ঢাকা ০৮:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভারত কি বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন চায়! কাজী সিরাজ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:১৭:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০১৫
  • ২৮০ বার

লীগ সরকার একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তাভাবনা করছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির কোনো কোনো নেতাও এ ধরনের সম্ভাবনার কথা নাকচ করছেন না। তবে তারা শঙ্কিত এই কারণে যে, তার আগে সরকার বিএনপিকে ভেঙে তছনছ করে দিতে পারে। এমন কি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার ব্যবস্থাটিও পাকাপোক্ত করে নিতে পারে। এ উদ্দেশ্যে তাদের দুজনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতি মামলার কাজ দ্রুত যাতে সম্পন্ন হয় সে জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের তৎপরতা হয়তো আরও বেড়ে যাবে। জিয়া অরফানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন তাতে মাতা-পুত্রের সাজা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ড হয়ে গেলেই তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য হয়ে যাবেন। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে ফৌজদারি মামলায় এমন দণ্ড হলে দণ্ড চলাকালীন সময় তো বটেই, কারামুক্তির পরবর্তী পাঁচ বছরও অপরাধীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো সুযোগ নেই। কেউ কেউ বলছেন, এ অবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আয়োজন করলে বিএনপি সেই নির্বাচনে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তখন বিএনপিতে নির্বাচনপন্থি অংশ দলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে পৃথক বিএনপি গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। সরকার সেই সুযোগটি কাজে লাগানোর কৌশল নেবে। কিন্তু সেই কৌশলে কি কাজ হবে? মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রশ্ন তো এসেছে দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ থেকে। খালেদা জিয়া-তারেকবিহীন একটি সরকারপন্থি বিএনপিকে নির্বাচনে এনে কি এটা প্রমাণ করা যাবে যে, নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে? সরকারের বিএনপি ভাঙার কোনো পরিকল্পনা যদি থাকে তাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের উদ্দেশ্য মোটেই সফল হবে না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রসঙ্গটা নতুন নয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এই দাবিতে আন্দোলনরত। তিন মাসের ব্যর্থ আন্দোলনে জামায়াতের এজেন্ডা ভিন্ন থাকলেও বিএনপির এজেন্ডা ছিল আগাম বা মধ্যবর্তী একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন। বিএনপির সেই দাবি এখন সম্ভাব্যতার নিরিখে বিবেচনা হচ্ছে। এই ভাবনা বিএনপির বাইরের লোকজনেরও ভাবনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের পর এই আলোচনা বেশ অর্থপূর্ণই মনে হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদির সফরের উদ্দেশ্য ছিল দ্বিবিধ। এক. নিকট প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে ভারতের আগের ‘প্রভুত্বের’ নয়- ‘বন্ধুত্বের’, ‘বড়ভাইয়ের’ নতুন সম্পর্কনীতি বাস্তবায়নের সদিচ্ছা প্রমাণ করে নিজেকে শুধু ভারতের নেতা নয়, আঞ্চলিক একক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং দুই. বাংলাদেশে ভারতের জরুরি স্বার্থসমূহ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সেই গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য সফল করার লক্ষ্যেই তার সফরকালে বাংলাদেশ-ভারত ২২টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাও প্রকাশ করা হয়েছে। বিনা বাধায়, বিনা গোলযোগে এই কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু যত সহজে হয়েছে, তত সহজে কী সব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে? এই প্রশ্নটাই মধ্যবর্তী বা আগাম নির্বাচনের বিষয়টিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার প্রায় শীর্ষে নিয়ে এসেছে। যুক্তিসঙ্গতভাবেই আলোচনা হচ্ছে যে, এই ধরনের চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের জন্য যে কোনো দেশের সরকারকে প্রকৃত অর্থে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হতে হয়। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনটিকে কোনোক্রমেই আদর্শ নির্বাচন বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনের ঘোষিত তারিখের ১৫ দিন আগেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ৩০০ আসনের সংসদের ১৫৩ জন ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচন’ ছাড়াই এমপি হয়ে যান। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচনের’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক। বাকি ১৪৭ আসনের নির্বাচন কেমন হয়েছিল দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের চোখের সামনেই তো হয়েছে সব। ৪৯টি কেন্দ্রে একটি ভোটও কাস্ট হয়নি। সিল মারামারি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অনৈতিক আচরণ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সব কিছুই দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হয়েছে। এমন একটি বিতর্কিত নির্বাচনকে জাস্টিফাই করার জন্য লীগ সরকার, তাদের লোকজন দুটি যুক্তি উত্থাপন করেন। এক. এটি সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন। এতে সাংবিধানিক নির্দেশের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি দুই. কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে কোনো ব্যক্তির নির্বাচিত হতে আইনি কোনো বাধা নেই। এ ধরনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড বাংলাদেশেই আছে। প্রথম যুক্তির পেছনে তারা বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের বিষয়কে দায়ী করেন। কিন্তু বিরোধীরা নির্বাচনটা কেন বর্জন করল তা আড়ালে রাখেন। বিএনপি নির্বাচনপন্থি একটি দল। আদর্শ নির্বাচন হলে তাতে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্য যে, আমাদের দেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব একে অপরকে বিশ্বাস করেন না। পারস্পরিক এই অনাস্থাজনিত কারণেই নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল এবং সব দলের সম্মতিতে তা সংবিধানে সনি্নবেশিত হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন লীগ সরকার এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বাতিল করে দেয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে। সব দলের সম্মতিতে গৃহীত ব্যবস্থাটি একদলীয় সিদ্ধান্তেই বাতিল হয়ে যায়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল অবিরাম অভিযোগ করে আসছে যে, নিজেদের জয় নিশ্চিত করার জন্যই ক্ষমতাসীনরা অনৈতিক কাজটি করেছে। ব্যবস্থাটি ছিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ প্রতিপক্ষ শক্তিসমূহকে নির্বাচনের বাইরে রাখার একটা রাজনৈতিক কূট-কৌশল। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়ে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দলই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছে। দ্বিতীয়ত, তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জনের নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পক্ষে অতীতের যে যুক্তি হাজির করেন তা হাস্যকর। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৪৯ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অতীতে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে কোনো দলের বা জোটের জয়লাভের রেকর্ড নেই। এবার তাই হয়েছে। সরকার গঠন করতে লাগে ১৫১ জন এমপির সমর্থন। সে ক্ষেত্রে শাসকদল ক্ষমতায় থেকে, পূর্ববর্তী পার্লামেন্ট বহাল রেখে বিনা ভোটে ১৫৩ আসন করায়ত্ত করে, অর্থাৎ জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই সরকার গঠন করার ব্যবস্থা করে ফেলে সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতার দোহাই দিয়ে। নৈতিক বৈধতার বিষয়টিও গ্রাহ্য করছেন না তারা। বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে স্বাক্ষরিত চুক্তি, প্রটোকল এবং সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের প্রশ্নেই উঠেছে বাংলাদেশের যে সরকারের সঙ্গে এতসব সই-সাবুদে হলো, এসব বাস্তবায়নে সে সরকারের সক্ষমতা কতটুকু? জনগণের ‘পপুলার ম্যান্ডেটহীন একটি সরকারের পক্ষে কি তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? খোদ ভারতেও এই প্রশ্ন উঠেছে। প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তো আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে ‘পড়ন্ত ভাবমূর্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার পড়ন্ত ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য অসময়ে তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন।

