স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের কাছে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা থেকে ৪৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নৌকাটিতে থাকা ১২৭ যাত্রীর মধ্যে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিহতদের মধ্যে চার নারী ও একটি শিশুও ছিল বলে জানিয়েছে স্পেনের বেসরকারি সংস্থা ‘কামিনান্দো ফ্রন্তেরাস’ (ওয়াকিং বর্ডার্স)। মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
প্রতিবেদনে সংস্থাটির প্রধান হেলেনা মালেনোর বরাতে জানান হয়, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া থেকে নৌকাটি যাত্রা শুরু করেছিল ২৭ দিন আগে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থাকার পর বুধবার রাতে নৌকাটি স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়ার দক্ষিণ উপকূলের আর্গুইনেগিন শহর থেকে প্রায় ৬৫ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ভাসমান অবস্থায় শনাক্ত করা হয়।
স্পেনের মেরিটাইম সেফটি অ্যান্ড রেসকিউ সোসাইটি (সাসেমার) জানায়, নৌকাটি ছিল একটি অস্থায়ীভাবে তৈরি ছোট নৌযান। সেখান থেকে ৪৪ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় হেলিকপ্টারে করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
খারাপ আবহাওয়ার কারণে নৌকায় থাকা আরও পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে সাসেমার। উদ্ধারকৃতরা হওয়া সাব-সাহারান আফ্রিকার বলে জানিয়েছে স্পেনের এই সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ। তবে গাম্বিয়া থেকে যাত্রার সময় নৌকাটিতে ঠিক কতজন ছিলেন, তা তারা নিশ্চিত করতে পারেনি।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে বেঁচে যাওয়া অভিবাসীদের দেখভাল করছে রেড ক্রস। সংস্থাটির এক মুখপাত্র জানান, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অনেকে মালি ও সেনেগালের নাগরিক। তাদের মধ্যে কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্কও রয়েছে।
রেড ক্রসের মুখপাত্র হোসে আন্তোনিও রদ্রিগেস ভেরোনার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন সমুদ্রে আটকে থাকার কারণে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা দিশেহারা ও পানিশূন্য হয়ে পড়েছিলেন। তীরে পৌঁছানোর পর অনেকে জ্ঞান হারিয়ে পড়ছিলেন বা বমি করছিলেন। তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা ‘অনেক, অনেক দিন’ সমুদ্রে আটকে ছিলেন। কারও কারও ধারণা, প্রায় এক মাস ধরে তারা সমুদ্রে ভাসছিলেন।
বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে শুরুতে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে নারী ও এক শিশুও ছিল। খাদ্য ও পানীয় শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি তৃষ্ণা মেটাতে বাধ্য হয়ে সমুদ্রের পানি পান করেছিলেন তারা।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, একপর্যায়ে নৌকায় থাকা মৃতদের মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া শুরু হয়। পরে জীবিতদের শক্তিও ফুরিয়ে যাওয়ায় মরদেহ সরিয়ে ফেলার কাজও বন্ধ হয়ে যায় বলে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অভিবাসনের পথগুলোর মধ্যে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জগামী আটলান্টিক রুটটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলে জানিয়েছে কামিনান্দো ফ্রন্তেরাস। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই স্পেনে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিভিন্ন অভিবাসন রুটে ১ হাজার ৩১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৪২ নারী ও ১২৯ শিশু রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার সময় মারা গেছেন।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ সরকারের প্রধান ফার্নান্দো ক্লাভিহো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, মানুষের প্রাণহানি অব্যাহত থাকা ‘অসহনীয়’। আটলান্টিককে যেন ‘মৃত্যুর পথ’ হিসেবে স্বাভাবিক করে নেওয়া না হয়, সেই আহ্বান জানান তিনি।
ক্লাভিহো বলেন, অভিবাসন সংকটকে একের পর এক জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে সামাল দেওয়া আর সম্ভব নয়। তার ভাষায়, বিষয়টি মানুষের জীবন ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধরনের ঘটনা আরও কার্যকর রাষ্ট্রীয় অভিবাসন নীতির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, স্পেনের অভিবাসন নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের ওপর রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। গত জুলাইয়ে মাত্র দুই দিনে মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় আনুমানিক ৭২ হাজার মানুষ প্রবেশ করেছিল। ওই ব্যাপক সীমান্ত পারাপারকে কেন্দ্র করে স্পেনজুড়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি কূটনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়।
নতুন এই নৌকাডুবি বা অভিবাসী মৃত্যুর ঘটনায় ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি আবারও সামনে এলো।
Reporter Name 























