তারাকান্দা : ২০২৫ সালে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় বাউলশিল্পী হালিম উদ্দিন আকন্দের মাথার চুল ও দাড়ি কর্তন
নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষজনের বাসা, সংগঠন ও কর্মস্থলে ধারাবাহিকভাবে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার কথা জানা গেছে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে।
বাংলাদেশ বাউল সমিতির মহাসচিব ও সংগঠক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও মবের শিকার হয়েছি। মব করে দখল করা হয়েছে আমাদের বাউল সমিতির অফিস।’ তিনি আরো বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশের বাউলশিল্পীরা তেমন কোনো অনুষ্ঠান করতে পারেননি। অল্প কিছু অনুষ্ঠান হলেও হামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিভাবে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি বাধার মুখে পড়েছে, জাতীয় সংসদে বীর মুক্তিযোদ্ধা এমপি ফজলুর রহমানের বক্তব্যে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, ‘৫ আগস্টের পর কী হলো—আপনারা জানেন। এখানে ইউনূস সরকার ছিল। আমি শিল্পকলা একাডেমির সামনে থাকি। একটা গান হইতে পারে নাই, একটা নাটক হইতে পারে নাই, একটা লালনের গীতি হইতে পারে নাই, একটা বাউল গান হইতে পারে নাই—সবকিছু কালো শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল।’
ক্ষমতায় থাকাকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা কখনোই মব ঠেকাতে নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নেননি। তবে গত ৫ এপ্রিল বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘মব ঠেকানোর ক্ষেত্রে দৃঢ়তা দেখাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’

মানিকগঞ্জ : ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর বাউলদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে আক্রমণ করে ‘তৌহিদি জনতা’
লোকশিল্পীদের ওপর হামলা, অনুষ্ঠানে বাধা
২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জে বাউলদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে তৌহিদি জনতার ব্যানারে আক্রমণ করা হয়। সেখানে ১০ জন বাউলশিল্পীকে বেদম পেটানো হয়। মারাত্মকভাবে আহত হন বাউলশিল্পী আবদুল আলীম, আরিফুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।

ঠাকুরগাঁও : ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর শহরের চৌরাস্তা মোড়ে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা ও মারধর
২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর ‘সম্প্রীতির ঐক্য, ঠাকুরগাঁও’ ব্যানারে শহরের চৌরাস্তা মোড়ে বাউলশিল্পীদের প্রতিবাদ সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। সেখানে প্রকাশ্যে বাউলরা মারধর ও হামলার শিকার হন।
বাউলশিল্পী ও সংগঠক রাজু সরকার বলেন, ইউনূসের আমলে সারা দেশে বাউল-ফকিররা অপদস্থ, হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এ সময় তাঁরা তেমন কোনো অনুষ্ঠানেও যেতে পারেননি, গান গাইতে পারেননি। সারা দেশেই বাউলশিল্পীরা ভয় ও আতঙ্কে ছিলেন।
বাউল ও পালাশিল্পীদের একটি বড় অংশ মাজার ঘরানার। তাঁরা মাজারে ওরস বা মাহফিলে গান করেন, বিভিন্ন মেলা-পার্বণে অংশ নেন। ইউনূসের শাসনামলে দেশের শতাধিক মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় অনেক জায়গায় হামলার শিকার হন বাউলশিল্পীরাও।
লোকসংস্কৃতি গবেষক আমিনুর রহমান সুলতান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাউল, পালাগান, লালনের গান, মাজারকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকতার চর্চা আমাদের সমাজের বৈচিত্র্য, মানবিকতা, সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের ধারাকে বহন করে। দুঃখের বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি নানাভাবে আক্রান্ত হয়।’
মঞ্চনাটক, গ্রাম থিয়েটারকর্মীরা আক্রান্ত
স্বাধীনতার পর আধুনিক নাট্য-আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’ উপহার দিয়েছে কালজয়ী নাটক ও অনেক শিল্পী-কলাকুশলী। চলচ্চিত্র নির্মাণেও রেখেছেন অবদান, যা দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। পেয়েছেন একুশে পদক, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কারসহ অনেক পদক ও সম্মাননা। এই গুণী মানুষটির নাম নাসির উদ্দীন ইউসুফ। এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকেও আসামি করা হয়েছে হত্যা মামলার।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র-জনতার ওপর আমি নাকি গুলি চালিয়েছি, মানুষ হত্যা করেছি! অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চাকে ব্যাহত করার উদ্দেশ্যেই মামলায় আমার নাম দেওয়া হয়েছে বলে মনে করি।’
দেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে আরেক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, নির্দেশক, সংগঠক মামুনুর রশীদও হেনস্তার শিকার হন। ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার সামনে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের এক অনুষ্ঠানে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। বিকেল ৪টার পর সমাবেশে মামুনুর রশীদের বক্তব্যের সময় কিছু লোক ডিম ছুড়ে মারে, নাট্যকর্মীদের ওপর হামলে পড়ে। পরে শিল্পকলা একাডেমিতে মামুনুর রশীদকে নাটকে অভিনয় না করার অনুরোধ করেন সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ।
