বাংলাদেশের রাজনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে যাঁদের অবদান স্থায়ীভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান তাঁদের অন্যতম। একাধারে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদ, তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রদূত, নীতিনির্ধারক এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির একজন অভিজ্ঞ নেতা।
জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, রাষ্ট্রচিন্তা ও জনকল্যাণকে সমান গুরুত্ব দিয়ে তিনি যে কর্মময় জীবন গড়ে তুলেছেন, তা বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, কমনওয়েলথ, ইউনেস্কো, বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তি সম্মেলন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্র গঠন, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন, অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা, সুশাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবন আজও গবেষক, শিক্ষার্থী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।
শৈশব, শিক্ষা ও একজন বিজ্ঞানীর আত্মপ্রকাশঃ
অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান এমন একটি শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে টানা তিন প্রজন্ম শিক্ষা, সমাজসেবা ও রাষ্ট্রগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। পারিবারিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উচ্চশিক্ষার শুরু থেকেই তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি গণিত ও পরিসংখ্যানে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় সম্মিলিতভাবে প্রথম স্থান অধিকার করে রাষ্ট্রপতির Best University Graduate Award লাভ করেন। এর আগে স্কুল ও কলেজ জীবনেও তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করে ধারাবাহিক মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
উচ্চতর গবেষণার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টর অব ফিলোসফি (D.Phil.) ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মৌলিক কণার Weak ও Strong Interaction-এর তাত্ত্বিক সীমান্তবর্তী ক্ষেত্র, যা সে সময় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো।
যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রবাসে স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে পাকিস্তান সরকার তাঁর বৃত্তি ও নাগরিকত্ব বাতিল করে। কিন্তু তিনি দমে যাননি। ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তায় গবেষণা সম্পন্ন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তিনি পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখান থেকেই শুরু হয় একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক, শিক্ষক ও বিজ্ঞানচিন্তকের দীর্ঘ পথচলা।
আন্তর্জাতিক গবেষণা, ফেলোশিপ ও একজন বিশ্বমানের বিজ্ঞানীর পথচলাঃ
অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খানের গবেষণা ও একাডেমিক জীবন কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর কর্মপরিধি বিস্তৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। একজন মেধাবী গবেষক হিসেবে তিনি বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন এবং আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
গবেষণায় অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি Colombo Plan Fellowship, Swedish International Development Agency (SIDA) Fellowship এবং International Atomic Energy Agency (IAEA) Fellowship লাভ করেন। এসব ফেলোশিপ তাঁর গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সমৃদ্ধ করে এবং বিশ্বমানের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এনে দেয়।
তাঁর গবেষণা জীবনের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় ইতালির ট্রিয়েস্টে অবস্থিত আব্দুস সালাম আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র (ICTP)। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক আব্দুস সালামের গবেষণা দলের সঙ্গে প্রতিবছর তিন মাস গবেষণার জন্য তিনি বিশেষ ফেলোশিপ লাভ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে পরিচালিত গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে একজন দক্ষ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিশ্বের একাধিক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে Visiting Scientist, Visiting Faculty এবং Postdoctoral Researcher হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
যুক্তরাজ্যের University of Oxford;
যুক্তরাষ্ট্রের California Institute of Technology (Caltech);
ইতালির International Centre for Theoretical Physics (ICTP);
সুইডেনের Manne Siegbahn Laboratory (সাবেক Nobel Institute of Physics), Stockholm University;
এবং Uppsala University, Sweden।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে তিনি আধুনিক Monte Carlo Simulation পদ্ধতি ব্যবহার করে পরমাণুর মৌলিক কাঠামো নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন। তাঁর গবেষণা পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি পরিবেশবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও নতুন চিন্তার দুয়ার উন্মোচন করে।
গবেষণার ফলাফল তিনি বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেন। পদার্থবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্র দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়। একই সঙ্গে তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পরিবেশবিষয়ক বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
একজন শিক্ষক হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল সমানভাবে প্রশংসিত। তাঁর তত্ত্বাবধানে গবেষণা করা একাধিক শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু জ্ঞান বিতরণ করেননি; গবেষণার নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি International Radiation Physics Society (IRPS)-এর সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (NDC)-এ সুশাসন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে নীতিগত বক্তৃতা প্রদান করে আসছেন। তাঁর এসব বক্তৃতা নীতিনির্ধারক, সামরিক কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা ও আধুনিক উন্নয়ন-ভাবনার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
একজন বিজ্ঞানী হিসেবে অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খানের কর্মজীবন প্রমাণ করে যে, গবেষণাগারের জ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সেই জ্ঞান রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং জনকল্যাণেও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা, শিক্ষকতা ও বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
