ঢাকা ০৮:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া নিয়ে নতুন বার্তা অধিদপ্তরের চলতি অর্থবছরেই ৪১ লাখ নতুন ফ্যামিলি কার্ড দেবে সরকার দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সরকারের প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী সংসদে ‘ব্যক্তিগত মন্তব্য’ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন শিক্ষামন্ত্রী আদমদীঘিতে কাঁচা মরিচের দামে ‘সেঞ্চুরি’, স্বস্তিতে কৃষক ব্রয়লার মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ ‘ব্রয়লার মুরগি’ মন্তব্য নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন ছাত্রদলের নাছির দেশের যেসব অঞ্চলে রাত ১টার মধ্যে ঝড়ের আভাস দিল্লিতে বসে হুঙ্কার দিয়ে লাভ নেই, সীমানায় ঢুকলেই গ্রেপ্তার: আইনমন্ত্রী

ম্যারাডোনা থেকে মেসি: বাংলাদেশে কেন আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ে এত উন্মাদনা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৩৪:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
  • ১৩ বার

বড় পর্দার আলো ততক্ষণে নিভে গেছে। হাজার হাজার সমর্থক তখনো চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা! মেসি! মেসি!’। ভিড়ের মধ্য থেকে ভেসে আসছিল ভুভুজেলার শব্দ। আর চারপাশ যেন পরিণত হয়েছিল আকাশি-সাদা রঙের একটি সমুদ্র।

এর কয়েক মুহূর্ত আগেই আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছেন। বড় পর্দায় খেলা দেখা তরুণ-তরুণীদের অনেকে নিজেদের গায়ে জড়িয়ে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকা। তারা একে অপরের কাঁধে উঠে গান গাইছেন, উদ্‌যাপন করছেন। খেলা শেষের বাঁশি বাজার অনেক পরও তাঁদের আনন্দ-উদ্‌যাপন থামছিল না।

এ দৃশ্য দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, এটি বুয়েনস এইরেসের কোনো চিত্র। কিন্তু বাস্তবে এটি আর্জেন্টিনার রাজধানী থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার।

বাংলাদেশ কখনোই ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবু প্রতি চার বছর পরপর যখন আর্জেন্টিনা মাঠে নামে, তখন সারা দেশের পাড়া-মহল্লা উৎসবে ফেটে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক এলাকায় বসানো হয় বড় পর্দা। আবাসিক ভবনগুলোয় সারা রাত জেগে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। রাস্তাঘাট ভরে যায় আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে। ঢাকার ৫০ বছর বয়সী আবদুল হাইয়ের এই যাত্রার শুরু হয়েছিল মেসিরও বহু আগে। আর্জেন্টিনার প্রতি আবদুল হাইয়ের এই ভালোবাসার শুরু ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সে বছর ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল।

আবদুল হাই বলেন, ‘আমি ১৯৮৬ সালেই ম্যারাডোনার “প্রেমে” পড়ে যাই। তখন খুব ছোট ছিলাম। কিন্তু নিজের চোখে দেখেছি, মানুষ তাঁর জন্য কতটা পাগল ছিল। তাঁর খেলার ধরন, আবেগ, দক্ষতা—এমনকি “হ্যান্ড অব গড” গোল—সবকিছুই আমাদের এমনভাবে মুগ্ধ করেছিল, যা অন্য কোনো কিছু পারেনি। তিনি আমাদের কাছে কিংবদন্তি ও এক বিস্ময় হয়ে উঠেছিলেন।’

এরপর আর্জেন্টিনাকে আবার বিশ্বকাপ জিততে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ৩৬ বছর। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে সেই অপেক্ষার অবসান হয়।

‘কিন্তু অপেক্ষাটা সার্থক ছিল। মেসির হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি দেখার পর ফুটবল নিয়ে আমার আর কোনো আক্ষেপ নেই। এবার আমি আগের বিশ্বকাপগুলোর মতো উদ্বেগ নিয়ে নয়, বরং অনেক আনন্দ নিয়ে বিশ্বকাপ দেখছি।’—বলেন আবদুল হাই।

