জেলা পরিষদ ভারতীয় উপমহাদেশের অত্যন্ত শক্তিধর এবং ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় সরকার, যা গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে স্বীকৃত। ১৮৮২ সালে লর্ড রিপনের স্থানীয় সরকারবিষয়ক রেজুলেশনের সূত্র ধরে ১৮৮৫-৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে জেলা পরিষদ গঠিত হতে থাকে এবং নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯২০ সাল থেকে এ পরিষদসমূহে নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বশীলতার বিকাশ ঘটে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব পর্যন্ত এ দেশে জেলা পরিষদ ব্যবস্থা বহাল থাকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে পূর্ব প্রচলিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও নির্দেশনার অধীনে আনয়নের মাধ্যমে পূর্ব ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়। বিশেষত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯, ৬০ ও ১৫২ ধারাসমূহে ‘স্থানীয় সরকার’ বা স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের রূপ, চরিত্র, আদল, কার্যক্রম, প্রশাসন ও অর্থায়ন বিষয়ে ব্যাপক নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্বাধীনতার এই ৪৫ বছরে (২০১৬) সরকার ও সংবিধানে বহু ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও স্বাভাবিকভাবে তার প্রভাব পড়েছে। স্বাধীনতার পর পূর্ব ধারাবাহিকতায় গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে বহু-স্তরীয় একটি কাঠামো হিসেবে নীতিগতভাবে মেনে নেওয়া হয় এবং নগরের ক্ষেত্রে একস্তরীয় পৌরসভা কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনস্তরীয় গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ও শাসন ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদের ধারাবাহিকতা নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্ষিত হলেও অন্য দুটি স্তর তথা থানা ও জেলা পর্যায় নিয়ে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সংশয় ও সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করতে থাকে। ফলে দীর্ঘদিন যাবৎ ঐ দুই স্তরে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিকাশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এমনকি ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে যেটুকু প্রতিনিধিত্বশীল ছিল তাও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। ১৯৮১ সালের পরের দশ বছর থানা (বর্তমান উপজেলা) পর্যায়ে পরিষদ গঠিত হলেও তা পুনরায় আঠার বছর (১৯৯১-২০০৯) স্থগিত থাকে। জেলার ক্ষেত্রে সেটি আরও বেদনাদায়ক। জেলা নিয়ে স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকারের ভেতরে এক ধরনের টেনশন ও নার্ভাসনেস কাজ করেছে বলে প্রতীয়মান। জনপ্রতিনিধি ও স্থায়ী সিভিল সার্ভিস নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মেলবন্ধন ও পারস্পরিক সম্পর্কে পুনর্গঠনের রূপরেখা নিয়ে একটি অস্পষ্টতা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কোনো অবসান হয়নি। একদিকে জেলা ও উপজেলায় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসমূহের বিস্তৃতি ঘটেছে, অপরদিকে স্থানীয়ভাবে গণতান্ত্রিক প্রশাসন সৃষ্টির সাংবিধানিক অঙ্গীকার অধরা থেকে গেছে। বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি দপ্তর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা উপজেলা ভেদে যথাক্রমে চব্বিশ ও পনের শ। এর মধ্যে উপজেলা পরিষদ ভবনের বাইরে অবস্থানরত দপ্তর ও সেবা সংস্থাসমূহকে ধরা হয়নি। তেমনিভাবে জেলায় ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয় ছাড়া আরও তেতাল্লিশটি দপ্তর বিদ্যমান।