সমাজবিজ্ঞান, পরিবেশ গবেষণা, আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব এবং বিজ্ঞান–তথ্যপ্রযুক্তিতে যুগান্তকারী অবদান
অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান কেবল একজন খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী নন; সমাজবিজ্ঞান, পরিবেশ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিজ্ঞানকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা। এ কারণেই তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, উন্নয়ন-গবেষক এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে সমানভাবে স্বীকৃতি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Socio-economic Integrated Village Study Group-এর সদস্য হিসেবে তিনি সমাজবিজ্ঞান গবেষণায় কম্পিউটারভিত্তিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির প্রয়োগ করেন। সে সময় বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞান গবেষণায় এটি ছিল একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ, যা গবেষণাকে আরও তথ্যনির্ভর ও আধুনিক করে তোলে।
পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ (BCAS)-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য একটি আধুনিক Geographic Information System (GIS) তৈরির কাজেও তিনি নেতৃত্ব দেন, যা পরিবেশ পরিকল্পনা ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
আন্তর্জাতিক নেতৃত্বঃ
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
২০০৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিতঃ Commonwealth Ministerial Summit on Information Technology-এ আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। একই বছর ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত Ministerial Round Table: Towards Knowledge Societies-এ বক্তব্য রাখেন। এছাড়া জেনেভায় অনুষ্ঠিত World Summit on the Information Society (WSIS)-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
২০০৪ সালে ভারতের হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এশীয় আইটি মন্ত্রী সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। একই বছরে চিলিতে অনুষ্ঠিত Global Biotechnology Forum, হংকংয়ের Global ICT Summit, গ্রিসের এথেন্সে World Congress on IT, আজারবাইজানের বাকুতে Global IT Summit এবং অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত Commonwealth High-level Seminar on Standardization-এ আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
একই বছরে ইতালির ট্রিয়েস্টে অবস্থিত আব্দুস সালাম আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র (ICTP)-এর ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অঙ্গনে তাঁর মর্যাদার স্বীকৃতি বহন করে।
২০০৫ সালে তিনি বাহরাইনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় এশীয় আইটি সম্মেলন, ক্যামেরুনে অনুষ্ঠিত Commonwealth Telecommunication Organisation (CTO) Annual Forum এবং তিউনিসিয়ায় অনুষ্ঠিত World Summit on the Information Society (WSIS)-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। একই বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার Seoul Digital Forum এবং জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত Forum for Nuclear Cooperation in Asia-এও তিনি বক্তৃতা প্রদান করেন।
বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে যুগান্তকারী অবদান
বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রী হিসেবে অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সময়ে গৃহীত একাধিক উদ্যোগ পরবর্তীকালে দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার পথ সুগম করে।
তাঁর নেতৃত্বে বাস্তবায়িত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বাংলাদেশের সাবমেরিন কেবল ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন;
জাতীয় বায়োটেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা;
বাংলাদেশ–কোরিয়া যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ–কোরিয়া আইসিটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা;
জাপানের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ঢাকায় আধুনিক জাতীয় প্ল্যানেটারিয়াম কমপ্লেক্স নির্মাণ;
জাতীয় বৈজ্ঞানিক ডকুমেন্টেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা;
নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউট-এর কাজ সম্পন্ন করা এবং দেশে রেডিওআইসোটোপ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন;
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর অনুমোদিত মানদণ্ড অনুযায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিরাপদে সংরক্ষণের স্থাপনা নির্মাণ;
বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় আইসিটি নীতি (ICT Policy) প্রণয়ন;
দেশের প্রথম সাইবার আইন (Cyber Law) প্রণয়নে নেতৃত্ব প্রদান।
তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে যে ভিত্তি নির্মিত হয়, তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর, ই-গভর্ন্যান্স এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্রচিন্তা, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে তিনি বাংলাদেশের আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব, উন্নয়ন দর্শন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা এবং ব্যক্তিজীবনঃ
অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। ১৯৯০ সালে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসানের পর তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার এবং অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি অন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে স্থানীয় সরকার কাঠামো বিষয়ক জাতীয় কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রণয়নে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৯৩ সালে পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেন। প্রচলিত Top-down Planning পদ্ধতির পরিবর্তে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণভিত্তিক Bottom-up Participatory Planning ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। তাঁর সম্পাদনায় “Local Level Participatory Perspective Planning in Bangladesh” শীর্ষক ১২ খণ্ডের পরিকল্পনা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিনি আরও ২০ খণ্ড গবেষণাগ্রন্থ প্রস্তুত করেন, যা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