ম্যারাডোনার জাদু

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, আবদুল হাইয়ের এই গল্প আসলে পুরো বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থন কীভাবে প্রথম ডালপালা মেলেছিল, তারই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি যতটুকু দেখেছি, এই উন্মাদনার শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক জয় এবং এরপর ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জয় সবকিছু বদলে দিয়েছিল। ম্যারাডোনার সেই অবিশ্বাস্য জাদুকরি ফুটবল দেখেই বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমর্থকে পরিণত হন।

এই সাবেক ফুটবলার বলেন, বিশ্বকাপ জয় ও আইকনিক সব ফুটবলারের কারণে আগে থেকেই ব্রাজিলের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী ছিল। তবে বাংলাদেশে ব্রাজিলের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে আর্জেন্টিনা হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প শক্তি।

শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, এর আগে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই ব্রাজিল সমর্থন করতেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের পর থেকে এ দেশে আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবেক এই তারকা মনে করেন, এর চার বছর পর অর্থাৎ ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ার পর এই ভালোবাসার বন্ধন আরও মজবুত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালের ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর ম্যারাডোনা যখন ট্রফি ছুঁতে পারলেন না এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন, সেই দৃশ্য এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। মূলত তখন থেকেই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থন স্থায়ী রূপ নেয়।’

আর এ কারণেই জার্মানি বা ইতালির মতো ফুটবল পরাশক্তিগুলো কখনোই এ দেশে তেমন বড় সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেনি বলে মনে করেন শফিকুল ইসলাম। তার ভাষায়, ‘এ দেশের মানুষের আবেগের জায়গাটা তত দিনে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছিল।’

ফুটবল কূটনীতি ও লিওনেল মেসি

আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশিদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা কূটনীতির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা খোদ ঢাকার সাধারণ সমর্থকদের সঙ্গে বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখছেন এবং আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলোতে উল্লাস করছেন।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বাংলাদেশিদের অভূতপূর্ব উন্মাদনা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। এর সূত্র ধরেই ৪৫ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৩ সালে ঢাকায় আবার নিজেদের দূতাবাস চালু করে বুয়েনস এইরেস। এর আগে বাজেট সংকোচনের অজুহাতে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক ঢাকায় তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছিল।

দূতাবাসটি আবার চালু করার পেছনে বাণিজ্যিক ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের চেয়েও দুই দেশের কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এই ফুটবল প্রেম।

তবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে ম্যারাডোনার স্মৃতির চেয়ে লিওনেল মেসির পায়ের জাদুই এখন বেশি পছন্দের। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকায় সমর্থকদের এক বিশাল র‍্যালিতে অংশ নিয়ে দ্বীন ইসলাম নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনার ভক্ত। আর এর একমাত্র কারণ লিওনেল মেসি।’

আবদুল হাইয়ের প্রজন্মের মতো দ্বীন ইসলামরা কখনোই সরাসরি ডিয়েগো ম্যারাডোনার খেলা দেখেননি। তবে ম্যারাডোনার জাদু না দেখলেও তাঁদের আবেগে বিন্দুমাত্র কমতি নেই। আর্জেন্টিনার ম্যাচ শুরুর আগে বৃষ্টিভেজা রাস্তা মাড়িয়ে যখন নতুন প্রজন্মের সমর্থকেরা র‍্যালি নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁদের চারপাশজুড়ে ছিল ঢাকঢোলের গর্জন আর বিশাল আকৃতির আকাশি-সাদা পতাকার উথালপাথাল ঢেউ।

অনেকের ক্ষেত্রে আবার এই ফুটবল প্রেম এসেছে একেবারে পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে। মোহাম্মদ জহির নামের এক সমর্থক যেমন বলছিলেন, আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসাটা তাঁদের রক্তে মিশে আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা আর্জেন্টিনার কট্টর ভক্ত ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই আমি এই দলের প্রতি ভালোবাসা পেয়েছি। এরপর যখন নিজে ফুটবল বুঝতে শুরু করলাম, তখন দলটির খেলার নান্দনিক শৈলী দেখে চিরদিনের জন্য প্রেমে পড়ে গেলাম।’

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেকগুলো ম্যাচই বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী মাঝরাতে কিংবা ভোররাতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে রাউন্ড অব ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় কেপ ভার্দের মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির দল।