উপজেলা পরিষদ ১৯৯৮ সালের স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইন বলে ২০০৯ সালে গঠিত হয়েছে এবং উপজেলা পর্যায়ে সতেরটি দপ্তর পরিষদের আইন অনুযায়ী হস্তান্তরিত। কিন্তু এখানে নির্বাচিত পরিষদ, হস্তান্তরিত ১৭টি দপ্তর ও অহস্তান্তরিত ৭-৮টি দপ্তর মিলে সমন্বিত কোনো একীভূত প্রশাসন ও সেবাকাঠামো এখনো (২০১৬) গড়ে উঠেনি। জেলা পর্যায়ে দীর্ঘদিন নির্বাচিত পরিষদ অনুপস্থিত। কিন্তু জেলা পরিষদ ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নিয়মিত সরকারি বাজেট বরাদ্দ ব্যবস্থা ৪৫ বছর ধরেই আছে। প্রতিটি জেলা পরিষদের জেলাব্যাপী অনেক স্থাবর-অস্থাবর সহায়-সম্পদ রয়েছে। জেলা পরিষদের বিগত ৪৫ বছরের ধারাবাহিকতায় দেখা যায় এটি জেলা প্রশাসন, মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জেলা সংসদ সদস্যগণের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে।
স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন ২০০০ সালের অধীনে ধারা ৮০(২) অনুসরণ করে ২০১১ সালে জেলা পরিষদে সরকারি কর্মচারীদের বাইরে থেকে ‘রাজনৈতিক প্রশাসক’ নিয়োজিত হয়। প্রশাসক নিয়ন্ত্রিত জেলা পরিষদ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ বছর পূরণ করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে; আশা করা যায ডিসেম্বর ২০১৬ সালের মধ্যে দেশের সমতল ভূমির একষট্টিটি জেলা পরিষদে ২০০০ সালের জেলা পরিষদ আইনের অধীনে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জেলা পরিষদই হবে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত জেলা পরিষদ।
নির্বাচন পদ্ধতি এবং পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা নিয়ে জনমনে বহু প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্ন, তর্ক-বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তে দেশে প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ গঠিত হতে যাচ্ছে। জেলা পরিষদসমূহে একজন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সাধারণ আসনের সদস্য এবং ৫ জন সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য, সর্বমোট ২১ জন প্রতিনিধি নিয়ে এ ব্যবস্থা কার্যকর হতে যাচ্ছে।
বর্তমান আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, যে জেলা পরিষদ ২০১৭ থেকে ২০২১ সালÑ এ পাঁচ বছর কাজ করবে, সে পরিষদের সামনে কী কী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ আসতে পারে এবং সে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট করণীয়গুলো কী কী হতে পারে, সে সম্পর্কে কিছু সূত্রের সন্ধান করা এবং এসবের সমাধানকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ প্রণয়ন। নিম্নে কিছু কিছু প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট করণীয়গুলো লিপিবদ্ধ হলো।
১) নতুন ধারার নির্বাচন ও নেতৃত্ব : ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য জেলা পরিষদ নির্বাচন দেশের অন্য যে কোনো নির্বাচন থেকে ভিন্ন। নির্বাচকম-লীতে যারা থাকছেন তাদের মধ্যে ভিন্নতা আকাশ-পাতাল, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে মন্ত্রী পদমর্যাদার সিটি মেয়র পর্যন্ত তা বিস্তৃত। কিন্তু জেলার সাধারণ মানুষ ভোটাধিকারবিহীন। ‘সর্বজনীনপ্রাপ্ত বয়স্ক ভোটাধিকারের’ ভিত্তিতে নির্বাচনের যে ধারণা এ দেশে বিরাজমান, এখানে সে ধারণার প্রয়োগ হচ্ছে না। তাই জেলা পরিষদের কর্মকাণ্ডে জন-আগ্রহ স্বাভাবিকভাবে কম থাকবে। ইতিমধ্যে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে কোন ধরনের নেতৃত্ব ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে তাও ভাবনার বিষয়। বিশেষত জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান যদি বয়স, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, জনগ্রহণযোগ্যতা প্রভৃতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট জেলার একটি ‘সাম্মানিক মুখ’ হিসেবে আবির্ভূত না হন তাহলে প্রথম যাত্রায় জেলা পরিষদ হোঁচট খেতে বাধ্য। পরিষদের অন্য বিশজন সদস্য-সদস্যার মধ্যেও অভিজ্ঞ, রুচিশীল, গ্রহণযোগ্য প্রার্থী ও নেতৃত্বের সমাবেশ হলে জেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য তা হবে মানানসই। যেহেতু বিএনপিসহ অন্যান্য দলের অংশগ্রহণ থাকছে না, তাই জেলা পরিষদ স্বাভাবিকভাবেই থাকছে সরকারি দলের একক নিয়ন্ত্রণে। এক্ষেত্রে নেতৃত্বের গুণাবলী ও গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষমতাসীন দল সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখলে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক সত্ত্বেও প্রথম পরিষদে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার চ্যালেঞ্জ কিছুটা হলেও মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। জেলার বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক নেতৃত্ব, এমপি, মন্ত্রী সবার সঙ্গে সমান দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায় কাজ করতে সক্ষম, সে রকম নেতৃত্বের সমাবেশ না ঘটলে পরিষদের সহযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে। তাই সরকারি দলের প্রার্থী মনোনয়ন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২) জেলা প্রশাসক ও জেলা পর্যায়ের অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা : উপমহাদেশে ডেপুটি কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও তার কার্যক্রমের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুদীর্ঘকালের। ১৭৭২-৭৩ সালের পর থেকে জেলাকেন্দ্রিক সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামোর বিকাশ ও সংহতকরণ প্রায় ২৪০ বছরব্যাপী বিস্তৃত। ব্রিটিশ প্রশাসনের উত্তরাধিকার জেলার সাধারণ প্রশাসন পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের ৪৫ বছর পর্যন্ত একই ধারায় বিরাজমান। স্বাধীন বাংলাদেশে জেলায় কোনো সময়ই নির্বাচিত কাউন্সিল ছিল না। জেলা প্রশাসন ও জেলা পরিষদ, প্রশাসন ও উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট সীমারেখায় নিজেদের কে কতটুকু সংযত রাখবেন এবং কেউ কারও নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করার নীতিকে কতটুকু সম্মান করবেন তার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে। তবে কিছু কিছু কর্মএলাকা রয়েছে যেখানে জেলা পরিষদ স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণে আগ্রহী হবে, সেক্ষেত্রে সনাতনী ঐতিহ্যের বিপরীতে জেলা প্রশাসক কতটুকু তাদের ছাড় দেবেন বা সহ্য করবেন সে অবস্থাটি দেখার বিষয়। যেমনÑ জেলার ‘উন্নয়ন সমন্বয়’ এ কাজটি কোন কার্যালয় থেকে হবে? ভূমি প্রশাসন, প্রটোকল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলাসহ শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে ডেপুটি কমিশনারের সনাতনী ভূমিকার অতিরিক্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য ও অন্যান্য সবকিছু মিলিয়ে জেলা প্রশাসকের যে কর্মতালিকা, তাতে ৫০২টি কাজের একটি সুদীর্ঘ তালিকা রয়েছে। শতাধিক কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ডেপুটি কমিশনারের উপর ন্যস্ত। এক্ষেত্রে জেলা পরিষদ পুনর্গঠিত হওয়ার পর ডেপুটি কমিশনারের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রমে নতুন এডজাস্টমেন্টের প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জিং বিষয় হবে জেলায় বিরাজিত অন্য ৪৩টি সংস্থা বা দপ্তরের সঙ্গে জেলা পরিষদের কার্যক্রমগত সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে। বর্তমান আইনি ব্যবস্থায় জেলা পরিষদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা অন্য ৪৩টি দপ্তর, কারও সঙ্গে সম্পর্কে স্বরূপ স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি বা নির্ণীত হয়নি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেভাবেই দেখা হোক না কেন তা আসবেই এবং আসতে বাধ্য। এখানে সরকারকে আনুভূমিক কর্ম-সম্পর্ক বিবেচনায় গ্রহণ করে বিধিমালা বা নির্দেশনা দিতে হবে। নতুবা শুরুতেই কর্মের আওতা ও অধিক্ষেত্র নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।
