ঢাকা ০৯:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ডাকাত আতঙ্কে পর্যটকশূন্য কিশোরগঞ্জের হাওর ভেঙে পড়েছে পর্যটন অর্থনীতি, বিপাকে হাজারো মানুষের জীবিকা শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস

হাওর পাড়ের মানুষের ভরসা ‘চলতি চুলা’

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:২২:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুলাই ২০১৭
  • ৩৯১ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ চলতি (ভাসমান) চুলা। ঘরের স্থায়ী চুলাতে জ্বালানো যাচ্ছে না আগুন। এ কারণে এমন অভিনব চুলার উদ্ভাবন। এখন হাওর পাড়ের বন্যাকবলিত প্রতিটি বাড়িতে রান্নাবান্নার ভরসা ‘চলতি চুলা’। টিন দিয়ে তৈরি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করার এ চুলার কদর এখন বন্যাকবলিত হাওর এলাকায়। এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। মাসের পর মাস। কমছে না বানের পানি। এক দু’ফুট পানি কমলেও বৃষ্টিতে আবার যেই সেই। বাড়ি ও ঘরে পানি। রাস্তাঘাট, টিউবওয়েল, টয়লেটও ডুবিয়ে দিয়েছে বানের পানি। ঘরের ভেতর আর রান্না ঘরে এখন পানির। এমন বেহাল অবস্থায় হাওর পাড়ের অনেকেই ইতিমধ্যে তাদের বসতভিটা ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যত্র। নিজের আত্মীয় স্বজন কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু কোথাও সমস্যা তাদের পিছু ছাড়ছে না। সেখানেও বিশুদ্ধ খাবার পানি, রান্নাবান্না আর টয়লেটের সমস্যা প্রকট। হাওরজুড়ে শুধুই হাহাকার। দিন দিন এই হাহাকার বেড়েই চলেছে। চারদিকে থৈ থৈ পানি। তাই কর্মহীন হাওর পাড়ের অসহায় হতদরিদ্র মানুষ। পরিবার পরিজন নিয়ে খাওয়া বাঁচার চিন্তায় তারা দিশাহারা। গতকাল সরজমিনে হাকালুকি হাওর পাড়ের বেলাগাঁও, শাহপুর, জালালপুর, কাইয়ারচর, শশারকান্দি দেখিয়ার পুর, বেড়কুড়ি, মদনগৌরি, সাদিপুর, উত্তর সাদিপুর, গৌড়করণসহ কয়েকটি গ্রামে গেলে দেখা মিলে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের দৃশ্য। পানিবন্দি অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে তারা নানা কষ্টে দিন যাপন করছেন। জালালপুর গ্রামের সুহেল মিয়া ও সাজনা বেগম জানালেন চলমান বন্যার সঙ্গে এখন আফাল ও বলনে (বড় ঢেউ)তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিচ্ছে। ঘরের ভেতরেও পানি থাকায় তারা চলতি (ভাসমান) চুলায় কোন রকম রান্নাবাড়ার কাজ সারছেন। আবদুর রহমান ও আছিয়া বেগম জানালেন বারবার বন্যায় আমাদের সব কেড়ে নিচ্ছে। খেয়ে না খেয়ে এতদিন নিজের ঘর বাড়িতে ছিলেন। এখন এই ভাঙা ঘরবাড়িতে হয়তো আর থাকতে পারেবেন না। পরিবারের ৮ সদস্য নিয়ে তারা চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। একই গ্রামের আবদুস শহিদ ও রোকেয়া বেগম জানান তাদের ৫ ছেলে মেয়ে সবাই লেখাপড়া করে। এ বছর বোরো ধান হারানোর পর তাদের সব স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। এখন কোন রকম অর্ধহারে অনাহারে দিন যাপন করছেন। তারা জানালেন বিশুদ্ধ পানি আর রান্নাবান্নার জন্য তারা সমস্যায় পড়েছেন। চলতি চুলায় রান্নার কাজ কোনরকম সারা গেলেও জ্বালানি কাটের সমস্যা প্রকট। তাছাড়া ওই চুলায় বড় বাসন দিয়ে রান্না করা যায় না। তাই সবদিক দিয়ে তাদের