বিভিন্ন বিষয়ে আমার আসতে দেরি হয়ে গেলেও আজকে হাজার শুকরিয়া জানাই আল্লাহর কাছে—আমি এসে সালামটা হুজুরকে দিতে পেরেছি। – হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও দেশের খ্যাতনামা আলেমেদ্বীন আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও দোয়া গ্রহণের পর এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় রবিবার (৯ আগষ্ট) প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যেভাবে একসঙ্গে কাজ করা হয়েছে, হুজুরের দোয়া নিয়ে আগামী দিনগুলোতেও দেশ গঠনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ফটিকছড়িতে প্রধানমন্ত্রীর এ সফর ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। পাইন্দং ইউনিয়নের পেলাগাজী সিএনবি মাঠে হেলিপ্যাড প্রস্তুতসহ নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। হেলিকপ্টারে করে ফটিকছড়িতে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী সরাসরি জামিয়া বাবুনগর মাদ্রাসায় যান। সেখানে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, মতবিনিময় ও সালাম করেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে সালাম বিনিময় করে জড়িয়ে ধরেন। মুনাজাতে আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য বিশেষ মুনাজাত করেন। মুনাজাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপদ, সুস্থ ও কল্যাণময় জীবন এবং দেশ পরিচালনায় সফলতা কামনা করেন। দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও কল্যাণের জন্যও মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়ি সফরের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে আল্লামা বাবুনগরীর এই দোয়া ও মুনাজাত।
দেশের প্রায় ৫০ জন ওলামা মাশায়েকের সাথে সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিগত দুর্দিনের সময়ে আমরা একসঙ্গে থেকে দেশকে একটি বিপদ থেকে রক্ষা করতে পেরেছি। একসঙ্গে যে কাজটা আমরা করেছি, যেটা হুজুরের দোয়ায় আপনারা সবাই করেছেন। হুজুর দোয়া করেছেন, সেজন্য আমরা সফল হয়েছি।
তিনি বলেন, দেশের সমস্যা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিগত ফ্যাসিবাদের সময় সারাদেশের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে তিনি বিভিন্ন সমস্যা দেখেছেন বলেও জানান।
ফটিকছড়ির বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে হাসপাতাল, রাস্তাঘাট ও কর্মসংস্থানের দাবি রয়েছে। মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এসব সমস্যা সমাধান করতে হবে। মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, হাসপাতাল ঠিক করা, শিক্ষার ব্যবস্থা করা, স্কুল-কলেজের উন্নয়ন এবং ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা না থাকলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের সন্তানদের চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা হবে।
তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের আগে যেভাবে একসঙ্গে কাজ করেছি, আজকে হুজুরের দোয়া নিয়ে আগামী দিনগুলোতেও আমাকে, আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা চাই এমন একটা বাংলাদেশ তৈরি করতে, যেখানে বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের সন্তানরা সুখে বেঁচে থাকবে। বিভিন্ন মানুষ আমরা একসঙ্গে শান্তিতে থাকব।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলাম ধর্মের মূল্যবোধকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তাঁর রহমতে সরকার গঠন হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০ বছর আগে আমরা যুদ্ধ করেছি একসঙ্গে। নির্বাচনের পরে আমরা দেশ গঠনে কাজ করব একসঙ্গে।’
হেফাজতের ৯ দফা দাবি
মতবিনিময় সভায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নয়টি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো উপস্থাপন করেন সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মাদ সাজেদুর রহমান।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কুরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস; কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা; ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় জড়িতদের বিচার এবং ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাযজ্ঞে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়।
হেফাজতের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা, হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা, পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের অপতৎপরতা বন্ধ, আলেমদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে আলেম-ওলামাকে অংশীদার করা।
এ ছাড়া তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা, মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে আগমনের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়ার দাবিও জানানো হয়।
‘এসব আমাদেরই দাবি’ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
হেফাজতের দাবিগুলোর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আপনারা যেসব দাবি দিয়েছেন, এসব আমাদেরই দাবি। এদেশে ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন হবে না।
তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের মামলার চার্জশিট হয়েছে, শিগগিরই বিচার হবে। আলেমদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তালিকা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের বিরুদ্ধে যা মামলা হয়েছে, তালিকা দেন, আবেদন দেন, কাজটা আমরা করবো।’
দাওরায়ে হাদিস শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে গেজেট হয়েছে। উপযুক্ত স্থানে তাদের পদায়ন করা হবে।
ধর্মীয় পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে কাজ করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা মদিনার সাথে আছি, সাহাবাদের চর্চিত ইসলামে আছি। ইনশাআল্লাহ, এভাবেই বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। আপনাদের সাথেই আমরা আছি।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফটিকছড়ি সফরকে স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ, সালাম প্রদান, দোয়া গ্রহণ এবং মুনাজাতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিশেষ দোয়া এ সফরকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়ি সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়; এটি দ্বীন ও রাষ্ট্রের মেলবন্ধনের এক অনন্য স্মারক। আলেমসমাজের পরামর্শ ও দেশীয় ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে দেশে ইনসাফ, শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শাকিলা ফারজানা, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল নোমান, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মাদ সাজেদুর রহমানসহ স্থানীয় আলেম-ওলামা ও নেতৃবৃন্দ।
প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে ফটিকছড়িতে জনস্রোত –
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে আজ রবিবার সকাল থেকেই ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের পেলাগাজী সিএনবি মাঠ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দুপুর ১২টার পর থেকে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে তৈরি হয় মানুষের দীর্ঘ সারি। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার অপেক্ষায় ছিলেন নারী, পুরুষ ও শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ।
বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ বিভিন্ন দাবিদাওয়া সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে সড়কের পাশে অবস্থান নেন। বিভিন্ন স্থান থেকে মিছিল নিয়ে আসেন নেতাকর্মীরা। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে চলে স্বাগত মিছিল ও স্লোগান। প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে স্থানীয়দের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টার থেকে অবতরণ করার পর হাজার হাজার জনতা তাকে অভিবাদন জানান। প্রধানমন্ত্রী ও পেলাগাজীদিঘী থেকে দীর্ঘ আট কিলোমিটার পথ বিশেষায়িত বাসে করে হাত নেড়ে ফটিকছড়িবাসীর প্রতিবেদনের জবাব দেন।
Reporter Name 




















