ঢাকা ০২:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না, আবার পেলেও তাদের মজুরি অনেক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৭:২৮:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬
  • ১৭ বার

‘১০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। পানিতে সব তলিয়ে গেছে। ৪ হাজার ৫০০ টাকা শ্রমিক মজুরি দিয়ে দেড় বিঘা জমির ধান কেটেছি। যাতে অন্তত মাস দেড়মাস পরিবারের খাদ্যের সংকট না হয়। বাকি সব ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছি। এতো টাকা খরচ করে এই বছর শূন্য হাতে ফিরলাম হাওর থেকে।’

বোরো ধান নিয়ে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কেওলার হাওরের কৃষক ছনওয়ার মিয়া। শুধু ছনওয়ার মিয়াই নন, জেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরসহ সবকটি হাওরের হাজারো কৃষকের চিত্র এখন একই।

পানির দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে জানিয়ে ছনওয়ার মিয়া বলেন, টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না। আবার পেলেও তাদের মজুরি অনেক। টাকা দিয়ে ধান কেটে কী লাভ? এই ধান বাজারে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ বিক্রি করতে হচ্ছে।’

মৌলভীবাজারের হাওরগুলোতে তীব্র শ্রমিক সংকটে সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। ধান পাকার আগেই অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে মাঠ। কিছু এলাকায় বুক সমান পানি থেকে ধান কাটার সুযোগ থাকলেও শ্রমিকের উচ্চ মজুরি ও ধান বিক্রির লোকসানের ভয়ে চাষিরা ধান কাটছেন না। হাওরে এক বিঘা আধপচা ধান কাটতে শ্রমিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা, যা ধানের বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢলের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমি। এতে জেলার প্রায় ২০ হাজার কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না, আবার পেলেও তাদের মজুরি অনেক’

সরেজমিনে দেখা গেছে, রোদ থাকলেও আধপচা ধান শুকাতে পারছেন না কৃষকেরা। বাজারে একটু ভালো মানের ধান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বিক্রি হলেও পচা ধান বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। অন্যদিকে, সরকারি গুদামে ৩৬ টাকা কেজি দরে (১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ) ধান বিক্রির নিয়ম থাকলেও কঠোর শর্তের কারণে সাধারণ কৃষকের কাছে তা ‘সোনার হরিণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে পাইকারদের কাছে পানির দামে ধান বিক্রি করছেন তারা।

শ্রমিকেরা জানান, বুক সমান পানিতে ধান কাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় অনেকে হাওরে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট।

কাউয়াদিঘী হাওরের কৃষক তনু মিয়া, কয়ছর মিয়া বলেন, হাওরের বেশিরভাগ ধান কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কাটা হয়। কিন্তু পানি বেশি থাকায় মেশিনে ধান সম্ভব হচ্ছে না। আবার এ সমস্যার কারণে শ্রমিকরাও ধান কাটতে অনিচ্ছুক। হাওরে এক বিঘা ধান কাটতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা অনেক জায়গায় ধান ঘরে তুলতে পারেননি। শ্রমিক পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না, আবার পেলেও তাদের মজুরি অনেক

আপডেট টাইম : ০৭:২৮:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

‘১০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। পানিতে সব তলিয়ে গেছে। ৪ হাজার ৫০০ টাকা শ্রমিক মজুরি দিয়ে দেড় বিঘা জমির ধান কেটেছি। যাতে অন্তত মাস দেড়মাস পরিবারের খাদ্যের সংকট না হয়। বাকি সব ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছি। এতো টাকা খরচ করে এই বছর শূন্য হাতে ফিরলাম হাওর থেকে।’

বোরো ধান নিয়ে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কেওলার হাওরের কৃষক ছনওয়ার মিয়া। শুধু ছনওয়ার মিয়াই নন, জেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরসহ সবকটি হাওরের হাজারো কৃষকের চিত্র এখন একই।

পানির দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে জানিয়ে ছনওয়ার মিয়া বলেন, টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না। আবার পেলেও তাদের মজুরি অনেক। টাকা দিয়ে ধান কেটে কী লাভ? এই ধান বাজারে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ বিক্রি করতে হচ্ছে।’

মৌলভীবাজারের হাওরগুলোতে তীব্র শ্রমিক সংকটে সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। ধান পাকার আগেই অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে মাঠ। কিছু এলাকায় বুক সমান পানি থেকে ধান কাটার সুযোগ থাকলেও শ্রমিকের উচ্চ মজুরি ও ধান বিক্রির লোকসানের ভয়ে চাষিরা ধান কাটছেন না। হাওরে এক বিঘা আধপচা ধান কাটতে শ্রমিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৫ হাজার টাকা, যা ধানের বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢলের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমি। এতে জেলার প্রায় ২০ হাজার কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না, আবার পেলেও তাদের মজুরি অনেক’

সরেজমিনে দেখা গেছে, রোদ থাকলেও আধপচা ধান শুকাতে পারছেন না কৃষকেরা। বাজারে একটু ভালো মানের ধান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বিক্রি হলেও পচা ধান বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। অন্যদিকে, সরকারি গুদামে ৩৬ টাকা কেজি দরে (১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ) ধান বিক্রির নিয়ম থাকলেও কঠোর শর্তের কারণে সাধারণ কৃষকের কাছে তা ‘সোনার হরিণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে পাইকারদের কাছে পানির দামে ধান বিক্রি করছেন তারা।

শ্রমিকেরা জানান, বুক সমান পানিতে ধান কাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় অনেকে হাওরে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট।

কাউয়াদিঘী হাওরের কৃষক তনু মিয়া, কয়ছর মিয়া বলেন, হাওরের বেশিরভাগ ধান কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কাটা হয়। কিন্তু পানি বেশি থাকায় মেশিনে ধান সম্ভব হচ্ছে না। আবার এ সমস্যার কারণে শ্রমিকরাও ধান কাটতে অনিচ্ছুক। হাওরে এক বিঘা ধান কাটতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা অনেক জায়গায় ধান ঘরে তুলতে পারেননি। শ্রমিক পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।