কানেকটিভিটি, বহুল কাঙ্ক্ষিত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ এবং নিজ দেশের সারপ্লাস পুঁজি বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুবিধাসহ অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন ভারতের জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু যে সরকারের প্রতি তার দেশের জনগণের ম্যান্ডেট প্রশ্নবিদ্ধ, সেই সরকার কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবে তা ভারতের প্রশংসিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নরেন্দ্র মোদির গণতান্ত্রিক সরকারকে ভাবিয়ে তুলতেই পারে। বাংলাদেশ সরকারের একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জনসমর্থনের দিক থেকে আওয়ামী লীগের সমান সমান (অন্যান্য বিরোধী দলের সমর্থন নিয়ে অনেক বেশি) বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও প্রায় ১৫ মিনিট একান্ত (ওয়ান-টু-ওয়ান) আলোচনাকে সেই ভাবনা থেকে মুক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এই সফরকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন লীগ সরকার মনস্তাত্তি্বক দৌর্বল্য কাটাতে চেয়েছিল বেগম জিয়াকে মানসিকভাবে আরও ধসিয়ে দিয়ে। মোদি-খালেদা বৈঠক না হলে তারা সফল হয়ে যেত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী সংবাদ সম্মেলন করে ‘খালেদা-মোদি বৈঠক হবে না’ ঘোষণা করার মাহাত্দ্য মানুষ বুঝেছে। তারা জানতেন, এমন বৈঠক বেগম জিয়া এবং তার দল ও সমর্থকদের ‘মোরাল’ অনেক উঁচুতে নিয়ে যাবে এবং তা বিএনপি-বিজেপি সম্পর্কের একটা নতুন দিগন্তও উন্মোচন করে দিতে পারে। বৈঠকটি না হওয়ার জন্য লীগ সরকার ভারত সরকারের কাছে দরখাস্ত দিয়ে কোনো অনুনয়-বিনয় করেছে কিনা, কিংবা আমাদের পররাষ্ট্র দফতর দিল্লির ‘সাউথ ব্লকের সঙ্গে কোনো দেনদরবার করেছে কিনা জানি না, তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে একটি অন্তর্নিহিত ম্যাসেজ তো পরিষ্কার ছিল যে, বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদির ‘হোস্ট’ এমন একটি বৈঠক চায় না। কিন্তু সেই ম্যাসেজে যে কোনো কাজ হয়নি, তাকে যে দিল্লির ‘সাউথ ব্লক’ পাত্তাই দেয়নি তার প্রমাণ পাওয়া গেছে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘বৈঠক হবে না’ ঘোষণার চার ঘণ্টা পর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গোটা সরকার এবং সরকারের ‘দলদাস’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা তাতে লজ্জা পাওয়ার কথা। জানি না পেয়েছেন কিনা! ব্যাকফুটে ছিল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগের দেশি-বিদেশি নানামুখী চাপ এবং তিন মাসের ব্যর্থ আন্দোলন শেষে বেগম খালেদা জিয়ার চেহারায় যে ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর তার সেই ক্লান্তি ও ছাপ কেটে গেছে বলে মনে হয়। তাকে বেশ আত্দপ্রত্যয়ী মনে হচ্ছিল, আচরণে-উচ্চারণে মনে হচ্ছে তিনি বেশ উজ্জীবিত। তার তো এখন একটাই এজেন্ডা- একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রায়- সারা গণতান্ত্রিক দুনিয়াই তা চেয়েছে, এখনো চায়। এই ব্যাপারে ভারতের এতদিনের ভূমিকা সবারই জানা। খালেদা-মোদি বৈঠকে ভারতের সেই ভূমিকা পরিবর্তনের কি ইঙ্গিত মিলেছে? এটা জানেন নরেন্দ্র মোদি, জানেন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া মুখে কিছু বলছেন না। কিন্তু তার বডি ল্যাংগুয়েজে কি কিছু বোঝা যায় না? তিনি দল পুনর্গঠনের কথা বলছেন। বৃদ্ধ, অসুস্থ, নিষ্ক্রিয় এবং খারাপ ব্যক্তিদের দল থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলছেন। দল ছেড়ে যাওয়াদের দলে ফেরাচ্ছেন। নির্বাচনী এলাকায় যেতে বলছেন সবাইকে। ঈদের পর কাজ শুরু হবে আরও জোরে। অপরদিকে শাসকলীগেও হাওয়া বইছে নির্বাচনের। এমপিদের এলাকায় যাওয়ার এবং নির্দিষ্ট সময় এলাকায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যোগ্যপ্রার্থী বাছাই কাজ শুরু হয়েছে। যারা দলের বোঝা, মন্ত্রী হলেও তাদের বাদ দিয়ে দলের ইমেজ সংকট পূরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দল, অঙ্গদল ও সহযোগী দলের কমিটি গঠন-পুনর্গঠনের মাধ্যমে দলকে চাঙ্গা করার কাজ পুরোদমে শুরু হবে ঈদের পর। সবই নির্বাচনেরই প্রস্তুতি। ২০১৯ সালে নির্বাচন হলে প্রধান দুই দলে এত আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি কেন?

মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবার পেছনে তিন পক্ষের তিনটি স্বার্থের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এক. ভারত একটি নির্বাচনমুখী গণতন্ত্র অনুশীলনের দেশ। মোদি সরকার সেই দেশের জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত। প্রতিবেশী দেশেও জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার থাকলে সম্পর্কোন্নয়ন এবং উভয় দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে তা উপযোগী বলে তারা ভাবতে পারে। সরকার জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত কিনা তা প্রমাণিত হয় একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে তেমন একটি নির্বাচন হোক তা তারা চাইতে পারে নিজেদের স্বার্থেও। কেননা, তেমন একটি সরকার ছাড়া যত চুক্তিই করা হোক, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দুই. সরকার ২০১৪ সালের নির্বাচনের নেতিবাচক বোঝা টানছে। তারা মনে করছে প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ তারা করেছে। জনগণ তাদের পক্ষে। বিএনপি এখন একেবারেই কাবু। এখন নির্বাচন করলে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা ভোগের পরিণতি তাদেরও অজানা নয়। অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনে হেরে গেলেও একটা ‘সেইফ এঙ্টি’ তৈরি হবে তাদের জন্য। তিন. বিএনপি মনে করছে আগাম নির্বাচন হলে তারা সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তা ছাড়া দল গোছানো হবে, জেল-জুলুম, মামলা-মোকদ্দমা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হলে সরকারকে এসব বিবেচনা করতেই হবে। যদি ক্ষমতায় যাওয়া না-ও যায়, সম্মানজনক আসন নিয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে সংসদে থাকতে পারবে, দল রক্ষা হবে। বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে মামলায় সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করলে পরিস্থিতি জটিল হবে বটে; তবে ধারণা করা হয়, তারপরও বিএনপি নির্বাচনে যাবে।

এসব নানাবিধ সমীকরণ থেকেই দেশে আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত কি বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন চায়! কাজী সিরাজ

আপডেট টাইম : ০৫:১৭:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০১৫

লীগ সরকার একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তাভাবনা করছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির কোনো কোনো নেতাও এ ধরনের সম্ভাবনার কথা নাকচ করছেন না। তবে তারা শঙ্কিত এই কারণে যে, তার আগে সরকার বিএনপিকে ভেঙে তছনছ করে দিতে পারে। এমন কি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার ব্যবস্থাটিও পাকাপোক্ত করে নিতে পারে। এ উদ্দেশ্যে তাদের দুজনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুর্নীতি মামলার কাজ দ্রুত যাতে সম্পন্ন হয় সে জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের তৎপরতা হয়তো আরও বেড়ে যাবে। জিয়া অরফানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন তাতে মাতা-পুত্রের সাজা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ড হয়ে গেলেই তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য হয়ে যাবেন। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে ফৌজদারি মামলায় এমন দণ্ড হলে দণ্ড চলাকালীন সময় তো বটেই, কারামুক্তির পরবর্তী পাঁচ বছরও অপরাধীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো সুযোগ নেই। কেউ কেউ বলছেন, এ অবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আয়োজন করলে বিএনপি সেই নির্বাচনে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তখন বিএনপিতে নির্বাচনপন্থি অংশ দলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে পৃথক বিএনপি গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। সরকার সেই সুযোগটি কাজে লাগানোর কৌশল নেবে। কিন্তু সেই কৌশলে কি কাজ হবে? মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রশ্ন তো এসেছে দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ থেকে। খালেদা জিয়া-তারেকবিহীন একটি সরকারপন্থি বিএনপিকে নির্বাচনে এনে কি এটা প্রমাণ করা যাবে যে, নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে? সরকারের বিএনপি ভাঙার কোনো পরিকল্পনা