মামুনুর রশীদ বলেন, ‘শিল্পকলার সাবেক ডিজি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন, আমি যাতে শিল্পকলায় অভিনয় না করি। কারণ হিসেবে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সময় দেওয়া ২৪ জন বিশিষ্টজনের একটি বিবৃতির কথা জানান। রাজাকার স্লোগান নিয়ে ২৪ জন বিশিষ্টজন বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেখানে আমার নাম ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ওই বিবৃতিতে কী অপরাধ আছে? অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে একটি মহল বিভিন্নভাবে চষ্টা করেছিল দেশে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হয়ে যাক।’
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থিয়েটারের সভাপতির বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থিয়েটারের সভাপতি ও সংগঠক হাবিবুর রহমান হাবিবের বাড়ি, জামালপুরের মেলান্দহে শহীদ সমর থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও নাট্যকার আসাদুল্লাহ ফারাজীর বাড়িও ভাঙচুর করা হয়। তাঁদের নামে একাধিক মামলাও করা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগ করে বর্তমানে জামিনে আছেন গ্রাম থিয়েটারের অন্যতম এই দুই সংগঠক।
রুপালি পর্দার তারকারাও আক্রান্ত
চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় মুখ নুসরাত ফারিয়া। বাংলাদেশ ও ভারতে একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। পেয়েছেন খ্যাতি ও ব্যাপক পরিচিতি। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীনির্ভর ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’ চলচ্চিত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নুসরাত ফারিয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হত্যা মামলার আসামি করা হয় এই অভিনেত্রীকে। ২০২৫ সালের ১৮ মে গ্রেপ্তার হন ফারিয়া। তাঁকে ভাটারা থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

ঢাকা : ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে কাকরাইলে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়
টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে পরিচিত মুখ কমেডি অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বিকেলে কাকরাইল এলাকায় মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। সংগৃহীত ভিডিওতে দেখা যায়, জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে একদল যুবক। কেউ একজন তাঁর গায়ে হাত তুলছিল। জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে সিদ্দিককে সেদিন রমনা থানা-পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে গুলশান থানায় জুলাই আন্দোলনে ছাত্র হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১১ মাস কারাভোগ করে সমপ্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এই অভিনেতা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শতাধিক চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক, পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। হত্যা বা হত্যাচেষ্টার মামলা হওয়ায় তাঁদের অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। ফেরদৌস আহমেদ, রিয়াজ, চঞ্চল চৌধুরী, শমী কায়সার, অপু বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, শামীমা তুষ্টি, সৈয়দা কামরুন নাহার শাহনূর, উর্মিলা শ্রাবন্তী কর, সোহানা সাবা, তানভীন সুইটি, মেহের আফরোজ শাওন, জাকিয়া মুন, জ্যোতিকা জ্যোতি, সুবর্ণা মুস্তাফা, আজিজুল হাকিম, আশনা হাবিব ভাবনা, সায়মন সাদিক, জায়েদ খান, রোকেয়া প্রাচী, তারিন জাহান, অরুণা বিশ্বাস, ইরেশ যাকের, সাজু খাদেম প্রমুখের বিরুদ্ধে মামলা হয় ওই সময়।
তবে এঁদের অনেকের কর্মকাণ্ডই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার ইন্ধন জুগিয়েছে বলে অভিযোগ ছিল।
চারুকলা শিল্পীদের হেনস্তা
২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের এক অনুষ্ঠানে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন প্রখ্যাত শিল্পী ও ‘টোকাই’ চরিত্রের স্রষ্টা রফিকুন নবী। সেদিন অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী-২০২৪-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। দুপুরে অনুষদে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের শিল্পকর্ম ঘুরে দেখেন এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন রফিকুন নবী। তবে পরে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁকে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার অনুরোধ জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তাঁর ওপর মব হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আয়োজকরা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনাটি চারুকলা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
একই বছরের ৫ মে রাজধানীর গুলশানে হেনস্তার শিকার হন ভাস্কর রাসা। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।
ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক রিকশা থামিয়ে ভাস্কর রাসাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার নামে মামলা হয় নাই? আপনি কই যান? গুলশান থানায় চলেন।’ এ সময় তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগালও করা হয়। এক পর্যায়ে পেছন থেকে ধাক্কা ও লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটে।

ঢাকা : ২০২৫ সালের ৫ মে গুলশানে ভাস্কর রাসাকে রিকশা থেকে নামিয়ে গালাগাল ও হেনস্তা করা হয়
সূত্র জানায়, সেদিন সন্ধ্যায় ভাস্কর রাসা রিকশায় করে গুলশানের সাজু আর্ট গ্যালারিতে যাচ্ছিলেন। গুলশান-১ ও গুলশান-২-এর মাঝামাঝি এলাকায় এক যুবক তারা রিকশা থামিয়ে তর্কে জড়ান। পরে আরো দুই-তিনজন সেখানে জড়ো হয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে ভাস্কর রাসা দ্রুত রাস্তা পার হয়ে সেখান থেকে সরে যান। তখন পেছন থেকে তাঁকে আঘাত করা হয় বলেও জানা গেছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নেতারাও আক্রান্ত
দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রায় দেড় শ সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই জোটের অধিকাংশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে হত্যা কিংবা হত্যাচষ্টোর মামলা রয়েছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে মব হামলার শিকার হয়েছেন। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ অনেক দিন ধরেই আত্মগোপনে আছেন। সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ মব আক্রমণ ও মামলা থেকে রক্ষা পেতে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে আবৃত্তিশিল্পী ও জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনূস আমল দেশের শিল্প-সংস্কৃতির জন্য অন্ধকার যুগ ছিল। সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন অনেকেই। আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। মব আক্রমণ ও হত্যার হুমকি পেয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।’
মুক্তধারা আবৃত্তি চর্চাকেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ও আবৃত্তিশিল্পী মহিউদ্দিন শামীম কালের কণ্ঠকে জানান, সারা দেশে আবৃত্তিশিল্পীরাও হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। আবৃত্তিশিল্পী আহসান উল্লাহ, মনির হোসেন, শামীম আরা রত্না, ইমদাদ হোসেন কৈশোর, মাহবুবুর রহমান মাহফুজ, শামসু মিঠু, জালাল উদ্দিন হিরা, বশির দুলাল প্রমুখের নামা মামলা হয়েছে।

ঢাকা : ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মারধরের শিকার হন কবি ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব
কথাশিল্পীরাও হামলা-মামলার শিকার
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পরই ৭ মার্চ ও ১৫ আগস্ট সরকারি ছুটি বাতিল করে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ক্রিয়েটিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠন মানববন্ধন আয়োজন করে। সেখানে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় অর্ধশত কবি-সাহিত্যিক ও লিটলম্যাগ কর্মী। সেদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁদের ওপর আক্রমণ চালায় কয়েক শ মানুষ। দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা দিয়ে তাঁদের প্রায় সবাইকে বেদম প্রহার করা হয়।
কালের কণ্ঠ সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন প্রেস ক্লাবের সামনে হামলায় গুরুতর আহত হন কবি ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব। তাঁকে রাস্তায় ফেলে নির্মমভাবে পেটানো হয়। এ ঘটনায় তিনি মারাত্মকভাবে শারীরিক ও মানসিক আঘাত পান। চিকিৎসা নেন কয়েকটি হাসপাতালে, তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। মাস ছয় পরে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল অসুস্থ অবস্থায় মারা যান এই কবি ও সাংবাদিক।
সেদিন হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন সংগঠনটির মুখপাত্র কবি কুতুব হিলালী। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, “সেদিন আমাদের ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। আমরা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত না। আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার ওপর আঘাতের প্রতিবাদে আমরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম।”
কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবে সুপরিচিত সোহেল হাসান গালিব। পেশায় তিনি বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। প্রকাশিত একটি বই ও কবিতায় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালে মামলা করা হয়। প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও এখনো কাজে যোগদান করতে পারেননি।
চারুলিপি প্রকাশনের প্রধান প্রকাশক হুমায়ুন কবীরকে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়। কালের কণ্ঠকে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো মামলা ছিল না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছবি থাকা এবং তাঁর বই প্রকাশ করার কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭১ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছি।’
