ঢাকা ০৩:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

পানির নিচে চলে গেছে রাজধানী

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
  • ২ বার

একটু ভারী বৃষ্টিতেই ডুবে যায় রাজধানী ঢাকার সড়ক। কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই  পানির নিচে চলে যায় প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার, হাসপাতালের সামনে থাকা রাস্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয় তীব্র পানিবদ্ধতা। এই পানিবদ্ধতায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না, শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যেতে ব্যর্থ হয়, রোগীদের হাসপাতালে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে যায়।

গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় সর্বোচ্চ ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর। সেই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকাসহ ছয় বিভাগে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল সকালের পর থেকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তেই বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। টানা ভারী বর্ষণের ফলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র‌্যাম্পের নিচের অংশসহ বনানী, খিলক্ষেত, ঢাকা গেট এবং মহানগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় ব্যাপক পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল ধীরগতির রয়েছে এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কাকলী মোড়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে আসা যানবাহন এবং নিচের সড়কে চলাচলকারী যানবাহনকে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হয়। প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্ক সংলগ্ন সড়কে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ধীরগতির হচ্ছে এবং সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হয়।

গত চার বছরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২৬২ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করেছে। এ সময়ে ৩৩৪ কিলোমিটারের বেশি ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তার পরও প্রায় ভারী বৃষ্টির পরই রাজধানীবাসীকে তীব্র পানিবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে কেন্দ্রীয় ঢাকার ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ এলাকা ছিল জলাশয়। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে সবুজ এলাকার পরিমাণ ২২ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) ২০২৪ সালের এক গবেষণা বলছে, দখল হওয়া মাত্র ১৫টি খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ পুনরাবৃত্ত পানিবদ্ধতা কমানো সম্ভব। খালগুলোর মধ্যে রয়েছে- রূপনগর প্রধান খাল, বাউনিয়া খাল, বাইশটেকি খাল, সাংবাদিক কলোনি খাল, কল্যাণপুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, পান্থপথ বক্স কালভার্ট খাল, রায়েরবাজার খাল, জিরানি খাল, রামপুরা খাল, ধোলাই খাল, কদমতলী খাল এবং মান্ডা খাল। রাজধানীর পানিবদ্ধতার নয়টি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- মিরপুর, পল্লবী, ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, রামপুরা, বাড্ডা, পুরান ঢাকা ও জুরাইনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।

দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের ভেতরেও পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রধান প্রবেশপথ থেকে শুরু করে একাধিক ভবনের সামনের চত্বর, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও গণমাধ্যম কেন্দ্রে যাওয়ার পথ  পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। মতিঝিল ব্যাংক পাড়ায় বেহাল অবস্থা তৈরি হয়। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে পানিবদ্ধতা দেখা দেয়ায় ব্যাহত হয় যান চলাচল। এতে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী, অফিসগামী মানুষ, পথচারী ও যানবাহনের চালকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। মতিঝিলের প্রধান সড়ক, দিলকুশা, শাপলা চত্বর, বাংলাদেশ ব্যাংকসংলগ্ন এলাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন সড়কে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে।
পুরান ঢাকার স্বাভাবিক জনজীবন অনেকটাই থমকে যায়। লক্ষ্মীবাজার, ইসলামপুর, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি ও আদালতপাড়া ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কগুলো তুলনামূলক ফাঁকা। অধিকাংশ দোকানপাটও খুলতে দেরি হয়েছে, কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত ঝাপই তোলা হয়নি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান অর্ধবার্ষিক ও অন্যান্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক কম। টানা বৃষ্টির মধ্যে জবির শান্ত চত্বরে পার্কিং এলাকায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসের ওপর বড় একটি গাছ ভেঙে পড়েছে। এতে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খণ্ড খণ্ড উদ্যোগ নেয়া হয়। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে একাধিক সংস্থা জড়িত। দুই সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন, সড়ক বিভাগ, নগর উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে পানিবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র দেখা গেলেও এর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ নাগরিকরা। প্রতিবছর পানিবদ্ধতা নিরসনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না। বরং প্রতি বর্ষায় রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শহরের পানিবদ্ধতা নিরসনে প্রতিবছর বিপুল অংকের টাকা ব্যয় হলে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। পানিবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে না। অথচ প্রতি অর্থবছরেই পানিবদ্ধতা নিরসনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সিটি করপোরেশন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি খুবই সীমিত। প্রকল্পভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবই ঢাকার পানিবদ্ধতা সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আগারগাঁও, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মালিবাগ, মগবাজার, শান্তিনগর, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাওরান বাজার, উত্তরা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছরই পানিবদ্ধতার চিত্র দেখা যায়। মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, শান্তিনগর, আরামবাগ, সায়াদাবাদ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট যেতে নতুন রাস্তা, খামারবাড়ি, শনির আখড়া, ধানমন্ডি, কালশী সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ও অলগলিতে পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে রাস্তায় পানি উঠে আসে পানিবদ্ধতার সময় হাসপাতালে রোগী নেয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকে। অনেক এলাকায় পানি জমে থাকায় জরুরি রোগী পরিবহনে বিলম্ব ঘটে। পানিবদ্ধতার কারণে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয় পণ্য। বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যায়। ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন। বিভিন্ন সড়কে বাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল বিকল হয়ে পড়েছে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, একটা লঘুচাপ ছিল। এটা পশ্চিম দিক থেকে বাতাসকে পূর্ব দিকে ধাক্কা দিয়েছে। আর মৌসুমি বায়ু পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে পুশ করেছে। এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবে ঢাকা মহানগরীতে বৃষ্টিপাত বেশি হয়।

নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী কামরুল জানান, বৃষ্টির দিনে দোকান খুলেও কোনো বিক্রি হয় না। পানি ঢুকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবছর ঢাকার পানিবদ্ধতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। বরং নতুন নতুন এলাকাও পানিবদ্ধতার আওতায় চলে আসছে। আমরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

ইসলামপুরের বাসিন্দা রায়হান বলেন, ভোর থেকেই ঝুম বৃষ্টি চলছিল, রাস্তায় মানুষ ও যানবাহন ছিল কম। সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে। আর জমে থাকা পানিতে সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে নিয়ে যেতে দেখেছি। যারা বেরিয়েছেন তাদের প্রায় প্রত্যেককেই পানিবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

মতিঝিলের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শফিকুল ইসলাম বলেন, পানিবদ্ধতা ও যানজটের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছে। অনেক জায়গায় হাঁটুসমান পানি থাকায় হেঁটেও চলাচল করতে কষ্ট হয়েছে। রাস্তা ডুবে যাওয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। প্রতি বছর একই ভোগান্তি হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এদিকে বৃষ্টির সুযোগে কিছু এলাকায় রিকশা ও অটোরিকশার ভাড়াও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে মতিঝিলে ৩০ টাকার ভাড়া নেয়া হচ্ছে ২০০ টাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। পানিবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। রাজধানীতে ভোর থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলজট নিরসন এবং উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ করে সড়ক সচল রাখতে ভোর থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ করছে ডিএসসিসির ওয়ার্ডভিত্তিক ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

পানির নিচে চলে গেছে রাজধানী

আপডেট টাইম : ১০:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

একটু ভারী বৃষ্টিতেই ডুবে যায় রাজধানী ঢাকার সড়ক। কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই  পানির নিচে চলে যায় প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার, হাসপাতালের সামনে থাকা রাস্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয় তীব্র পানিবদ্ধতা। এই পানিবদ্ধতায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না, শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যেতে ব্যর্থ হয়, রোগীদের হাসপাতালে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে যায়।

গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় সর্বোচ্চ ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর। সেই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকাসহ ছয় বিভাগে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল সকালের পর থেকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তেই বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। টানা ভারী বর্ষণের ফলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র‌্যাম্পের নিচের অংশসহ বনানী, খিলক্ষেত, ঢাকা গেট এবং মহানগরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় ব্যাপক পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল ধীরগতির রয়েছে এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কাকলী মোড়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে আসা যানবাহন এবং নিচের সড়কে চলাচলকারী যানবাহনকে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হয়। প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্ক সংলগ্ন সড়কে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ধীরগতির হচ্ছে এবং সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হয়।

গত চার বছরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২৬২ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করেছে। এ সময়ে ৩৩৪ কিলোমিটারের বেশি ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তার পরও প্রায় ভারী বৃষ্টির পরই রাজধানীবাসীকে তীব্র পানিবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে কেন্দ্রীয় ঢাকার ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ এলাকা ছিল জলাশয়। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে সবুজ এলাকার পরিমাণ ২২ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) ২০২৪ সালের এক গবেষণা বলছে, দখল হওয়া মাত্র ১৫টি খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ পুনরাবৃত্ত পানিবদ্ধতা কমানো সম্ভব। খালগুলোর মধ্যে রয়েছে- রূপনগর প্রধান খাল, বাউনিয়া খাল, বাইশটেকি খাল, সাংবাদিক কলোনি খাল, কল্যাণপুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, পান্থপথ বক্স কালভার্ট খাল, রায়েরবাজার খাল, জিরানি খাল, রামপুরা খাল, ধোলাই খাল, কদমতলী খাল এবং মান্ডা খাল। রাজধানীর পানিবদ্ধতার নয়টি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- মিরপুর, পল্লবী, ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, রামপুরা, বাড্ডা, পুরান ঢাকা ও জুরাইনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা।

দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের ভেতরেও পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রধান প্রবেশপথ থেকে শুরু করে একাধিক ভবনের সামনের চত্বর, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও গণমাধ্যম কেন্দ্রে যাওয়ার পথ  পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। মতিঝিল ব্যাংক পাড়ায় বেহাল অবস্থা তৈরি হয়। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে পানিবদ্ধতা দেখা দেয়ায় ব্যাহত হয় যান চলাচল। এতে ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী, অফিসগামী মানুষ, পথচারী ও যানবাহনের চালকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। মতিঝিলের প্রধান সড়ক, দিলকুশা, শাপলা চত্বর, বাংলাদেশ ব্যাংকসংলগ্ন এলাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন সড়কে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে।
পুরান ঢাকার স্বাভাবিক জনজীবন অনেকটাই থমকে যায়। লক্ষ্মীবাজার, ইসলামপুর, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি ও আদালতপাড়া ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কগুলো তুলনামূলক ফাঁকা। অধিকাংশ দোকানপাটও খুলতে দেরি হয়েছে, কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত ঝাপই তোলা হয়নি। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান অর্ধবার্ষিক ও অন্যান্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক কম। টানা বৃষ্টির মধ্যে জবির শান্ত চত্বরে পার্কিং এলাকায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসের ওপর বড় একটি গাছ ভেঙে পড়েছে। এতে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খণ্ড খণ্ড উদ্যোগ নেয়া হয়। রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে একাধিক সংস্থা জড়িত। দুই সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন, সড়ক বিভাগ, নগর উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে পানিবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র দেখা গেলেও এর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ নাগরিকরা। প্রতিবছর পানিবদ্ধতা নিরসনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না। বরং প্রতি বর্ষায় রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শহরের পানিবদ্ধতা নিরসনে প্রতিবছর বিপুল অংকের টাকা ব্যয় হলে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। পানিবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে না। অথচ প্রতি অর্থবছরেই পানিবদ্ধতা নিরসনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সিটি করপোরেশন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি খুবই সীমিত। প্রকল্পভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবই ঢাকার পানিবদ্ধতা সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আগারগাঁও, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মালিবাগ, মগবাজার, শান্তিনগর, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, খিলগাঁও, সবুজবাগ, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাওরান বাজার, উত্তরা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছরই পানিবদ্ধতার চিত্র দেখা যায়। মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি, শান্তিনগর, আরামবাগ, সায়াদাবাদ, আগারগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর গেট যেতে নতুন রাস্তা, খামারবাড়ি, শনির আখড়া, ধানমন্ডি, কালশী সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ও অলগলিতে পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে রাস্তায় পানি উঠে আসে পানিবদ্ধতার সময় হাসপাতালে রোগী নেয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকে। অনেক এলাকায় পানি জমে থাকায় জরুরি রোগী পরিবহনে বিলম্ব ঘটে। পানিবদ্ধতার কারণে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয় পণ্য। বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যায়। ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন। বিভিন্ন সড়কে বাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল বিকল হয়ে পড়েছে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, একটা লঘুচাপ ছিল। এটা পশ্চিম দিক থেকে বাতাসকে পূর্ব দিকে ধাক্কা দিয়েছে। আর মৌসুমি বায়ু পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে পুশ করেছে। এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবে ঢাকা মহানগরীতে বৃষ্টিপাত বেশি হয়।

নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী কামরুল জানান, বৃষ্টির দিনে দোকান খুলেও কোনো বিক্রি হয় না। পানি ঢুকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিবছর ঢাকার পানিবদ্ধতার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। বরং নতুন নতুন এলাকাও পানিবদ্ধতার আওতায় চলে আসছে। আমরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

ইসলামপুরের বাসিন্দা রায়হান বলেন, ভোর থেকেই ঝুম বৃষ্টি চলছিল, রাস্তায় মানুষ ও যানবাহন ছিল কম। সড়ক ও অলিগলি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে। আর জমে থাকা পানিতে সিএনজির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চালকদের ঠেলে নিয়ে যেতে দেখেছি। যারা বেরিয়েছেন তাদের প্রায় প্রত্যেককেই পানিবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

মতিঝিলের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শফিকুল ইসলাম বলেন, পানিবদ্ধতা ও যানজটের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছে। অনেক জায়গায় হাঁটুসমান পানি থাকায় হেঁটেও চলাচল করতে কষ্ট হয়েছে। রাস্তা ডুবে যাওয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। প্রতি বছর একই ভোগান্তি হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এদিকে বৃষ্টির সুযোগে কিছু এলাকায় রিকশা ও অটোরিকশার ভাড়াও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে মতিঝিলে ৩০ টাকার ভাড়া নেয়া হচ্ছে ২০০ টাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ভারী বর্ষণে সাময়িক জলজট তৈরি হলেও আমাদের কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভোর থেকে মাঠে রয়েছে। পানিবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। রাজধানীতে ভোর থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলজট নিরসন এবং উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ করে সড়ক সচল রাখতে ভোর থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ করছে ডিএসসিসির ওয়ার্ডভিত্তিক ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম।