ট্রেন ছুটছে। জানালার বাইরে একের পর এক দৃশ্য পেছনে পড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি নিয়ে কেউ বসে আছেন, কেউ দাঁড়িয়ে। ভিড় বাড়লে জায়গা আরও সংকুচিত হয়। সেই ভিড়ের মধ্যেই একজন নারীকে হয়তো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে, কখনো আবার অপরিচিত পুরুষ যাত্রীর পাশের আসনেই কেটে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পরিবারের সদস্যদের কেউ সঙ্গে না থাকলে অস্বস্তির সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও।
দীর্ঘ পথযাত্রায় তাই নারীদের জন্য আলাদা একটি কোচ অনেকের কাছেই শুধু স্বস্তির জায়গা নয়, নিরাপদে পথ পাড়ি দেওয়ার একটি প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক এখনো বেশ বড়। ট্রেনে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা কোচ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কোথাও পরীক্ষামূলকভাবে চালুও হয়েছে। অথচ দেশের সব আন্তঃনগর ট্রেনে তা নিয়মিত ব্যবস্থা হিসেবে নিশ্চিত হয়নি।
এর মধ্যেই রেলওয়ের নতুন আইনের খসড়ায় নারী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত কোচ বা স্থানে পুরুষের প্রবেশের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, নারী কোচ থাকলে সেখানে পুরুষ ঢুকতে পারবেন না। ঢুকলে গুনতে হতে পারে জরিমানা, এমনকি হতে পারে কারাদণ্ডও। কিন্তু যে প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে, তা হলো, নারীদের জন্য সেই কোচটি থাকবে কোথায়? কতটি থাকবে? কতটি আসন থাকবে?
খসড়ার ১০৪ ধারায় বলা হয়েছে, রেলওয়ে কোনো ক্যারেজ, কম্পার্টমেন্ট, কক্ষ বা অন্য কোনো স্থান শুধু নারী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষণ করেছে, এটি জানা সত্ত্বেও কোনো পুরুষ যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া সেখানে প্রবেশ করলে এবং রেলওয়ে কর্মচারীর অনুরোধের পরও স্থানটি ত্যাগ না করলে তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে।
এ ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা জরিমানা, অথবা তিন মাসের কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই ব্যক্তির পরিশোধ করা ভাড়া, পাস বা কেনা টিকিট বাজেয়াপ্ত করা এবং তাকে রেলওয়ে থেকে অপসারণের ক্ষমতাও রাখা হয়েছে।
আইনের ভাষায় সংরক্ষিত জায়গাটির সীমানা তাই বেশ স্পষ্ট। কিন্তু নারীদের জন্য সেই জায়গাটি নিশ্চিত করার ছবিটা ততটা স্পষ্ট নয়।
খসড়ার ১০৪ ধারায় প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেনে কিংবা নির্দিষ্টসংখ্যক ট্রেনে নারীদের জন্য আলাদা ক্যারেজ রাখতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নেই। অর্থাৎ, রেলওয়ে কোনো কোচ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করলে সেখানে পুরুষের প্রবেশ ঠেকাতে শাস্তির বিধান কার্যকর হবে। কিন্তু কোনো ট্রেনে নারী কোচ না থাকলে সেটি চালু করার জন্য একই ধারায় রেলওয়ের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে না।
ফলে আইনের কাঠামোয় শাস্তির জায়গাটি যেমন নির্দিষ্ট, নারী কোচ নিশ্চিত করার জায়গাটি তেমন নির্দিষ্ট নয়। কোথাও নারী কোচ থাকলে সেটি রক্ষায় আইন আছে, কিন্তু কোথায় নারী কোচ
থাকতে হবে, কতটি থাকতে হবে কিংবা কতসংখ্যক আসন নারীদের জন্য রাখা হবে, তার কোনো বাধ্যতামূলক কাঠামো নেই।
নারী কোচ চালুর উদ্যোগ ও এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি প্রস্তাবিত আইনের বিধানটি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে নারী কোচ কোথায় থাকবে, কতটি আসন সংরক্ষিত হবে এবং যাত্রীরা কীভাবে তা শনাক্ত করবেন, এসব বিষয় আইনে স্পষ্ট না থাকলে বিধানটি বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী ও সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। তিনি বলেন, ‘আইনের কোনো বিধান কার্যকর করতে হলে তার বাস্তবায়নের দায়িত্বও স্পষ্ট থাকা
প্রয়োজন। শুধু নারী সংরক্ষিত কোচে পুরুষের প্রবেশের জন্য শাস্তির বিধান রেখে যদি কোথায়, কোন ট্রেনে এবং কতটি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, তা নির্ধারণ করা না হয়, তা হলে বিধানটি অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এতে নারীদের জন্য সুরক্ষার প্রত্যাশা তৈরি হবে, কিন্তু সেই সুরক্ষা পাওয়ার আইনগত ও প্রশাসনিক নিশ্চয়তা থাকবে না। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই অন্তত ন্যূনতম সংরক্ষণের মানদণ্ড এবং তা নির্ধারণ ও প্রকাশের দায়িত্ব রেলওয়ের ওপর স্পষ্ট করা প্রয়োজন। নারীর নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে শাস্তির পাশাপাশি নারী কোচ ও আসন সংরক্ষণের বিষয়টিও আইনে নিশ্চিত করা উচিত।’
জয়দেবপুর স্টেশন থেকে প্রতিদিন কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনে যাতায়াত করেন সুমাইয়া রহমান। দীর্ঘদিনের এই যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘপথের ট্রেনযাত্রায় একজন নারী হিসেবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিরাপদ ও স্বস্তিতে থাকা। ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় নারী যাত্রীদের দাঁড়িয়ে যেতে হয়, আবার অপরিচিত পুরুষ যাত্রীর পাশে দীর্ঘসময় বসেও যেতে হয়। পরিবার ছাড়া একা ভ্রমণ করলে বিষয়টি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তাই নারীদের জন্য আলাদা কোচ থাকলে তারা অন্তত যাত্রাপথে কিছুটা স্বস্তি ও নিরাপত্তা পাবেন।’
আরেক নারী যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, ‘নারীদের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করা হলে সেখানে পুরুষ ঢুকতে পারবে না, এটা ঠিক। কিন্তু তার আগে নারীদের জন্য সেই জায়গাটা নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু নারী কোচে ঢুকলে পুরুষকে শাস্তি দেওয়া হবে, অথচ কোথায় নারী কোচ থাকবে সেটাই যদি নির্দিষ্ট না থাকে, তা হলে আইনটি নারীদের জন্য কতটা সুবিধা তৈরি করবে, সেটি প্রশ্নের বিষয়। রেল যদি সত্যিই নারীদের নিরাপদ যাত্রার কথা ভাবে, তা হলে নারী কোচ কোথায় থাকবে এবং কতটি থাকবে, সেটিও স্পষ্ট করা উচিত।’
নারীদের জন্য আলাদা কোচের ভাবনাটি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় পরীক্ষামূলকভাবে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ও জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ কোচ যুক্ত করা হয়। ঈদের পর অন্যান্য আন্তঃনগর ট্রেনেও এমন কোচ চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
কিন্তু ঈদের সেই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এখনো দেশের সব আন্তঃনগর ট্রেনে নিয়মিত ব্যবস্থায় রূপ নেয়নি। ফলে ট্রেনের দীর্ঘ পথযাত্রায় নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা জায়গার যে প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
Reporter Name 





