এ ছাড়া কবি কামাল চৌধুরী, কবি মোহাম্মদ সাদিক, কবি তারিক সুজাত, লেখক রাখাল রাহা, প্রকাশক ওসমান গনি, প্রকাশক আফজাল হোসেন প্রমুখের নামে মামলা হয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়াসহ অনেক কবি-সাহিত্যিকের স্মৃতিচিহ্ন, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, গ্রাফিতি অবমাননা ও ভাঙচুর করা হয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি ও পরে এক দফার সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড জলের গান-এর প্রধান রাহুল আনন্দ। তবু এই শিল্পী রক্ষা পাননি মব সহিংসতা থেকে। হাসিনা সরকারের পতনের দিনই রাহুল আনন্দর ধানমণ্ডির বাসভবনে চালানো হয় হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। গোটা বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। শিল্পীর তিন শতাধিক বাদ্যযন্ত্র, স্টুডিও রক্ষা পায় না ভাঙচুর, আগুন থেকে। লেপ-তোষক, এসি থেকে শুরু করে সবকিছু খুলে নিয়ে যায় লুটপাটকারীরা। সেদিন প্রাণ বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে বাসা ছাড়তে বাধ্য হন রাহুল। পরে নিঃস্ব অবস্থায় দেশ ছাড়েন এই শিল্পী।
কারা হামলা করেছে
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সারা দেশে বাউল, লোকশিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনাগুলোর পেছনে একই ধরনের সংগঠিত চক্রের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিলেছে। অধিকাংশ হামলাকারী ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানার ব্যবহার করে মাঠে নামে। তবে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় এরই মধ্যে শনাক্ত হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, হামলায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে সাবিদ সাদী নামের এক ব্যক্তিকে। ৫ আগস্টের পর তিনি হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। হামলার সময় তাঁকে মাইক হাতে বাউলদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ঘোষণা দিতে দেখা যায়। আরেকজন শনাক্ত ব্যক্তি হলেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বরংগোখোলা গ্রামের হেফাজতে ইসলামের কর্মী আবদুল আলিম। স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলার সময় তিনি আহতও হন।
মানিকগঞ্জের একাধিক সূত্র বলছে, হামলায় অংশ নেওয়া অনেকেই স্থানীয় পরিচিত মুখ ছিল না। তাদের বড় অংশ বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্র। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মুফতি সাঈদ নূর পরিচালিত সদর উপজেলার মিতরা গ্রামের নূরে কোরআন মাদরাসা থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্র ওই মিছিলে অংশ নেয়।
এ ছাড়া হামলার উসকানি ও সংগঠনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুফতি ওবায়দুল্লাহ, মুফতি মজিবুর রহমান, মাওলানা মাহাবুবুর রহমান, মাওলানা আশিকুল ইসলাম ছানোয়ার, আবদুল হান্নান, মুফতি আবদুল আল ফিরোজ, কারি সোহায়েল ও মুফতি আবদুল করিম কাসেমী। স্থানীয়দের দাবি, তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক বা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
শুধু মানিকগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় একই ব্যানারে বাউলশিল্পী, মাজার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, শতাধিক মাজার ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ মনে করেন, শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ওপর হামলাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের নীরব পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভয় ও অস্থিরতা তৈরি করতে চেয়েছে। একই সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টাও ছিল এসব হামলার পেছনে।
নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফও এসব ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের কোনো ব্যক্তি জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড বা নাশকতার সঙ্গে জড়িত নন। তার পরও অসংখ্য সাংস্কৃতিক কর্মী হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফের মতে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে। সংস্কৃতিচর্চা সব সময়ই সমাজে সহনশীলতা, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার চর্চা বাড়ায়। আর সেই জায়গাটিকেই দুর্বল করার চেষ্টা করেছে একটি উগ্র গোষ্ঠী।
আবৃত্তিশিল্পী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহর নামে একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অধিকাংশ মানুষই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ চর্চা করতে গিয়ে তাঁদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করা তো অন্যায় বা অসাংবিধানিক কিছু নয়। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর হামলা, হুমকিসহ হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
তিনি দাবি করেন, ‘সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বা যাঁরা হামলার শিকার হয়েছেন, আমি হলফ করে বলতে পারি, তাঁদের কেউই জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।’
Reporter Name 

























