ঢাকা ০৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বৃহত্তর ময়মনসিংহের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর অস্তিত্বসংকটে বুড়িগঙ্গা ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রবাস থেকে যত প্রতিরোধ মেঘনার এক ইলিশ বিক্রি হলো ১০ হাজার টাকায় মাওলানা মাহমুদ মাদানী ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ মানবতা ও ভারতের নৈতিক মর্যাদার জন্য কলঙ্ক অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে ৫ আগস্ট সংবাদপত্রে ছুটি বাংলাদেশে কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষায় সহযোগিতার আগ্রহ অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ে কাজ করবে আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট : সেনাপ্রধান শেখ হাসিনা যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারে: দিনেশ ত্রিবেদীকে হুমায়ুন কবির

অনেকে নিরুৎসাহিত করলেও হাল ছাড়েননি হামিদুল্লাহ, বিক্রি প্রায় ২ লাখ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০২:১৬:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • ৩০ বার
  • শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে লটকন চাষ
  • ২০০৭ সালে শখের বশে চারা রোপণ
  • ৭ বছর পর গাছে প্রথম ফল আসে
  • বিক্রি করেছেন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা
  • পাহাড়ি অর্থনীতিতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত

চলতি মৌসুমে গারো পাহাড়ের পাদদেশ শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে এখন হলুদের মেলা। উপজেলার কয়েকটি বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে টক-মিষ্টি আর রসে ভরা ফল লটকন। পাতা দেখা না গেলেও ডাল থেকে শুরু করে গাছের গোড়া পর্যন্ত শুধু লটকন।

জানা যায়, ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. হামিদুল্লাহ ২০০৭ সালে জন্মস্থান নরসিংদীর বেলাব উপজেলার আমলাব গ্রামে চাচার বাড়িতে গিয়ে লটকনের বাগান দেখে মুগ্ধ হন। ফেরার সময় শখের বশে কয়েকটি লটকনের চারা সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরে ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের ভারুয়া গ্রামে বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত জমিতে চারাগুলো রোপণ করেন।

রোপণের প্রায় ৭ বছর পর ২০১৪ সালে গাছগুলোতে প্রথম ফল আসে। ফলন আশানুরূপ হওয়ায় তিনি বুঝতে পারেন, এ অঞ্চলেও সফলভাবে লটকন চাষ সম্ভব। এরপর ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার বাগানে শতাধিক লটকন গাছ আছে। এর মধ্যে এ বছর ৫১টি গাছের লটকন বিক্রি করে পেয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

বাগানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত থোকায় থোকায় ঝুলছে লটকন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ফল ব্যবসায়ীরা এসেছেন লটকন কিনতে। তারা নিজেরাই বাগানে ঢুকে গাছ থেকে ইচ্ছেমতো লটকন সংগ্রহ করছেন। এই বাগানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর অনেকেই দেখতে আসেন।

ইউপি সদস্য মো. হামিদুল্লাহ বলেন, ‌‘শুরুতে শুধু শখের বশে কয়েকটি চারা লাগিয়েছিলাম। পরে ভালো ফলন দেখে বাগান বড় করার সিদ্ধান্ত নিই। লটকন চাষে তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। গাছ রোপণের পর পরিপূর্ণ হতে প্রায় ১০ বছর লেগে যায়। তারপর থেকে ফলের উৎপাদন বাড়তে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমে যখন লটকন বাগান করি; তখন অনেকেই নিরুৎসাহিত করেন। তারা বলেন, এ অঞ্চলে এর ভালো ফলন হবে না। লোকসান হবে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আজ প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের এলাকায় লটকন চাষ সম্ভব। এখন প্রতি বছর লটকন বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও গাছ লাগানোর পরিকল্পনা আছে।’

বাগানের শ্রমিক মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, ‘আমরা মেম্বারের লটকন বাগানের পরিচর্যার কাজ করে যে বেতন পাই, তাতে আমার সংসার চলে। এ ছাড়া মেম্বারের বাগানের দেখাদেখি আরও কয়েকজন চাষ শুরু করেছেন। ওই বাগানগুলোতেও অনেক শ্রমিক কাজ করে তাদের সংসার চালান।’

স্থানীয় কৃষক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘মেম্বারের বাগান দেখে আমার বাড়ির পাশের জমিতে লটকন গাছের চারা রোপণের জন্য এরই মধ্যে প্রস্তুত করেছি। আশা করছি, অল্প কিছু দিনের মধ্যে চারা রোপণ করতে পারব।’

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সিফাত হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ের পরিবেশে লটকন গাছ ভালো হয়, রোগবালাইও কম। তাছাড়া লটকন গাছের পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে সহজ। তাই অনেক তরুণ এখন এটি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এরই মধ্যে পাহাড়ি এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ছোট আকারে বাগান করা হয়েছে।’

স্কুলশিক্ষক মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘এই বাগানের লটকন আকারে বড় এবং সুমিষ্ট। লটকন প্রচুর ক্যালোরি ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি ঔষধি ফল। এই বাগানে লটকন দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি নিজেও লটকন গাছের চারা রোপণ করব।’

ভয়েজ অব ঝিনাইগাতীর সভাপতি জাহিদুল হক মনির বলেন, ‘পাহাড়ে ফলভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ পরিবেশের জন্যও ইতিবাচক। লটকন চাষ বাড়লে পাহাড়ে সবুজায়ন যেমন বাড়বে; তেমনই কৃষকদের আয়ও বাড়বে। লটকন শুধু সুস্বাদু ফল নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ বাড়ানো গেলে পাহাড়ি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।’

জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাখওয়াত হোসেন বলেন, ‘লটকন একটি উচ্চমূল্যের লাভজনক ফল। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়া এই ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বৃহত্তর ময়মনসিংহের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

অনেকে নিরুৎসাহিত করলেও হাল ছাড়েননি হামিদুল্লাহ, বিক্রি প্রায় ২ লাখ

আপডেট টাইম : ০২:১৬:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে লটকন চাষ
  • ২০০৭ সালে শখের বশে চারা রোপণ
  • ৭ বছর পর গাছে প্রথম ফল আসে
  • বিক্রি করেছেন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা
  • পাহাড়ি অর্থনীতিতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত

চলতি মৌসুমে গারো পাহাড়ের পাদদেশ শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে এখন হলুদের মেলা। উপজেলার কয়েকটি বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে টক-মিষ্টি আর রসে ভরা ফল লটকন। পাতা দেখা না গেলেও ডাল থেকে শুরু করে গাছের গোড়া পর্যন্ত শুধু লটকন।

জানা যায়, ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. হামিদুল্লাহ ২০০৭ সালে জন্মস্থান নরসিংদীর বেলাব উপজেলার আমলাব গ্রামে চাচার বাড়িতে গিয়ে লটকনের বাগান দেখে মুগ্ধ হন। ফেরার সময় শখের বশে কয়েকটি লটকনের চারা সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরে ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের ভারুয়া গ্রামে বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত জমিতে চারাগুলো রোপণ করেন।

রোপণের প্রায় ৭ বছর পর ২০১৪ সালে গাছগুলোতে প্রথম ফল আসে। ফলন আশানুরূপ হওয়ায় তিনি বুঝতে পারেন, এ অঞ্চলেও সফলভাবে লটকন চাষ সম্ভব। এরপর ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার বাগানে শতাধিক লটকন গাছ আছে। এর মধ্যে এ বছর ৫১টি গাছের লটকন বিক্রি করে পেয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

বাগানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত থোকায় থোকায় ঝুলছে লটকন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ফল ব্যবসায়ীরা এসেছেন লটকন কিনতে। তারা নিজেরাই বাগানে ঢুকে গাছ থেকে ইচ্ছেমতো লটকন সংগ্রহ করছেন। এই বাগানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর অনেকেই দেখতে আসেন।

ইউপি সদস্য মো. হামিদুল্লাহ বলেন, ‌‘শুরুতে শুধু শখের বশে কয়েকটি চারা লাগিয়েছিলাম। পরে ভালো ফলন দেখে বাগান বড় করার সিদ্ধান্ত নিই। লটকন চাষে তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। গাছ রোপণের পর পরিপূর্ণ হতে প্রায় ১০ বছর লেগে যায়। তারপর থেকে ফলের উৎপাদন বাড়তে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমে যখন লটকন বাগান করি; তখন অনেকেই নিরুৎসাহিত করেন। তারা বলেন, এ অঞ্চলে এর ভালো ফলন হবে না। লোকসান হবে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আজ প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের এলাকায় লটকন চাষ সম্ভব। এখন প্রতি বছর লটকন বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও গাছ লাগানোর পরিকল্পনা আছে।’

বাগানের শ্রমিক মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, ‘আমরা মেম্বারের লটকন বাগানের পরিচর্যার কাজ করে যে বেতন পাই, তাতে আমার সংসার চলে। এ ছাড়া মেম্বারের বাগানের দেখাদেখি আরও কয়েকজন চাষ শুরু করেছেন। ওই বাগানগুলোতেও অনেক শ্রমিক কাজ করে তাদের সংসার চালান।’

স্থানীয় কৃষক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘মেম্বারের বাগান দেখে আমার বাড়ির পাশের জমিতে লটকন গাছের চারা রোপণের জন্য এরই মধ্যে প্রস্তুত করেছি। আশা করছি, অল্প কিছু দিনের মধ্যে চারা রোপণ করতে পারব।’

তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সিফাত হোসেন বলেন, ‘পাহাড়ের পরিবেশে লটকন গাছ ভালো হয়, রোগবালাইও কম। তাছাড়া লটকন গাছের পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে সহজ। তাই অনেক তরুণ এখন এটি চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এরই মধ্যে পাহাড়ি এ অঞ্চলে বেশ কয়েকটি ছোট আকারে বাগান করা হয়েছে।’

স্কুলশিক্ষক মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘এই বাগানের লটকন আকারে বড় এবং সুমিষ্ট। লটকন প্রচুর ক্যালোরি ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি ঔষধি ফল। এই বাগানে লটকন দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি নিজেও লটকন গাছের চারা রোপণ করব।’

ভয়েজ অব ঝিনাইগাতীর সভাপতি জাহিদুল হক মনির বলেন, ‘পাহাড়ে ফলভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ পরিবেশের জন্যও ইতিবাচক। লটকন চাষ বাড়লে পাহাড়ে সবুজায়ন যেমন বাড়বে; তেমনই কৃষকদের আয়ও বাড়বে। লটকন শুধু সুস্বাদু ফল নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ বাড়ানো গেলে পাহাড়ি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।’

জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাখওয়াত হোসেন বলেন, ‘লটকন একটি উচ্চমূল্যের লাভজনক ফল। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়া এই ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’