষয়টি উভয় পক্ষই কম বোঝে। পরীক্ষায় এর প্রভাব পড়েছে। তারা বলেন, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোতে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। সৃজনশীল পদ্ধতির সঙ্গে এসব শিক্ষার্থী পুরোপুরি পরিচিত নয়। উপযুক্ত ধারণা অর্জন করতে পারেনি অনেকে। যার প্রভাব পড়েছে পরীক্ষার ফলে।