প্রতিটি পরিষদে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, যিনি সরকার থেকে প্রেষণে নিয়োজিত এবং যার সিভিল সার্ভিসের পদমর্যাদা উপ-সচিব এবং একজন সচিবসহ কম-বেশি ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকছেন। তাদের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। তাছাড়াও একটি জেলায় অরাষ্ট্রীয় বহু সংস্থা এবং ব্যক্তিখাতে বহু উন্নয়ন ও সেবাকর্ম রয়েছে। সেগুলোর সঙ্গেও জেলা পরিষদের একটি আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়নি। আইন এখানে নীরব। এখানেও রশি টানাটানি হতে পারে। জেলা পরিষদ আইন ‘জেলার সব উন্নয়ন কর্মকান্ড পর্যালোচনার’ ম্যান্ডেট জেলা পরিষদকে দিয়েছে। তাছাড়া আইনের ধারা ৩৪-এ ৭টি স্থায়ী কমিটির বিধান রয়েছে। এ ৭টি স্থায়ী কমিটির আওতায় জেলা পরিষদ প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করতে পারবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় অর্থাৎ জেলা পর্যায়ের বা বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাগণের ভূমিকা ও মনোভাবকে তাই বিবেচনায় নিতে হবে। এ ব্যাপারেও আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। একইভাবে জেলা পরিষদে সরকার কর্তৃক প্রেষণে নিয়োজিত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিবসহ অন্যদের সঙ্গে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহীর অর্থাৎ চেয়ারম্যানের সম্পর্কের বিষয়টিও সংশয় ও সন্দেহমুক্ত করে সহযোগিতার ভিত্তি নির্মাণের একটি কাঠামো নির্ণয় করে দিতে হবে। জেলা পরিষদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে জেলার সব মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে জেলা পরিষদের সম্পর্ককে সম্পূরক-পরিপূরকভাবে গড়ে তোলার বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যেতে পারে এবং এটি সমাধানের বিষয়টি সুরাহা করতে হবে। বর্তমান আইনি কাঠামো এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়।
৩) জেলার সব জাতীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে জেলা পরিষদের সম্পর্ক : একটি জেলায় ৭০ থেকে ১০০টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৫-১০টি উপজেলা পরিষদ, একাধিক পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এবং বেশ কয়েকজন জাতীয় সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গ রয়েছেন। তারা সবাই জনপ্রতিনিধি। আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধিদের সুবিধা-অসুবিধা যাই-ই বলি, তা হচ্ছে তারা সুনির্দিষ্ট একটি কর্মপরিধি, আচরণবিধি বা কর্মশৃঙ্খলায় আবদ্ধ থাকতে অভ্যস্ত নন। এখানে আবার অনেকের নির্বাচনি এলাকা এক ও অভিন্ন। তাই জেলা পরিষদ এক্ষেত্রে কর্মএলাকা এবং উন্নয়ন ইস্যু বা নিজস্ব কাজের বিষয় ও আওতা নির্ধারণে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। বিশেষত জাতীয় সংসদ সদস্যগণের সঙ্গে একই দলের সদস্য ও নেতা হওয়ার পরও এ সমস্যা অনিবার্য হয়ে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে জেলা পরিষদের অর্থ-সম্পদ বিলি বণ্টনে স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্যদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। জেলা পরিষদ ব্যবস্থায় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অর্থ-ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও আইনের প্রয়োগ ছিল সীমিত। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত ঢাকা জেলা পরিষদে বিগত পাঁচ বছরে নানা অনিয়মের চিত্রে তা স্পষ্ট। জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের পরও এ অবস্থাটির বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। জেলা পরিষদ আইনের ধারা ৩০ অনুযায়ী স্থানীয় সংসদ সদস্যগণ জেলা পরিষদের উপদেষ্টা। এক্ষেত্রে উপদেষ্টার ভূমিকা ও কর্মপদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে নিরূপিত নয়, তাই অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারই উপদেষ্টার মুখ্য ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায়। জেলা পরিষদকে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার অধীনে কার্যনির্বাহ করতে হলে যথাসম্ভব অনানুষ্ঠানিক চাপ ও প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এটি জেলা পরিষদ, সরকার এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য, সবার জন্যই একটি চ্যালেঞ্জ।
