ঢাকা ১২:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বিলের পানিতে ডুবে ভাই-বোন নিহত এমন রাজনৈতিক চর্চা করা যাবে না, যাতে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের পথ সহজ হয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তরুণরা নেতৃত্ব দিলে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন টেকসই হবে: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে ইউএনওদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর আলেমদের সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, প্রস্তুত ৭ ভেন্যু সরাসরি বিশ্বকাপে আফগানিস্তান, বাংলাদেশের ভাগ্য সেই ভারতের হাতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেবে জামায়াত চিকিৎসক সমাজের পেশাগত উৎকর্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ড্যাব : জুবাইদা রহমান জেআইসিতে এক-এগারোর সময় তারেক রহমানকে নির্যাতনের তথ্য পাওয়া গেছে: চিফ প্রসিকিউটর

আলেমদের সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ বার

উলামায়ে কেরামকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন, বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, উলামায়ে কেরাম শুধু মসজিদে ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত কিংবা খুতবার মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাদের সঠিক পথনির্দেশনা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

শনিবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘মতবিরোধ নয়, ঐক্যেই গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে আয়োজিত এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। সম্মেলনে প্রস্তাবনা পেশ ও সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি ও তামিরুল মিল্লা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও ড. এএইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।

জামায়াত আমির বলেন, উলামায়ে কেরামের ইলম চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে কোরআন ও সুন্নাহ। আল্লাহর বিধান মানার পূর্ণাঙ্গ মডেল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার আনুগত্যের বাস্তব মডেল সাহাবায়ে কেরাম। মুসলিম উম্মাহ এই আদর্শ অনুসরণ করলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

উলামায়ে কেরামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতে হবে; তবে কাউকে অপমান, ছোট করা বা কটূক্তি করা যাবে না। দ্বীনের দাওয়াত এমনভাবে দিতে হবে, যাতে মানুষের হৃদয়ে তা পৌঁছে যায়। তিনি কোরআনের নির্দেশনার আলোকে প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর ভাষায় মানুষকে আহ্বান জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উলামায়ে কেরামের চিন্তা ও মত সবসময় এক হবে না। অতীতেও মতপার্থক্য ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে মতের ভিন্নতার কারণে কাউকে অসম্মান করা যাবে না। কেউ সমালোচনা বা কটূক্তি করলেও পাল্টা কটূক্তি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের জন্য দোয়া করতে হবে এবং তার বক্তব্যে কোনো কল্যাণকর বিষয় থাকলে তা গ্রহণ করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে উত্তেজনামূলক বক্তব্য বা ‘আক্রমণাত্মক’ মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। কেউ আমাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও আমরা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ব না অর্থাৎ উসকানির জবাব উসকানি দিয়ে না দিয়ে ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে আলিয়া ও কওমি দুই ধারার শিক্ষারই প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, আলিয়া শিক্ষায় শিক্ষিতরা সমাজের প্রচলিত ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন, আর কওমি শিক্ষায় শিক্ষিতরা দ্বীনের মৌলিকত্ব ধরে রেখে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই কোনো একটি ধারাকে বাদ দিয়ে নয়, বরং উভয় ধারার আলেম ও শিক্ষিত মানুষকে সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, যে জাতি জ্ঞান ও গবেষণায় যত বেশি এগিয়ে যায়, সেই জাতি বিশ্বকে তত বেশি নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। তিনি উলামায়ে কেরামসহ সবাইকে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ইসলামী জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতে গেলে বাধা আসতে পারে। কিন্তু সেই কারণে হকের কথা বলা থেকে বিরত হওয়া যাবে না। একই সঙ্গে কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইমাম যেমন নামাজে নেতৃত্ব দেন এবং মুসল্লিরা তাকে অনুসরণ করেন, তেমনি সমাজের মানুষও উলামায়ে কেরামের জীবন ও আমল অনুসরণ করবে। এজন্য উলামায়ে কেরামের সতর্কতার মাত্রা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে বিভিন্ন পেশা, শ্রেণি ও মর্যাদার মানুষ থাকলেও জনগণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিক ও সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে উলামায়ে কেরামের। কোনো বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সমাজ পরিবর্তন কিংবা একটি সভ্যতা ও পরিবারের পরিবর্তনে সবচেয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারেন উলামায়ে কেরাম। সমাজে বিদ্যমান ইসলামের বিভিন্ন বিধান ও ফরজ দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণার বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের সঠিক শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরতে উলামায়ে কেরামকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উম্মতের জন্য রেখে যাওয়া আল্লাহর কিতাব ও তার সুন্নাহ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে অনুসরণ করতে হবে।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, বর্তমানে একটি শ্রেণি পরিকল্পিতভাবে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে নানা ধরনের বিতর্ক ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। উলামায়ে কেরামের উচিত এসব বিষয় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেদের দাওয়াত ও সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাওয়া।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মুসলমানদের উত্থান ও পতনের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, উলামায়ে কেরামের মর্যাদা অনেক উঁচু এবং সমাজে তাদের প্রভাব ও দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে সাতটি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাবগুলো হলো ১. মাদ্রাসা ও কলেজে ইসলামী শিক্ষা সংকোচন বন্ধ করতে হবে। ২. মাদ্রাসার নারী শিক্ষার্থীদের ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৩. উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে উলামা-মাশায়েখদের হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। ৫. ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণ করতে হবে। ৬. ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সার্ভিস রুল ও পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ৭. ফিলিস্তিনসহ সকল দেশের মুসলিম হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের সেক্রেটারি মাওলানা নুরুল আমিন এমপি, মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা তারিক মুনাওয়ার, কেন্দ্রীয় ওলামা বিভাগীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ, মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, লক্ষ্মীপুরের মাওলানা ইসমাইল হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের ওলামা বিভাগের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারফ হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ড. মীম আতিকুল্লাহ, উত্তরের সাবেক সভাপতি ড. হাবিবুর রহমান ও তানজিমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাফেজ হাবীবুল্লাহ মোহাম্মদ ইকবাল।