যদি থাকে তাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের উদ্দেশ্য মোটেই সফল হবে না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রসঙ্গটা নতুন নয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এই দাবিতে আন্দোলনরত। তিন মাসের ব্যর্থ আন্দোলনে জামায়াতের এজেন্ডা ভিন্ন থাকলেও বিএনপির এজেন্ডা ছিল আগাম বা মধ্যবর্তী একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন। বিএনপির সেই দাবি এখন সম্ভাব্যতার নিরিখে বিবেচনা হচ্ছে। এই ভাবনা বিএনপির বাইরের লোকজনেরও ভাবনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের পর এই আলোচনা বেশ অর্থপূর্ণই মনে হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদির সফরের উদ্দেশ্য ছিল দ্বিবিধ। এক. নিকট প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে ভারতের আগের ‘প্রভুত্বের’ নয়- ‘বন্ধুত্বের’, ‘বড়ভাইয়ের’ নতুন সম্পর্কনীতি বাস্তবায়নের সদিচ্ছা প্রমাণ করে নিজেকে শুধু ভারতের নেতা নয়, আঞ্চলিক একক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং দুই. বাংলাদেশে ভারতের জরুরি স্বার্থসমূহ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সেই গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য সফল করার লক্ষ্যেই তার সফরকালে বাংলাদেশ-ভারত ২২টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণাও প্রকাশ করা হয়েছে। বিনা বাধায়, বিনা গোলযোগে এই কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু যত সহজে হয়েছে, তত সহজে কী সব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে? এই প্রশ্নটাই মধ্যবর্তী বা আগাম নির্বাচনের বিষয়টিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার প্রায় শীর্ষে নিয়ে এসেছে। যুক্তিসঙ্গতভাবেই আলোচনা হচ্ছে যে, এই ধরনের চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের জন্য যে কোনো দেশের সরকারকে প্রকৃত অর্থে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হতে হয়। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনটিকে কোনোক্রমেই আদর্শ নির্বাচন বলা যাচ্ছে না। নির্বাচনের ঘোষিত তারিখের ১৫ দিন আগেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ৩০০ আসনের সংসদের ১৫৩ জন ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচন’ ছাড়াই এমপি হয়ে যান। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচনের’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক। বাকি ১৪৭ আসনের নির্বাচন কেমন হয়েছিল দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের চোখের সামনেই তো হয়েছে সব। ৪৯টি কেন্দ্রে একটি ভোটও কাস্ট হয়নি। সিল মারামারি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অনৈতিক আচরণ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সব কিছুই দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হয়েছে। এমন একটি বিতর্কিত নির্বাচনকে জাস্টিফাই করার জন্য লীগ সরকার, তাদের লোকজন দুটি যুক্তি উত্থাপন করেন। এক. এটি সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন। এতে সাংবিধানিক নির্দেশের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি দুই. কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যে কোনো ব্যক্তির নির্বাচিত হতে আইনি কোনো বাধা নেই। এ ধরনের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড বাংলাদেশেই আছে। প্রথম যুক্তির পেছনে তারা বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের বিষয়কে দায়ী করেন। কিন্তু বিরোধীরা নির্বাচনটা কেন বর্জন করল তা আড়ালে রাখেন। বিএনপি নির্বাচনপন্থি একটি দল। আদর্শ নির্বাচন হলে তাতে তাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্য যে, আমাদের দেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব একে অপরকে বিশ্বাস করেন না। পারস্পরিক এই অনাস্থাজনিত কারণেই নির্বাচনকালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছিল এবং সব দলের সম্মতিতে তা সংবিধানে সনি্নবেশিত হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন লীগ সরকার এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বাতিল করে দেয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে। সব দলের সম্মতিতে গৃহীত ব্যবস্থাটি একদলীয় সিদ্ধান্তেই বাতিল হয়ে যায়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল অবিরাম অভিযোগ করে আসছে যে, নিজেদের জয় নিশ্চিত করার জন্যই ক্ষমতাসীনরা অনৈতিক কাজটি করেছে। ব্যবস্থাটি ছিল প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ প্রতিপক্ষ শক্তিসমূহকে নির্বাচনের বাইরে রাখার একটা রাজনৈতিক কূট-কৌশল। