ঢাকা ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

অহংকারমুক্ত পরিচ্ছন্ন জীবনই প্রকৃত সফলতা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:২৭:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
  • ৫ বার

মানুষের ইহকালীন জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে দুনিয়াবি সফলতার পেছনে আমরা কত কিছুই না করি! কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, প্রকৃত সফল কারা? তবে একেকজন হয়তো একেক ভাবে উত্তর দেবেন। মানুষের তৈরি সফলতার মাপকাঠি একেক জনের কাছে একেক রকম হলেও, মহান আল্লাহ তাআলার কাছে সফলতার সংজ্ঞা একটু ভিন্ন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : নিশ্চয়ই সে সফলতা লাভ করবে, যে পবিত্রতা অর্জন করে। (সূরা আল-আলা, আয়াত: ১৪)। এখানে পবিত্রতা বলতে মূলত মানুষের অন্তঃকরণ বা কলবের আত্মশুদ্ধিকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, যারা তাদের অন্তরকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পাপমুক্ত করেছে, তারাই প্রকৃত সফল। এখন প্রশ্ন হতে পারে কলব বা অন্তর সুন্দর রাখার অর্থ কী? কলব সুন্দর রাখার অর্থ হলো মানুষের মনকে যাবতীয় আত্মিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখা। এই ব্যাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো : হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা এবং অহংকার। কোনো বান্দা যদি নিজের অন্তরকে এসব কলুষতা থেকে মুক্ত করে বিশুদ্ধ করতে পারেন, তবেই তিনি আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হতে পারেন।
অন্তর বিনষ্টকারী এই মানসিক ব্যাধিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো অহংকার (আরবিতে-তাকাব্বুর)। অহংকার এমন এক জঘন্য আত্মিক রোগ, যা মানুষের ঈমান ও আমলকে এক নিমেষেই ধ্বংস করে দেয়, মানুষের চরিত্র বা আখলাককে কলুষিত করে। আপনি দেখতে সুন্দর হতে পারেন, উচ্চশিক্ষিত হতে পারেন কিংবা বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন; কিন্তু আপনার মনে যদি অহংকার থাকে, তবে আল্লাহর কাছে এর কোনো মূল্য নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন : নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লোকমান, আয়াত: ১৮)।
অনেক সময় দেখা যায়, প্রচুর আমল করার কারণে কেউ কেউ নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করেন। এটিও অহংকারেরই একটি রূপ। এই আত্মদাম্ভিকতা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে ঠেলে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন : যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ মুসলিম)।
অহংকারের কারণে আল্লাহ তাআলা অনেক সম্মানিত সৃষ্টিকে এক লহমায় লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইবলিস (যাকে অনেকে আজাজিল নামেও উল্লেখ করেন)। সে ছিল জিন জাতির মধ্যে সবচেয়ে ইবাদতগুজার ও সম্মানিত। কিন্তু মহান আল্লাহ যখন তাকে আদম (আ.)-কে সেজদাহ করার নির্দেশ দিলেন, তখন সে অহংকারের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম।’ এই অহংকারের কারণেই সে আল্লাহর চিরদিনের অভিশপ্ত ও লাঞ্ছিত শয়তানে পরিণত হলো।
আমাদের মাঝে অহংকার বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, কখনো প্রকাশ্য আবার কখনো অত্যন্ত সুক্ষ্ম। অনেকে মুখে সরাসরি অহংকার প্রকাশ করেন। যেমন : ‘আমি তার চেয়ে কত ভালো,’ কিংবা কথায় কথায় বংশের বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বলে, ‘তুই আমাকে চিনিস? আমি কার ছেলে জানিস?’ ইত্যাদি। আবার অনেকে মুখে কিছু না বললেও তাদের হাঁটাচলা, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও আচরণে অহংকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা অন্য মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এক শ্রেণির মানুষের অহংকার মুখে বা আচরণে প্রকাশ পায় না, কিন্তু তা মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে। তারা মনে মনে অন্যের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করে। সুযোগের অপেক্ষায় থেকে ভাবেন, কাল সকালে বুঝবি আমি কী জিনিস! কিংবা ‘পরে বুঝিয়ে দেব কত ধানে কত চাল।’ অন্তরের এই গোপন অহংকার ও হিংসাই সমাজে বড় বড় ফিতনা তৈরি করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ হয়তো আমাদের অন্তরের খবর জানে না, কিন্তু মহান আল্লাহ অন্তরের সব গোপন রহস্যের খবর রাখেন। দুনিয়াতে সামান্য ক্ষমতাশালী বা প্রভাবশালী মানুষের প্রিয় পাত্র হওয়ার জন্য আমরা কত ত্যাগ স্বীকার করি, কত অন্যায় অবলীলায় করে ফেলি! অথচ যিনি পুরো মহাবিশ্বের মালিক, সেই আল্লাহর পছন্দের তালিকায় জায়গা পাওয়ার জন্য আমাদের অন্তরকে অহংকারমুক্ত রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
অহংকারের বিপরীত গুণ হলো বিনয় বা নম্রতা। বিনয় মানুষের চরিত্রকে সুশোভিত ও উজ্জ্বল করে। যারা অহংকারমুক্ত ও বিনয়ী জীবনযাপন করতে পারেন, তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে প্রকৃত সম্মানের অধিকারী হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (সহীহ মুসলিম)। বর্তমান অস্থির সমাজে মানবিক ও নৈতিক গুণাবলী ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য আমাদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতা পরিহার করে বিনয়ী হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অহংকারমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর একটি জীবন দান করুন। আমিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

অহংকারমুক্ত পরিচ্ছন্ন জীবনই প্রকৃত সফলতা

আপডেট টাইম : ০৫:২৭:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

মানুষের ইহকালীন জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে দুনিয়াবি সফলতার পেছনে আমরা কত কিছুই না করি! কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, প্রকৃত সফল কারা? তবে একেকজন হয়তো একেক ভাবে উত্তর দেবেন। মানুষের তৈরি সফলতার মাপকাঠি একেক জনের কাছে একেক রকম হলেও, মহান আল্লাহ তাআলার কাছে সফলতার সংজ্ঞা একটু ভিন্ন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : নিশ্চয়ই সে সফলতা লাভ করবে, যে পবিত্রতা অর্জন করে। (সূরা আল-আলা, আয়াত: ১৪)। এখানে পবিত্রতা বলতে মূলত মানুষের অন্তঃকরণ বা কলবের আত্মশুদ্ধিকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, যারা তাদের অন্তরকে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পাপমুক্ত করেছে, তারাই প্রকৃত সফল। এখন প্রশ্ন হতে পারে কলব বা অন্তর সুন্দর রাখার অর্থ কী? কলব সুন্দর রাখার অর্থ হলো মানুষের মনকে যাবতীয় আত্মিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখা। এই ব্যাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো : হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ-লালসা এবং অহংকার। কোনো বান্দা যদি নিজের অন্তরকে এসব কলুষতা থেকে মুক্ত করে বিশুদ্ধ করতে পারেন, তবেই তিনি আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র হতে পারেন।
অন্তর বিনষ্টকারী এই মানসিক ব্যাধিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো অহংকার (আরবিতে-তাকাব্বুর)। অহংকার এমন এক জঘন্য আত্মিক রোগ, যা মানুষের ঈমান ও আমলকে এক নিমেষেই ধ্বংস করে দেয়, মানুষের চরিত্র বা আখলাককে কলুষিত করে। আপনি দেখতে সুন্দর হতে পারেন, উচ্চশিক্ষিত হতে পারেন কিংবা বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন; কিন্তু আপনার মনে যদি অহংকার থাকে, তবে আল্লাহর কাছে এর কোনো মূল্য নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন : নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লোকমান, আয়াত: ১৮)।
অনেক সময় দেখা যায়, প্রচুর আমল করার কারণে কেউ কেউ নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতে শুরু করেন। এটিও অহংকারেরই একটি রূপ। এই আত্মদাম্ভিকতা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে ঠেলে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন : যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ মুসলিম)।
অহংকারের কারণে আল্লাহ তাআলা অনেক সম্মানিত সৃষ্টিকে এক লহমায় লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেছেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইবলিস (যাকে অনেকে আজাজিল নামেও উল্লেখ করেন)। সে ছিল জিন জাতির মধ্যে সবচেয়ে ইবাদতগুজার ও সম্মানিত। কিন্তু মহান আল্লাহ যখন তাকে আদম (আ.)-কে সেজদাহ করার নির্দেশ দিলেন, তখন সে অহংকারের বশবর্তী হয়ে আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম।’ এই অহংকারের কারণেই সে আল্লাহর চিরদিনের অভিশপ্ত ও লাঞ্ছিত শয়তানে পরিণত হলো।
আমাদের মাঝে অহংকার বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, কখনো প্রকাশ্য আবার কখনো অত্যন্ত সুক্ষ্ম। অনেকে মুখে সরাসরি অহংকার প্রকাশ করেন। যেমন : ‘আমি তার চেয়ে কত ভালো,’ কিংবা কথায় কথায় বংশের বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বলে, ‘তুই আমাকে চিনিস? আমি কার ছেলে জানিস?’ ইত্যাদি। আবার অনেকে মুখে কিছু না বললেও তাদের হাঁটাচলা, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও আচরণে অহংকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা অন্য মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এক শ্রেণির মানুষের অহংকার মুখে বা আচরণে প্রকাশ পায় না, কিন্তু তা মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে। তারা মনে মনে অন্যের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করে। সুযোগের অপেক্ষায় থেকে ভাবেন, কাল সকালে বুঝবি আমি কী জিনিস! কিংবা ‘পরে বুঝিয়ে দেব কত ধানে কত চাল।’ অন্তরের এই গোপন অহংকার ও হিংসাই সমাজে বড় বড় ফিতনা তৈরি করে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষ হয়তো আমাদের অন্তরের খবর জানে না, কিন্তু মহান আল্লাহ অন্তরের সব গোপন রহস্যের খবর রাখেন। দুনিয়াতে সামান্য ক্ষমতাশালী বা প্রভাবশালী মানুষের প্রিয় পাত্র হওয়ার জন্য আমরা কত ত্যাগ স্বীকার করি, কত অন্যায় অবলীলায় করে ফেলি! অথচ যিনি পুরো মহাবিশ্বের মালিক, সেই আল্লাহর পছন্দের তালিকায় জায়গা পাওয়ার জন্য আমাদের অন্তরকে অহংকারমুক্ত রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
অহংকারের বিপরীত গুণ হলো বিনয় বা নম্রতা। বিনয় মানুষের চরিত্রকে সুশোভিত ও উজ্জ্বল করে। যারা অহংকারমুক্ত ও বিনয়ী জীবনযাপন করতে পারেন, তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে প্রকৃত সম্মানের অধিকারী হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (সহীহ মুসলিম)। বর্তমান অস্থির সমাজে মানবিক ও নৈতিক গুণাবলী ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য আমাদের অহংকার ও আত্মম্ভরিতা পরিহার করে বিনয়ী হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অহংকারমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর একটি জীবন দান করুন। আমিন।