৪) জেলা পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধি : দেশের প্রতিটি জেলা পরিষদের নতুন ২১ জন নির্বাচিত চেয়ারম্যান/সদস্য এবং ৪০ জন করে কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের সবারই ব্যাপক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তব কর্মদক্ষতার অভাব রয়েছে। নতুন নির্বাচিতদের মধ্যে রাজনৈতিক দলীয় কাজের সক্ষমতা থাকলেও প্রশাসনিক ও সরকারি অর্থ-সম্পদ ব্যবহারের নিয়ম-কানুন তাদের জানতে হবে। এ জন্য প্রথম বছরের মধ্যে ব্যাপক প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বিষয়ে সক্ষমতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন আইনের প্রয়োগ, পরিষদের প্রশাসন, সেবা, অর্থ-ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয়ে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম হাতে নিতে বিলম্ব হলে প্রতিষ্ঠানের সমূহ ক্ষতি হতে পারে। অপরদিকে জেলায় কর্মরত সরকারি বিভাগগুলোর মধ্যে পরিষদকে এড়িয়ে চলার পরিবর্তে পরিষদকে নিয়ে কাজ করার জন্য স্পষ্ট সরকারি নির্দেশনা প্রয়োজন।
৫) অন্যান্য চ্যালেঞ্জ : জেলা পরিষদের অনেক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিশেষত জমি বেদখল হয়ে আছে। অনেকক্ষেত্রে দখলে থাকলেও নামমাত্র ভাড়ায় কিছু কায়েমি স্বার্থবাদী মহল ভোগদখল করছে। অনেক ভবন, স্থাপনা ইত্যাদি অরক্ষিত এবং সংস্কারবিহীন অবস্থায় আছে। এক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে এসব পুনরুদ্ধার করে পরিষদের নিজস্ব আয় অনেক বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ বিষয়ে প্রতিটি পরিষদের দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরদিকে একটি দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী দল গড়ে তোলা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সততা ও নিষ্ঠাকে একত্রিত করে কার্যকর পরিষদ কাঠামো গড়ে তোলা সবার জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্ভাবনাসমূহ : জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকারের একটি অমিত সম্ভাবনার জায়গা। কারণ এখানে দক্ষতার ঘাটতি থাকলেও জনবল ও সম্পদের অভাব তত প্রকট নয়। বিগত দিনে ‘প্রশাসক’ নিয়োগের পর প্রশাসকগণের পাঁচ বছরের অবস্থানে অনেক জেলা পরিষদ একটি দপ্তর বা সংগঠন হিসেবে কিছু ইতিবাচক কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। অনেক জেলা পরিষদ তাদের অদখলীয় ও বেদখলীয় স্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। নিজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং ইউনিয়ন ও উপজেলার সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। জমি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে নওগাঁ, নিচের দিকের পরিষদগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণে খুলনা ও যশোর এবং স্থানীয়ভাবে নিজস্ব আয় বৃদ্ধিতে চট্টগ্রামের উদাহরণ প্রশংসাযোগ্য।
আমরা আশা করি, জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার গড়ার পথে বাংলাদেশে একটি নবতর অধ্যায়ের সূচনা হবে। মাঠ প্রশাসন, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানসমূহ (ইউনিয়ন, উপজেলা এবং পৌরসভা) এবং অরাষ্ট্রীয় উদ্যোগসমূহ একটি সমন্বিত ও গতিশীল স্থানীয় উন্নয়ন ও সেবা কাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
Reporter Name 






