আরো বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন, মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমেদ, মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী, মাওলানা বদরুল আলম, মাওলানা হাবিবুর রহমান, অধ্যক্ষ মাওলানা মহিউদ্দিন, মাওলানা আব্দুল মোমিন নাসেরী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আজহারী, মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী ও মুফতি নূরুজ্জামান নুমানী।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মো. কামাল হোসেন এমপি, ইসলামিক কানুন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, মুফতি আলী হাসান উসামা, মাওলানা রুহুল আমিন, মাহবুব তাহের জাবেরি আল মাদানী, মোল্লা নাজিম উদ্দিনসহ সারাদেশ থেকে আগত উলামা প্রতিনিধিরা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বিলের পানিতে ডুবে ভাই-বোন নিহত

আলেমদের সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের

আপডেট টাইম : ১২:০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

উলামায়ে কেরামকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন, বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, উলামায়ে কেরাম শুধু মসজিদে ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত কিংবা খুতবার মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাদের সঠিক পথনির্দেশনা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

শনিবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘মতবিরোধ নয়, ঐক্যেই গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে আয়োজিত এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। সম্মেলনে প্রস্তাবনা পেশ ও সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি ও তামিরুল মিল্লা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও ড. এএইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।

জামায়াত আমির বলেন, উলামায়ে কেরামের ইলম চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে কোরআন ও সুন্নাহ। আল্লাহর বিধান মানার পূর্ণাঙ্গ মডেল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার আনুগত্যের বাস্তব মডেল সাহাবায়ে কেরাম। মুসলিম উম্মাহ এই আদর্শ অনুসরণ করলে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