তবে সময়ের এই প্রতিকূলতা বাংলাদেশিদের উন্মাদনা দমিয়ে রাখতে পারছে না একটুও। সময়ের কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিলেন জহির। তিনি বলেন, ‘খেলা দেখার জন্য আমার কোনো অ্যালার্ম বা ঘড়ির কাঁটার প্রয়োজন হয় না। আর্জেন্টিনা যখনই মাঠে নামে, আমার ঘুম এমনিতেই ভেঙে যায়।’

বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ

ক্রীড়া সাংবাদিক ও ভাষ্যকার শাহনূর রব্বানী মনে করেন, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি বাংলাদেশিদের এই তুমুল মোহ মূলত মাঠের মহানায়কদের প্রতি আকর্ষণেরই এক প্রতিফলন।

রব্বানী বলেন, ‘আমরা যদি ফুটবলের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় এবং পরবর্তী সময়ে লাতিন আমেরিকার এই দুটি দলই সবচেয়ে ভালো খেলেছে। আশির দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল একাধিকবার বিশ্বকাপ জিতেছে।

রব্বানী বলছিলেন, ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে রোনালদো, রিভালদো এবং বর্তমান যুগের মেসি ও নেইমার—এই তারকাদের উপস্থিতিই সব সময় মানুষকে এই দল দুটির প্রতি আকৃষ্ট করেছে। এটা কেবল ফুটবল খেলার শৈলী নয়, বরং তারকা খেলোয়াড়দের ক্যারিশমা। দলগত খেলা হলেও বাঙালি সব সময় একজন একক নায়ক বা ত্রাতা পছন্দ করে।’

অনেক বাংলাদেশির জন্য এই ফুটবলীয় আনুগত্য কেবল পাড়া-মহল্লায় নয়, বরং ঘরের ভেতরেও বিভক্তি তৈরি করে। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আয়মান ব্রাজিল সমর্থক। আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার মধ্যকার ম্যাচের আগে ঢাকায় এক র‍্যালিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অংশ নিয়ে সে বলে, ‘আমার ভাই আমাকে জোর করে এখানে নিয়ে এসেছে।’

আয়মানের অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া বড় ভাই সালমান হাসিমুখে বলেন, ‘বাসায় আমরা প্রায়ই এটা নিয়ে তর্ক করি। আমাদের বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক আর মা ব্রাজিলের।’

এর কয়েক ঘণ্টা পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে টিএসসির বড় পর্দার সামনেও সেই চিরচেনা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ দেখা গেল। হাজার হাজার সমর্থক যখন লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক উদ্‌যাপনে মত্ত, তখন আকাশি-সাদার সমুদ্রে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল এক ব্রাজিল সমর্থক কিশোর। তার আর্জেন্টিনার সমর্থক বন্ধুরা তাকে খোঁচাতে ছাড়ছিল না।

একজন হেসে বলল, ‘ও খেলা শুরুর আগে বলছিল, ম্যাচটা নাকি ড্র হবে!’ র‍্যালিতে অংশ নেওয়া জুবায়দা ইসলাম জেরিন নামের এক রাজনৈতিক কর্মী তো নিজের পোষা বিড়ালকেও আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। বিড়ালটির নাম রাখা হয়েছে ‘মেসি’।

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র সৈকত হাসান তখনো মেসির হ্যাটট্রিক দেখার ঘোর থেকে বের হতে পারছিলেন না। সৈকত বলেন, ‘অনুভূতিটা জাস্ট অসাধারণ!’ তবে তার বন্ধু মাহিরের চোখ আরও দূরে, চরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাহির বলল, ‘এবারও বিশ্বকাপ আমাদেরই।’

বাংলাদেশ কি কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারবে

আর্জেন্টিনার জয়ে ‘বিশ্বকাপ আমাদের’ বলে উল্লাস করলেও এই ‘আমাদের’ শব্দটাই ভাবিয়ে তুলেছে ক্রীড়া সাংবাদিক শাহনূর রব্বানীকে। তাঁর মনে বড় প্রশ্ন—ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশিদের এই তুমুল উন্মাদনা কেন কখনো দেশের ফুটবলের সাফল্যে রূপান্তর হলো না? বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফার র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮১ নম্বরে।

বাংলাদেশি সমর্থকদের এমন পাগলাটে ফুটবল প্রেম নিয়ে রব্বানী বলেন, ‘ওদের এই বাঁধভাঙা উল্লাস দেখলে আমার যেমন ভীষণ আনন্দ হয়, ঠিক তেমনি একধরনের কষ্ট অনুভব করি। কারণ, আমাদের এত আবেগ ও ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও আমাদের ফুটবল দল এবং সামগ্রিকভাবে দেশের খেলাধুলা যে অবস্থানে থাকার কথা ছিল, তার ধারেকাছেও নেই।’

শাহনূর রব্বানীর মতে, ফুটবল নিয়ে মানুষের এই আবেগকে সাফল্যে রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, ‘এখানে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা কিংবা উন্নত একাডেমি নেই। এমনকি যেসব তরুণ ক্রীড়াবিদ হতে চায়, তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা বা পথও নেই। মানুষের ফুটবল খেলার তীব্র ইচ্ছা আর আবেগ আছে। কিন্তু পেশাদার উপায়ে কীভাবে সেই স্বপ্ন পূরণ করা যায়, তা অনেকেই জানে না।’

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, একসময় বাংলাদেশে একটি সমৃদ্ধ ফুটবল সংস্কৃতির শক্ত ভিত্তি ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ধরে রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

এই সাবেক ফুটবলার বলেন, ‘আমাদের অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় ছিলেন, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করা বা একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার কথা কেউ ভাবেননি। দেশের তরুণ সমাজ তো আর এখনই বাংলাদেশকে আগামী বিশ্বকাপে দেখতে চাচ্ছে না। তারা কেবল একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চায় এবং এটা নিশ্চিত হতে চায়, দেশের ফুটবল সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।’

বিনিয়োগ ও সঠিক পরিকল্পনা কীভাবে পুরো দেশের মানসিকতা বদলে দিতে পারে, তার প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাস মনে করিয়ে দেন শাহনূর রব্বানী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন ১৯৯৭ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল, তখন পুরো দেশ উৎসবে মেতেছিল। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানকে হারিয়েছিল, তখনো পুরো দেশ একইভাবে গর্জে উঠেছিল। সেটা কেবল কোনো খেলা ছিল না, মনে হচ্ছিল যেন বাংলাদেশ নিজেই এক বড় বিজয় অর্জন করেছে।’

ক্রীড়া সাংবাদিক রব্বানী আক্ষেপের সুরে প্রশ্ন তোলেন, ‘খেলাধুলা যদি একটি দেশকে এই পরিমাণ অনাবিল আনন্দ দিতে পারে, তবে কেন আমাদের খেলাধুলার খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা হবে না?’

সূত্র : আল জাজিরা

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই সরকারের অগ্রাধিকার: মাহদী আমিন

ম্যারাডোনা থেকে মেসি: বাংলাদেশে কেন আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ে এত উন্মাদনা

আপডেট টাইম : ১১:৩৪:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

বড় পর্দার আলো ততক্ষণে নিভে গেছে। হাজার হাজার সমর্থক তখনো চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা! মেসি! মেসি!’। ভিড়ের মধ্য থেকে ভেসে আসছিল ভুভুজেলার শব্দ। আর চারপাশ যেন পরিণত হয়েছিল আকাশি-সাদা রঙের একটি সমুদ্র।

এর কয়েক মুহূর্ত আগেই আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছেন। বড় পর্দায় খেলা দেখা তরুণ-তরুণীদের অনেকে নিজেদের গায়ে জড়িয়ে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকা। তারা একে অপরের কাঁধে উঠে গান গাইছেন, উদ্‌যাপন করছেন। খেলা শেষের বাঁশি বাজার অনেক পরও তাঁদের আনন্দ-উদ্‌যাপন থামছিল না।

এ দৃশ্য দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, এটি বুয়েনস এইরেসের কোনো চিত্র। কিন্তু বাস্তবে এটি আর্জেন্টিনার রাজধানী থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার।

বাংলাদেশ কখনোই ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবু প্রতি চার বছর পরপর যখন আর্জেন্টিনা মাঠে নামে, তখন সারা দেশের পাড়া-মহল্লা উৎসবে ফেটে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক এলাকায় বসানো হয় বড় পর্দা। আবাসিক ভবনগুলোয় সারা রাত জেগে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। রাস্তাঘাট ভরে যায় আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে। ঢাকার ৫০ বছর বয়সী আবদুল হাইয়ের এই যাত্রার শুরু হয়েছিল মেসিরও বহু আগে। আর্জেন্টিনার প্রতি আবদুল হাইয়ের এই ভালোবাসার শুরু ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ থেকে। সে বছর ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল।

আবদুল হাই বলেন, ‘আমি ১৯৮৬ সালেই ম্যারাডোনার “প্রেমে” পড়ে যাই। তখন খুব ছোট ছিলাম। কিন্তু নিজের চোখে দেখেছি, মানুষ তাঁর জন্য কতটা পাগল ছিল। তাঁর খেলার ধরন, আবেগ, দক্ষতা—এমনকি “হ্যান্ড অব গড” গোল—সবকিছুই আমাদের এমনভাবে মুগ্ধ করেছিল, যা অন্য কোনো কিছু পারেনি। তিনি আমাদের কাছে কিংবদন্তি ও এক বিস্ময় হয়ে উঠেছিলেন।’

এরপর আর্জেন্টিনাকে আবার বিশ্বকাপ জিততে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ৩৬ বছর। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে সেই অপেক্ষার অবসান হয়।

‘কিন্তু অপেক্ষাটা সার্থক ছিল। মেসির হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি দেখার পর ফুটবল নিয়ে আমার আর কোনো আক্ষেপ নেই। এবার আমি আগের বিশ্বকাপগুলোর মতো উদ্বেগ নিয়ে নয়, বরং অনেক আনন্দ নিয়ে বিশ্বকাপ দেখছি।’—বলেন আবদুল হাই।

ম্যারাডোনার জাদু

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, আবদুল হাইয়ের এই গল্প আসলে পুরো বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থন কীভাবে প্রথম ডালপালা মেলেছিল, তারই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি যতটুকু দেখেছি, এই উন্মাদনার শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক জয় এবং এরপর ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জয় সবকিছু বদলে দিয়েছিল। ম্যারাডোনার সেই অবিশ্বাস্য জাদুকরি ফুটবল দেখেই বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমর্থকে পরিণত হন।

এই সাবেক ফুটবলার বলেন, বিশ্বকাপ জয় ও আইকনিক সব ফুটবলারের কারণে আগে থেকেই ব্রাজিলের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী ছিল। তবে বাংলাদেশে ব্রাজিলের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে আর্জেন্টিনা হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প শক্তি।

শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, এর আগে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই ব্রাজিল সমর্থন করতেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের পর থেকে এ দেশে আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হতে শুরু করে।

বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবেক এই তারকা মনে করেন, এর চার বছর পর অর্থাৎ ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ার পর এই ভালোবাসার বন্ধন আরও মজবুত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালের ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর ম্যারাডোনা যখন ট্রফি ছুঁতে পারলেন না এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন, সেই দৃশ্য এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। মূলত তখন থেকেই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থন স্থায়ী রূপ নেয়।’

আর এ কারণেই জার্মানি বা ইতালির মতো ফুটবল পরাশক্তিগুলো কখনোই এ দেশে তেমন বড় সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেনি বলে মনে করেন শফিকুল ইসলাম। তার ভাষায়, ‘এ দেশের মানুষের আবেগের জায়গাটা তত দিনে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছিল।’

ফুটবল কূটনীতি ও লিওনেল মেসি

আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশিদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা কূটনীতির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা খোদ ঢাকার সাধারণ সমর্থকদের সঙ্গে বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখছেন এবং আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলোতে উল্লাস করছেন।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বাংলাদেশিদের অভূতপূর্ব উন্মাদনা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। এর সূত্র ধরেই ৪৫ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৩ সালে ঢাকায় আবার নিজেদের দূতাবাস চালু করে বুয়েনস এইরেস। এর আগে বাজেট সংকোচনের অজুহাতে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক ঢাকায় তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছিল।

দূতাবাসটি আবার চালু করার পেছনে বাণিজ্যিক ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের চেয়েও দুই দেশের কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এই ফুটবল প্রেম।

তবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে ম্যারাডোনার স্মৃতির চেয়ে লিওনেল মেসির পায়ের জাদুই এখন বেশি পছন্দের। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকায় সমর্থকদের এক বিশাল র‍্যালিতে অংশ নিয়ে দ্বীন ইসলাম নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনার ভক্ত। আর এর একমাত্র কারণ লিওনেল মেসি।’