তাঁর বিশ্বাস ছিল—উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন জনগণ নিজেরাই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অংশীদার হয়। এই দর্শনের ভিত্তিতেই তিনি তৃণমূলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন, যা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে তিনি National Environmental Management Action Plan (NEMAP) প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের পরিবেশসম্মত টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতিমালা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। একই সময়ে তিনি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং প্রতিবছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের উন্নয়ন কর্মসূচির তত্ত্বাবধান করেন।
২০০১ সালে তিনি টানা চতুর্থবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। এটি ছিল তাঁর তৃতীয়বারের মতো মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি। পরবর্তীতে ২০০৯ ও ২০১৬ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সাল থেকে তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্বঃ
ড. আবদুল মঈন খান জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, কমনওয়েলথ, ইউনেস্কো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তিনি UNDP আয়োজিত সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলনে আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন। জাতিসংঘের Commission on Social Development-এর ৩৮তম, ৩৯তম ও ৪০তম অধিবেশনে অংশ নিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বিষয়ক নীতিমালা নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
২০০০ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত World Social Summit (WSSD+5)-এ অংশগ্রহণ করেন এবং World Economic Forum (WEF)-এ বিশ্বায়ন বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। একই বছরে ইতালির সিনেটে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংসদ সদস্য সম্মেলনে দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ সংকটবিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
বিশ্বব্যাংকের আমন্ত্রণে তিনি যুক্তরাজ্যের House of Commons-এ বিশ্বায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনবিষয়ক আন্তর্জাতিক বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন। এছাড়া Wilton Park Conference-এও তিনি নিয়মিত আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন।
২০০১ সালে তিনি OECD ও ADB-এর উদ্যোগে দুর্নীতি দমনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারকে (MOU) বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে ADB/OECD Anti-Corruption Initiative-এর স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কিম দে জুং-এর হাতে Defender of Democracy Award আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন। একই বছরে ভারতের সংসদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংসদ সদস্য সম্মেলনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সে সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল উন্নয়নশীল বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রদূত হিসেবে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেন।
২০১৪ সালে তিনি জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদর দপ্তরে Financial Inclusion-বিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশ নেন। একই বছর চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) আমন্ত্রণে বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে বেইজিং সফর করেন। ২০২৫ সালেও তিনি সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে পুনরায় চীন সফর করেন।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত Inter-Parliamentary Union (IPU)-এর ১৫২তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
সাম্প্রতিক কার্যক্রমঃ
২০১৯ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের Institute of Development Studies (IDS)-এর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সুশাসন বিষয়ে বক্তৃতা দেন।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর শুরু হওয়া “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন”-এ তিনি অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পঞ্চমবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
পারিবারিক পরিচয় ও সামাজিক সম্পৃক্ততা
অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে টানা তিন প্রজন্ম শিক্ষা ও জনসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তাঁর দাদা ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন এবং শিক্ষকতার চাকরি হারান। তাঁর পিতা কলকাতা গভর্নমেন্ট কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে ব্রিটিশ ভারতের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে অধ্যাপক মঈন খান Institute of Democracy & Human Rights (IDHR)-এর সঙ্গে যুক্ত। তিনি বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেড ও জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া Consumer Protection Society of Bangladesh-এর প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি এবং Khan Foundation-এর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
তাঁর সহধর্মিণী রোকসানা খন্দকার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাবেক চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (BSAF), বর্তমানে The Millennium University-এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন এবং Khan Foundation-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক।
তাঁদের তিন কন্যা—মাহরীন খান, নওশীন খান এবং নওরীন খান—বিদেশে বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সঙ্গে কর্মরত।
সাহিত্যচর্চাঃ
রাষ্ট্রনীতি, বিজ্ঞান ও গবেষণার পাশাপাশি অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান সাহিত্যচর্চার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ “দীপান্তরে নির্বাসিতা”। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “নিজ দেশে পরবাসী” এবং প্রথম উপন্যাস “Digital Life” প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
উপসংহারঃ
অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খানের জীবন এক বিরল সমন্বয়ের প্রতিচ্ছবি—যেখানে বিজ্ঞান, শিক্ষা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রযুক্তি, গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবকল্যাণ একই সূত্রে গাঁথা। একজন আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানী থেকে জাতীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারক—প্রতিটি পর্যায়ে তিনি জ্ঞান, সততা, দূরদর্শিতা এবং দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কর্মময় জীবন বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
Reporter Name 
