বিড়ম্বনার শেষ নেই। আর বাড়ি ও ঘরেতে যে পানি ডুকেছে তা শরীরে লাগলে চুলকায়। বিশুদ্ধ পানি না থাকায় তারা ওই বানের পানিই খাচ্ছেন। এজন্য তাদের পেট ব্যথা, ডাইরিয়া, চর্মরোগসহ নানা রোগবালাই এখন তাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে পিছু নিয়েছে। সাদিপুর গ্রামের লয়েছ মিয়া ও শাফিয়া বেগম জানান বন্যার পর থেকে নানা দুর্ভোগ আমাদের সঙ্গী হয়েছে। রান্নার জন্য চলতি চুলায় ভরসা পেলেও এখন মারাত্মক সমস্যা টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির। টিবওয়েলগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমরা বিপাকে পড়েছি। তাই বানের পানি আমরা কলসে ভরে ‘রড’ গরম করে তাতে ঢুকিয়ে দিয়ে বিশুদ্ধ করে সেই পানি খাই। তারা জানালেন ‘রড’ গরম করে এরকম পানি বিশুদ্ধ করার অভিনব পদ্ধতি তারা নিজেই আবিষ্কার করেছেন। এ অঞ্চলের তাদের পূর্বসূরিরা নাকি বন্যার সময় টিবওয়েল পানিতে ডুবে গেলে এরকম পানি বিশুদ্ধ করতেন। সেই পুরনো পদ্ধতি এখন বলবৎ রেখেছেন তারা। উত্তর সাদিপুর গ্রামের মিশিল মিয়া জানালেন তার পরিবারের লোকসংখ্যা ১০ জন। তার পেশা হচ্ছে কৃষি আর মাছ ধরা। কিন্তু এ বছর সব হিতে বিপরীত। চৈত্রের অকাল বন্যায় যেমন ধান খেয়েছে। তেমনি ভাসমান পানিতে এখন মাছও ধরা পড়ছে কম। তারপর ঘরে খানা নেই। জ্বালানি নেই। বিশুদ্ধ পানিও নেই। এ বছরের বন্যা তাদের সব কেড়ে নিয়ে চরম অসহায় করে দিয়েছে। জালালপুর গ্রামের নামর আলী জানালেন সরকারি সহায়তা আমাদের কপালে জোটে না। দোকানবাকি খেয়ে কোন রকম জীবন রক্ষা করছি। বানের পানি না কমলে আফাল আর বলনের কবল থেকে ঘরবাড়িও রক্ষা করা যাবে না। ঘরে পানি থাকায় এখন চলতি চুলাই আমাদের রান্নাবান্নার একমাত্র ভরসা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ডাকাত আতঙ্কে পর্যটকশূন্য কিশোরগঞ্জের হাওর ভেঙে পড়েছে পর্যটন অর্থনীতি, বিপাকে হাজারো মানুষের জীবিকা

হাওর পাড়ের মানুষের ভরসা ‘চলতি চুলা’

আপডেট টাইম : ১২:২২:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুলাই ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ চলতি (ভাসমান) চুলা। ঘরের স্থায়ী চুলাতে জ্বালানো যাচ্ছে না আগুন। এ কারণে এমন অভিনব চুলার উদ্ভাবন। এখন হাওর পাড়ের বন্যাকবলিত প্রতিটি বাড়িতে রান্নাবান্নার ভরসা ‘চলতি চুলা’। টিন দিয়ে তৈরি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করার এ চুলার কদর এখন বন্যাকবলিত হাওর এলাকায়। এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। মাসের পর মাস। কমছে না বানের পানি। এক দু’ফুট পানি কমলেও বৃষ্টিতে আবার যেই সেই। বাড়ি ও ঘরে পানি। রাস্তাঘাট, টিউবওয়েল, টয়লেটও ডুবিয়ে দিয়েছে বানের পানি। ঘরের ভেতর আর রান্না ঘরে এখন পানির। এমন বেহাল অবস্থায় হাওর পাড়ের অনেকেই ইতিমধ্যে তাদের বসতভিটা ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যত্র। নিজের আত্মীয় স্বজন কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু কোথাও সমস্যা তাদের পিছু ছাড়ছে না। সেখানেও বিশুদ্ধ খাবার পানি, রান্নাবান্না আর টয়লেটের সমস্যা প্রকট। হাওরজুড়ে শুধুই হাহাকার। দিন দিন এই হাহাকার বেড়েই চলেছে। চারদিকে থৈ থৈ পানি। তাই কর্মহীন হাওর পাড়ের অসহায় হতদরিদ্র মানুষ। পরিবার