আবদুল হাইয়ের প্রজন্মের মতো দ্বীন ইসলামরা কখনোই সরাসরি ডিয়েগো ম্যারাডোনার খেলা দেখেননি। তবে ম্যারাডোনার জাদু না দেখলেও তাঁদের আবেগে বিন্দুমাত্র কমতি নেই। আর্জেন্টিনার ম্যাচ শুরুর আগে বৃষ্টিভেজা রাস্তা মাড়িয়ে যখন নতুন প্রজন্মের সমর্থকেরা র‍্যালি নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁদের চারপাশজুড়ে ছিল ঢাকঢোলের গর্জন আর বিশাল আকৃতির আকাশি-সাদা পতাকার উথালপাথাল ঢেউ।

অনেকের ক্ষেত্রে আবার এই ফুটবল প্রেম এসেছে একেবারে পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে। মোহাম্মদ জহির নামের এক সমর্থক যেমন বলছিলেন, আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসাটা তাঁদের রক্তে মিশে আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা আর্জেন্টিনার কট্টর ভক্ত ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই আমি এই দলের প্রতি ভালোবাসা পেয়েছি। এরপর যখন নিজে ফুটবল বুঝতে শুরু করলাম, তখন দলটির খেলার নান্দনিক শৈলী দেখে চিরদিনের জন্য প্রেমে পড়ে গেলাম।’

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেকগুলো ম্যাচই বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী মাঝরাতে কিংবা ভোররাতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে রাউন্ড অব ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় কেপ ভার্দের মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির দল।

তবে সময়ের এই প্রতিকূলতা বাংলাদেশিদের উন্মাদনা দমিয়ে রাখতে পারছে না একটুও। সময়ের কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিলেন জহির। তিনি বলেন, ‘খেলা দেখার জন্য আমার কোনো অ্যালার্ম বা ঘড়ির কাঁটার প্রয়োজন হয় না। আর্জেন্টিনা যখনই মাঠে নামে, আমার ঘুম এমনিতেই ভেঙে যায়।’

বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ

ক্রীড়া সাংবাদিক ও ভাষ্যকার শাহনূর রব্বানী মনে করেন, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি বাংলাদেশিদের এই তুমুল মোহ মূলত মাঠের মহানায়কদের প্রতি আকর্ষণেরই এক প্রতিফলন।

রব্বানী বলেন, ‘আমরা যদি ফুটবলের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় এবং পরবর্তী সময়ে লাতিন আমেরিকার এই দুটি দলই সবচেয়ে ভালো খেলেছে। আশির দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল একাধিকবার বিশ্বকাপ জিতেছে।

রব্বানী বলছিলেন, ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে রোনালদো, রিভালদো এবং বর্তমান যুগের মেসি ও নেইমার—এই তারকাদের উপস্থিতিই সব সময় মানুষকে এই দল দুটির প্রতি আকৃষ্ট করেছে। এটা কেবল ফুটবল খেলার শৈলী নয়, বরং তারকা খেলোয়াড়দের ক্যারিশমা। দলগত খেলা হলেও বাঙালি সব সময় একজন একক নায়ক বা ত্রাতা পছন্দ করে।’

অনেক বাংলাদেশির জন্য এই ফুটবলীয় আনুগত্য কেবল পাড়া-মহল্লায় নয়, বরং ঘরের ভেতরেও বিভক্তি তৈরি করে। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আয়মান ব্রাজিল সমর্থক। আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার মধ্যকার ম্যাচের আগে ঢাকায় এক র‍্যালিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অংশ নিয়ে সে বলে, ‘আমার ভাই আমাকে জোর করে এখানে নিয়ে এসেছে।’

আয়মানের অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া বড় ভাই সালমান হাসিমুখে বলেন, ‘বাসায় আমরা প্রায়ই এটা নিয়ে তর্ক করি। আমাদের বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক আর মা ব্রাজিলের।’

এর কয়েক ঘণ্টা পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে টিএসসির বড় পর্দার সামনেও সেই চিরচেনা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ দেখা গেল। হাজার হাজার সমর্থক যখন লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক উদ্‌যাপনে মত্ত, তখন আকাশি-সাদার সমুদ্রে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল এক ব্রাজিল সমর্থক কিশোর। তার আর্জেন্টিনার সমর্থক বন্ধুরা তাকে খোঁচাতে ছাড়ছিল না।