উলামায়ে কেরামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতে হবে; তবে কাউকে অপমান, ছোট করা বা কটূক্তি করা যাবে না। দ্বীনের দাওয়াত এমনভাবে দিতে হবে, যাতে মানুষের হৃদয়ে তা পৌঁছে যায়। তিনি কোরআনের নির্দেশনার আলোকে প্রজ্ঞা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর ভাষায় মানুষকে আহ্বান জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উলামায়ে কেরামের চিন্তা ও মত সবসময় এক হবে না। অতীতেও মতপার্থক্য ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে মতের ভিন্নতার কারণে কাউকে অসম্মান করা যাবে না। কেউ সমালোচনা বা কটূক্তি করলেও পাল্টা কটূক্তি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের জন্য দোয়া করতে হবে এবং তার বক্তব্যে কোনো কল্যাণকর বিষয় থাকলে তা গ্রহণ করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে উত্তেজনামূলক বক্তব্য বা ‘আক্রমণাত্মক’ মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। কেউ আমাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও আমরা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ব না অর্থাৎ উসকানির জবাব উসকানি দিয়ে না দিয়ে ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে আলিয়া ও কওমি দুই ধারার শিক্ষারই প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, আলিয়া শিক্ষায় শিক্ষিতরা সমাজের প্রচলিত ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন, আর কওমি শিক্ষায় শিক্ষিতরা দ্বীনের মৌলিকত্ব ধরে রেখে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাই কোনো একটি ধারাকে বাদ দিয়ে নয়, বরং উভয় ধারার আলেম ও শিক্ষিত মানুষকে সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, যে জাতি জ্ঞান ও গবেষণায় যত বেশি এগিয়ে যায়, সেই জাতি বিশ্বকে তত বেশি নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। তিনি উলামায়ে কেরামসহ সবাইকে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ইসলামী জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণাকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বলতে গেলে বাধা আসতে পারে। কিন্তু সেই কারণে হকের কথা বলা থেকে বিরত হওয়া যাবে না। একই সঙ্গে কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না।

উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইমাম যেমন নামাজে নেতৃত্ব দেন এবং মুসল্লিরা তাকে অনুসরণ করেন, তেমনি সমাজের মানুষও উলামায়ে কেরামের জীবন ও আমল অনুসরণ করবে। এজন্য উলামায়ে কেরামের সতর্কতার মাত্রা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথি জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে বিভিন্ন পেশা, শ্রেণি ও মর্যাদার মানুষ থাকলেও জনগণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিক ও সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে উলামায়ে কেরামের। কোনো বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সমাজ পরিবর্তন কিংবা একটি সভ্যতা ও পরিবারের পরিবর্তনে সবচেয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারেন উলামায়ে কেরাম। সমাজে বিদ্যমান ইসলামের বিভিন্ন বিধান ও ফরজ দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণার বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের সঠিক শিক্ষা মানুষের সামনে তুলে ধরতে উলামায়ে কেরামকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উম্মতের জন্য রেখে যাওয়া আল্লাহর কিতাব ও তার সুন্নাহ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে অনুসরণ করতে হবে।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, বর্তমানে একটি শ্রেণি পরিকল্পিতভাবে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে নানা ধরনের বিতর্ক ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। উলামায়ে কেরামের উচিত এসব বিষয় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেদের দাওয়াত ও সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যাওয়া।

সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মুসলমানদের উত্থান ও পতনের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, উলামায়ে কেরামের মর্যাদা অনেক উঁচু এবং সমাজে তাদের প্রভাব ও দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে সাতটি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাবগুলো হলো ১. মাদ্রাসা ও কলেজে ইসলামী শিক্ষা সংকোচন বন্ধ করতে হবে। ২. মাদ্রাসার নারী শিক্ষার্থীদের ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৩. উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে উলামা-মাশায়েখদের হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। ৫. ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণ করতে হবে। ৬. ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সার্ভিস রুল ও পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ৭. ফিলিস্তিনসহ সকল দেশের মুসলিম হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের সেক্রেটারি মাওলানা নুরুল আমিন এমপি, মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা তারিক মুনাওয়ার, কেন্দ্রীয় ওলামা বিভাগীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ, মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, লক্ষ্মীপুরের মাওলানা ইসমাইল হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের ওলামা বিভাগের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা মোশারফ হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ড. মীম আতিকুল্লাহ, উত্তরের সাবেক সভাপতি ড. হাবিবুর রহমান ও তানজিমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাফেজ হাবীবুল্লাহ মোহাম্মদ ইকবাল।

আরো বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন, মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমেদ, মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী, মাওলানা বদরুল আলম, মাওলানা হাবিবুর রহমান, অধ্যক্ষ মাওলানা মহিউদ্দিন, মাওলানা আব্দুল মোমিন নাসেরী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আজহারী, মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী ও মুফতি নূরুজ্জামান নুমানী।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মো. কামাল হোসেন এমপি, ইসলামিক কানুন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, মুফতি আলী হাসান উসামা, মাওলানা রুহুল আমিন, মাহবুব তাহের জাবেরি আল মাদানী, মোল্লা নাজিম উদ্দিনসহ সারাদেশ থেকে আগত উলামা প্রতিনিধিরা।