পরিজন নিয়ে খাওয়া বাঁচার চিন্তায় তারা দিশাহারা। গতকাল সরজমিনে হাকালুকি হাওর পাড়ের বেলাগাঁও, শাহপুর, জালালপুর, কাইয়ারচর, শশারকান্দি দেখিয়ার পুর, বেড়কুড়ি, মদনগৌরি, সাদিপুর, উত্তর সাদিপুর, গৌড়করণসহ কয়েকটি গ্রামে গেলে দেখা মিলে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের দৃশ্য। পানিবন্দি অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে তারা নানা কষ্টে দিন যাপন করছেন। জালালপুর গ্রামের সুহেল মিয়া ও সাজনা বেগম জানালেন চলমান বন্যার সঙ্গে এখন আফাল ও বলনে (বড় ঢেউ)তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিচ্ছে। ঘরের ভেতরেও পানি থাকায় তারা চলতি (ভাসমান) চুলায় কোন রকম রান্নাবাড়ার কাজ সারছেন। আবদুর রহমান ও আছিয়া বেগম জানালেন বারবার বন্যায় আমাদের সব কেড়ে নিচ্ছে। খেয়ে না খেয়ে এতদিন নিজের ঘর বাড়িতে ছিলেন। এখন এই ভাঙা ঘরবাড়িতে হয়তো আর থাকতে পারেবেন না। পরিবারের ৮ সদস্য নিয়ে তারা চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। একই গ্রামের আবদুস শহিদ ও রোকেয়া বেগম জানান তাদের ৫ ছেলে মেয়ে সবাই লেখাপড়া করে। এ বছর বোরো ধান হারানোর পর তাদের সব স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। এখন কোন রকম অর্ধহারে অনাহারে দিন যাপন করছেন। তারা জানালেন বিশুদ্ধ পানি আর রান্নাবান্নার জন্য তারা সমস্যায় পড়েছেন। চলতি চুলায় রান্নার কাজ কোনরকম সারা গেলেও জ্বালানি কাটের সমস্যা প্রকট। তাছাড়া ওই চুলায় বড় বাসন দিয়ে রান্না করা যায় না। তাই সবদিক দিয়ে তাদের বিড়ম্বনার শেষ নেই। আর বাড়ি ও ঘরেতে যে পানি ডুকেছে তা শরীরে লাগলে চুলকায়। বিশুদ্ধ পানি না থাকায় তারা ওই বানের পানিই খাচ্ছেন। এজন্য তাদের পেট ব্যথা, ডাইরিয়া, চর্মরোগসহ নানা রোগবালাই এখন তাদের নিত্য সঙ্গী হয়ে পিছু নিয়েছে। সাদিপুর গ্রামের লয়েছ মিয়া ও শাফিয়া বেগম জানান বন্যার পর থেকে নানা দুর্ভোগ আমাদের সঙ্গী হয়েছে। রান্নার জন্য চলতি চুলায় ভরসা পেলেও এখন মারাত্মক সমস্যা টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির। টিবওয়েলগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমরা বিপাকে পড়েছি। তাই বানের পানি আমরা কলসে ভরে ‘রড’ গরম করে তাতে ঢুকিয়ে দিয়ে বিশুদ্ধ করে সেই পানি খাই। তারা জানালেন ‘রড’ গরম করে এরকম পানি বিশুদ্ধ করার অভিনব পদ্ধতি তারা নিজেই আবিষ্কার করেছেন। এ অঞ্চলের তাদের পূর্বসূরিরা নাকি বন্যার সময় টিবওয়েল পানিতে ডুবে গেলে এরকম পানি বিশুদ্ধ করতেন। সেই পুরনো পদ্ধতি এখন বলবৎ রেখেছেন তারা। উত্তর সাদিপুর গ্রামের মিশিল মিয়া জানালেন তার পরিবারের লোকসংখ্যা ১০ জন। তার পেশা হচ্ছে কৃষি আর মাছ ধরা। কিন্তু এ বছর সব হিতে বিপরীত। চৈত্রের অকাল বন্যায় যেমন ধান খেয়েছে। তেমনি ভাসমান পানিতে এখন মাছও ধরা পড়ছে কম। তারপর ঘরে খানা নেই। জ্বালানি নেই। বিশুদ্ধ পানিও নেই। এ বছরের বন্যা তাদের সব কেড়ে নিয়ে চরম অসহায় করে দিয়েছে। জালালপুর গ্রামের নামর আলী জানালেন সরকারি সহায়তা আমাদের কপালে জোটে না। দোকানবাকি খেয়ে কোন রকম জীবন রক্ষা করছি। বানের পানি না কমলে আফাল আর বলনের কবল থেকে ঘরবাড়িও রক্ষা করা যাবে না। ঘরে পানি থাকায় এখন চলতি চুলাই আমাদের রান্নাবান্নার একমাত্র ভরসা।