একজন হেসে বলল, ‘ও খেলা শুরুর আগে বলছিল, ম্যাচটা নাকি ড্র হবে!’ র‍্যালিতে অংশ নেওয়া জুবায়দা ইসলাম জেরিন নামের এক রাজনৈতিক কর্মী তো নিজের পোষা বিড়ালকেও আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। বিড়ালটির নাম রাখা হয়েছে ‘মেসি’।

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র সৈকত হাসান তখনো মেসির হ্যাটট্রিক দেখার ঘোর থেকে বের হতে পারছিলেন না। সৈকত বলেন, ‘অনুভূতিটা জাস্ট অসাধারণ!’ তবে তার বন্ধু মাহিরের চোখ আরও দূরে, চরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাহির বলল, ‘এবারও বিশ্বকাপ আমাদেরই।’

বাংলাদেশ কি কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারবে

আর্জেন্টিনার জয়ে ‘বিশ্বকাপ আমাদের’ বলে উল্লাস করলেও এই ‘আমাদের’ শব্দটাই ভাবিয়ে তুলেছে ক্রীড়া সাংবাদিক শাহনূর রব্বানীকে। তাঁর মনে বড় প্রশ্ন—ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশিদের এই তুমুল উন্মাদনা কেন কখনো দেশের ফুটবলের সাফল্যে রূপান্তর হলো না? বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফার র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮১ নম্বরে।

বাংলাদেশি সমর্থকদের এমন পাগলাটে ফুটবল প্রেম নিয়ে রব্বানী বলেন, ‘ওদের এই বাঁধভাঙা উল্লাস দেখলে আমার যেমন ভীষণ আনন্দ হয়, ঠিক তেমনি একধরনের কষ্ট অনুভব করি। কারণ, আমাদের এত আবেগ ও ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও আমাদের ফুটবল দল এবং সামগ্রিকভাবে দেশের খেলাধুলা যে অবস্থানে থাকার কথা ছিল, তার ধারেকাছেও নেই।’

শাহনূর রব্বানীর মতে, ফুটবল নিয়ে মানুষের এই আবেগকে সাফল্যে রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, ‘এখানে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা কিংবা উন্নত একাডেমি নেই। এমনকি যেসব তরুণ ক্রীড়াবিদ হতে চায়, তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা বা পথও নেই। মানুষের ফুটবল খেলার তীব্র ইচ্ছা আর আবেগ আছে। কিন্তু পেশাদার উপায়ে কীভাবে সেই স্বপ্ন পূরণ করা যায়, তা অনেকেই জানে না।’

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, একসময় বাংলাদেশে একটি সমৃদ্ধ ফুটবল সংস্কৃতির শক্ত ভিত্তি ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ধরে রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

এই সাবেক ফুটবলার বলেন, ‘আমাদের অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় ছিলেন, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করা বা একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার কথা কেউ ভাবেননি। দেশের তরুণ সমাজ তো আর এখনই বাংলাদেশকে আগামী বিশ্বকাপে দেখতে চাচ্ছে না। তারা কেবল একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চায় এবং এটা নিশ্চিত হতে চায়, দেশের ফুটবল সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।’

বিনিয়োগ ও সঠিক পরিকল্পনা কীভাবে পুরো দেশের মানসিকতা বদলে দিতে পারে, তার প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাস মনে করিয়ে দেন শাহনূর রব্বানী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন ১৯৯৭ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল, তখন পুরো দেশ উৎসবে মেতেছিল। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানকে হারিয়েছিল, তখনো পুরো দেশ একইভাবে গর্জে উঠেছিল। সেটা কেবল কোনো খেলা ছিল না, মনে হচ্ছিল যেন বাংলাদেশ নিজেই এক বড় বিজয় অর্জন করেছে।’

ক্রীড়া সাংবাদিক রব্বানী আক্ষেপের সুরে প্রশ্ন তোলেন, ‘খেলাধুলা যদি একটি দেশকে এই পরিমাণ অনাবিল আনন্দ দিতে পারে, তবে কেন আমাদের খেলাধুলার খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা হবে না?’

সূত্র : আল জাজিরা