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়ে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দলই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছে। দ্বিতীয়ত, তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জনের নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পক্ষে অতীতের যে যুক্তি হাজির করেন তা হাস্যকর। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৪৯ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অতীতে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে কোনো দলের বা জোটের জয়লাভের রেকর্ড নেই। এবার তাই হয়েছে। সরকার গঠন করতে লাগে ১৫১ জন এমপির সমর্থন। সে ক্ষেত্রে শাসকদল ক্ষমতায় থেকে, পূর্ববর্তী পার্লামেন্ট বহাল রেখে বিনা ভোটে ১৫৩ আসন করায়ত্ত করে, অর্থাৎ জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই সরকার গঠন করার ব্যবস্থা করে ফেলে সাংবিধানিক শাসনের ধারাবাহিকতার দোহাই দিয়ে। নৈতিক বৈধতার বিষয়টিও গ্রাহ্য করছেন না তারা। বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে স্বাক্ষরিত চুক্তি, প্রটোকল এবং সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের প্রশ্নেই উঠেছে বাংলাদেশের যে সরকারের সঙ্গে এতসব সই-সাবুদে হলো, এসব বাস্তবায়নে সে সরকারের সক্ষমতা কতটুকু? জনগণের ‘পপুলার ম্যান্ডেটহীন একটি সরকারের পক্ষে কি তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? খোদ ভারতেও এই প্রশ্ন উঠেছে। প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তো আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে ‘পড়ন্ত ভাবমূর্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার পড়ন্ত ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য অসময়ে তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন।

কানেকটিভিটি, বহুল কাঙ্ক্ষিত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ এবং নিজ দেশের সারপ্লাস পুঁজি বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুবিধাসহ অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন ভারতের জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু যে সরকারের প্রতি তার দেশের জনগণের ম্যান্ডেট প্রশ্নবিদ্ধ, সেই সরকার কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবে তা ভারতের প্রশংসিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নরেন্দ্র মোদির গণতান্ত্রিক সরকারকে ভাবিয়ে তুলতেই পারে। বাংলাদেশ সরকারের একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জনসমর্থনের দিক থেকে আওয়ামী লীগের সমান সমান (অন্যান্য বিরোধী দলের সমর্থন নিয়ে অনেক বেশি) বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও প্রায় ১৫ মিনিট একান্ত (ওয়ান-টু-ওয়ান) আলোচনাকে সেই ভাবনা থেকে মুক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এই সফরকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন লীগ সরকার মনস্তাত্তি্বক দৌর্বল্য কাটাতে চেয়েছিল বেগম জিয়াকে মানসিকভাবে আরও ধসিয়ে দিয়ে। মোদি-খালেদা বৈঠক না হলে তারা সফল হয়ে যেত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী সংবাদ সম্মেলন করে ‘খালেদা-মোদি বৈঠক হবে না’ ঘোষণা করার মাহাত্দ্য মানুষ বুঝেছে। তারা জানতেন, এমন বৈঠক বেগম জিয়া এবং তার দল ও সমর্থকদের ‘মোরাল’ অনেক উঁচুতে নিয়ে যাবে এবং তা বিএনপি-বিজেপি সম্পর্কের একটা নতুন দিগন্তও উন্মোচন করে দিতে পারে। বৈঠকটি না হওয়ার জন্য লীগ সরকার ভারত সরকারের কাছে দরখাস্ত দিয়ে কোনো অনুনয়-বিনয় করেছে কিনা, কিংবা আমাদের পররাষ্ট্র দফতর দিল্লির ‘সাউথ ব্লকের সঙ্গে কোনো দেনদরবার করেছে কিনা জানি না, তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে একটি অন্তর্নিহিত ম্যাসেজ তো পরিষ্কার ছিল যে, বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদির ‘হোস্ট’ এমন একটি বৈঠক চায় না। কিন্তু সেই ম্যাসেজে যে কোনো কাজ হয়নি, তাকে যে দিল্লির ‘সাউথ ব্লক’ পাত্তাই দেয়নি তার প্রমাণ পাওয়া গেছে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘বৈঠক হবে না’ ঘোষণার চার ঘণ্টা পর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গোটা সরকার এবং সরকারের ‘দলদাস’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা তাতে লজ্জা পাওয়ার কথা। জানি না পেয়েছেন কিনা! ব্যাকফুটে ছিল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগের দেশি-বিদেশি নানামুখী চাপ এবং তিন মাসের ব্যর্থ আন্দোলন শেষে বেগম খালেদা জিয়ার চেহারায় যে ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর তার সেই ক্লান্তি ও ছাপ কেটে গেছে বলে মনে হয়। তাকে বেশ আত্দপ্রত্যয়ী মনে হচ্ছিল, আচরণে-উচ্চারণে মনে হচ্ছে তিনি বেশ উজ্জীবিত। তার তো এখন একটাই এজেন্ডা- একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রায়- সারা গণতান্ত্রিক দুনিয়াই তা চেয়েছে, এখনো চায়। এই ব্যাপারে ভারতের এতদিনের ভূমিকা সবারই জানা। খালেদা-মোদি বৈঠকে ভারতের সেই ভূমিকা পরিবর্তনের কি ইঙ্গিত মিলেছে? এটা জানেন নরেন্দ্র মোদি, জানেন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া মুখে কিছু বলছেন না। কিন্তু তার বডি ল্যাংগুয়েজে কি কিছু বোঝা যায় না? তিনি দল পুনর্গঠনের কথা বলছেন। বৃদ্ধ, অসুস্থ, নিষ্ক্রিয় এবং খারাপ ব্যক্তিদের দল থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলছেন। দল ছেড়ে যাওয়াদের দলে ফেরাচ্ছেন। নির্বাচনী এলাকায় যেতে বলছেন সবাইকে। ঈদের পর কাজ শুরু হবে আরও জোরে। অপরদিকে শাসকলীগেও হাওয়া বইছে নির্বাচনের। এমপিদের এলাকায় যাওয়ার এবং নির্দিষ্ট সময় এলাকায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যোগ্যপ্রার্থী বাছাই কাজ শুরু হয়েছে। যারা দলের বোঝা, মন্ত্রী হলেও তাদের বাদ দিয়ে দলের ইমেজ সংকট পূরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দল, অঙ্গদল ও সহযোগী দলের কমিটি গঠন-পুনর্গঠনের মাধ্যমে দলকে চাঙ্গা করার কাজ পুরোদমে শুরু হবে ঈদের পর। সবই নির্বাচনেরই প্রস্তুতি। ২০১৯ সালে নির্বাচন হলে প্রধান দুই দলে এত আগে নির্বাচনের প্রস্তুতি কেন?

মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবার পেছনে তিন পক্ষের তিনটি স্বার্থের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এক. ভারত একটি নির্বাচনমুখী গণতন্ত্র অনুশীলনের দেশ। মোদি সরকার সেই দেশের জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত। প্রতিবেশী দেশেও জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার থাকলে সম্পর্কোন্নয়ন এবং উভয় দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে তা উপযোগী বলে তারা ভাবতে পারে। সরকার জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত কিনা তা প্রমাণিত হয় একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে তেমন একটি নির্বাচন হোক তা তারা চাইতে পারে নিজেদের স্বার্থেও। কেননা, তেমন একটি সরকার ছাড়া যত চুক্তিই করা হোক, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দুই. সরকার ২০১৪ সালের নির্বাচনের নেতিবাচক বোঝা টানছে। তারা মনে করছে প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ তারা করেছে। জনগণ তাদের পক্ষে। বিএনপি এখন একেবারেই কাবু। এখন নির্বাচন করলে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে। শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা ভোগের পরিণতি তাদেরও অজানা নয়। অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনে হেরে গেলেও একটা ‘সেইফ এঙ্টি’ তৈরি হবে তাদের জন্য। তিন. বিএনপি মনে করছে আগাম নির্বাচন হলে তারা সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তা ছাড়া দল গোছানো হবে, জেল-জুলুম, মামলা-মোকদ্দমা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হলে সরকারকে এসব বিবেচনা করতেই হবে। যদি ক্ষমতায় যাওয়া না-ও যায়, সম্মানজনক আসন নিয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে সংসদে থাকতে পারবে, দল রক্ষা হবে। বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে মামলায় সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করলে পরিস্থিতি জটিল হবে বটে; তবে ধারণা করা হয়, তারপরও বিএনপি নির্বাচনে যাবে।

এসব নানাবিধ সমীকরণ থেকেই দেশে আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট